মহাসড়ক

  • মহাসড়ক রক্ষণাবেক্ষণে আসছে নতুন নীতিমালা

    মহাসড়ক রক্ষণাবেক্ষণে আসছে নতুন নীতিমালা

    দেশের মহাসড়ক রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং অনিয়মের ঝুঁকি কমাতে নতুন নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত ‘মহাসড়ক রক্ষণাবেক্ষণ নীতিমালা, ২০২৬’-এর আওতায় সড়ক মেরামতের পরিকল্পনা, বাজেট বরাদ্দ, দরপত্র, কাজের অগ্রগতি ও ব্যয়ের হিসাব সফটওয়্যারভিত্তিক নজরদারির আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

    খসড়া নীতিমালায় সড়ক রক্ষণাবেক্ষণকে রুটিন, পর্যায়ক্রমিক, বিশেষ ও জরুরিÑএ চার ভাগে ভাগ করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি সড়কের অবস্থা, যানবাহনের চাপ, বৃষ্টিপাত, বন্যা ও জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় বাজেট বরাদ্দ এবং ঝুঁকিপূর্ণ সেতু প্রতিস্থাপন, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

    সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অধীন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) আওতাধীন মহাসড়কগুলোর কার্যকারিতা, নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব বাড়ানো এ নীতিমালার মূল লক্ষ্য। এর মাধ্যমে মেরামতের ব্যয় কমানো, দুর্ঘটনার ঝুঁকি হ্রাস এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

    খসড়া নীতিমালা নিয়ে সম্প্রতি অর্থ বিভাগের সঙ্গে সড়ক পরিবহন ও সেতু বিভাগের বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

    খসড়া অনুযায়ী, মহাসড়ক রক্ষণাবেক্ষণের পরিকল্পনা ও অনুমোদন থেকে শুরু করে বাজেট বরাদ্দ, দরপত্র, বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং ব্যয়ের তথ্য সফটওয়্যারভিত্তিক ব্যবস্থায় সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ করা হবে। এতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সরাসরি প্রবেশাধিকার থাকবে। কাজের তথ্যের যথার্থতার জন্য সংশ্লিষ্ট সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীকে দায়বদ্ধ রাখার প্রস্তাবও রয়েছে।

    প্রতিটি কাজের ধরন, সড়কের অবস্থান, প্রাক্কলিত ব্যয়, অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ, কার্যাদেশ, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং ভৌত ও আর্থিক অগ্রগতির তথ্য সফটওয়্যারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কাজ শুরুর আগে, কাজ চলাকালে ও শেষে জিও-ট্যাগ করা ছবিও সংরক্ষণ করতে হবে। এ ব্যবস্থায় একই সড়কাংশে একাধিকবার বরাদ্দ দেওয়ার ঝুঁকি কমবে এবং প্রকৃত অগ্রগতি যাচাই সহজ হবে বলে খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।

    চার ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ

    নীতিমালার খসড়ায় রক্ষণাবেক্ষণকাজের ধরন অনুযায়ী পৃথক কাঠামো নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। রুটিন রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় থাকবে সড়কের গর্ত ও ফাটল মেরামত, শোল্ডার সংস্কার, ড্রেন পরিষ্কার, পানি নিষ্কাশন, সড়কচিহ্ন ও নিরাপত্তা উপকরণ মেরামত এবং সেতু-কালভার্টের নিয়মিত পরিচর্যা।

    পর্যায়ক্রমিক রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় নির্দিষ্ট সময় পরপর সড়কের পৃষ্ঠ নবায়ন, ওভারলে, পেভমেন্ট শক্তিশালীকরণ এবং সেতুর বিভিন্ন অংশ সংস্কার করা হবে। এ ধরনের বড় কাজ কার্যাদেশ দেওয়ার তারিখ থেকে সর্বোচ্চ ৯ মাসের মধ্যে এবং সংশ্লিষ্ট অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই সম্পন্ন করার প্রস্তাব রয়েছে।

    অন্যদিকে এক অর্থবছরে শেষ করা সম্ভব নয়, এমন বড় ধরনের কাজ বা কাঠামোগত উন্নয়ন বিশেষ রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় নেওয়া হবে। এর মধ্যে মহাসড়ক প্রশস্তকরণ, গভীর পেভমেন্ট পুনর্নির্মাণ, বড় ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক নির্মাণ, নতুন ইন্টারচেঞ্জ, আন্ডারপাস ও ওভারপাস নির্মাণ এবং জরাজীর্ণ সেতু প্রতিস্থাপনের মতো কাজ রয়েছে।

    বন্যা, ভূমিধস, দুর্ঘটনা কিংবা অন্য কোনো আকস্মিক বিপর্যয়ে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে দ্রুত যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এক্ষেত্রে অস্থায়ী সেতু, ডাইভারশন সড়ক এবং সড়কধস প্রতিরোধে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

