মানসিক স্বাস্থ্য

  • স্মার্টফোন ও শৈশব: ঘুম, মনোযোগ ও বন্ধুত্বে কী প্রভাব পড়ছে

    স্মার্টফোন ও শৈশব: ঘুম, মনোযোগ ও বন্ধুত্বে কী প্রভাব পড়ছে

    রাত ক্রমেই গভীর হচ্ছে। চারদিকে নীরবতা, কিন্তু স্মার্টফোনের স্ক্রিন তখনো জ্বলছে। একটি ভিডিও শেষ হতে না হতেই শুরু হচ্ছে আরেকটি। রিলের ফাঁকে আসছে মেসেজ ও নোটিফিকেশন। ‘আরেকটু দেখেই ঘুমাব’—ভাবতে ভাবতে কখন যে রাত গড়িয়ে যায়, টের পাওয়া যায় না।

    পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট হয়। ক্লাসে মন বসে না, সারাদিন ক্লান্তি ও খিটখিটে মেজাজ থাকে। পড়াশোনা বা অন্য কাজে মনোযোগ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। এমন অভিজ্ঞতা অনেক পরিবারের কাছেই পরিচিত।

    স্মার্টফোন এখন শিশু-কিশোরদের পড়াশোনা, বিনোদন ও বন্ধুত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রযুক্তি শেখা, সৃজনশীলতা প্রকাশ এবং দূরে থাকা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে অতিরিক্ত বা অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ঘুম, মনোযোগ ও সামাজিক সম্পর্ককে কীভাবে প্রভাবিত করছে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

    বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৫–২৬ অর্থবছরের আইসিটি জরিপ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল–জুন সময়ে পাঁচ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের ৫৯.২ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করেছেন। আগের বছরের একই সময়ে এ হার ছিল ৫৫ শতাংশ। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে প্রকাশিত এই পরিসংখ্যান শিশুদের আলাদাভাবে দেখায় না, তবে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের বিস্তার সম্পর্কে ধারণা দেয়।

    যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৫ সালের জরিপে দেখা যায়, ৪০ শতাংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে উৎপাদনশীলতায় এবং ২২ শতাংশ পড়াশোনার ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাবের কথা বলেছেন। তবে এগুলো অংশগ্রহণকারীদের নিজস্ব মূল্যায়ন; এসব তথ্য একা প্রমাণ করে না যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই সমস্যাগুলোর কারণ।

    সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব

    স্মার্টফোনের মাধ্যমে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং নিজেদের আগ্রহের বিষয় নিয়ে আলোচনা করা সহজ হয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের একই জরিপে ৭৪ শতাংশ মার্কিন কিশোর-কিশোরী বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাঁদের বন্ধুদের জীবনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, ৩১ শতাংশ জানিয়েছেন, এসব প্ল্যাটফর্মে তাঁরা কখনো কখনো বন্ধুদের কাছ থেকে বাদ পড়ার অনুভূতি পান। অর্থাৎ, অনলাইন যোগাযোগে সংযোগ ও চাপ—দুই ধরনের অভিজ্ঞতাই থাকতে পারে।

    বাংলাদেশেও অনলাইনে নেতিবাচক অভিজ্ঞতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ইউনিসেফ বাংলাদেশের ২০২৫ সালের ইউ-রিপোর্ট জরিপে প্রায় ২৯ হাজার শিশু ও তরুণ-তরুণী অংশ নেন। তাঁদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ভুয়া খবর ও ভুল তথ্যকে মানসিক চাপের বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রায় এক-সপ্তমাংশ বুলিং ও নেতিবাচক মন্তব্যের কথা বলেন। আরও ১৪ শতাংশ ক্ষতিকর বা মন খারাপ করা কনটেন্টকে মানসিক চাপের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।

    শিশু মনোবিজ্ঞানী ও প্লে থেরাপিস্ট মোস্তাক আহমেদ ইমরান দ্য ডেইলি স্টারের একটি প্রতিবেদনে বলেন, ছোট শিশুদের বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে স্ক্রিন যদি মানুষের সঙ্গে সাড়া-প্রতিক্রিয়ামূলক যোগাযোগের জায়গা নিয়ে নেয়, তাহলে কথা বলার বিকাশে বিলম্ব ও সামাজিকভাবে গুটিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে সব স্ক্রিন ব্যবহারকারী শিশুর এমন সমস্যা হয় না। ঝুঁকি বাড়তে পারে যখন ডিভাইস সরাসরি যোগাযোগ, খেলাধুলা ও পারিবারিক মেলামেশার বিকল্প হয়ে ওঠে।

