মিশরীয় ফরোয়ার্ড হামজা আবদেলকারিমের সঙ্গে ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত চুক্তিতে সম্মত হয়েছে স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনা।
আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টায় (সিইএসটি) বার্সেলোনা সভাপতি হোয়ান লাপোর্তার কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিতে সই করবেন আবদেলকারিম। এরপর ক্লাবের কমার্শিয়াল অফিসে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হবেন তিনি।
২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ধারে বার্সেলোনায় যোগ দেন এই মিশরীয় ফরোয়ার্ড। মৌসুমের শেষ পর্যন্ত ধারে খেলার কথা থাকলেও খুব দ্রুতই নজর কাড়েন তিনি। ৮ মার্চ উস্কার বিপক্ষে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে অভিষেক ম্যাচেই গোল করেন আবদেলকারিম।
মাত্র ছয়টি লিগ ম্যাচে নয় গোল করেন তিনি। এর মধ্যে মন্টেকার্লোর বিপক্ষে বার্সেলোনার ৯-০ গোলের জয়ে হ্যাটট্রিকও করেন। ওই ম্যাচেই বার্সেলোনা División d’Honor শিরোপা নিশ্চিত করে।
২০২৬ সালের গ্রীষ্মে আবদেলকারিমকে স্থায়ীভাবে দলে নেয় বার্সেলোনা। এরপর হান্সি ফ্লিকের অধীনে প্রথম দলের সঙ্গে প্রাক-মৌসুম প্রস্তুতিতে অংশ নেন তিনি। প্রাক-মৌসুমে চার গোল করে দলের সর্বোচ্চ গোলদাতাও হন এই ফরোয়ার্ড।
গত ৩১ আগস্ট স্প্যানিশ লা লিগায় রায়ো ভায়েকানোর বিপক্ষে স্পটিফাই ক্যাম্প ন্যুতে বার্সেলোনার হয়ে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে অভিষেক হয় আবদেলকারিমের।
রবি ঠাকুরের কবিতার লাইনগুলো নিশ্চয়ই জানা? ‘বহু দিন ধ’রে বহু ক্রোশ দূরে/ বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে/ দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা/ দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু…।’
পরের লাইনগুলোয় একটু পরে আসা যাবে। আগে এই লাইনগুলোর তরজমা হোক। রবার্ট লেভানডফস্কি ও ফেরান তোরেস চলে যাওয়ার পর হন্যে হয়ে স্ট্রাইকার খুঁজেছে বার্সেলোনা। পছন্দ ছিল একটাই—আতলেতিকো মাদ্রিদের হুলিয়ান আলভারেজ। সে জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলে চেষ্টা করেছে বার্সা। আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকারের সেই ডাকে সাড়া দেওয়ার যত ইচ্ছাই থাকুক, আতলেতিকো তাঁকে ছাড়বে কেন! একে তো অমন একটা স্ট্রাইকারকে ছাড়লে তাদের লোকসান, তার ওপর লিগের প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাতে আলভারেজকে তুলে দেওয়ার অর্থ হলো নিজেদের পায়েই কুড়াল মারা।
অতএব আলভারেজ মিশনে বহুদিন ধরে বহুভাবে চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত খালি হাতে ফিরেছে বার্সা। মৌসুম শুরুর আগে তাই প্রশ্ন উঠেছিল কাতালান ক্লাবটির সেন্টার ফরোয়ার্ড হবেন কে? স্বয়ং বার্সার এক বোর্ড সদস্যই প্রাক্–মৌসুমে সেন্ট জর্জেস পার্কে বার্সার অনুশীলনে কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফুটিয়ে বলেছিলেন, ‘(দলে) কোনো সেন্টার ফরোয়ার্ড নেই।’
কিন্তু এখন আর সেই প্রশ্নের অস্তিত্ব নেই। রসিকতা করে কেউ কেউ বলতে পারেন, বার্সার নীতিনির্ধারকদের হয়তো বিশ্বকবির ওই কবিতার পরের লাইনগুলো জানা ছিল! সে যাহোক, পরের লাইনগুলোয় ফিরে দেখা যাক—‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/ একটি ধানের শিষের উপরে/ একটি শিশিরবিন্দু।’
রাফিনিয়া এখন বার্সার সেই ‘শিশিরবিন্দু’।
ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলতে আগে রবি ঠাকুরের লাইনগুলোর সারমর্ম একটু বুঝিয়ে বলতে হয়। কবি বলছেন, প্রচুর অর্থ ও সময় খরচ করে মানুষ দূর-দূরান্তে সৌন্দর্য দেখতে ছুটে যায়, কিন্তু ঘরে কিংবা ঘরের কাছে থাকা সুন্দর রূপটি অনেক সময় অদেখাই থেকে যায়।
এই রাফিনিয়াকে আগে দেখা যায়নি রয়টার্স
