আয়কর আইন অনুযায়ী কোম্পানিগুলো তাদের বার্ষিক মুনাফা থেকে ঋণের সুদকে ‘ব্যয়’ হিসেবে বাদ দিয়ে নিট মুনাফা দেখায়। এর ফলে কোম্পানিগুলোর করে হিসেবে জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে এটি উপস্থাপন করেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর মূল উদ্দেশ্য হলো—কোম্পানিগুলো যেন ঋণের সুদের বিপরীতে বারবার ‘ব্যয়ের’ সুবিধা নিয়ে সরকারকে কর ফাঁকি দিতে না পারে। কোম্পানি সুদের যে ব্যয় দাবি করে, তা তিন বছরের মধ্যে পরিশোধ না করলে সরকার ধরে নেবে—এটি আসলে ব্যয় ছিল না, বরং মুনাফা ছিল। তাই ওই সুদের ওপর এখন কর দিতে হবে।
এ বিষয়ে এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, অ্যাকাউন্টিংয়ের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অ্যাক্রুয়াল বেসিসে হিসাব করা হয়। কিন্তু আয়কর আইনে যে বিধানটি রয়েছে, সেটা করা হয়েছে কস্ট বেসিসে। এখন নতুন ধারা যুক্ত করে অ্যাকাউন্টিংয়ের ক্ষেত্রে আইএফআরএসের (ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং সিস্টেমের) সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য কোম্পানির ব্যয়ের হিসাবকেও অ্যাক্রুয়াল বেসিসে করা হয়েছে। আয়কর আইনের ইংরেজি ভার্সনে বিষয়টি ঠিকই আছে, কিন্তু বাংলায় অনুবাদ করতে গিয়ে কোনো কারণে মিসিং হয়ে গিয়েছিল। ফলে নতুন করে এ ধারাটি সংযোজন করতে হচ্ছে।
অ্যাক্রুয়াল ও কস্ট বেসিসে হিসাবের পার্থক্যটি নিচের উদাহরণের মাধ্যমে স্পষ্ট করা যেতে পারে। ধরা যাক, একটি কোম্পানি একটি ব্যাংক থেকে এক কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যার বার্ষিক সুদ ১০ লাখ টাকা।
অ্যাক্রুয়াল বেসিস : হিসাববিজ্ঞানের নিয়ম (আইএফআরএস) অনুযায়ী, আপনি এই বছর টাকা পরিশোধ না করলেও ওই ১০ লাখ টাকা আপনার চলতি বছরের ‘খরচ’ । কারণ, সুদটি এই বছরেরই এবং কোম্পানি এটি পরিশোধ করতে বাধ্য। তাই আর্থিক বিবরণীতে আপনি ১০ লাখ টাকাই খরচ দেখাবেন।
কস্ট বেসিস : আয়কর আইন অনুযায়ী, এনবিআর আগে বলত—‘টাকা পকেট থেকে না গেলে (বা পরিশোধ না হলে) সেটি খরচ হিসেবে গণ্য হবে না।’ ফলে কোম্পানি ওই ১০ লাখ টাকা খরচ হিসেবে দেখালেও, ট্যাক্স রিটার্নে এনবিআর ওই খরচটি বাতিল করে দিত এবং ওই টাকার ওপর কর আরোপ করত।
সমস্যাটি কোথায় ছিল?
এতে কোম্পানির বইতে একটি বা সময়ের পার্থক্য তৈরি হতো। অ্যাকাউন্টিং বলছে এটা খরচ, কিন্তু ট্যাক্স ল বলছে এটা খরচ নয়। নতুন ধারার অর্থ হলো—এনবিআর এখন বলছে, ‘ঠিক আছে, তোমরা তো অ্যাক্রুয়াল বেসিসে এটাকে খরচ হিসেবে দেখাচ্ছ, আমরা সেটাকে অনুমোদন দেব। কিন্তু এই সুযোগ অনন্তকাল চলতে পারে না।’
অর্থাৎ, যদি তিন বছর পর্যন্ত সুদ পরিশোধ না করে ওই টাকাটা ঋণের মূলধনের সঙ্গে যোগ করে বা অন্যভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়, তবে সরকার চতুর্থ বছরে এসে সেটিকে আয় হিসেবে গণ্য করে কর দাবি করবে।