    অভিভাবকদের অভিজ্ঞতাতেও বিষয়টি উঠে এসেছে। দুই সন্তানের মা ফাতেমা আক্তার সুইটি একই প্রতিবেদনে জানান, ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের পর তাঁর বড় ছেলের বাইরে খেলতে যাওয়ার আগ্রহ কমে যায়। তিনি বলেন, বাইরে নিয়ে যেতে চাইলে ছেলে নানা অজুহাত দেখায়। অন্যদিকে, ভিডিও দেখে সে রঙের নামও শিখেছে। তাই তিনি স্ক্রিন ব্যবহারের সময় ও কনটেন্টের ওপর নজর রাখেন। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রযুক্তির ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুই ধরনের প্রভাবই থাকতে পারে।

    ঘুম

    ঘুমের সময় স্মার্টফোন ব্যবহার দৈনন্দিন রুটিনকে প্রভাবিত করতে পারে। শোয়ার আগে ভিডিও দেখা বা মেসেজের উত্তর দিতে গিয়ে ঘুমানোর সময় পিছিয়ে গেলে পরদিন ক্লান্তি ও মনোযোগের সমস্যা দেখা দিতে পারে। রাতের নোটিফিকেশন এবং একের পর এক ভিডিও দেখার অভ্যাসও সময়মতো ঘুমাতে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

    পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৫ সালের জরিপে ৪৫ শতাংশ মার্কিন কিশোর-কিশোরী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে নিজেদের ঘুমের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

    যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের প্রতিদিন ৯–১২ ঘণ্টা এবং ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের ৮–১০ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ঘুম শেখা, মনোযোগ, আচরণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।

    ঘুমের অভ্যাস উন্নত করতে সিডিসি প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো ও ঘুম থেকে ওঠার মতো অভ্যাসের পরামর্শ দেয়। পাশাপাশি, আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের পরামর্শে ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ করা এবং রাতে ফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস শোবার ঘরের বাইরে রাখার কথা বলা হয়েছে।

    ঘুমানোর নির্দিষ্ট সময় ঠিক করা, রাতে ফোন বিছানা থেকে দূরে রাখা এবং পরিবারের সবার জন্য একই ধরনের নিয়ম চালু করা এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

    মনোযোগ

    পড়াশোনার মাঝখানে বারবার নোটিফিকেশন দেখা বা নতুন ভিডিও খুলে ফেলা মনোযোগের ধারাবাহিকতায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। কিছুক্ষণ ফোন দেখার পর বইয়ে ফিরে এলেও আগের কাজে মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে সময় লাগতে পারে। ফলে পড়াশোনা, খেলাধুলা ও অন্যান্য কাজে সময় ভাগ করে নেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

    যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাকাডেমিস অব সায়েন্সেস, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মেডিসিনের ২০২৪ সালের Social Media and Adolescent Health প্রতিবেদন বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভ্রান্তিকর বৈশিষ্ট্য কিশোরদের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে। তবে এর প্রভাব কতটা, তা নির্ধারণ করা কঠিন। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম, ব্যবহারের ধরন এবং ব্যক্তিভেদে অভিজ্ঞতার পার্থক্যও বিবেচনায় নিতে হয়।

    তাই স্মার্টফোন ব্যবহার মস্তিষ্কের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা স্থায়ীভাবে নষ্ট করে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। বরং দেখতে হবে, ফোন ব্যবহারের কারণে শিশু নিয়মিত পড়াশোনা, ঘুম, শারীরিক কার্যক্রম বা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কি না।

    বয়স অনুযায়ী ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ, পড়ার সময় অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা এবং নির্দিষ্ট সময় পর বিরতি নেওয়া মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি বই পড়া, ছবি আঁকা, খেলাধুলা ও হাতে-কলমে কাজের সুযোগ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।

    অতিরিক্ত ব্যবহার

    কতক্ষণ ফোন ব্যবহার করা হচ্ছে, শুধু তা দিয়ে সমস্যার মাত্রা বোঝা যায় না। ফোন ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা, এর কারণে দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হওয়া এবং অন্য কার্যক্রমের জায়গা ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে আসাও বিবেচনায় নিতে হয়।

    পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৫ সালের জরিপে ৪৫ শতাংশ মার্কিন কিশোর-কিশোরী বলেছেন, তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করেন। একই জরিপে ৪৪ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার কমিয়েছেন। সমান সংখ্যক কিশোর-কিশোরী স্মার্টফোনের ব্যবহার কমানোর কথাও বলেছেন। অর্থাৎ, অনেকে নিজেদের ব্যবহারের ধরন নিয়ে ভাবছেন এবং পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন।

    বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইউরোপীয় অঞ্চলের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে ইউরোপ, মধ্য এশিয়া ও কানাডার ৪৪টি দেশ ও অঞ্চলের ১১, ১৩ ও ১৫ বছর বয়সী প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার কিশোর-কিশোরীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে সমস্যাজনক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের লক্ষণ থাকা কিশোর-কিশোরীর হার ২০১৮ সালের ৭ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে ১১ শতাংশে ওঠে।

    প্রতিবেদনে সমস্যাজনক ব্যবহারের লক্ষণ হিসেবে ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো, অন্য কাজের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং দৈনন্দিন জীবনে নেতিবাচক প্রভাবের কথা বলা হয়েছে। এটি ইউরোপ, মধ্য এশিয়া ও কানাডার তথ্য।

    সামাজিক মনোবিজ্ঞানী জোনাথন হাইট তাঁর The Anxious Generation বইয়ে স্বাধীনভাবে খেলাধুলা ও সরাসরি মেলামেশার সুযোগ কমে যাওয়া এবং ফোনকেন্দ্রিক শৈশবের বিস্তার নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করা, ঘুমের ঘাটতি ও মনোযোগে বারবার ব্যাঘাত শিশু-কিশোরদের সুস্থতার জন্য উদ্বেগের বিষয়।

    তবে গবেষকদের মধ্যে এ বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে। ন্যাশনাল অ্যাকাডেমিসের ২০২৪ সালের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, বিদ্যমান গবেষণা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কিশোরদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যগত পরিবর্তনের একক কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে না। কিছু কিশোর অনলাইনে ক্ষতিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেও অন্যরা বন্ধুত্ব, সৃজনশীলতা ও সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে। তাই প্রযুক্তির ব্যবহার, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ—সবকিছু বিবেচনা করা জরুরি।

    অভিভাবকেরা কী করতে পারেন?

    বিডি গ্লোবাল টাইমসের সঙ্গে আলাপকালে ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে (McMaster University) স্বাস্থ্য গবেষণা পদ্ধতিবিদ্যায় (Health Research Methodology) পিএইচডি গবেষণারত তাসলিমা চৌধুরী সুন্না বলেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার শিশুদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ ঝুঁকি কমাতে শিশুদের খেলাধুলা ও বাইরের পরিবেশে সময় কাটানোর পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করা জরুরি।

    তাঁর মতে, এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। সন্তান কী ধরনের গেম খেলছে, ইন্টারনেটে কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে, সেদিকে সতর্ক নজর রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, তাদের অনলাইন অভিজ্ঞতা বোঝা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরামর্শ ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

    স্মার্টফোনের ইতিবাচক দিকও রয়েছে। অনলাইন ক্লাস, শিক্ষামূলক ভিডিও, তথ্য সংগ্রহ, সৃজনশীল কাজ এবং দূরে থাকা স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগে প্রযুক্তি কাজে আসে। তাই শিশু-কিশোরদের প্রযুক্তি থেকে পুরোপুরি দূরে রাখা বাস্তবসম্মত নয়। বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত স্বাস্থ্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা।

    অভিভাবকেরা কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে পারেন:

    • শিশুর বয়স, পড়াশোনা ও দৈনন্দিন রুটিন অনুযায়ী ফোন ব্যবহারের নিয়ম নির্ধারণ করুন।
    • ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ রাখার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
    • পড়াশোনা, পারিবারিক খাবার ও একসঙ্গে সময় কাটানোর সময় ফোন দূরে রাখুন।
    • বাইরে খেলাধুলা, বই পড়া, ছবি আঁকা ও বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি মেলামেশার সুযোগ বাড়ান।
    • অনলাইনে শিশু কী দেখছে ও কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, তা নিয়ে দোষারোপ না করে খোলামেলা আলোচনা করুন।
    • কোনো ক্ষতিকর অভিজ্ঞতা বা অনলাইন হয়রানির শিকার হলে যেন শিশু নির্ভয়ে জানাতে পারে, এমন পরিবেশ তৈরি করুন।
    • পরিবারের বড়রাও নিজেদের ফোন ব্যবহারের অভ্যাসে ভারসাম্য রাখুন।

    পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসেও যদি যার যার ফোনে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে শিশুদের কাছে ভিন্ন আচরণ আশা করা কঠিন। তাই পরিবারের খাবারের সময় ফোন দূরে রাখা, নিয়মিত একসঙ্গে সময় কাটানো এবং শিশুদের অনলাইন অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলা ছোট হলেও কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে।

    শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। বয়সোপযোগী ডিজিটাল শিক্ষা, নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ এবং হয়রানি বা ক্ষতিকর কনটেন্টের ক্ষেত্রে সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

    স্মার্টফোন এখন জীবনের অংশ, আর ভবিষ্যতে প্রযুক্তির সঙ্গে শিশু-কিশোরদের সম্পর্ক আরও গভীর হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রযুক্তিকে বাদ দেওয়া নয়, বরং এমনভাবে ব্যবহার করা, যাতে ঘুম, পড়াশোনা, খেলাধুলা, বন্ধুত্ব ও পরিবারের সঙ্গে কাটানো সময়ের ভারসাম্য বজায় থাকে।

    —

  • মহাসড়কের পাশে ২৪টি ট্রমা সেন্টার দ্রুত চালু হচ্ছে, বদলে যাচ্ছে নাম

    মহাসড়কের পাশে ২৪টি ট্রমা সেন্টার দ্রুত চালু হচ্ছে, বদলে যাচ্ছে নাম

    দেশের মহাসড়কগুলোর পাশে দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃতভাবে পড়ে থাকা ২৪টি ট্রমা সেন্টার দ্রুততম সময়ের মধ্যে চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। এসব ট্রমা সেন্টারের নাম পরিবর্তন করে ‘অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট সেন্টার’ নামে নামকরণ করা হবে। একই সাথে দেশব্যাপী ২৪ ঘণ্টার অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

    দীর্ঘদিন পড়ে থাকা এসব প্রতিষ্ঠানকে আধুনিকায়ন করে ‘অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট সেন্টার’ নামে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য লজিস্টিকস নিশ্চিত করে ২৪টি কেন্দ্রেই পর্যায়ক্রমে চিকিৎসাসেবা চালু করা হবে। গত ১২ আগস্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক বৈঠকে এসব কেন্দ্র চালুর বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

    বৈঠকে বিদ্যমান ২৪টি ট্রমা সেন্টারের নাম পরিবর্তন করে ‘অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট সেন্টার’ নামে নামকরণ করতে হবে এবং সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের সাথে আলোচনা করে সড়ক ও মহাসড়কের পাশে খালি জায়গায় প্রকল্পের মাধ্যমে ‘অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধন্ত গ্রহণ করা হয়।

    এ ছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী এক্স-রে মেশিন, অ্যাম্বুলেন্স ও যন্ত্রপাতির সংস্থান স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অনুমোদিত বাজেট থেকে নির্বাহ করতে হবে বলেও বৈঠকে নির্দেশনা প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী।

    সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দুর্ঘটনাস্থলের কাছাকাছি দ্রুত সময়ের মধ্যেই চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের পাশে বিভিন্ন সময়ে এই ২৪টি ট্রমা সেন্টার চালু করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল আহতদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় এনে প্রাণহানি কমানোই। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রশাসনিক অনুমোদন না থাকায়, বছরের পর বছর ধরে এসব সেন্টার অব্যবহৃত পড়ে আছে।

    স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের পাশে ২০০৪-০৫ অর্থবছরে ১০টি ও ২০১০ সালে আরও ১৪টি ট্রমা সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এগুলোর মধ্যে মাত্র দুটিতে সীমিত পরিসরে বহির্বিভাগ চালু রয়েছে। একটি সংশ্লিষ্ট জেলা হাসপাতালের অর্থোপেডিকস বিভাগের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এগুলো নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল বিশেষ করে মাথা, বুক, মেরুদণ্ড ও হাড়ে গুরুতর আঘাত পাওয়া রোগীর দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করা। তিন তলা ভবনে ২০ শয্যার আইসিইউ ও ৪০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

    এমনই একটি কেন্দ্র হলো সিরাজগঞ্জ সদরের মুলিবাড়ি ট্রমা সেন্টার। ঢাকা-রাজশাহী-রংপুর মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের তাৎক্ষণিক সেবা দিতে ২০২০ সালে প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি নির্মাণ করা হয়। ছয় বছর অব্যবহৃত থাকার পর গত কোরবানির ঈদের সময় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের সেবা দিতে ২১ মে থেকে ১৪ দিনের জন্য অস্থায়ীভাবে কেন্দ্রটি চালু করা হয়েছিল। পরে এটি আবার বন্ধ হয়ে যায়।