বার্সার ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ঘরের ভেতরকার সেই ‘সৌন্দর্য’ অদেখা থাকলেও শেষ পর্যন্ত চোখ ও মস্তিস্কের রাডারে ব্যাপারটা ধরা পড়েছে। তার আগে অবশ্য ক্যাম্প ন্যুর চৌকাঠের ওপাশে দু–পা ফেলে মাদ্রিদে গিয়ে আলভারেজ নামে আর্জেন্টাইন সৌন্দর্যের সন্ধান করেছেন বার্সার নীতিনির্ধারকেরা। সেখান থেকে ব্যর্থ মনোরথে ঘরে ফিরে বার্সার টিম ম্যানেজমেন্ট যেন হঠাৎ করেই ব্রাজিলিয়ান সেই ‘শিশিরবিন্দু’ আবিষ্কার করে ফেললেন! দরকার ছিল শুধু সেই ‘শিশিরবিন্দু’র অবস্থানটা একটু পাল্টানো। কোচ হান্সি ফ্লিক সেটা করার পর ফলটা মিলছে হাতেনাতে।
চলতি মৌসুমে ৫ ম্যাচ খেলেছে বার্সা। সবগুলো ম্যাচেই শুরুর একাদশের হয়ে মাঠে নামেন রাফিনিয়া। তবে একটু অন্য ভূমিকায়। উইঙ্গার হিসেবে এত দিন খেললেও চলতি মৌসুমে রাফিনিয়াকে দেখা যাচ্ছে মুক্ত ফরোয়ার্ডের ভূমিকায়। তাতে ৫ ম্যাচে পেয়েছেন ৮ গোল, অ্যাসিস্ট ১টি। কিন্তু এটা তো মাঠের ফল। বার্সার নীতিনির্ধারকদের মনেও একটা প্রভাব পড়ার কথা। আলভারেজকে তাঁরা নিশ্চয়ই ভুলে গেছেন! কিংবা এভাবেও বলা যায়, উইঙ্গার থেকে ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলে রাফিনিয়া বার্সার আলভারেজ–বিরহ ভুলিয়ে ছেড়েছেন।
বার্সার মাঝমাঠ থেকে পেদ্রি কিংবা ডান প্রান্ত থেকে লামিনে ইয়ামাল গোলের পাস দিতে এখন রাফিনিয়াকে খোঁজেন। ফেইনুর্ডের বিপক্ষে তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় গোল সে কথাই বলে।
বার্সার সমর্থকেরা সে জন্য তাঁদের ক্লাবকে একটা ধন্যবাদও জানাতে পারেন। সর্বশেষ বিশ্বকাপ থেকে বার্সা আলভারেজের পেছনে ছুটতে শুরু করেছিল বলেই তো এই মৌসুমে রাফিনিয়ার ভেতরকার ফরোয়ার্ড–সত্তাটা জেগে উঠল! আর সেই সত্তায় শুধু গোল এবং অ্যাসিস্ট নয়, ফুটছে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সেই ছন্দময় গতি, ড্রিবলিং, স্ট্যামিনা ও ফিনিশিং দক্ষতা। চ্যাম্পিয়নস লিগে ফেইনুর্ডের বিপক্ষে তাঁর প্রথম গোলকেই উদাহরণ হিসেবে নিতে পারেন।
বক্সে দৌড়ের ওপর রাফিনিয়ার পায়ে বল। তাঁকে ঠেকাতে ডাচ ক্লাবটির দুজন ডিফেন্ডার একসঙ্গে স্লাইডিং ডাইভে সামনে চলে এলেন। তখন রাফিনিয়ার বাঁ পায়ে যেন ফুটবল কবিতার ছন্দ! আলতো স্পর্শে বলটা বাঁ দিকে যখন সরালেন, দুই ডিফেন্ডার তখন তাঁর সামনে দিয়ে স্লাইড করে যেন নেদারল্যান্ডসে চলে গেলেন! তারপর বাঁ পায়ের শটে গোল। জার্সি নম্বর ১১ হলেও কে বলবে এই রাফিনিয়া ৯ নম্বর নয়!
রাফিনিয়াকে আটকাতে যাওয়া দুই ফেইনুর্ড ডিফেন্ডার স্লাইডে দূরে সরে শুধু গোল হতে দেখলেন রয়টার্স
বার্সার গোলের সমস্যা সমাধানে রাফিনিয়ার এগিয়ে আসা নতুন কিছু না। ২০২৪-২৫ মৌসুমে করেছিলেন ৩৪টি গোল ও ২৬টি অ্যাসিস্ট; যার মধ্যে লিগে অবদান ছিল ৩০ গোলে (১৮টি গোল ও ১২টি অ্যাসিস্ট)। বার্সাও জিতেছিল লা লিগা শিরোপা। আর রাফিনিয়াও উইঙ্গার পজিশন থেকে প্রথাগত ফরোয়ার্ডদের মতো বক্সে ঢুকে কিংবা তার আশপাশ থেকে গোলগুলো করেন এবং করান। সরাসরি সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে তখনো খেলা শুরু করেননি।
পরের মৌসুমে চোটের কারণে মাসের পর মাস মাঠের বাইরে থাকতে হলেও তাঁর কার্যকারিতা ছিল দেখার মতো। সেবারও ২১ গোল করার পাশাপাশি ৮ অ্যাসিস্ট করে বার্সার লিগ শিরোপা ধরে রাখতে ভূমিকা রাখেন। কিন্তু বিশ্বকাপেও চোটে পড়ায় হলুদ জার্সিতে সেই রাফিনিয়াকে দেখা যায়নি।
মরক্কো ও হাইতির বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে খেলেছেন। গোল পাননি। চোটে পড়েন হাইতি ম্যাচে। সুস্থ হয়ে শেষ ষোলোয় নরওয়ের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমেও গোল পাননি। ব্রাজিলও হেরে বিদায় নেয় শেষ ষোলো থেকে। এই বিশ্বকাপ চলার মাঝেই বার্সার আলভারেজের পিছু ছোটার খবর বেশি করে চাউর হয় সংবাদমাধ্যমে। রাফিনিয়ার কি তখন আঁতে ঘা লেগেছিল? কে জানে!
