ট্যাগ বিটিভি

  • হঠাৎ কেন বিটিভির লোগো বদলের সিদ্ধান্ত?

    বছরে ২০০ কোটি টাকার বেশি লোকসানের মুখে ধুঁকতে থাকা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৯৮০ সালে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকারের আমলে রঙিন সম্প্রচার যুগে প্রবেশ করে বিটিভি। ওই বছরই শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের হাতে যুক্ত হয় বিটিভির রঙিন লোগো। ৪৬ বছরে চিরচেনা এই লোগোটি গেঁথে গেছে অনেকের হৃদয়ে। সেই লোগো কেন পরিবর্তনের চিন্তা করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

    গত রবিবার রাতে বিটিভির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বলা হয়, ‘ফিরছে নতুন রূপে বিটিভি। বাংলাদেশ টেলিভিশনের লোগো নির্মাণের গৌরবোজ্জ্বল অংশীদার হতে পারেন আপনিও। আপনার আইডিয়া অথবা লোগো ডিজাইন পাঠিয়ে দিন এই ঠিকানায়—logo@btv.gov.bd। জমা দেওয়ার শেষ তারিখ : ১০ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬।’ এ ঘোষণার পর সোশ্যালে শুরু হয়েছে আলোচনা। কেউ কেউ বিটিভির অনুষ্ঠানের মান বাড়ানোরও তাগিদ দিচ্ছেন।

    বিষয়টি নিয়ে আগামীর সময় যোগাযোগ করে বিটিভির মহাপরিচালক কাজী জেসিনের সঙ্গে। গত ৭ আগস্ট বিটিভিতে মহাপরিচালক পদে যোগ দিয়েছেন কাজী জেসিন। লোগো পরিবর্তনবিষয়ক যে বিজ্ঞাপনটি প্রকাশিত হয়েছে, তার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন তিনি। তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। কাজী জেসিন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের তিনজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। তারা বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিব রহমান পার্থকে ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

    কাজী জেসিন মহাপরিচালকের দায়িত্ব নেওয়ার পর গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। গত ২৫ আগস্ট নিজের ফেসবুক পোস্টে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কাজী জেসিন বলেন, বিটিভিকে শুধু আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়া নয়, বরং আরও আধুনিক, অনন্য ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে চান প্রধানমন্ত্রী।

    তবে কী লোগো পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই বিটিভিকে নতুন রূপে সাজানোর কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে? কাজী জেসিনের ভাষ্য, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিটিভিকে ক্ষমতাসীন দলের প্রচারযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি দর্শক হারিয়েছে এবং বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে পড়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পরও বিটিভিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের সূচনা হয়নি। অতীতে কোনো সরকার বিটিভিকে নিয়ে এতটা গুরুত্ব দিয়ে ভাবেনি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠানটির পরিবর্তনে উদ্যোগ নিয়েছেন। এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে বিটিভিকেও নতুনভাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

    বিটিভির রঙিন লোগো অনুমোদন করেছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তার সময়েই দর্শকদের জন্য প্রথমবার রঙিন সম্প্রচারে যায় রাষ্ট্রীয় এই টেলিভিশনটি। ফাইল ছবি

    জিয়াউর রহমানের অনুমোদিত লোগো কেন হঠাৎ পরিবর্তন?

    ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর ঢাকার তৎকালীন ডিআইটি ভবনের নিচতলায় বিটিভির যাত্রা শুরু হয়। এরপর সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশের জন্মের পরের বছর যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ টেলিভিশন। ১৯৭৫ সালে ডিআইটি ভবন থেকে বিটিভিকে রামপুরায় নিজস্ব ভবনে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৮০ সালে দর্শকদের রঙিন পর্দা উপহার দেওয়ার মাধ্যমে নতুন যুগে পদার্পণ করে বিটিভি। বর্তমানে চ্যানেলটির সম্প্রচার এইচডি (হাই ডেফিনিশন) এবং টেরিস্ট্রিয়াল, স্যাটেলাইট ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে।

