ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শত বছরের পুরোনো দেয়াল অনেক কিছুর সাক্ষী। এই বিশ্ববিদ্যালয় একদিকে যেমন ন্যায়পন্থি বিভিন্ন আন্দোলন ও মুক্তিসংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরেই সংঘটিত বিভিন্ন হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় রয়েছে বিচারহীনতার কালো ইতিহাস। সেই নির্মম বাস্তবতায় আজও বিচারের অপেক্ষায় আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর পরিবার ও সহপাঠীরা।
২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্যার এএফ রহমান হলে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে নিহত হন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু বকর সিদ্দিক। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর মামলায় অভিযুক্ত দশজনই খালাস পান। এমনকি রাষ্ট্রপক্ষ সেই খালাসের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল পর্যন্ত করেনি মর্মে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস এলাকায় নিহত হলেন, মামলা হলো, বিচার হলো; কিন্তু শেষ পর্যন্ত হত্যাকারী কে, সেটিই প্রমাণ করা গেল না!
একইভাবে, ২০২৫ সালের ১৩ মে রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আলম সাম্য টিএসসির নিকটস্থ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকায় ছুরিকাঘাতে নিহত হওয়ার ঘটনায় আজও সুষ্ঠু বিচার পাননি তার পরিবার ও সহপাঠীরা।
এই যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি—এর নেপথ্যের কারণ কী? একটি হত্যার বিচার নিশ্চিত না হওয়া অপরাধীদের আরেকটা হত্যার পথ সহজ করে দেয়। এরূপ হত্যার শিকার শুধু আবু বকর বা সাম্য নয়, আরো অনেকে হয়েছেন বিভিন্ন সময় এবং তারও অনেক ক্ষেত্রে কোনো বিচার হয়নি। অপরাধীদের কোনো শাস্তি হয়নি। ক্যাম্পাসে ক্ষমতার রাজনীতির অপচর্চা বিচারকে প্রভাবিত করেছে বহুবার। নৈতিক মূল্যবোধ আর সততার শিক্ষা দেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার নিজস্ব শিক্ষার্থীদেরই হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে পারেনি, এর চেয়ে লজ্জা আর কী হতে পারে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবু বকর ও সাম্য হত্যার মতো প্রতিটি ঝুলে থাকা হত্যাকাণ্ডের বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি কোনো অনিবার্য বাস্তবতা নয়। এটি তৈরি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা, জবাবদিহির অভাব এবং সর্বোপরি, সময়ের সঙ্গে বিচারপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীদের স্মৃতি থেকে ঘটনাগুলো হারিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। তাই এর প্রতিকারও হতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক, ধারাবাহিক ও দৃশ্যমান মাধ্যমে।
প্রথমত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সব হত্যাকাণ্ডের একটি পূর্ণাঙ্গ নথি প্রণয়ন করা প্রয়োজন। ক্যাম্পাসের নিহত শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ ডেটা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ‘আর্কাইভ’ তৈরি করা যেতে পারে। সেখানে শুধু নিহত শিক্ষার্থীর ছবি কিংবা স্মৃতিচারণই থাকবে না; বরং মামলার নম্বর, তদন্তের অবস্থা, চার্জশিট, বিচারিক অগ্রগতি, আসামিদের বর্তমান অবস্থা এবং মামলাটি কোথায় আটকে আছে—এসবের পূর্ণাঙ্গ তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে।
দ্বিতীয়ত, বিচার শুধু ভুক্তভোগী পরিবারের ওপর ছেড়ে না দিয়ে বিচারাধীন প্রতিটি মামলার অগ্রগতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কর্তৃক দায়িত্ব নিয়ে নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ডাকসু, শিক্ষার্থী প্রতিনিধি এবং প্রয়োজনে আইনজীবীদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন সেল গঠন করা যেতে পারে। এই সেল কোনো বিচারিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করবে না; বরং সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করে নির্দিষ্ট সময় পরপর তা শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার সামনে তুলে ধরবে।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে যেকোনো মূল্যে অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হতে হবে। অপরাধী কোনো দলের, কোনো সংগঠনের কিংবা কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ—এই পরিচয় যেন তদন্তের গতিপথ নির্ধারণ না করে। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় যদি একজন অপরাধীকে আইনের নাগালের বাইরে নিয়ে যায়, তাহলে সেটি আর রাজনীতি থাকে না; সেটি হয়ে যায় শোষণের হাতিয়ার।
চতুর্থত, বিচারপ্রত্যাশী সচেতন শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিচার দাবির ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হবে। আমাদের লেখালেখি, আলাপ, সভা-সেমিনার, পাঠচক্রে নিহতদের বিচার দাবি জীবন্ত রাখতে হবে। আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সম্ভবত এখানেই। একটি হত্যাকাণ্ডের পর আমরা সোচ্চার হই, মিছিল করি, প্রতিবাদ করি। কিন্তু কয়েক মাস কিংবা কয়েক বছর পর যখন নতুন কোনো ঘটনা সামনে আসে, তখন পুরোনো মামলাটি আমাদের আলোচনার বাইরে চলে যায়। তাছাড়া ঘটনার সময়কার শিক্ষার্থীরা একসময় লেখাপড়া শেষে ক্যাম্পাস ছেড়ে যান এবং ক্যাম্পাসে নতুন শিক্ষার্থীরা আসেন, যারা এ বিষয়ে জানতেও পারেন না। এভাবে বিচারহীনতা দীর্ঘায়িত হয়। নিহতদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে কাজ করা শিক্ষার্থী, প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট সবারই দায়িত্ব।পাশাপাশি, নতুন করে যাতে আর কোনো হত্যাকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেই লক্ষ্যে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ও সিসিটিভি নজরদারি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। টিএসসি, কার্জন হল এলাকাসহ ক্যাম্পাসের নিকটবর্তী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো এলাকাগুলোতে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা টহল ও আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে ক্যাম্পাস এলাকা সুরক্ষিত রাখতে হবে, যাতে কোনো অপরাধী অপরাধ ঘটিয়ে সটকে পড়ার সুযোগ না পায়!