বল হারালে প্রেস করছেন, আক্রমণে উঠছেন, সব মিলিয়ে আরও সহজ করে তুলছেন বার্সার খেলাকে। অথচ এর আগে কোনো ক্লাবেই ফরোয়ার্ড (৯ নম্বর) পজিশনে খেলেননি রাফিনিয়া।
বার্সার জার্মান কোচ ফ্লিক কৌশলে দূরদর্শী মানুষ। বিশ্বকাপ শেষে এবারের মৌসুম শুরুর আগে রাফিনিয়ার পজিশন নিয়ে বার্সার অনুশীলনে বেশ কাজ করেন ফ্লিক। উইঙ্গার পজিশন থেকে তাঁকে সরিয়ে এনে মাঠের ভেতরে ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলানোর সিদ্ধান্ত নেন। মুক্ত ফরোয়ার্ড হয়ে আক্রমণভাগ চষে বেড়ানোর ভার দেন রাফিনিয়ার কাঁধে। এতে শুধু বার্সার খেলার কৌশল বদলায়নি, আক্রমণভাগ নিয়ে দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তার অবসানও হয়েছে।
তবে সন্দেহও ছিল। উইং পজিশনটা সাধারণত বল নিয়ে লম্বা দৌড়ের। সামনে প্রতিপক্ষ পেলে হয় পাস দিয়ে বল ছাড়তে হয় কিংবা ড্রিবলিং করে বেরিয়ে যেতে হয়। রাফিনিয়া এত দিন সেভাবেই অভ্যস্ত ছিলেন। সেখান থেকে একদম বক্সে কিংবা তার আশপাশে সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ড পজিশনে খেলার কিছু ঝামেলা ছিল।
জায়গাটা সংকীর্ণ, প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের জটলায় খেলার জায়গাও খুব কম মেলে। বার্সার খেলার ধাঁচের সঙ্গে মিলিয়ে ওই পজিশনে সফল হতে হলে পায়ের কারুকাজ থাকা বাধ্যতামূলক। এর সঙ্গে ফিনিশ করার সহজাত ক্ষমতাও লাগে। প্রশ্ন ছিল, রাফিনিয়া কি ওই পজিশনে মানিয়ে নিতে পারবেন?
২০২৬–২৭ মৌসুমের প্রথম পাঁচ ম্যাচে ৮ গোল করে রাফিনিয়া এখন উড়ছেন রয়টার্স
উত্তর মিলছে মাঠেই। কতটা মানিয়ে নিয়েছেন এ মৌসুমে গোল–পরিসংখ্যানই তার প্রমাণ। আর গোল করার বাইরে সতীর্থদের নিয়ে যেভাবে খেলে যাচ্ছেন, তা হয়তো আরও বড় প্রমাণ। বার্সার মাঝমাঠ থেকে পেদ্রি কিংবা ডান প্রান্ত থেকে লামিনে ইয়ামাল গোলের পাস দিতে এখন রাফিনিয়াকে খোঁজেন। ফেইনুর্ডের বিপক্ষে তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় গোল সে কথাই বলে।
সবচেয়ে দারুণ ব্যাপার, রাফিনিয়ার খেলা দেখে মনে হচ্ছে এটাই তাঁর চিরাচরিত পজিশন। বল হারালে প্রেস করছেন, আক্রমণে উঠছেন, সব মিলিয়ে আরও সহজ করে তুলছেন বার্সার খেলাকে। অথচ এর আগে কোনো ক্লাবেই ফরোয়ার্ড (৯ নম্বর) পজিশনে খেলেননি।
আরও মজার বিষয়, ২০২২ সালে বার্সায় যোগ দেওয়ার সময় রাফিনিয়া কিন্তু বাঁ প্রান্তের উইঙ্গার ছিলেন না। ডান প্রান্তের উইঙ্গার হয়ে ক্লাবটিতে যোগ দিয়ে দেম্বেলে ও তারপর ইয়ামালের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সরে যান বাঁয়ে। ক্লাবের প্রয়োজনেই সেই রাফিনিয়া এখন ফরোয়ার্ড—ফোঁটা ফোঁটা শিশিরবিন্দুর মতো তাঁর একেকটি গোলে ব্রাজিলিয়ানের সবচেয়ে সুন্দর রূপটি কি দেখছে বার্সা?
দল জিতেছে ৫-০ গোলে। মৌসুমের শুরুটা হয়েছে চার ম্যাচে চার জয়ে। পয়েন্ট টেবিলেও অবস্থান শীর্ষে। কিন্তু এমন দুর্দান্ত শুরুর পরও পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন বার্সেলোনা কোচ হান্সি ফ্লিক। তাঁর চোখে, এই বার্সেলোনার আরও ভালো করার জায়গা আছে।
রোববার রাতে মেস্তায়ায় ভ্যালেন্সিয়াকে রীতিমতো উড়িয়ে দিয়েছে বার্সেলোনা। লামিনে ইয়ামাল করেছেন জোড়া গোল, গোল পেয়েছেন রাফিনিয়া, ফেরমিন লোপেজ আর পেদ্রিও। এই জয়ে চার ম্যাচে চার জয় নিয়ে বার্সার মৌসুমটাই শুরু হলো শিরোপার বড় দাবিদার হিসেবে। আগের দিন রিয়াল বেতিসের কাছে হেরে যাওয়া রিয়াল মাদ্রিদ আছে পয়েন্ট তালিকার তিনে, মাঝে দুইয়ে আলাভেস।
ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের পর ফ্লিকের মুখে শুধু প্রশংসাই ছিল না; বরং ৫-০ গোলের জয়ের পরও তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, নিখুঁত বলে কিছু নেই, ‘আজ আমরা দারুণ খেলেছি, প্রায় নিখুঁতই বলা যায়। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে ছিল, আমরা আধিপত্য দেখিয়েছি। আমি এটাই চাই। ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করা এবং জায়গা খুঁজে নেওয়া। আমরা সেটা করতে পেরেছি।’
এরপরই সতর্ক করেছেন, ‘কিন্তু কিছুই নিখুঁত নয়। সব সময়ই উন্নতির জায়গা থাকে। আমরা আরও ভালো করতে পারি।’
শুধু জয় নয়, বার্সেলোনার আক্রমণাত্মক ফুটবলের ধারও চোখে পড়ছে শুরু থেকেই। চার ম্যাচের তিনটিতেই ৫ গোল করেছে বার্সা। সব মিলিয়ে ১৭ গোল হয়ে গেছে এরই মধ্যে। রাফিনিয়া স্ট্রাইকারের ভূমিকায় খেলে করেছেন ৬ গোল। ফেরমিন ও ইয়ামালের গোল ৪টি করে।
