রীর গর্ভে

  • অন্য নারীর গর্ভে সন্তান ধারণ- ইসলাম কী বলে?

    অন্য নারীর গর্ভে সন্তান ধারণ- ইসলাম কী বলে?

    আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে নানা ধরনের নতুন পদ্ধতি চালু হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘সারোগেসি’ বা অন্য নারীর গর্ভে সন্তান ধারণ। কোনো দম্পতি সন্তান ধারণে অক্ষম হলে অন্য একজন নারীর গর্ভে ভ্রূণ স্থাপন করে সন্তান জন্ম দেওয়ার এই পদ্ধতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে মুসলিম সমাজে এ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে- ইসলামের দৃষ্টিতে অন্য নারীর গর্ভে সন্তান ধারণ করা কি বৈধ?
    ইসলামী শরিয়াহর দৃষ্টিতে বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কারণ সন্তান জন্মদানের সঙ্গে শুধু চিকিৎসা বা প্রযুক্তির বিষয় জড়িত নয়; এর সঙ্গে বংশপরিচয়, বৈবাহিক সম্পর্ক, মাতৃত্ব এবং উত্তরাধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ শরিয়াহভিত্তিক বিষয়ও সম্পৃক্ত। এ কারণে কৃত্রিম প্রজনন বা সারোগেসি নিয়ে ইসলামী ফিকহবিদ ও আলেমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

    সারোগেসি কী?
    সারোগেসি বলতে সাধারণত এমন একটি প্রক্রিয়াকে বোঝায়, যেখানে কোনো নারী অন্য দম্পতির জন্য গর্ভধারণ করেন এবং সন্তান জন্ম দেন। এর বিভিন্ন ধরন রয়েছে। কখনো স্বামী-স্ত্রীর ডিম্বাণু ও শুক্রাণু দিয়ে পরীক্ষাগারে ভ্রূণ তৈরি করে অন্য নারীর জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। আবার কখনো গর্ভধারণকারী নারীর ডিম্বাণুও ব্যবহার করা হয়।
    ইসলামী বিধান নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে প্রশ্ন আসে-সন্তানের জৈবিক পিতা-মাতা কারা, গর্ভধারণকারী নারী কে এবং সন্তানটির বংশপরিচয় কীভাবে নির্ধারিত হবে।

    স্বামী-স্ত্রীর ভ্রূণ হলেও অন্য নারীর গর্ভে?
    ইসলামী বিশ্বের অধিকাংশ সমসাময়িক ফিকহি প্রতিষ্ঠান ও আলেমের মত হলো, স্বামী-স্ত্রীর ভ্রূণ অন্য কোনো নারীর গর্ভে স্থাপন করে সন্তান জন্ম দেওয়ার পদ্ধতি বৈধ নয়। কারণ, ইসলামে সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে বৈধ বিবাহের সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর নিজস্ব শুক্রাণু ও ডিম্বাণু ব্যবহার করা হলেও ভ্রূণটি যদি তৃতীয় কোনো নারীর গর্ভে ধারণ করা হয়, তাহলে মাতৃত্বের পরিচয় নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। যে নারী সন্তান জন্ম দিচ্ছেন, তিনি কি মা হিসেবে গণ্য হবেন, নাকি যার ডিম্বাণু থেকে ভ্রূণ তৈরি হয়েছে তিনি মা- এ প্রশ্নের সৃষ্টি হয়।
    পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মানুষের বংশপরিচয় সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। সূরা আল-আহযাবের ৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, সন্তানদের তাদের পিতার পরিচয়ে ডাকতে হবে; এটাই আল্লাহর কাছে অধিক ন্যায়সংগত।
    ইসলামী শরিয়াহতে বংশপরিচয় বা ‘নসব’ সংরক্ষণ পাঁচটি মৌলিক উদ্দেশ্যের অন্যতম হিসেবে বিবেচিত। তাই এমন কোনো পদ্ধতি যাতে সন্তানের বংশপরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে, তা নিয়ে শরিয়াহ অত্যন্ত সতর্ক।

    কেন সারোগেসি নিয়ে আপত্তি?
    সারোগেসির ক্ষেত্রে প্রধান আপত্তিগুলোর একটি হলো তৃতীয় ব্যক্তির গর্ভধারণের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। ইসলামে বিবাহের বাইরে সন্তান উৎপাদনের কোনো সুযোগ নেই। বৈধ দাম্পত্য সম্পর্কের বাইরে কোনো তৃতীয় ব্যক্তিকে সন্তান জন্মদানের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করলে বৈবাহিক সম্পর্কের স্বাতন্ত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
    এ ছাড়া গর্ভধারণকারী নারীর সঙ্গে গর্ভস্থ সন্তানের একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি হয়। গর্ভধারণ, প্রসব ও মাতৃদুগ্ধের মতো বিষয়গুলো ইসলামী দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সন্তানটির প্রকৃত মাতৃত্ব কার- এ প্রশ্নটি শুধু জৈবিক নয়, বরং শরিয়াহ ও পারিবারিক অধিকারের সঙ্গেও সম্পর্কিত। এ কারণে অধিকাংশ ফিকহবিদ সারোগেসিকে অনুমোদন করেননি।
    স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কৃত্রিম প্রজনন কি বৈধ?
    এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলাদা করে বোঝা প্রয়োজন। সারোগেসি নিষিদ্ধ হওয়ার অর্থ এই নয় যে ইসলামে সব ধরনের কৃত্রিম প্রজনন নিষিদ্ধ।
    চিকিৎসাগত প্রয়োজনে স্বামী-স্ত্রীর নিজেদের শুক্রাণু ও ডিম্বাণু ব্যবহার করে চিকিৎসা পদ্ধতিতে সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে অনেক আলেম শর্তসাপেক্ষে অনুমতি দিয়েছেন। যেমন- ভ্রূণ তৈরিতে শুধু বৈধ স্বামী-স্ত্রীর প্রজনন উপাদান ব্যবহার করতে হবে এবং ভ্রূণটি স্ত্রীর নিজের জরায়ুতেই স্থাপন করতে হবে।
    অর্থাৎ চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করা হলেও তাতে তৃতীয় কোনো নারী বা পুরুষের প্রজনন উপাদান যুক্ত করা যাবে না। একইভাবে স্ত্রীর তৈরি ভ্রূণ অন্য কোনো নারীর গর্ভে স্থাপন করাও অধিকাংশ আলেমের মতে বৈধ নয়।

