মোবাইল অপারেটর

  • টাওয়ার ছাড়াই মুঠোফোনে যোগাযোগের বাণিজ্যিক অনুমোদন চায় বাংলালিংক

    টাওয়ার ছাড়াই মুঠোফোনে যোগাযোগের বাণিজ্যিক অনুমোদন চায় বাংলালিংক

    দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, চর, দ্বীপ কিংবা সাগরে থাকা মানুষকে মুঠোফোন নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ডিরেক্ট-টু-সেল’ (ডিটুসি) সেবা চালু করেছিল বাংলালিংক। এ কার্যক্রম সফল হয়েছে দাবি করে স্যাটেলাইটভিত্তিক এই সেবা এবার বাণিজ্যিকভাবে চালু করতে চায় অপারেটরটি। এ জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছে আবেদন করেছে বাংলালিংক।

    স্টারলিংকের সঙ্গে অংশীদারত্বে এ সেবা চালাবে বাংলালিংক। অনুমোদন পেলে শুরুতে এসএমএস ও লাইট ডেটা সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ভয়েস ও ডেটা সেবা বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।

    তবে দেশের সব অঞ্চলে মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, চর, দ্বীপ, উপকূল ও গভীর সমুদ্রে স্থলভিত্তিক নেটওয়ার্ক অবকাঠামো তৈরি করা কঠিন। এসব এলাকায় নতুন টাওয়ার স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচও তুলনামূলক বেশি।

    যেভাবে কাজ করে ডিটুসি

    সাধারণ মুঠোফোনের যোগাযোগব্যবস্থা মূলত ভূমিতে স্থাপিত মোবাইল টাওয়ারের ওপর নির্ভরশীল। ফোন থেকে পাঠানো সংকেত প্রথমে কাছের মোবাইল টাওয়ারে যায়। কিন্তু কোনো এলাকায় টাওয়ার না থাকলে বা দুর্যোগে টাওয়ার অচল হয়ে গেলে মুঠোফোনে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না।

    ডিরেক্ট-টু-সেল প্রযুক্তিতে মুঠোফোনের সংকেত সরাসরি মহাকাশে থাকা স্যাটেলাইটে পৌঁছায়। স্যাটেলাইট সেই সংকেত গ্রাউন্ড স্টেশনে পাঠায়। এরপর সেটি সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বার্তা বা ডেটা আদান-প্রদানের সুযোগ তৈরি করে। এ প্রযুক্তির বড় সুবিধা হলো, সেবা পেতে আলাদা স্যাটেলাইট ফোন বা বিশেষ কোনো যন্ত্রের প্রয়োজন হয় না।

    প্রযুক্তিগতভাবে উপযোগী সাধারণ ফোর–জি মুঠোফোন ব্যবহার করেই সেবা নেওয়া সম্ভব। মোবাইল টাওয়ারের কভারেজের বাইরে গেলে ফোনটি স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করবে।

    কোনো এলাকায় টাওয়ার না থাকলে বা দুর্যোগে টাওয়ার অচল হয়ে গেলে মুঠোফোনে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না।

    কেন দরকার

    বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশের চারটি মোবাইল অপারেটরের মোট মুঠোফোন গ্রাহক ১৯ কোটির কাছাকাছি। মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করেন প্রায় ১২ কোটি গ্রাহক। অপারেটরগুলোর নিজস্ব টাওয়ার রয়েছে ২১ হাজার ৩৬৯টি। এর বাইরে সাত হাজারের বেশি টাওয়ার ভাগাভাগি করে ব্যবহার করা হচ্ছে।

    তবে দেশের সব অঞ্চলে মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, চর, দ্বীপ, উপকূল ও গভীর সমুদ্রে স্থলভিত্তিক নেটওয়ার্ক অবকাঠামো তৈরি করা কঠিন। এসব এলাকায় নতুন টাওয়ার স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচও তুলনামূলক বেশি। ফলে কম জনসংখ্যার বা দুর্গম এলাকায় টাওয়ার স্থাপনে অপারেটরদের আগ্রহ কম থাকে।

    ডিরেক্ট-টু-সেল প্রযুক্তি সেই সীমাবদ্ধতা কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। যেখানে টাওয়ার স্থাপন করা কঠিন, সেখানে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সাধারণ মুঠোফোনে সীমিত যোগাযোগসেবা দেওয়া সম্ভব হবে।

    বাংলালিংক বলছে, পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিটিআরসি, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি ও নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তাদের সামনে ডিরেক্ট-টু-সেল সেবার প্রদর্শনী করেছে।