এমন গোল-উৎসবের মধ্যেই অবশ্য বার্সেলোনার একজন প্রকৃত ‘নাম্বার নাইন’ দরকার কি না, সে আলোচনাও চলছে। রবার্ট লেভানডফস্কি ও ফেরান তোরেসের বিদায়ের পর নতুন স্ট্রাইকারের খোঁজে ছিল বার্সেলোনা। আতলেতিকো মাদ্রিদের হুলিয়ান আলভারেজকে নেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত গ্যাব্রিয়েল জেসুসকে দলে এনেছে তারা। ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষেই বদলি হিসেবে অভিষেক হয়েছে তাঁর।
তবে জেসুসের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বার্সেলোনা এভাবে গোল করতে থাকলে। ফ্লিক অবশ্য একজন স্ট্রাইকার এখনো দরকার মনে করছেন, ‘আমাদের একজন প্রকৃত নাম্বার নাইন দরকার, এটা পরিষ্কার। তবে আক্রমণভাগে আমাদের অনেক মানসম্পন্ন খেলোয়াড় আছে। মাঝমাঠেও আছে, যারা গোল করতে পারে।’
বার্সেলোনা কোচ হান্সি ফ্লিক এএফপি
ভ্যালেন্সিয়া ম্যাচ দিয়ে বার্সার প্রথম একাদশে অভিষেক হয়েছে রদ্রির। ম্যানচেস্টার সিটি থেকে আসা এই মিডফিল্ডার এক ঘণ্টা মাঠে থেকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। বার্সেলোনার হয়ে সবচেয়ে বেশি ৮১টি সফল পাস ছিল তাঁর। রদ্রির প্রশংসায় ফ্লিক বলেছেন, ‘রদ্রি আমাদের দলে আছে, এটা নিয়ে আমরা খুবই খুশি। বল পায়ে সে যা করে, মাঠে যেভাবে খেলে, সবকিছুতেই যুক্তি আছে। বল আমাদের দখলে থাকলে সে দলের কাঠামো ঠিক রাখে, আবার বল ছাড়া সময়েও সাহায্য করে।’
লা লিগায় বার্সেলোনার পরের ম্যাচ ১৩ সেপ্টেম্বর লেভান্তের বিপক্ষে। তার আগে ৯ সেপ্টেম্বর চ্যাম্পিয়নস লিগে ফ্লিকের দল খেলবে ফেইনুর্ডের বিপক্ষে।
বার্সেলোনার জার্সিতে প্রথমবারের মতো শুরুর একাদশে মাঠে নেমেছেন রদ্রিগো হার্নান্দেজ। ম্যানচেস্টার সিটির সাবেক এই তারকা ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে ৬২ মিনিট খেলেছেন। ধীরে ধীরে নিজের পুরোনো ছন্দে ফেরার চেষ্টা করলেও তার পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট কোচ হ্যান্সি ফ্লিক।
জার্মান কোচের মতে, বল পায়ে কিংবা বল ছাড়া—দুই অবস্থাতেই রদ্রির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তরুণ খেলোয়াড়দের উন্নতিতেও তার অভিজ্ঞতা বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন ফ্লিক।
ভ্যালেন্সিয়াকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে লা লিগার শীর্ষস্থান আরও মজবুত করেছে বার্সেলোনা। ম্যাচ শেষে রদ্রির প্রশংসা করে ফ্লিক বলেন, ‘সে আমাদের দলে আছে বলে আমরা খুশি। মাঠে বল পায়ে সে যা কিছু করে, সবকিছুর মধ্যেই যুক্তি আছে। আক্রমণে বল পায়ে দলকে কাঠামো দেওয়ার পাশাপাশি বল ছাড়া অবস্থায়ও সে গুরুত্বপূর্ণ।’
তরুণ মিডফিল্ডারদের জন্য রদ্রির উপস্থিতিকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে ফ্লিক আরও বলেন, ‘বার্নালও দারুণ কাজ করছে। তার জন্য এটি একটি ভালো পরিস্থিতি। সে যদি এই সুযোগ সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে উন্নতি করবে এবং ক্রমেই আরও ভালো খেলোয়াড় হয়ে উঠবে। এই দলবদলের মাধ্যমে আমরাও সেটিই চেয়েছিলাম। রদ্রি অসাধারণ। শুধু মাঠেই নয়, ড্রেসিংরুমেও সে একজন অসাধারণ নেতা। তাকে দলে পাওয়া দারুণ ব্যাপার।’
এদিকে স্পেন জাতীয় দলেও রদ্রি ও পেদ্রি একসঙ্গে খেলেছেন। বিশ্বকাপের শুরুতে দুজনকে একসঙ্গে দেখা গেলেও পরে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলে পেদ্রির জায়গা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এমনকি দুজন একসঙ্গে খেললে কার্যকর হবেন কি না, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছিল।
তবে রদ্রির সঙ্গে খেলা নিয়ে ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন পেদ্রি। তিনি বলেন, ‘বলা হয়েছে যে আমরা একসঙ্গে ভালো কাজ করি না। কিন্তু রদ্রির সঙ্গে খেলা খুবই স্বাচ্ছন্দ্যের।’
স্প্যানিশ এই মিডফিল্ডার আরও বলেন, ‘সে প্রায় কখনোই বল হারায় না, আর সেটা রক্ষণে অনেক সাহায্য করে। আমরা একে অপরকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারব এবং যত বেশি ম্যাচ খেলব, আমাদের বোঝাপড়াও তত উন্নত হবে।’
শুরু এবং শেষ—দুই দৃশ্যেই একজন: লামিনে ইয়ামাল। গোল করেছেন দুটি, শানিয়েছেন একের পর এক আক্রমণ। তাতেই লা লিগায় ভ্যালেন্সিয়া নিজেদের মাঠ এস্তাদিও মেস্তায়ায় ৫–০ গোলে রীতিমতো বিধ্বস্ত হয়েছে বার্সেলোনার কাছে।
