পেয়ারা

  • পতিত জমিতে পেয়ারা চাষে সফল ইমামুল

    পতিত জমিতে পেয়ারা চাষে সফল ইমামুল

    মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলায় পতিত ও পরিত্যক্ত জমিতে পেয়ারা চাষে অপার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। উপজেলার জায়ফরনগর ইউনিয়নের চম্পকলতা গ্রামে পতিত জমিকে কাজে লাগিয়ে পেয়ারা চাষে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন কৃষক ইমামুল ইসলাম। তার এ সাফল্যে এলাকার অন্য কৃষকরাও এখন বাণিজ্যিকভাবে পেয়ারা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।

    পেয়ারা আমাদের দেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সহজলভ্য একটি ফল। পুষ্টিবিদদের মতে, পেয়ারা ভিটামিন-সি, আঁশ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ও হজম প্রক্রিয়ায় দারুণ কার্যকর। বিশেষ করে ‘গোল্ডেন এইট’ ও ‘গোল্ডেন টেন’ জাতের পেয়ারাগুলো অত্যন্ত সুস্বাদু, রসালো এবং উচ্চ ফলনশীল। এ জাতের গাছগুলো আকারে ছোট ও ঘন হওয়ায় উচ্চ ঘনত্বের চাষাবাদের জন্য বেশ উপযোগী। বছরে দুইবার ফলন পাওয়ায় কৃষকদের কাছে এসব জাতের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

    চাষি ইমামুল ইসলাম জানান, সিলেট অঞ্চলে কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প’-এর সহযোগিতায় তিনি আধুনিক পদ্ধতিতে পেয়ারা চাষ শুরু করেন। দুই বিঘা জমিতে ‘গোল্ডেন এইট’ ও ‘গোল্ডেন টেন’ জাতের ৬৭টি চারা রোপণ করে মাত্র এক বছরের মধ্যেই বাম্পার ফলন পেয়েছেন। তার বাগানে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয় হলেও ইতোমধ্যে ২ লাখ টাকারও বেশি পেয়ারা বিক্রি করেছেন। বর্তমান বাজারদরে প্রতি সপ্তাহে গড়ে ১৮-২০ হাজার টাকার পেয়ারা বিক্রি করছেন।

    গাছের অবশিষ্ট ফল বিক্রি করে ব্যয়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ লাভের আশা করছেন ইমামুল।

    ইমামুল ইসলামের বাগানের সুস্বাদু পেয়ারা কিনতে প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় করছেন। এ ছাড়া বাগান দেখতে দর্শনার্থীদের আনাগোনাও চোখে পড়ার মতো। ইমামুলের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে চম্পকলতা গ্রামের আরও অনেকে পতিত জমিতে পেয়ারা বাগান তৈরির পরিকল্পনা করছেন।

    জুড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম খান দৈনিক বলেন, ‘ইমামুল ইসলামের সাফল্য প্রমাণ করে সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ থাকলে পতিত জমিকেও আয়ের প্রধান উৎসে পরিণত করা সম্ভব। পেয়ারা চাষের জন্য বেলে ও দোআঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী, যা আমাদের উপজেলায় প্রচুর রয়েছে। আমরা কৃষি বিভাগ থেকে চাষিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করছি।’

    কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে অল্প সময়ে ও কম খরচে অধিক ফলন নিশ্চিত করে জুড়ীর কৃষি খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা সম্ভব।

  • স্বপ্ন যখন ‘কর্পোরেট কফিন’

    স্বপ্ন যখন ‘কর্পোরেট কফিন’

    কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার মুন্সীপাড়া এলাকা। দিগন্তজোড়া সবুজ আর পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকার কথা ছিল যে উদ্যান, সেখানে আজ কেবলই শ্মশানের নীরবতা। তিন বিঘা জমিতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে শত শত কঙ্কালসার মৃত পেয়ারা গাছ। দিনমজুর থেকে সফল উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নে বিভোর কৃষক আতাউল্লাহর ২০ লাখ টাকার স্বপ্ন এখন মাটির সাথে মিশে ছাই। আর এই সুপরিকল্পিত ধ্বংসলীলার নেপথ্যে উঠে এসেছে একটি বহুজাতিক কোম্পানির ‘হরমোন-সন্ত্রাস’ ও স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের রহস্যজনক নীরবতা।


