ফখর জামান

  • ফখর আবারও প্রমাণ দিলেন ‘ফর্ম টেম্পোরারি, তবে ক্লাস পার্মানেন্ট’

    ফখর আবারও প্রমাণ দিলেন ‘ফর্ম টেম্পোরারি, তবে ক্লাস পার্মানেন্ট’

    পাকিস্তানি ব্যাটার ফখর জামান আবারও বুঝিয়ে দিলেন, ‘ফর্ম ইজ টেম্পোরারি, ক্লাস ইজ পারমানেন্ট’ যদিও কথাটি ক্রিকেট তো বটেই, খেলার দুনিয়ায় বহুল চর্চিত এক বাক্য। বিষয়বস্তু যখন ফখর জামানের মতো কেউ একজন, তখন সে বাক্যের চর্চা বোধ হয় আরও বেশি হয়। তার পারফর্ম্যান্স জলজ্যান্ত এক প্যারাডক্সই বটে, তিনি যেদিন ছন্দে থাকেন, বিশ্বসেরা লাইন আপ এলেও পাত্তা নেই তার সামনে; আর না থাকলে? সেসব আজ থাক নাহয়।

    এই তো, ফাইনালের আগের পারফর্ম্যান্সটাই নাহয় দেখুন। ৪ ম্যাচ শেষে তার নামের পাশে রান ছিল মোটে ৩১। যে সিরিজে দেদারসে রান উঠেছে, বিশ্বরেকর্ডও হয়েছে একাধিকবার, সে সিরিজে এমন রান বড্ড বেমানান। ফাইনালের আগে তাই তিনি খানিকটা চাপে ছিলেন বৈকি।

    তবু ম্যানেজমেন্ট তার ওপরই ভরসা রাখল। কারণ মঞ্চটা বড়, আর এমন পরিস্থিতিতেই তিনি জ্বলে ওঠেন, বলছিল অতীত। সে কারণেই হয়তো, তিনি দলে টিকে গেলেন।

    পরিস্থিতিটাও ক্রমেই তার জন্য মঞ্চ তৈরি করে দিচ্ছিল। শ্রীলঙ্কা শুরুতে ব্যাট করে তুলে দিয়েছিল ৩২৫ রানের পাহাড়। সেটা তাড়া করতে নেমে আবার ১৪ রান তুলতেই যখন ২ উইকেট নেই, কাজটা তখন কঠিন হয়ে যায় আরও।

    ফখর জামান সে কঠিনেরেই বাসেন ভালো। অতীতে বহুবার সে নজির দেখিয়েছেন। দেখালেন গত রাতেও। ভাগ্যও সহায়তা করেছে খানিকটা। আসিথা ফার্নান্দোর বলে কাট করে ডিপ থার্ড ম্যানে বল পাঠিয়েছিলেন তিনি, ক্যাচের খুব কাছে চলে গিয়েছিলেন দিলশান মাদুশঙ্কা, কিন্তু তার হাতে লেগে বলটা চলে যায় সীমানার বাইরে।

    ঘটনাটা ৯ বছর আগের এক কাণ্ডের কথা মনে করিয়ে দিল সঙ্গে সঙ্গে। ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালেও ইনিংসের গোড়ার দিকে তিনি ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন উইকেটের পেছনে, মহেন্দ্র সিং ধোনি তা ধরেও ফেলেছিলেন। তবে রিপ্লেতে দেখা যায় যশপ্রীত বুমরাহর ডেলিভারিটা ‘নো বল’ ছিল। সেদিন এক ‘জীবন’ পেয়ে সেঞ্চুরি করেছিলেন, পাকিস্তান হেসেছিল শেষ হাসি। গত রাতে মাদুশঙ্কার হাত গলে ছক্কাটা যখন পেলেন, তখনও কি একই ভাবনা মাথায় খেলছিল? নাকি তখনই ‘আজ তোমারই দিন’— দৈববাণীটা পেয়ে গিয়েছিলেন?