এই জয়ে ৪ ম্যাচে ১২ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে আরও একধাপ শক্ত অবস্থান নিল বার্সেলোনা। সমান ম্যাচে ৯ পয়েন্ট নিয়ে চারে রিয়াল মাদ্রিদ। অন্যদিকে ৪ ম্যাচে এখনো কোনো জয় না পাওয়া ভ্যালেন্সিয়া আছে ২০ নম্বরে।
প্রতিপক্ষের মাঠে শুরুতেই ইয়ামাল-ঝড়; ম্যাচের ষষ্ঠ মিনিটেই বার্সাকে এগিয়ে দেন এই স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড। ফেরমিন লোপেসের দারুণ পাস থেকে নিখুঁত শটে জালে বল জড়ান ইয়ামাল। এর দুই মিনিট পর আবারও লক্ষ্যভেদ করেন তিনি। এবারও বলের যোগানদাতা লোপেস, দারুণ শটে মুহূর্তেই জাল কাঁপান ইয়ামাল। তবে ভিএআর পর্যালোচনায় অফসাইড ধরা পড়ায় গোলটি বাতিল হয়ে যায়।
গোল করেছেন, আবার গোল বানিয়েও দিয়েছেন লোপেস। এমন উচ্ছ্বাস তাকেই তো মানায় এএফপি
তবু দ্বিতীয় গোলের জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি বার্সাকে। ২২ মিনিটে প্রথম গোলের জোগানদাতা লোপেস নিজেই স্কোরবোর্ডে নাম লেখান। ভ্যালেন্সিয়ার এলোমেলো রক্ষণের সুযোগটা দারুণভাবে কাজে লাগান এই তরুণ মিডফিল্ডার। ডি-বক্সের ভেতর থেকে বাঁ পায়ের শটে বল জালে পাঠান তিনি। চলতি লা লিগায় এটি লোপেসের চতুর্থ গোল। ২০১১-১২ মৌসুমে সেস্ক ফাব্রেগাসের পর লোপেসই প্রথম কোনো স্প্যানিশ খেলোয়াড়, যিনি লিগে মৌসুমের প্রথম চার ম্যাচে বার্সেলোনার হয়ে অন্তত চারটি গোল করলেন।
২৪ মিনিটে ভ্যালেন্সিয়াকে তৃতীয় গোল খাওয়া থেকে বাঁচান স্তোলে দিমিত্রিয়েভস্কি। ইয়ামালের বাঁকানো শট দারুণভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে ক্রসবারের ওপর দিয়ে ঠেলে দেন ভ্যালেন্সিয়ার এই গোলরক্ষক।
৩৯ মিনিটে আরেকটা বড় সুযোগ পায় বার্সা। আবারও লোপেসের সঙ্গে ইয়ামালের চমৎকার বোঝাপড়া। ইয়ামালের দৌড়ের পথেই বক্সের ভেতর পাস বাড়িয়ে দেন লোপেস। প্রতিপক্ষের এক ডিফেন্ডারকে ড্রিবল করে নিচু শট নেন ইয়ামাল, কিন্তু বলটি পোস্ট ঘেঁষে বাইরে চলে যায়।
২–০ গোলে এগিয়ে থেকে প্রথমার্ধ শেষ করে বার্সা। দ্বিতীয় পর্বেও আক্রমণের একই রূপ। তৃতীয় গোলটাও তারা পেয়ে যায় দ্রুত। লোপেসের বাড়ানো বল আলতো টোকায় জালে জড়ান রাফিনিয়া।
এই গোলে বার্সেলোনার কিংবদন্তি লিওনেল মেসির একটি তথ্য মনে করিয়ে দিলেন এই ব্রাজিলিয়ান। ২০১২–১৩ ও ২০১৩–১৪ মৌসুমে লিগে বার্সার প্রথম চার ম্যাচে ছয়টি করে গোল করেছিলেন মেসি। একুশ শতকে মেসির পর দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে লা লিগায় নিজ দলের প্রথম চার ম্যাচে ছয়টি গোলে (গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে) সরাসরি অবদান রাখলেন রাফিনিয়া।
তিন গোল করেও আক্রমণের ধার কমেনি বার্সার। ৭৯ মিনিটে চার নম্বর গোলটি পায় কাতালানরা। দানি ওলমোর বাড়ানো বল চমৎকার শটে নিশানাভেদ করেন পেদ্রি। এর ঠিক পাঁচ মিনিট পর ভ্যালেন্সিয়ার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন ইয়ামাল (৫–০)।
ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে বড় ধাক্কার আশঙ্কা করছে বার্সেলোনা। শনিবার দলের শেষ অনুশীলনে ছিলেন না লামিন ইয়ামাল। ফলে মেস্তায়ায় ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে লা লিগার ম্যাচে ১৯ বছর বয়সী এই উইঙ্গারের খেলা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
২০২৬-২৭ মৌসুমে লা লিগায় নিজেদের চতুর্থ ম্যাচের প্রস্তুতি নিচ্ছে হানসি ফ্লিকের দল। তবে ম্যাচের আগমুহূর্তে ইয়ামালের অনুপস্থিতি সেই প্রস্তুতিতে ফেলেছে দুশ্চিন্তার ছাপ। স্পোর্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেস্তায়ায় কঠিন অ্যাওয়ে ম্যাচের আগে শনিবার দলের শেষ অনুশীলনে অপ্রত্যাশিতভাবেই ছিলেন না ইয়ামাল।
রায়ো ভায়েকানোর বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পরই তার অনুপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শনিবার দল ম্যাচের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে ইয়ামালের শারীরিক অবস্থা ভালোভাবে পরীক্ষা করবেন ক্লাবের চিকিৎসকেরা। এরপর ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে কথা বলতে পারেন কোচ ফ্লিক।