    ঝুঁকি বিবেচনায় বাজেট বরাদ্দ

    রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট বণ্টনে শুধু সড়কের দৈর্ঘ্য বা প্রচলিত বরাদ্দের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে ক্ষয়ক্ষতি, যানবাহনের চাপ ও প্রাকৃতিক ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। খসড়ায় সড়কের অবস্থা, আন্তর্জাতিক রাফনেস ইনডেক্স (আইআরআই), আগের তিন বছরে মেরামত না হওয়া সড়কের অনুপাত, বৃষ্টিপাত, বন্যা ও জলবায়ু ঝুঁকিকে বাজেট নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।

    সড়ক সম্পদ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা (এইচডিএম-৪/র‍্যামস) এবং ব্রিজ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (বিএমএস) কারিগরি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে মেরামতের প্রয়োজন নির্ধারণ ও অগ্রাধিকার তালিকা তৈরির প্রস্তাবও রয়েছে। প্রতি বছর বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ চাহিদা প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে কোন সড়ক বা সেতুতে আগে কাজ করা প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করা হবে। দীর্ঘদিনের জমে থাকা রক্ষণাবেক্ষণ চাহিদা কমাতে নিয়মিত বাজেটের পাশাপাশি প্রয়োজনে দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সহযোগী কিংবা বিকল্প উৎস থেকে অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও খসড়ায় বলা হয়েছে।

    ঠিকাদারের মান যাচাইয়ে গুরুত্ব

    রক্ষণাবেক্ষণকাজের দরপত্র ও চুক্তি সম্পাদনে সরকারি ক্রয় আইন ও প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুসরণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ঠিকাদারদের কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যাস, নিয়মিত কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন এবং তালিকা হালনাগাদ করার বিষয়টিও খসড়ায় রয়েছে।

    বড় মহাসড়ক ও এক্সপ্রেসওয়ের নির্ধারিত সেবামান বজায় রাখতে পারফরম্যান্স বেজড মেইনটেন্যান্স কন্ট্রাক্ট (পিবিএমসি) অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে শুধু কতটুকু কাজ সম্পন্ন হয়েছে, তা নয়; বরং নির্ধারিত সেবামান বজায় রাখার ভিত্তিতে ঠিকাদারের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করা হবে। প্রস্তাব অনুযায়ী, এ ধরনের চুক্তির মেয়াদ সর্বোচ্চ পাঁচ বছর হতে পারবে।

    এছাড়া আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ঝুঁকিপূর্ণ বেইলি সেতু এবং জরাজীর্ণ সেতু-কালভার্ট পর্যায়ক্রমে প্রতিস্থাপন ও জলবায়ু সহিষ্ণু অবকাঠামো নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

    সড়ক নিরাপত্তায় তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনার তাগিদ

    এদিকে সড়ক নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রকৃত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, নৌপরিবহন এবং রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

    সম্প্রতি ‘ফ্রম ডেটা টু ডিসিশন : অ্যাডভান্সিং রোড সেফটি অ্যান্ড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক কর্মশালায় তিনি বলেন, সড়ক নির্মাণ ও নকশা প্রণয়নে শুধু পরিবহন সুবিধা বিবেচনা না করে সড়ক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ভবিষ্যতে সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকার তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে নেওয়া উচিত।

    স্বতন্ত্র তহবিলের পরামর্শ

    পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক আমার দেশকে বলেন, উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ। দেশে অনেক সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে, কিন্তু যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কয়েক বছর না যেতেই সেগুলো নষ্ট হয়ে যায়। সময়মতো মেরামত করা না হলে একদিকে মানুষের ভোগান্তি বাড়ে, অন্যদিকে সড়ক সংস্কারে ব্যয়ও অনেক বেড়ে যায়। এটি একটি বড় সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে সড়ক নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ পাওয়া যায় না। এ কারণে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্বতন্ত্র তহবিল গঠন অনেক আগে থেকেই প্রয়োজন ছিল।

    তিনি বলেন, সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের জন্য সরকারের যে বরাদ্দ থাকে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এ অবস্থায় নিজস্ব উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তহবিল গঠন করা গেলে তা সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

    তিনি বলেন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নিবন্ধন ফি থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশ, বড় উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দের নির্দিষ্ট অংশ এবং জ্বালানি তেলের ওপর সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ফি আরোপের মাধ্যমে এ তহবিল গঠন করা যেতে পারে। বিএনপির আগের আমলেই এ ধরনের তহবিল চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথা ছিল। এখন সেটি বাস্তবায়নের উপযুক্ত সময় এসেছে।

    তিনি আরো বলেন, প্রথমে তহবিলটি চালু করা জরুরি। এরপর মানুষ যখন এর সুফল দেখতে পাবে, তখন উন্নত ও টেকসই সড়ক নিশ্চিত করতে বাড়তি অর্থ দিতেও তাদের আপত্তি থাকবে না। তবে এক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। সড়ক পুরোপুরি নষ্ট হওয়ার পর মেরামতের পরিবর্তে আগেভাগে ক্ষয়ক্ষতি শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ‘প্রিভেনটিভ মেইনটেন্যান্স’ পদ্ধতি চালু করা জরুরি।