    গত ২০ শ্রাবণ। সেঞ্চুরি এ্যাগ্রো লিঃ-এর এরিয়া ম্যানেজার মেহেদী হোসেন অধিক ফলনের প্রলোভন দেখিয়ে আতাউল্লাহকে প্রলুব্ধ করেন তাদের প্যাকলোবিউট্রাজল উপাদান সমৃদ্ধ হরমোন ‘টনটন’ ব্যবহারে। অভিজ্ঞ কৃষক আতাউল্লাহ বারবার ডোজ নিয়ে প্রশ্ন তুললেও তাকে আশ্বস্ত করা হয়। যেখানে ১০ এমএল প্রয়োগই যথেষ্ট, সেখানে কোম্পানির প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সরাসরি গাছের গোড়ায় ঢেলে দেওয়া হয় ৫০ এমএল বিষ। ফলশ্রুতিতে পহেলা আশ্বিন থেকেই শুরু হয় মড়ক। সতেজ গাছগুলো মুহূর্তেই রূপ নেয় একেকটি মৃত কাঠে।


    পেয়ারা বাগান ধ্বংসের পর শুরু হয় কোম্পানির নতুন নাটক। প্রথমে ‘গাছের বয়স’ আর পরে ‘ভাইরাস’- নানা অজুহাতে দায় এড়ানোর চেষ্টা চলে। তবে আতাউল্লাহর হাতে থাকা অডিও-ভিডিও রেকর্ড বলছে ভিন্ন কথা। এরিয়া ম্যানেজার মেহেদী হাসান স্বীকার করেছেন তাদের নির্দেশনার ভুল। কিন্তু ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে মাত্র কয়েকশ চারা কিনে দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন তিনি, যা এক ‘নিষ্ঠুর রসিকতা’ ছাড়া আর কিছুই নয়।
    সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য হলো : মিরপুর ও ভেড়ামারা কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা সশরীরে বাগান পরিদর্শন করে অতিরিক্ত ডোজের প্রমাণ পেয়েছেন। তবুও অজানা কারণে রহস্যময় নীরবতা পালন করছে কৃষি বিভাগ। অভিযোগ উঠেছে, কোম্পানির প্রভাবশালী মহলের সাথে মাঠ পর্যায়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তার ‘গোপন আঁতাত’ রয়েছে। ফলে একজন কৃষকের ২০ লাখ টাকার সম্পদ ধ্বংস হওয়া সত্ত্বেও এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে ‘সেঞ্চুরি এ্যাগ্রো’।
    কান্নাভেজা চোখে আতাউল্লাহর প্রশ্ন- ‘আমার সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ, ঋণের কিস্তিতে আমি দিশেহারা। কোম্পানি শিক্ষিত অফিসারদের কথায় বিশ্বাস করা কি আমার অপরাধ ছিল?’ আতাউল্লাহর এই দীর্ঘশ্বাস আজ কুষ্টিয়ার কৃষি খাতের এক বিরাট লজ্জা।


    জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. শওকত হোসেন ভূঁইয়া লিখিত অভিযোগের অপেক্ষায় আছেন। অথচ তার মাঠ কর্মকর্তারা সব জেনেও কেন এখনো নীরব, সেই প্রশ্ন এখন স্থানীয় সচেতন মহলের মুখে মুখে।
    সেঞ্চুরি এ্যাগ্রো লি.-এর ম্যানেজার (প্রোডাক্ট ডেভলপমেন্ট) ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, পেয়ারা বাগান ক্ষতিগ্রস্তের কথা জানতে পেরে আমরা কোম্পানির রাজশাহীর দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন কৃষিবিদ পাঠিয়েছিলাম। তিনি সরেজমিনে দেখেছেন, উপজেলা কৃষি অফিসারের সাথেও কথা বলে এসেছেন। সে সময় ওই কৃষকের সাথে কথা হয়েছিল, ওই প্রোডাক্ট দিয়ে কৃষি অফিস এবং কোম্পানি আলাদা আলাদাভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ট্রায়াল দেবে। যদি ডোজের কারণে এমনটা হয় তখন প্রোডাক্টের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। তিনি আরও বলেন, আমাদের কোম্পানির একই প্রোডাক্ট সারাদেশে ব্যবহার হচ্ছে, কোথাও এ ধরনের অভিযোগ আসেনি। তিনি মনে করেন, এটা ডোজের জন্য হয়নি, বরং গাছের বয়স, পরিচর্যাসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনা দায়ী। তিনি এ বিষয়ে রিপোর্ট করার ক্ষেত্রে, আগে টেকনিক্যাল এক্সপার্টদের সাথে পরামর্শ করার অনুরোধ জানান।