ইয়ামালের চোটের বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি বার্সেলোনা। তবে অনুশীলনে তার অনুপস্থিতির সময়টা তরুণ এই তারকার জন্য হতাশাজনকই। কারণ সতীর্থদের ভোটে নতুন সহ-অধিনায়ক নির্বাচিত হওয়ার সুখবর পাওয়ার দিনই অনুশীলনে অনুপস্থিত থাকতে হলো তাকে। মুন্দো দেপোর্তিভোর খবর অনুযায়ী, ড্রেসিংরুমের ভোটে ইয়ামালকে বার্সেলোনার নতুন সহ-অধিনায়ক হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে।
ইয়ামালকে না পেলে কৌশলে পরিবর্তন আনতে হতে পারে ফ্লিককে। বার্সেলোনার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই জার্মান কোচ হাই-প্রেসিং ফুটবল অনুসরণ করছেন। এই কৌশলে ইয়ামাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। আক্রমণে তার কার্যকারিতার পাশাপাশি বল দখলের জন্য তার নিরলস পরিশ্রমও দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
করোনাভাইরাস মহামারির সময় ভয়াবহ আর্থিক সংকটে পড়া বার্সেলোনা এখন ঘুরে দাঁড়িয়ে নতুন ইতিহাস গড়েছে। ২০২৫-২৬ মৌসুমে প্রথমবারের মতো এক মৌসুমে ১ বিলিয়ন ইউরোর বেশি রাজস্ব আয় করেছে কাতালান ক্লাবটি। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
বার্সেলোনার প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সদ্য শেষ হওয়া মৌসুমে ক্লাবটির মোট আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ইউরোতে। আগের মৌসুমে এই অঙ্ক ছিল ৯৯৪ মিলিয়ন ইউরো, অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
রেকর্ড আয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বার্সেলোনার ঐতিহ্যবাহী স্টেডিয়াম ক্যাম্প ন্যু। সংস্কারকাজ চলার কারণে মৌসুমজুড়ে স্টেডিয়ামটি পুরোপুরি ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। মৌসুমের শুরুতে কিছু ম্যাচ এস্তাদি জোহান ক্রুইফ ও অলিম্পিক স্টেডিয়ামে আয়োজন করতে হয়েছে। এছাড়া ক্যাম্প ন্যুতে ফেরার পরও দর্শক ধারণক্ষমতা সীমিত ছিল ৪২ হাজারে।
এসব সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও বাজেটের প্রায় পুরোটা রাজস্ব আদায় করতে পারাকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে ক্লাবটি। বার্সেলোনার ভাষ্য অনুযায়ী, অর্থনৈতিক দিক থেকে এটি ছিল তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল মৌসুম, যেখানে প্রথমবারের মতো এক বিলিয়ন ইউরোর সীমা অতিক্রম করা সম্ভব হয়েছে।
ক্লাবের মতে, স্টেডিয়াম পরিচালনা ও ম্যাচডে আয়ের বৃদ্ধি এই সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ। ক্যাম্প ন্যু পুরোপুরি চালু হলে ভবিষ্যতে রাজস্ব আরও বাড়বে বলে আশাবাদী বার্সা কর্তৃপক্ষ।
স্টেডিয়াম আয় ছাড়াও পৃষ্ঠপোষকতা খাত এবং ক্লাবের মার্চেন্ডাইজিং প্রতিষ্ঠান বার্সা লাইসেন্সিং অ্যান্ড মার্চেন্ডাইজিং (বিএলএম) থেকে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব এসেছে। গত মৌসুমে প্রতিষ্ঠানটির আয় প্রায় ২০০ মিলিয়ন ইউরো, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ হাজার ৮৬০ কোটি টাকার সমান।
এক মৌসুমে ১ বিলিয়ন ইউরো রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য বার্সেলোনা প্রথম নির্ধারণ করেছিল ২০১৮ সালে। তবে করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাব সেই পরিকল্পনাকে পিছিয়ে দেয়। আট বছর পর অবশেষে কাঙ্ক্ষিত মাইলফলকে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে ক্লাবটি।
অর্থনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি মাঠের পারফরম্যান্সেও উজ্জ্বল ছিল বার্সেলোনা। জার্মান কোচ হান্সি ফ্লিকের অধীনে টানা দ্বিতীয়বারের মতো স্প্যানিশ লা লিগা শিরোপা জিতেছে দলটি।
তবে রাজস্ব আয়ের দিক থেকে এখনো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদের পেছনে রয়েছে বার্সা। গত মৌসুমে রিয়ালের আয় ছিল প্রায় ১৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। যদিও দুই ক্লাবের ব্যবধান ধীরে ধীরে কমছে। দল শক্তিশালী করতে গত গ্রীষ্মে খেলোয়াড় কেনার পেছনে বার্সেলোনা ব্যয় করেছে প্রায় ২ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা।
উল্লেখ্য, ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এক মৌসুমে ১ বিলিয়ন ইউরো রাজস্ব আয়ের কীর্তি গড়েছিল রিয়াল মাদ্রিদ। ২০২৩-২৪ মৌসুমে সেই মাইলফলক স্পর্শ করা ক্লাবটির পর এবার একই কাতারে নাম লেখাল বার্সেলোনা।