    পরীক্ষামূলক কার্যক্রম

    চলতি বছরের এপ্রিল মাসে স্টারলিংকের মাধ্যমে ডিরেক্ট-টু-সেল সেবা পরীক্ষার জন্য বিটিআরসির অনুমতি চেয়েছিল বাংলালিংক। গত মে মাসে সরকার দুই মাসের প্রুফ অব কনসেপ্ট (পিওসি) পরীক্ষার অনুমতি দেয়। পরীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল প্রচলিত মোবাইল টাওয়ারের বাইরে থাকা এলাকায় স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সাধারণ মুঠোফোনে মোবাইল সংযোগ দেওয়া কতটা কার্যকর, তা যাচাই করা। পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের সময় বান্দরবান, সন্দ্বীপসহ নেটওয়ার্ক কভারেজের বাইরে থাকা এলাকায় প্রযুক্তিটি পরীক্ষা করা হয়।

    বাংলালিংক বলছে, পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিটিআরসি, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি ও নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তাদের সামনে ডিরেক্ট-টু-সেল সেবার প্রদর্শনী করেছে বাংলালিংক। প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক তথ্যমতে, সেখানে এসএমএস, ওটিটি-ভিত্তিক মেসেজিং, ওটিটি ভয়েস কলসহ বিভিন্ন কার্যকারিতা দেখানো হয়েছে।

    সফলভাবে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ করার পর আমরা এখন প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের অপেক্ষায় আছি। অনুমোদন পাওয়া গেলে বাণিজ্যিকভাবে এই উদ্ভাবনী প্রযুক্তি চালু করা সম্ভব হবে

    বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তৈমুর রহমান

    বাণিজ্যিক অনুমোদন চেয়ে চিঠি

    পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ করার পর স্টারলিংকের সঙ্গে অংশীদারত্বে সেবাটি বাণিজ্যিকভাবে চালুর অনুমোদন চেয়ে সম্প্রতি বিটিআরসিকে চিঠি দিয়েছে বাংলালিংক। চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রচলিত এলটিই-সক্ষম মুঠোফোন কোনো বাড়তি যন্ত্র ছাড়াই সরাসরি ডিটুসি সেবায় যুক্ত হতে পারে—পিওসিতে তা প্রমাণিত হয়েছে। এই ভিত্তিতে বিদ্যমান সেলুলার মোবাইল সার্ভিসেস অপারেটর লাইসেন্সের আওতায় প্রাথমিকভাবে এসএমএস ও লাইট ডেটা সেবা দিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর অনুমতি চেয়েছে তারা।

    চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সাধারণ মোবাইল টাওয়ার বা ফাইবার নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে ডিটুসি বিকল্প যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে। এ ছাড়া গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া জেলে ও অন্য সামুদ্রিক পেশাজীবীরা, যাঁরা বর্তমানে স্থলভিত্তিক মোবাইল নেটওয়ার্কের কভারেজের বাইরে থাকেন, তাঁরাও এর মাধ্যমে সংযুক্ত থাকার সুযোগ পাবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

    বাংলালিংক আরও জানিয়েছে, সেবা চালুর ক্ষেত্রে কমিশনের নির্ধারিত সব শর্ত ও নির্দেশনা মেনে চলতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

    জানতে চাইলে বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তৈমুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্টারলিংকের ডিরেক্ট-টু-সেল প্রযুক্তি দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সফলভাবে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ করার পর আমরা এখন প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের অপেক্ষায় আছি। অনুমোদন পাওয়া গেলে বাণিজ্যিকভাবে এই উদ্ভাবনী প্রযুক্তি চালু করা সম্ভব হবে।’

    স্টারলিংকের সঙ্গে অংশীদারত্বে এ সেবা চালাবে বাংলালিংক। অনুমোদন পেলে শুরুতে এসএমএস ও লাইট ডেটা সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ভয়েস ও ডেটা সেবা বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।

    শুরুতে যে সেবা মিলবে

    বাংলালিংক সূত্র বলছে, বাণিজ্যিক অনুমোদন পেলে প্রথম পর্যায়ে এসএমএস ও ওটিটি মেসেজিং চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী ধাপে ভয়েস ও ডেটা সেবা যুক্ত হতে পারে। অর্থাৎ শুরুতেই সাধারণ মোবাইল ইন্টারনেটের মতো উচ্চগতির ইন্টারনেট পাওয়া যাবে—এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। ডিরেক্ট-টু-সেলের বর্তমান ব্যবহারে মূল সুবিধা হলো, প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা অবস্থায়ও সীমিত ব্যান্ডউইথে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করা।

