স্ট্রোক মানেই হাত-পা অবশ হয়ে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা মুখ বেঁকে যাওয়ার মতো লক্ষণ—এমন ধারণাই বেশি প্রচলিত। তবে চিকিৎসকদের মতে, এমন এক ধরনের স্ট্রোক রয়েছে, যা কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই নীরবে মস্তিষ্কের ক্ষতি করে যেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি ‘সাইলেন্ট স্ট্রোক’ নামে পরিচিত।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের নিউরোসার্জন ডা. বৈভব প্যাটেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি জানান, প্রতি সপ্তাহেই তার কাছে এমন রোগী আসেন, যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন, স্বাস্থ্যকর খাবার খান এবং সুস্থ জীবনযাপন করেন। কিন্তু এমআরআই পরীক্ষায় দেখা যায়, তাদের মস্তিষ্কে ছোট ছোট ক্ষত তৈরি হয়েছে, যদিও তারা কখনো বুঝতেই পারেননি যে তাদের স্ট্রোক হয়েছিল।
কেন এটি ‘সাইলেন্ট স্ট্রোক’?
ডা. বৈভব প্যাটেলের মতে, সাধারণ স্ট্রোকের মতো এতে হাত-পায়ে দুর্বলতা, কথা বলতে সমস্যা বা মুখ বেঁকে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে অধিকাংশ মানুষ বুঝতেই পারেন না যে তাদের মস্তিষ্কে ক্ষতি হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে একাধিক সাইলেন্ট স্ট্রোক স্মৃতিশক্তি হ্রাস, ভারসাম্য নষ্ট হওয়া এবং ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।যেসব লক্ষণ অবহেলা করা ঠিক নয়
ভারতের নয়াদিল্লির একটি হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের পরিচালক ডা. ধ্রুব চতুর্বেদীর মতে, সাইলেন্ট স্ট্রোকের স্পষ্ট লক্ষণ না থাকলেও কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। যেমন—হঠাৎ স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া, মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হওয়া, হাঁটার সময় ভারসাম্য হারানো, শরীরের কোনো অংশে হালকা অসাড় অনুভূতি, চিন্তাভাবনা ধীর হয়ে যাওয়া, আচরণ বা মেজাজে অস্বাভাবিক পরিবর্তন।
তিনি বলেন, অনেকেই এসব সমস্যাকে বয়সের প্রভাব বা মানসিক চাপ মনে করে এড়িয়ে যান। কিন্তু এগুলো সাইলেন্ট স্ট্রোকের ইঙ্গিতও হতে পারে।
শনাক্ত করবেন কীভাবে?বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইলেন্ট স্ট্রোক শনাক্ত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এমআরআই পরীক্ষা। এতে মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র ক্ষতও ধরা পড়ে। বিশেষ করে যাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা উচ্চ কোলেস্টেরলের সমস্যা রয়েছে, তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত।
ঝুঁকি কমাতে কী করবেন?
ডা. ধ্রুব চতুর্বেদীর পরামর্শ অনুযায়ী, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ব্যায়াম এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস মস্তিষ্কের রক্তনালি সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান, ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান থেকে বিরত থাকাও জরুরি।
সাইলেন্ট স্ট্রোকের পর সুস্থ থাকা সম্ভব?
চিকিৎসকদের ভাষ্য, স্ট্রোকে ক্ষতিগ্রস্ত মস্তিষ্কের কোষ পুনরায় তৈরি হয় না। তবে সময়মতো রোগ শনাক্ত করা গেলে পরবর্তী ক্ষতি অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। এজন্য রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিয়মিত ব্যায়াম, মানসিক অনুশীলন, পর্যাপ্ত ঘুম এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড ও সবুজ শাকসবজি সমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাস অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী নিউরোলজিস্টের পরামর্শ নিয়ে নিয়মিত পরীক্ষা করালে ভবিষ্যতে স্মৃতিভ্রংশসহ বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