    লেখক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব খ ম হারুন আগামীর সময়কে বলেন, ‘মনে রাখতে হবে বর্তমান লোগোটিতে শিল্পী কামরুল হাসান ও মুস্তাফা মনোয়ারের হাতের স্পর্শ আছে। শিল্পী ইমদাদ হোসেন ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে বিটিভির লোগো নির্মাণে ভূমিকা রাখেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৮০ সালে বিটিভি যখন রঙিন যুগে প্রবেশ করে, তখন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আগের লোগোটিকে আবার নতুন রূপে অঙ্কিত করেন।’

    প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অনুমোদন করা লোগোটি বর্তমান বিএনপি সরকার কেন পরিবর্তন করতে চাইছে— এই প্রশ্ন তুলে খ ম হারুন বলেন, ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন ১৯৮০ সালের ১ ডিসেম্বর রঙিন যুগে প্রবেশ করে। সেদিন রঙিন টেলিভিশন এবং মুস্তাফা মনোয়ার পরিকল্পিত বিটিভির রঙিন লোগো (১৯৭১-এর মূল লোগোর নতুন রূপ) উদ্বোধন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এখন হঠাৎ লোগোটি পরিবর্তন করা কেন এত জরুরি হলো?’

    বিটিভির এখন কী কী করা উচিত, সে বিষয়ে কিছু পরামর্শও দেন এই টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব। তিনি বলেন, ‘এখন দরকার বিটিভির অনুষ্ঠানে বৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা এবং মেধাবী মানুষদের দিয়ে নতুন নতুন কনটেন্ট তৈরি করা। তথাকথিত অডিশন প্রথা বাতিল করে গুণী শিল্পীদের আলাদাভাবে তালিকাভুক্ত করা; বিটিভির ত্রৈমাসিক অনুষ্ঠান পরিকল্পনা এবং সেই ভিত্তিতে টিভি গাইড পুনরায় প্রকাশের ব্যবস্থা করা; বিটিভির সব চ্যানেলের শূন্য পদ পূরণসহ সব স্তরে দুর্নীতিমুক্ত করা। নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং শিল্পী সম্মানী কাঠামো যুগোপযোগী করা।’

    এ ছাড়া টেলিভিশন সংযোগ ও টেলিভিশন সেটের ওপর আরোপিত লাইসেন্স ফির যথাযথ হিসাব রাখা, পাবলিক সার্ভিস ব্রডকাস্টিং অর্গানাইজেশন হিসেবে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরশীল না হওয়া এবং বিটিভির ওয়েবসাইটকে আরও জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শও দেন তিনি।

    বিটিভির আয় ও ব্যয় কত?

    ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত করসহ বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মোট আয় হয়েছে ৮ কোটি ৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এর বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ২৫৪ কোটি ১৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। গত ২২ জুন জাতীয় সংসদে নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হুদার প্রশ্নের জবাবে সাবেক তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এ তথ্য জানিয়েছিলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর টেবিলে তা উপস্থাপন করা হয়।

    সাবেক তথ্যমন্ত্রী জানান, ওই অর্থবছরে বিটিভির মোট আয়ের মধ্যে বিজ্ঞাপন শাখা থেকে রাজস্ব আয় হয়েছে ৫ কোটি ৭ লাখ ৯ হাজার ৪১৭ টাকা। একই সঙ্গে তিনি বিটিভির গত পাঁচ অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের চিত্র তুলে ধরেন।

    মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে বিটিভির আয় ছিল ৩৪ কোটি ৫ লাখ ৯৯ হাজার টাকা, ব্যয় ২৮০ কোটি ৮১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে আয় ৪০ কোটি ২৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং ব্যয় ২৮৫ কোটি ৪৭ লাখ ২৭ হাজার টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয় ৩০ কোটি ৮৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকা, ব্যয় ৩৭০ কোটি ৬১ লাখ ৫১ হাজার টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আয় দাঁড়ায় ৪৪ কোটি ২১ লাখ ২২ হাজার টাকা, ব্যয় ২৯৮ কোটি ৫৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় ছিল ২৭ কোটি ৬৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং ব্যয় ৩০৭ কোটি ৯২ লাখ ২২ হাজার টাকা।

  • বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপ দেখাতে পারে বিটিভি

    বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপ দেখাতে পারে বিটিভি

    সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম বিটিভি সরাসরি খেলা সম্প্রচার করবে। ফলে বাংলাদেশে ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখা যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেকটাই কেটেছে।