    নিয়ন্ত্রক অনুমোদনে প্রশ্ন

    পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফল হওয়ার পরও বাণিজ্যিক সেবা চালুর আগে নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বিটিআরসি বাংলালিংককে যে অনুমতি দিয়েছিল, তা ছিল শুধু পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের জন্য। সেই অনুমোদনকে ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক অনুমোদনের নিশ্চয়তা হিসেবে ধরা যাবে না—এমন শর্তও ছিল।

    এর বাইরে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ডিরেক্ট-টু-সেল সেবার জন্য ব্যবহৃত স্পেকট্রাম নিয়ে আলোচনা চলছে। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) আওতায় মুঠোফোন সেবার জন্য নির্ধারিত আইএমটি ব্যান্ড স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মোবাইল সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ২০২৭ সালের ওয়ার্ল্ড রেডিওকমিউনিকেশন কনফারেন্সে (ডব্লিউআরসি) এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

    বাংলাদেশের নিজস্ব নিয়ন্ত্রক কাঠামোতেও এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিটিআরসির এনজিএসও (নন-জিওস্টেশনারি অরবিট) স্যাটেলাইট সার্ভিসের গাইডলাইনে এই লাইসেন্সের আওতায় ‘স্যাটেলাইট ও স্থলভিত্তিক আইএমটি সেবা’ দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আইএমটি বলতে মূলত মুঠোফোন সেবার জন্য ব্যবহৃত প্রযুক্তি ও স্পেকট্রামকে বোঝায়।

    যদিও বিটিআরসির একটি সূত্র বলছে, ডিটুসি প্রযুক্তির বিষয়টি কমিশন ইতিবাচকভাবে ভাবছে।

    বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব) এমদাদ উল বারী প্রথম আলোকে বলেন, ডিরেক্ট-টু-সেল প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের প্রতিবেদন এখনো কমিশনের হাতে আসেনি। প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

  • মোবাইল অপারেটরদের বিরুদ্ধে ৫ বছরে ৬৬ হাজার অভিযোগ, সবচেয়ে বেশি সেবার মান নিয়ে

    মোবাইল অপারেটরদের বিরুদ্ধে ৫ বছরে ৬৬ হাজার অভিযোগ, সবচেয়ে বেশি সেবার মান নিয়ে

    • নিষ্পত্তি করা হয়েছে ৬৫ হাজার অভিযোগ।
    • অভিযোগ করার প্রক্রিয়া সবার জানা থাকলে অভিযোগের সংখ্যা কয়েক কোটি ছাড়াত: মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি
    • কিছু অভিযোগ রাতারাতি নিষ্পন্ন করা সম্ভব হয় না: বিটিআরসি চেয়ারম্যান

    মোবাইল অপারেটরদের বিরুদ্ধে গ্রাহকের অভিযোগের তালিকা দিনে দিনে দীর্ঘ হচ্ছে। সেবার মান, ইন্টারনেটের গতি (ডেটা স্পিড), মূল্য সংযোজন পরিষেবা (ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস-ভ্যাস), রিচার্জ/বিলিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে গত সাড়ে পাঁচ বছরে দেশের চার মোবাইল অপারেটরের বিরুদ্ধে বিটিআরসিতে (বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশন) জমা পড়েছে ৬৬ হাজারের বেশি অভিযোগ। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে সেবার মান নিয়ে। অভিযোগের সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে রবি। এরপর যথাক্রমে গ্রামীণফোন, টেলিটক ও বাংলালিংক।

    বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী আজকের পত্রিকাকে বলেন, কমিশনে আসা অভিযোগগুলো মূলত দ্বিতীয় পর্যায়ের অভিযোগ। কোনো সেবা নিয়ে সমস্যা হলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরের গ্রাহক সেবা কেন্দ্রে অভিযোগ জানাতে হয়। অপারেটরের কাছ থেকে সমাধান না পেলে গ্রাহক বিটিআরসির দ্বারস্থ হন।

    কোন অপারেটরের বিরুদ্ধে কত অভিযোগ

    বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত তারা মোট ৬৬ হাজার ৭০৫টি অভিযোগ পেয়েছে। এর মধ্যে ৬৫ হাজার ৮৫৬টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করেছে বিটিআরসি। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে রবির বিরুদ্ধে- ২৪ হাজার ৮৭৪টি। এর মধ্যে ২৪ হাজার ৮৩৯টি অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে। অর্থাৎ নিষ্পত্তির বাইরে রয়েছে ৩৫টি অভিযোগ।