হুলিয়ান আলভারেজের জন্য যে এখনো আকুল হয়ে আছে বার্সেলোনা সেটা সবারই জানা। তবে আর্জেন্টাইন এই তারকা ফরোয়ার্ডকে শেষ পর্যন্ত না পেলে বিকল্প একাধিক পরিকল্পনাও নাকি ছিল কাতালান ক্লাবটির। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আলভারেজের জাতীয় দলের সতীর্থ লাউতারো মার্তিনেজকেও বিবেচনায় রেখেছিল স্প্যানিশ জায়ান্টরা।
ট্রান্সফার উইন্ডো বন্ধ হওয়ার পর এই প্রথমবারের মতো সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হলেন লাউতারো মার্টিনেজ। ‘গ্রান গালা দেল ক্যালসিও’ অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে ইন্টার মিলানের এই অধিনায়ক কথা বলেন ‘স্কাই ইতালি’র সামনে। বার্সেলোনায় হুলিয়ান আলভারেজের সম্ভাব্য চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার পর মার্তিনেজকে জড়িয়ে যেসব দলবদলের গুঞ্জন চাউর হয়েছিল, সে বিষয়ে খোলাখুলি কথা বলতে একদমই পিছপা হননি তিনি।
দলবদলের এই গুঞ্জন নিয়ে সরাসরিই মার্তিনেজ বলেন, ‘এই ধরনের কোনো প্রস্তাব আসলে সত্যি বলতে বেশ ভালো লাগে, কারণ নিজেকে শীর্ষ পর্যায়ে ধরে রাখার জন্যই তো আমরা দিনরাত কষ্ট করি। গুঞ্জনগুলো কিন্তু মিথ্যে ছিল না, তবে আমার চিন্তাভাবনা শুরু থেকেই একদম পরিষ্কার ছিল—আমি ইন্টারের সতীর্থ আর আমাদের এই অসাধারণ সমর্থকদের সঙ্গেই থাকতে চেয়েছি। ক্লাব কর্তৃপক্ষ আমাকে যত দিন চাইবে, আমি এখানেই থাকব; এমনকি সারা জীবন থেকে যেতে বললেও আমার আপত্তি নেই।’
অবশ্য পেশাদার ফুটবলে যে ভিন্ন বাস্তবতাও আছে সেটাও মনে করিয়ে দিলেন মার্তিনেজ, ‘তবে এই পেশার নির্মম বাস্তবতা তো আমাদের সবারই জানা—যখন তুমি আর কারো কাজে আসবে না, তখন তোমাকে ছুড়ে ফেলা হবে। ইন্টার আমার কাছে সবকিছু—আমার গর্ব, আমার আনন্দ আর সামনে এগিয়ে যাওয়ার মূল প্রেরণা। তাই আবারও এখানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ইন্টারের হয়ে দারুণ কিছু করে দেখাতে চাই।’
২৯ বছর বয়সি মার্তিনেজ আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ রানার্সআপ হওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছিলেন। আবার অধিনায়ক হিসেবে ইন্টারের ঝুলিতে তুলে দিয়েছেন আরও একটি ‘স্কুদেত্তো’। গত মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে তার পা থেকে এসেছে ২২টি গোল।
ক্লাবে থাকার কারণ ব্যাখ্যা করে ইন্টারের তারকা ফরোয়ার্ড আরও যোগ করেন, ‘আমি এখানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কারণ এখানে আমি বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছি এবং ইন্টারের হয়ে দারুণ সব সাফল্য পেতে চাই।’
২০১৮ সালে ইন্টার মিলানে নাম লিখিয়ে ক্লাবটির হয়ে অনেক সাফল্যই পেয়েছেন মার্তিনেজ। ৩৭৮ ম্যাচে ইতালি জায়ান্ট ক্লাবটির জার্সিতে করেছেন ১৭৫ গোল। তিনটি লিগ শিরোপা সহ জিতেছেন মোট নয়টি ট্রফি।
ইন্টার মিলানের হয়ে এতটা সাফল্য পাওয়ার কথা কখনো কল্পনাতেও নাকি ছিল না মার্তিনেজের। আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ী ফরোয়ার্ড বলেন, ‘ইন্টারে নিজের ক্যারিয়ার এই পর্যায়ে পৌঁছাবে কিংবা সব স্বপ্ন পূরণ হবে—এমনটা আগে কখনো কল্পনাও করতে পারিনি। তবে এই সাফল্যই আমাকে আরও সামনে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে; শুরু থেকেই আমার মানসিকতা এমন। প্রতিটি ট্রেনিং সেশনেই আমি নিজের সেরাটা উজাড় করে দেওয়ার চেষ্টা করি। ফুটবলে ভবিষ্যতে কী ঘটবে তা আগে থেকে বলা অসম্ভব, তবে বর্তমান চুক্তিতে আমি অত্যন্ত সুখী। এখানে আমি বেশ ভালো আছি এবং ইন্টারের হয়ে আরও বড় বড় অর্জন ছুঁতে চাই বলেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
ইন্টার মিলানের সঙ্গে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত চুক্তি রয়েছে মার্তিনেজের। অন্যদিকে ইন্টার কর্তৃপক্ষও ইতোমধ্যে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যেকোনো মূল্যেই হোক নিজেদের অধিনায়ককে হাতছাড়া করতে রাজি নয় তারা।
সর্বকালের সেরা ফুটবলার কে? পেলে, ম্যারাডোনা, মেসি না রোনালদো? এ নিয়ে তর্ক যেন শেষ হওয়ার নয়। নিজে অবশ্য কখনোই নিজেকে সর্বকালের সেরা বলেননি মেসি। তবে অবসরের ঠিক পরপরই নিজের ইনস্টাগ্রামে প্রকাশ করা এক ভিডিওতে দেখা গেছে, বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে মেসিকেই বলা হয়েছে ‘সর্বকালের সেরা’।
