বিনিয়োগ

  • বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরল বাংলাদেশ-জাপান, ঋণ আলোচনা এখনো খোলা

    বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরল বাংলাদেশ-জাপান, ঋণ আলোচনা এখনো খোলা

    ২৭ অক্টোবরের শীর্ষ বৈঠকের পর পাঁচ বছরে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ১ লাখ কোটি ইয়েনের জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরেছে দুই দেশ। নেতারা শিল্প অংশীদারত্বও উন্নীত করেছেন এবং সহযোগিতার পাঁচটি দলিলে সই করেছেন। সফরের আগে কর্মকর্তারা যে ঋণ প্যাকেজের কথা বলেছিলেন, প্রকাশিত শীর্ষ বৈঠকের বিবরণে তা ঘোষণা করা হয়নি। সফর চলবে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত।

    ছবির ক্যাপশন: একটি কর্মশালায় পোশাক সেলাই করছেন কর্মীরা। ফাইল ছবি: Kroisenbrunner, CC BY-SA 4.0, উইকিমিডিয়া কমন্সের মাধ্যমে।

    সংক্ষেপে

    • প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের সানায়ে তাকাইচি মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর টোকিওতে যৌথ বিবৃতি দেন। এতে পাঁচ বছরে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ১ লাখ কোটি ইয়েন, প্রায় ৬৩৪ কোটি ডলারের জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগ এবং ২ লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
    • দুই দেশ তাদের বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্টকে “বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি”তে উন্নীত করেছে। মাতারবাড়ী-মহেশখালীকে পণ্য পরিবহন, জ্বালানি ও শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে গড়াই এর মূল বিষয়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং পরিবেশ নিয়ে সহযোগিতার পাঁচটি দলিলে সই হয়েছে।
    • ফেব্রুয়ারিতে সই হওয়া জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি দ্রুত কার্যকর করার অঙ্গীকার করেছেন দুই নেতা। ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের কথা রয়েছে। প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর আবেদন জাতিসংঘের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
    • তারেক রহমান একটি যৌথ মন্ত্রী পর্যায়ের কমিশন ও বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্কের প্রস্তাব দেন। বৈঠকে তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতি হতে পারে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে জিডিপি ১ লাখ কোটি ডলার ছাড়াতে পারে।

    কানতেইয়ে শীর্ষ বৈঠক

    তারেক রহমানের চার দিনের সরকারি সফরের দ্বিতীয় দিনে টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে শীর্ষ বৈঠক হয়। যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বাড়াতে তারেক রহমানের প্রশাসনের চেষ্টার প্রশংসা করেন তাকাইচি। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ১ লাখ কোটি ইয়েন, প্রায় ৬৩৪ কোটি ৩০ লাখ ডলারের জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগ ও ২ লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাকে তিনি স্বাগত জানান। এই উপলক্ষে বড় বিনিয়োগ ঘোষণাকে দুই প্রধানমন্ত্রী স্বাগত জানান। উৎপাদনশিল্প, খাদ্য ও কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ওষুধশিল্পে পরিপূরক ও অভিঘাত মোকাবিলায় সক্ষম সরবরাহব্যবস্থা গড়ার বিষয়েও তাঁরা একমত হন।

    বেসরকারি বিনিয়োগের এই প্রক্ষেপণ রাষ্ট্রীয় ঋণ বা কোম্পানিগুলোর বাধ্যতামূলক প্রতিশ্রুতি নয়। বৈঠকের আগে কর্মকর্তারা প্রায় ২০০ কোটি ডলার জাপানি ঋণ ও আর্থিক সহায়তার প্রত্যাশা করেছিলেন। এর মধ্যে ৩০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা। শীর্ষ বৈঠকের বিবরণে এর কোনোটিকেই সই হওয়া প্রতিশ্রুতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। তবে ওই বিবরণে না থাকা মানে জাপান এগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে, তা নয়। আর বেসরকারি বিনিয়োগকে রাষ্ট্রীয় ঋণ থেকে বিয়োগ করা বা তার বিকল্প হিসেবে ধরা যায় না।

    সই হয়েছে সহযোগিতার পাঁচটি দলিল, চারটি সমঝোতাপত্র ও একটি অভিপ্রায়পত্র। অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মধ্যে একটি সমঝোতাপত্র হয়েছে। জাপানের কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যথাক্রমে বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দুটি সমঝোতাপত্র হয়েছে। পরিবেশ নিয়ে দুই দেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের একটি সমঝোতাপত্র এবং জাপানের গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ব্যুরোর সঙ্গে বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি অভিপ্রায়পত্র হয়েছে।