    পরে যা করলেন, তা পাকিস্তানের খুবই চেনা। সাদ বেগকে নিয়ে ১৪৯ রানের জুটি গড়লেন। সাদের বিদায়ের পর সালমান আলী আগার সঙ্গে গড়লেন ৫৭ রানের জুটি, যে জুটির ৪৫-ই তার। দলীয় ২২০ রানে তিনি যখন ফিরলেন, তার নামের পাশে যোগ হয়ে গেছে ১২৭ রান। দল তখন জয় থেকে আর মাত্র ১০৬ রানের দূরত্বে, যা করতে তাদের হাতে ডেলিভারি ছিল ৯৮টি।

    তিনি যখন মাঠ ছেড়ে যাচ্ছেন, গাদ্দাফি স্টেডিয়াম তখন দাঁড়িয়ে সম্মান জানাল তাকে। কারণ সবাই জেনে গেছে, ১১ চার আর ৬টি ছক্কায় গড়া ইনিংসটাতে ফখর তার কাজটা সেরে দিয়ে গেছেন খুব ভালোভাবেই। পাকিস্তানকে যেমন চালকের আসনে তুলে এনেছেন, তেমনি লঙ্কানদের মনোবলও গুঁড়িয়ে দিয়েছেন সঙ্গে সঙ্গে।

    বড় খেলোয়াড়দের সবচেয়ে বড় গুণ, তারা পারফর্ম্যান্সের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিপক্ষের মগজেও ঢুকে যেতে পারেন অবলীলায়। সে কাজটা ফখর তার পুরো ক্যারিয়ারে বহুবার করে দেখিয়েছেন। ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ভারত, তার পরের বছর ত্রিদেশীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়া সেটা টের পেয়েছে। গত রাতে সেটা টের পেল শ্রীলঙ্কা।

    পাকিস্তান ম্যানেজমেন্ট কেন তাকে এমন বাজে পারফর্ম্যান্সের পরও ফাইনালের একাদশে রেখেছিল, তার জবাবটা ফখর ব্যাট দিয়ে দিয়েছেন। গড়ে ফেলেছেন একগাদা রেকর্ডও। ৩০০ বা তার চেয়ে বেশি রান তাড়া করতে নেমে সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরি করা পাকিস্তানি ব্যাটার এখন তিনিই, এমন মঞ্চে তার সেঞ্চুরি সংখ্যা ৪টি।

    ফখর গেল রাতে সাঈদ আনোয়ারের একটা রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছেন। বহুজাতিক টুর্নামেন্টের ফাইনালে সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরি করা পাক ব্যাটার ছিলেন সাঈদ, গেল রাতে সেঞ্চুরি করে তার সঙ্গী বনে গেছেন ফখর জামান। তবে একটা জায়গায় তিনি পাক কিংবদন্তির চেয়েও বেশ ভালো। সাঈদ আনোয়ারের ২ সেঞ্চুরির ২টিই এসেছিল ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে। ওদিকে ফখরের ম্যাচ জেতানো সেঞ্চুরির একটা পাকিস্তানকে জিতিয়েছে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। যে ট্রফি আবার হয়ে আছে শেষ ১৫ বছরে পাকিস্তানের জেতা একমাত্র আইসিসি শিরোপাও। যদিও সে স্মৃতি এখন সুদূর অতীত।

    তবে অতীত থেকে বর্তমান, যেটা ধ্রুব হয়ে থেকে যাচ্ছে সেটা হলো তার পারফর্ম্যান্স। সেটা ৯ বছর আগে যেমন ছিল, এখনও আছে হুবহু তেমনই। বড় মঞ্চ এলেই পাকিস্তান তাকায় তার দিকে, ফখরও দিয়ে যান দুই হাত উজাড় করে। কারণ, ফর্ম টেম্পোরারি হলেও, ক্লাস যে পার্মানেন্ট!