    অভিযোগের সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে গ্রামীণফোন। অপারেটরটির বিরুদ্ধে ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ২১ হাজার ৫২৬টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ২০ হাজার ৮৯৫টি অভিযোগ। নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে ৬৩১টি অভিযোগ।

    টেলিটকের বিরুদ্ধে গত সাড়ে ৫ বছরে অভিযোগ এসেছে মোট ১১ হাজার ৫৯৪টি। এর মধ্যে ১১ হাজার ৪৪৭টি অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে। ১৪৭টি অভিযোগ অনিষ্পন্ন রয়েছে। আর বাংলালিংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে ৮ হাজার ৭১১টি। এর মধ্যে ৮ হাজার ৬৭৫টি নিষ্পত্তি হয়েছে, অনিষ্পন্ন রয়েছে ৩৬টি।

    মোট অভিযোগের সংখ্যায় রবি শীর্ষে থাকলেও গ্রাহকসংখ্যার অনুপাতে টেলিটকের অভিযোগের হার সবচেয়ে বেশি। টেলিটকের মোট গ্রাহকসংখ্যার বিপরীতে প্রায় শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ অভিযোগ এসেছে। রবির ক্ষেত্রে এ হার শূন্য দশমিক শূন্য ৪২ শতাংশ, গ্রামীণফোনের শূন্য দশমিক শূন্য ২৫ এবং বাংলালিংকের শূন্য দশমিক শূন্য ২৩ শতাংশ।

    সেবার মান নিয়ে অভিযোগ সবচেয়ে বেশি

    বিটিআরসি বলছে, গ্রাহকেরা সেবার মান (কিউওএস) নিয়ে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ করে থাকেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিটিআরসির প্রতিবেদনে এই প্রবণতা দেখা গেছে। ওই অর্থবছরে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মোট ১১ হাজার ৪২৭টি অভিযোগ নথিভুক্ত হয়। এর মধ্যে সেবার মান-সংক্রান্ত অভিযোগ ছিল সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫২৯টি। ডেটা স্পিড নিয়ে ৯২৬টি, বিবিধ বিষয়ে ১ হাজার ৩৩১টি, ভ্যাস নিয়ে ৮১১টি, লাইসেন্স-সংক্রান্ত ৭৯৮টি, রিচার্জ/বিলিং নিয়ে ৪৬৭টি, প্যাকেজ মাইগ্রেশন নিয়ে ৬৪৭টি এবং ডেটা ভলিউম-সংক্রান্ত ৪৮১টি অভিযোগ ছিল। এ ছাড়া এমএনপি (মোবাইল নম্বর পোর্টেবিলিটি), কল-এসএমএস, সিম নিবন্ধন ও মালিকানা, ট্যারিফসহ আরও বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ এসেছে।

    বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন বলছে, মোবাইল অপারেটরদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকায় থাকা ‘সেবার মান’, ‘ডেটা স্পিড’, ‘ডেটা ভলিউম’ বা ‘কল ও এসএমএস-সংক্রান্ত’ বিষয়গুলো মূলত গ্রাহকের দৈনন্দিন ভোগান্তির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। নেটওয়ার্ক না পাওয়া, কথা বলার সময় কল কেটে যাওয়া, ইন্টারনেটের গতি কমে যাওয়া, প্যাকেজের ডেটা দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়া কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত সেবা চালু হয়ে টাকা কেটে নেওয়ার মতো বিষয় নিয়ে নিয়মিত অভিযোগ করেন গ্রাহকেরা।

    মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মাশরিক আহমেদ বলেন, ‘বাসায় মোবাইলে কথা বলতে গেলে শুধু এক রুম থেকে আরেক রুমে ছুটতে হয়। কোনো রুমে একেবারেই নেটওয়ার্ক থাকে না। কোনো রুমে কিছুটা পাওয়া যায়। ঢাকা শহরেই যদি নেটওয়ার্কের এই অবস্থা হয়, তাহলে দেশের অন্যান্য এলাকার অবস্থা তো আরও খারাপ।’

    অপারেটরদের বক্তব্য

    গ্রাহকদের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় বলে দাবি করেছে মোবাইল অপারেটরগুলো। গ্রামীণফোনের হেড অব কমিউনিকেশনস শারফুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের সকল প্রচেষ্টার কেন্দ্রে রয়েছেন আমাদের গ্রাহক। আমরা গ্রাহকদের প্রতিটি অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে তা সমাধানের চেষ্টা করি।’

    শারফুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী জানান, টাওয়ার বা নেটওয়ার্ক-সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করা সম্ভব না হলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরবর্তী করণীয় জানানো হয়। গ্রাহকসেবার মান উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। দেশের সবচেয়ে বেশি মানুষের আস্থাভাজন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সর্বোচ্চ মানের সেবা দিতে নানা উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।

    রবির চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম বলেন, বিটিআরসি থেকে প্রাপ্ত অভিযোগগুলোর প্রায় ৯৫ শতাংশ ইতিমধ্যে সমাধান করা হয়েছে। গ্রাহকসেবার মানোন্নয়ন এবং অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তিকে রবি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। পাশাপাশি সেবার মান, ডেটা স্পিড ও ভ্যাসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা উন্নত করতে নিয়মিত নেটওয়ার্ক ও সেবা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বিটিআরসিতে রবির বিষয়ে উত্থাপিত বিষয়গুলোর ৪০ শতাংশের বেশি অনুসন্ধানমূলক বা ইনকোয়ারি বলে দাবি করেন সাহেদ আলম।

    তবে বিটিআরসি বলছে ভিন্ন কথা। বিটিআরসির পরিচালক (সেবা) লে. কর্নেল মো. কামরুল হাসান মামুন বলেন, যেসব গ্রাহক অপারেটরের কাস্টমার কেয়ার বা গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে গিয়ে প্রতিকার পান না, সাধারণত বিটিআরসিতে কেবল তাঁরাই অভিযোগ করতে পারেন। যদি শুধুমাত্র অনুসন্ধানমূলক বিষয় বা ইনকোয়ারি হয়ে থাকে, সেটা বিটিআরসিতে আসার কথা নয়। সেটা গ্রাহকসেবা কেন্দ্রেই সমাধান হয়ে যায়।

    বিটিআরসিতে অভিযোগ জানাবার প্রক্রিয়া

    নির্ধারিত অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাহকেরা বিটিআরসিতে অভিযোগ জানাতে পারেন। এর মধ্যে ‘১০০’ শর্টকোডে কল, ওয়েববক্স বা ই-মেইলের মাধ্যমে অভিযোগ নথিভুক্ত করানো যায়। অভিযোগ পাওয়ার পর তা সংশ্লিষ্ট অপারেটরের কাছে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা ও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিটিআরসি।

    বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আগে মাসে রাফলি ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত অভিযোগ আমরা নিষ্পত্তি করতে পারতাম। গত মাসে এটা ৬৯ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পেরেছি।’ তবে সব অভিযোগ রাতারাতি নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি। বিশেষ করে নেটওয়ার্ক কাভারেজ বা অবকাঠামো সংক্রান্ত অভিযোগ সমাধানে সময় লাগে। তিনি বলেন, ‘অনেক অভিযোগ আছে, যেগুলো মাস কেন, বছর দিয়েও করা যায় না। যেমন, একজন বলছেন তাঁর এলাকায় কাভারেজ ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। এই অভিযোগ ওভারনাইট কোনোভাবেই সমাধান করা সম্ভব নয়।’

    এদিকে মোবাইল অপারেটরদের বিরুদ্ধে বিটিআরসিতে আসা অভিযোগের সংখ্যা গ্রাহকদের অভিযোগের প্রকৃত চিত্র নয় বলে মনে করে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন। অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, দেশে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক অভিযোগ করার পদ্ধতিই জানেন না। জেলা পর্যায়ে বিটিআরসির অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা না থাকায় সাধারণ গ্রাহকদের বড় অংশ অভিযোগ করতে পারেন না। যদি সক্রিয়ভাবে অভিযোগ করতে পারতেন, তাহলে এই অভিযোগ নিশ্চয়ই ৬৬ হাজার হতো না, কয়েক কোটি ছাড়িয়ে যেত।

    মহিউদ্দিন আহমেদের মতে, অভিযোগ গ্রহণের সুযোগ আরও সহজ করা এবং জেলা পর্যায়ে অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা ব্যবস্থা চালু করার পাশাপাশি অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য বিটিআরসির কারিগরি সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। একটি নম্বরে কল করে যে অভিযোগ জানানো যায়, এটা নিয়ে আরও প্রচারণা চালানো উচিত বলে মনে করেন তিনি।