    কেন্দ্রে মাতারবাড়ী

    এই দলিলগুলোর বৃহত্তর কাঠামো হলো দুই দেশের প্রধান উদ্যোগ বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্টকে “বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি”তে উন্নীত করা। উন্নীত উদ্যোগে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোকে যুক্ত করে শিল্পের মূল্যশৃঙ্খল এবং বাণিজ্য ও সরবরাহের প্রবেশপথ গড়ার কথা রয়েছে। এর কেন্দ্র ভৌগোলিক: মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ঘিরে মাতারবাড়ী-মহেশখালীকে বড় পণ্য পরিবহন, জ্বালানি ও শিল্পকেন্দ্রে গড়তে দুই দেশ কাজ করবে। বন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা করতে তারা সম্মত হয়েছে। ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর প্রস্তুতি এগোনো এবং ঢাকার মেট্রোরেল লাইনগুলোর নির্মাণ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও নেতারা একমত হন।

    অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি ফেব্রুয়ারিতে সই হলেও এখনো কার্যকর হয়নি। বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সহায়তার জন্য এই ধাপ দ্রুত শেষ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন দুই নেতা।

    ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের কথা রয়েছে। তবে প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর আবেদন জাতিসংঘের প্রক্রিয়ায় বিবেচনাধীন। উত্তরণ ঘটলে একই দিনে সব বাণিজ্যসুবিধা শেষ হয় না। বাজার ও ব্যবস্থাভেদে অন্তর্বর্তী সুবিধার শর্ত আলাদা। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নির্দেশনায় উত্তরণের তারিখ থেকে এসব ব্যবস্থা আলাদা করে দেখা হয়েছে।

    বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে জাপানের অংশ বেড়েছে। সংবাদে উদ্ধৃত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাবে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে জাপানের অংশ ছিল ৩.২৫ শতাংশ। মোট ১ হাজার ৫৮ কোটি ডলার রপ্তানির মধ্যে জাপানে গেছে ৩৪ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার। আগের পুরো অর্থবছরে জাপানের অংশ ছিল ২.৯৩ শতাংশ। হিসাবগুলো ভিন্ন দৈর্ঘ্যের সময়ের, সরাসরি বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধির হার নয়।

    জ্বালানি ও প্রস্তাব

    তারেক রহমানের বক্তব্যজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয় ছিল। পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া উদ্যোগের আওতায় সাম্প্রতিক ৫ হাজার কোটি ইয়েনের জরুরি সহায়তা ঋণের জন্য তিনি জাপানকে ধন্যবাদ জানান। বাংলাদেশের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আরও জাপানি বিনিয়োগ ও অংশগ্রহণ চান তিনি। সফরের প্রথম দিন সোমবার চিবায় জেরার এলএনজি টার্মিনাল পরিদর্শন করেন তিনি। বাংলাদেশের সারশিল্প আধুনিকায়ন ও নবায়নযোগ্য প্রকল্পে বিনিয়োগ চাইতে মারুবেনির চেয়ারম্যানের সঙ্গেও বৈঠক করেন।

    তাঁর দুটি কাঠামোগত প্রস্তাব ছিল অগ্রাধিকার খাতে সহযোগিতা দ্রুত করতে যৌথ মন্ত্রী পর্যায়ের কমিশন এবং জাপানি কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণ প্রযুক্তিকর্মীদের যুক্ত করতে বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক। শীর্ষ বৈঠকের সংবাদে কোনোটিকেই গৃহীত হিসেবে দেখানো হয়নি। দুটিই আলোচনায় দেওয়া প্রস্তাব। এগুলোর উদ্দেশ্য তুলে ধরতে তিনি নিজের ভাষায় বলেন, “২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতি হতে পারে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে আমাদের জিডিপি ১ লাখ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়াতে পারে।”

    সফরে রোহিঙ্গা বিষয়ও তুলেছেন তারেক রহমান। সোমবার তারো আসোর নেতৃত্বাধীন জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগের প্রতিনিধিদলের সঙ্গেও তিনি বিষয়টি তোলেন। বিভিন্ন রাজধানীতে ঢাকা যে প্রত্যাবাসনের দাবি জানায়, সেটিই তুলে ধরেন তিনি। শীর্ষ বৈঠকের প্রকাশিত বিবরণে অর্থনৈতিক বিষয়গুলোই কেন্দ্রে রয়েছে।

    এরপর যা হবে

    সফর চলবে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত। পরবর্তী বাস্তব পদক্ষেপ হলো নির্দিষ্ট কোম্পানির বিনিয়োগ ঘোষণা, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি কার্যকরের প্রক্রিয়া শেষ করা এবং উন্নীত বিগ-বি উদ্যোগের প্রকল্প। পরে কোনো ঋণ চুক্তি হলে তার পরিমাণ, ঋণগ্রহীতা, শর্ত ও সইয়ের তারিখ আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে হবে।