    ডিম্বাণু বা শুক্রাণু দান প্রসঙ্গে
    ইসলামী শরিয়াহর দৃষ্টিতে স্পার্ম ডোনেশন বা ডিম্বাণু দানের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অপরিচিত পুরুষের শুক্রাণু বা অপরিচিত নারীর ডিম্বাণু ব্যবহার করে সন্তান জন্ম দেওয়া অধিকাংশ ইসলামী ফিকহবিদ বৈধ মনে করেন না।
    কারণ, এতে সন্তানের বংশপরিচয় নিয়ে গুরুতর সমস্যা তৈরি হতে পারে। একজন পুরুষের শুক্রাণু এবং অন্য নারীর ডিম্বাণু ব্যবহার করে সন্তান জন্মালে শিশুটির জৈবিক পিতা-মাতা তার বৈধ দাম্পত্য সম্পর্কের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে না। ইসলামে বংশপরিচয় সংরক্ষণের যে নীতি রয়েছে, এ ধরনের পদ্ধতি তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বিবেচিত হয়।

    সন্তানের অধিকার কী হবে?
    সারোগেসির অন্যতম জটিল দিক হলো সন্তানের অধিকার। সন্তান জন্মের পর তার পরিচয়, পিতৃত্ব, মাতৃত্ব, উত্তরাধিকার, মাহরাম সম্পর্ক এবং পারিবারিক অধিকার নির্ধারণ করতে হয়।
    ইসলাম শিশুর কোনো অপরাধ নেই—এই নীতিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। কোনো পদ্ধতি শরিয়াহসম্মত না হলেও সেই পদ্ধতির মাধ্যমে জন্ম নেওয়া শিশুকে দায়ী করা যাবে না। শিশুর প্রতি অন্যায় করা, তাকে অবহেলা করা বা তার অধিকার নষ্ট করা ইসলামে অনুমোদিত নয়।
    তাই কোনো সারোগেসি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সন্তান জন্ম নিলে তার সঙ্গে মানবিক ও ন্যায়সংগত আচরণ করা জরুরি। তবে এই বাস্তবতা সারোগেসি প্রক্রিয়াটিকে শরিয়াহসম্মত করে না।

    চিকিৎসার প্রয়োজন হলে কী করা উচিত?
    সন্তান লাভের আকাক্সক্ষা স্বাভাবিক। সন্তান না হওয়া অনেক দম্পতির জন্য কঠিন মানসিক পরীক্ষা হতে পারে। ইসলাম চিকিৎসা গ্রহণকে নিরুৎসাহিত করে না। বরং বৈধ উপায়ে চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।

    বন্ধ্যাত্ব বা সন্তান ধারণে সমস্যার ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন। তবে কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণের আগে সেটি শরিয়াহসম্মত কি না, তা জেনে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
    যদি চিকিৎসার এমন কোনো পদ্ধতি হয় যেখানে স্বামী-স্ত্রীর নিজেদের প্রজনন উপাদান ব্যবহার করা হবে এবং ভ্রূণ স্ত্রীর নিজের গর্ভেই স্থাপন করা হবে, তাহলে সংশ্লিষ্ট আলেম বা ইসলামী ফিকহ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

    ইসলামের মূল শিক্ষা
    ইসলামে সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি নিয়ামত। সন্তান লাভের আকাঙ্ক্ষা যেমন বৈধ, তেমনি সন্তান লাভের জন্য বৈধ পথ অনুসরণ করাও জরুরি। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মুসলমানের জন্য চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণের ক্ষেত্রে শরিয়াহর সীমারেখা অতিক্রম করা উচিত নয়।
    অন্য নারীর গর্ভে স্বামী-স্ত্রীর ভ্রূণ ধারণের বিষয়ে অধিকাংশ সমসাময়িক ইসলামী ফিকহবিদের মত হলো- এটি বৈধ নয়। এর প্রধান কারণ হলো বংশপরিচয় সংরক্ষণ, মাতৃত্বের পরিচয় স্পষ্ট রাখা এবং বৈধ দাম্পত্য সম্পর্কের সীমা অক্ষুণ্ন রাখা।
    তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নানা নতুন পদ্ধতি নিয়ে ফিকহি আলোচনা চলমান রয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি বৈধ কি না, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে পদ্ধতিটির প্রকৃতি, কার প্রজনন উপাদান ব্যবহৃত হচ্ছে, ভ্রূণ কোথায় স্থাপন করা হচ্ছে এবং চিকিৎসাগত প্রয়োজন কতটা- এসব বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। তাই সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে সারোগেসি বা কৃত্রিম প্রজননের কোনো পদ্ধতি গ্রহণের আগে শুধু চিকিৎসকের পরামর্শ নয়, বিশ্বস্ত আলেম বা ইসলামী ফিকহ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ। এতে একদিকে চিকিৎসার সুযোগ নেওয়া সম্ভব হবে, অন্যদিকে ইসলামী শরিয়াহর বিধানও যথাসম্ভব মেনে চলা যাবে।