    পাবনার আটঘরিয়া, বগুড়ার শেরপুর, সিরাজগঞ্জ সদর ও উল্লাপাড়া, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, গোপালগঞ্জ সদর, মাদারীপুরের শিবচর, মানিকগঞ্জের শিবালয়, শরীয়তপুরের জাজিরা, ফরিদপুরের ভাঙ্গা (মধুখালী), মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর, ঢাকার ধামরাই, টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, হাটহাজারী ও রাউজান, কুমিল্লার দাউদকান্দি, ময়মনসিংহের ভালুকা, সুনামগঞ্জের ছাতক এবং হবিগঞ্জের বাহুবলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব কেন্দ্র অবস্থিত।

    মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি ট্রমা সেন্টারে সাতজন কনসালট্যান্ট, তিনজন অর্থোপেডিক সার্জন, দুজন অ্যানেসথেটিস্ট ও দুজন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তাসহ মোট ১৪ জন চিকিৎসক থাকার কথা ছিল।

    এ ছাড়া প্রতিটি কেন্দ্রে ১০ জন নার্সের পাশাপাশি ফার্মাসিস্ট, রেডিওগ্রাফার ও অন্যান্য টেকনিশিয়ান থাকার কথা ছিল।

    তবে কোনো কেন্দ্রেই প্রস্তাবিত জনবল কাঠামো অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

    এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বাসস’কে বলেন, ‘মহাসড়কগুলোকে কেন্দ্র করে আমরা চব্বিশটি ট্রমা সেন্টার চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। খুব দ্রুতই এগুলোকে ‘অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি সেন্টার’ হিসেবে রূপান্তর করা হবে। সড়ক দুর্ঘটনায় দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে।

    ভবিষ্যতে এটিকে আমাদের নিয়মিত স্বাস্থ্যব্যবস্থার (হেলথ সিস্টেম) একটি টেকসই অংশ হিসেবে পরিচালনা করার লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি।’

  • পরীক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের পরিচর্যা

    পরীক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের পরিচর্যা

    গ্রীষ্মকাল মানেই তীব্র গরম। এসময় অতিরিক্ত তাপমাত্রা, ঘুমের ব্যাঘাত, পড়াশোনার চাপ সব মিলিয়ে অনেক পরীক্ষার্থী উদ্বেগ, হতাশা কিংবা অস্থিরতার মতো সমস্যায় ভুগতে পারে। তাই এই সময়ে মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

    গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত গরম মানুষের মেজাজের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাপমাত্রা বাড়লে বিরক্তি, রাগ এবং মানসিক ক্লান্তি বৃদ্ধি পায়। পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় এই প্রভাব আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী সহজেই হতাশ হয়ে পড়ে বা মনোযোগ ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়।

    পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুমের গুরুত্ব

    গরমের কারণে অনেক সময় ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন অন্তত ৬-৮ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করা জরুরি। ঘুমের আগে মোবাইল বা স্ক্রিন ব্যবহার কমিয়ে আনা এবং একটি নির্দিষ্ট রুটিন মেনে চলা ঘুমের মান উন্নত করতে সাহায্য করে।

    হাইড্রেশন ও সুষম খাদ্য

    শরীর পানিশূন্য হয়ে গেলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যায় ফলে মনোযোগে ঘাটতি দেখা দেয়। তাই পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং ফলমূল, সবজি ও হালকা খাবার গ্রহণ করা প্রয়োজন। অতিরিক্ত চা-কফি বা জাঙ্ক ফুড এড়িয়ে চলা উচিত।

    পড়াশোনায় সঠিক পরিকল্পনা

    গরমের দিনে দীর্ঘ সময় একটানা পড়াশোনা করা কষ্টকর হতে পারে। তাই ছোট ছোট বিরতি নিয়ে পড়াশোনা করা বেশি কার্যকর। সকালে বা রাতে তুলনামূলক ঠান্ডা সময়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পড়া যেতে পারে। একটি বাস্তবসম্মত রুটিন তৈরি করলে চাপ অনেকটাই কমে যায়।

    মানসিক চাপ কমানোর কৌশল

    শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, হালকা শরীরচর্চা কিংবা কিছু সময় নিজের পছন্দের কাজে ব্যয় করা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলা বা বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ রাখাও মানসিক স্বস্তি দেয়।

    অভিভাবকদের ভূমিকা

    এই সময়ে অভিভাবকদের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে সন্তানদের পাশে থাকা, তাদের কথা শোনা এবং মানসিক সমর্থন দেওয়া প্রয়োজন। তুলনা বা অতিরিক্ত প্রত্যাশা শিক্ষার্থীদের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

    কখন পেশাদার সহায়তা প্রয়োজন

    যদি কোনো শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ, অনিদ্রা বা হতাশায় ভোগে তবে পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া উচিত। দ্রুত সহায়তা পাওয়া গেলে সমস্যা বড় আকার ধারণ করার আগেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।