মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর বেলা প্রায় ১২টা ৪৩ মিনিটে পূর্বাঞ্চলীয় গ্রিডে বিপর্যয়ে পূর্ব ঢাকা ও চট্টগ্রামের কিছু অংশে বিদ্যুৎ বন্ধ হয়। বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে বাংলাদেশ সচিবালয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বিচারকাজ চলতে থাকা একটি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই ঘণ্টায় জাতীয় উৎপাদন ৫ হাজার ৩৭০ মেগাওয়াট কমে, যা দুপুরে উৎপাদিত বিদ্যুতের এক-তৃতীয়াংশের বেশি। কারণ এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
ছবির ক্যাপশন: সন্ধ্যায় ঢাকার মালিবাগের ফাইল ছবি। এটি ২৭ অক্টোবরের বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ছবি নয়। ছবি: Sharminsumona, CC BY-SA 4.0, উইকিমিডিয়া কমন্সের মাধ্যমে।
সংক্ষেপে
- পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি জানিয়েছে, বেলা প্রায় ১২টা ৪৩ মিনিট থেকে মতিঝিল, গুলশান, রামপুরা ও মগবাজারসহ পূর্ব ঢাকা এবং চট্টগ্রামের কিছু অংশে সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়। সচিবালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে।
- দুপুর ১২টায় উৎপাদন ছিল ১৪ হাজার ৭১৯ মেগাওয়াট, বেলা ১টায় তা ৯ হাজার ৩৪৯ মেগাওয়াটে নামে। ওই ঘণ্টায় গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন প্রায় ৬০ শতাংশ এবং কয়লাভিত্তিক উৎপাদন প্রায় ৩৯ শতাংশ কমে। বেলা ৩টায় উৎপাদন ছিল ১০ হাজার ৮২৫ মেগাওয়াট।
- ট্রাইব্যুনাল আধঘণ্টা অপেক্ষার পর দিনের কার্যক্রম স্থগিত করে। একজন প্রসিকিউটর বলেছেন, বিদ্যুৎ না থাকায় ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজ আগে কখনো বন্ধ হওয়ার কথা তাঁর মনে নেই।
- বিদ্যুৎ বিভাগ বিপর্যয়কে কারিগরি ত্রুটি বলেছে। তাদের বক্তব্য, বিকেল গড়ানোর মধ্যে বেশির ভাগ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিদ্যুৎ ফিরেছিল এবং অন্যত্র কাজ চলছিল। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের একজন সদস্য রাত ১০টার মধ্যে পরিস্থিতি স্বস্তিকর পর্যায়ে যাওয়ার আশা প্রকাশ করেছিলেন।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম বন্ধ
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি জানিয়েছে, পূর্ব ঢাকার ভুলতা, হরিপুর, সিদ্ধিরগঞ্জ, গুলশান, রামপুরা, উলন, মতিঝিল, মগবাজার, বনশ্রী ও খিলগাঁও এবং চট্টগ্রামের কিছু অংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়। বিদ্যুৎহীন প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরও ছিল: বাংলাদেশ সচিবালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ বিদ্যুৎ হারায়। পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের ভাষ্য অনুযায়ী, জাতীয় গ্রিডের কার্যক্রম ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। উত্তরাঞ্চলসহ দেশের অন্য এলাকায় সরবরাহ চালু ও স্বাভাবিক ছিল।
ট্রাইব্যুনালে বিভ্রাট বিচারকার্যক্রমে প্রভাব ফেলে। আধঘণ্টা অপেক্ষার পরও বিদ্যুৎ না ফিরলে আদালত কার্যক্রম স্থগিত করে এবং দিনের বাকি সময় না বসার সিদ্ধান্ত নেয়। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হোসেন তামিম সংবাদমাধ্যমকে বলেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজ বন্ধ হওয়ার পূর্ববর্তী কোনো ঘটনা তাঁর মনে পড়ছে না।
এক ঘণ্টায় উৎপাদনের বড় পতন
পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের ঘণ্টাভিত্তিক পরিসংখ্যানে বিপর্যয়ের মাত্রা পাওয়া যায়, যা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড প্রকাশ করেছে। দুপুর ১২টার ১৪ হাজার ৭১৯ মেগাওয়াট থেকে বেলা ১টায় উৎপাদন ৯ হাজার ৩৪৯ মেগাওয়াটে নামে। এক ঘণ্টায় কমে ৫ হাজার ৩৭০ মেগাওয়াট। কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক বড় কয়েকটি কেন্দ্র হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন ৪ হাজার ৩৮২ মেগাওয়াট থেকে ১ হাজার ৭৩৪ মেগাওয়াটে নামে। কমে ২ হাজার ৬৪৮ মেগাওয়াট, প্রায় ৬০ শতাংশ। কয়লাভিত্তিক উৎপাদন ৪ হাজার ৮৬৩ থেকে ২ হাজার ৯৪৭ মেগাওয়াটে নামে। কমে ১ হাজার ৯১৬ মেগাওয়াট, প্রায় ৩৯ শতাংশ। দুই জ্বালানি মিলিয়ে ওই ঘণ্টার উৎপাদন হ্রাসের ৪ হাজার ৫৬৪ মেগাওয়াটের হিসাব পাওয়া যায়। বেলা ৩টায় উৎপাদন বেড়ে ১০ হাজার ৮২৫ মেগাওয়াট হয়েছিল। পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের ঘণ্টাভিত্তিক তথ্য তখন ওই সময়ের পর আর হালনাগাদ হয়নি।
প্রাথমিক এক প্রতিবেদনে মেঘনাঘাট বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকাকে বিপর্যয়ের সূচনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে ওই বিবরণে পুরো কারিগরি ঘটনাক্রম প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বলেছে, ক্ষতিগ্রস্ত কেন্দ্রগুলোর সম্পূর্ণ ও নিশ্চিত তালিকা তখনো পাওয়া যায়নি। উৎপাদন কমার হিসাব হারানো বিদ্যুৎ উৎপাদন বোঝায়; এটি নিজে থেকে কোন যন্ত্রাংশে ত্রুটি হয়েছে বা কী কারণ, তা প্রমাণ করে না।
সকাল ১১টায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড চাহিদা ১৪ হাজার ৬০১ মেগাওয়াট ও উৎপাদন ১৪ হাজার ৩০৩ মেগাওয়াট বলেছিল। ঘাটতি ছিল ২৯৮ মেগাওয়াট। আগের ওই ঘাটতির সঙ্গে পরের বিপর্যয়ের কোনো সম্পর্ক কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠা করেননি। এসব পরিসংখ্যান ব্যবস্থার সম্পূর্ণ রিজার্ভ মার্জিন মাপে না বা কার্যকারণ সম্পর্ক প্রমাণ করে না।
সকালে মন্ত্রীর বক্তব্য
ওই দিন সকালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বুয়েটের রিনিউয়েবল এনার্জি ফেস্টে বক্তব্য দেন। তিনি বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা ও ভর্তুকি দিয়ে বিক্রির কথা বলেন। অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা বদলালে ব্যাংক খাতে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেন। বিভিন্ন উৎসের উৎপাদন যুক্ত করতে গ্রিড আধুনিকায়ন প্রয়োজন বলেও জানান তিনি। এসব নীতিগত উদ্বেগ বিকেলের বিভ্রাটের কারণ প্রতিষ্ঠা করে না।
এরপর যা হবে
বিদ্যুৎ বিভাগ ঘটনাকে কারিগরি ত্রুটি হিসেবে বর্ণনা করে জানায়, বেশির ভাগ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিদ্যুৎ ফিরেছে এবং অন্যত্র পুনরুদ্ধার চলছিল। পরে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের বিবৃতি নিয়ে সংবাদে বলা হয়, বেলা ২টা ৩০ মিনিটে গ্রিড পুনরুদ্ধার শেষ হয়েছিল। সঞ্চালন সংযোগ ফেরানো ও উৎপাদন পুনরুদ্ধার ভিন্ন মাপকাঠি। কোনোটিই একা প্রত্যেক গ্রাহকের স্বাভাবিক সেবা নিশ্চিত করে না।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের উৎপাদনের দায়িত্বে থাকা সদস্য মো. জহুরুল ইসলাম এর আগে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেছিলেন, বিবিয়ানা-৩ ও আরএনপিএল ইউনিট-১সহ কেন্দ্রগুলো ফিরছিল। রাত ১০টার মধ্যে সরবরাহ স্বস্তিকর পর্যায়ে পৌঁছানোর আশা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। সেটি প্রত্যাশা ছিল, নিশ্চিত পুনরুদ্ধারের সময় নয়। তা মূল্যায়নে পরবর্তী উৎপাদন ও গ্রাহকসেবার তথ্য প্রয়োজন।
২০২২ সালের ৪ অক্টোবর ও ২০১৪ সালের ১ নভেম্বরও বাংলাদেশে বড় গ্রিড বিপর্যয় হয়েছিল। এসব পূর্বঘটনা প্রমাণ করে না যে সর্বশেষ ঘটনার কারণও একই। সঞ্চালনব্যবস্থা পরিচালনাকারী পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসিকে তদন্তের মাধ্যমে কারিগরি ঘটনাক্রম নির্ধারণ করতে হবে।