গত ৩১ আগস্ট আর্জেন্টিনাকে বিদায় বলেছেন মেসি। মেসির ইনস্টাগ্রামে এই ভিডিওটি পোস্ট করা হয়েছে গতকাল। ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, ‘২০ বছরের বেশি সময়। ছয়টি ফিফা বিশ্বকাপ ও অগণিত স্মৃতি। আমার পথচলার প্রতিটি ধাপে পাশে থাকার জন্য আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।’
ইনস্টাগ্রামের এই ভিডিও পোস্টে অবশ্য ট্যাগ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিয়ার কোম্পানি মাইকেলব আল্ট্রাকে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির সব অর্জন দেখানো হয়েছে এক রেস্তোরাঁর রসিদে। সেই রসিদের শেষ লাইনে সর্বকালের সেরা নিয়ে বিতর্কের অবসানও টানা হয়েছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, রসিদে একের পর এক লাইনে উঠে এসেছে আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির সব অর্জন। তবে এটি কিন্তু একটি নতুন ব্র্যান্ড ক্যাম্পেইনের অংশ।
রসিদে উঠে এসেছে মেসির প্রভাবের কথাও। আর্জেন্টিনার হয়ে খেলে তিনি যে কোটি কোটি ভক্তকে অনুপ্রাণিত করেছেন, সেটিও তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিপক্ষ দলের সমর্থকদের কতটা যন্ত্রণা দিয়েছেন, সেটাও বাদ যায়নি। আর সবশেষে লেখা হয়েছে—‘গোট ডিবেট সেটেলড।’
মাঠ থেকে নয়, লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে আর না খেলার কথা জানিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তবে জাতীয় দলের হয়ে তাঁর দুই দশকের বর্ণিল পথচলাকে মাঠেই বিশেষভাবে সম্মান জানাতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)।
চলতি সপ্তাহান্তে আর্জেন্টিনার সব ঘরোয়া ম্যাচের দশম মিনিটে খেলা থামবে। দেওয়া হবে এক মিনিটের করতালি। মেসি আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসর ঘোষণার পর তাঁকে সম্মান জানাতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আর্জেন্টিনা দলে ১০ নম্বর জার্সি পরেছেন মেসি। সে জন্যই খেলা থামানো হবে দশম মিনিটে। পুরুষ ও নারীদের সব ধরনের ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় সিদ্ধান্তটি কার্যকর করা হবে। গত বুধবার এএফএ এক বিবৃতিতে খবরটি জানায়।
শুধু করতালিতেই শেষ হচ্ছে না মেসির জন্য আয়োজন। যেসব স্টেডিয়ামে জায়ান্ট স্ক্রিন রয়েছে, সেসব মাঠে ম্যাচ শুরুর আগে মেসিকে নিয়ে একটি বিশেষ ভিডিও প্রদর্শন করা হবে। মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ার পর এএফএর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়েছিল।
গত সোমবার ইনস্টাগ্রামে স্প্যানিশ ভাষায় হাতে লেখা তিনটি কাগজের ছবি পোস্ট করে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন মেসি। সেখানে তিনি নিশ্চিত করেন, ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচটিই আর্জেন্টিনার হয়ে তাঁর শেষ ম্যাচ। ৩৯ বছর বয়সে জাতীয় দল অধ্যায়ের ইতি টানলেন কিংবদন্তি।
মেসি লিখেছেন, ‘আমি আমার সবটুকু দিয়েছি; দেওয়ার মতো আর কিছুই বাকি নেই।’ সিদ্ধান্তটি তাঁকে কষ্ট দিয়েছে এবং এখনো ভেতর থেকে কষ্ট দেয় বলেও জানান আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। তবে সময়টা এসে গেছে—এমন উপলব্ধি থেকেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মেসি।
২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার মূল দলে অভিষেক মেসির। এরপর জাতীয় দলের হয়ে করেছেন ১২৫ গোল, যা দেশটির হয়ে সর্বোচ্চ। খেলেছেন রেকর্ড ছয়টি বিশ্বকাপ। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা এনে দেন মেসি। সেটি ছিল ৩৬ বছর পর আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ এবং দেশটির ইতিহাসে তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়।
বিশ্বকাপেও একাধিক রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন মেসি। টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ৩৪ ম্যাচ খেলার রেকর্ড তাঁর। সবচেয়ে বেশি ২৩টি ম্যাচ জয়ের রেকর্ডও তাঁর দখলে।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির শেষ অধ্যায় তাই শুধু একটি অবসরের গল্প নয়। দুই দশকের বেশি সময়ের এক বর্ণিল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি। আর সেই ক্যারিয়ারকেই এবার দেশের প্রতিটি ঘরোয়া প্রতিযোগিতার মাঠে এক মিনিটের করতালিতে সম্মান জানাবে এএফএ।