    আজ বুধবার তথ্য মন্ত্রণালয় ও বিটিভির দুটি সূত্র প্রথম আলোকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলতে রাজি হননি।

    জানতে চাইলে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন প্রথম আলোকে বলেন, ‘পাবলিক মানি (জনগণের টাকা) খরচ না করে পাবলিককে খেলা দেখানোর জন্য সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা সন্তোষজনকভাবে এগিয়ে চলছে।’

    ১১ জুন পর্দা উঠছে বৈশ্বিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই আসরের। বাংলাদেশে এবারের বিশ্বকাপের সম্প্রচারস্বত্ব পেয়েছিল সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্প্রিংবক পিটিই লিমিটেড। বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের কাছ থেকে স্বত্ব কিনে বাংলাদেশে খেলা সম্প্রচার করার কথা ছিল।

    প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রচারস্বত্ব বাবদ বিটিভির কাছে প্রায় ১৫১ কোটি টাকা চেয়েছিল। করসহ তা দাঁড়াত ২০০ কোটি টাকার কাছাকাছিতে। তবে শেষ পর্যন্ত সেই চুক্তি হয়নি।

    এদিকে বিক্রি করতে না পারায় স্বত্ব ছেড়ে দিয়েছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ওই প্রতিষ্ঠান।

    এরপর বাংলাদেশ সরকার বিশ্বকাপ ফুটবল সম্প্রচার নিয়ে সরাসরি ফিফার সঙ্গে আলোচনা শুরু করে। গতকাল মঙ্গলবার রাতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র প্রথম আলোকে জানায়, বিনা মূল্যে সম্প্রচারস্বত্ব পেতে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে ফিফার সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে।

    তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) এবং বিটিভির শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এ আলোচনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

    তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওই সূত্র প্রথম আলোকে বলেছে, আশা করা যায়, দর্শকেরা খেলা দেখতে পারবেন। আলোচনা চূড়ান্ত হলে বিটিভি বিশ্বকাপ সম্প্রচারস্বত্ব নেবে। বেসরকারি পর্যায়ে যারা খেলা দেখাবে, তারা বিটিভি থেকে স্বত্ব নেবে। দুই–এক দিনের মধ্যে হয়তো আলোচনা চূড়ান্ত হবে।

    এদিকে খেলা সরাসরি সম্প্রচার করবে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম টফিও। প্রতিষ্ঠানটি প্রথম আলোকে জানায়, বিশ্বকাপ ফুটবলের ডিজিটাল সম্প্রচারস্বত্ব পেয়েছে বাংলালিংক ও টফি। বাংলালিংকসহ সব ফুটবলপ্রেমীরা টফিতে খেলা দেখতে পারবেন।

    বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত ও চীনের কোটি কোটি ফুটবল সমর্থকও সম্প্রচারস্বত্ব জটিলতার কারণে বিশ্বকাপ দেখা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ছিলেন। তবে সম্প্রতি ফিফা চায়না মিডিয়া গ্রুপের (সিএমজি) সঙ্গে ২০২৬ ও ২০৩০ পুরুষ বিশ্বকাপ এবং ২০২৭ ও ২০৩১ নারী বিশ্বকাপের সম্প্রচার চুক্তি নিশ্চিত করেছে।

    আর ভারতের গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান জি এন্টারটেইনমেন্টের সঙ্গে চুক্তি করেছে ফিফা।

    বিটিভি সূত্র বলছে, ২০১৮ সালে ‘প্যাকেজ নীতিমালা’–এর (যারা সম্প্রচারস্বত্ব পেত, তারা বিটিভির মাধ্যমে সম্প্রচার করত) আওতায় কোনো খরচ ছাড়াই বিশ্বকাপ সম্প্রচার করেছিল বিটিভি।

    তবে ২০২২ সালে এই নীতিমালা বাতিল হয়ে যায়। ফলে ওই বছর বিশ্বকাপের আগে শেষ মুহূর্তে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তে অর্থ বরাদ্দ পায় বিটিভি। তখন ‘বিশেষ বাজেটে’ ৯৮ কোটি টাকা খরচ করে সম্প্রচারস্বত্ব কিনেছিল তারা।