পৃথিবী

  • সূর্য থেকে দূরে থেকেও পৃথিবী উত্তপ্ত কেন

    সূর্য থেকে দূরে থেকেও পৃথিবী উত্তপ্ত কেন

    গ্রীষ্মের কড়া রোদ, ভ্যাপসা গরম আর ঘামে ভিজে নুয়ে পড়া জনজীবন—প্রকৃতির এই রুক্ষ রূপ আমাদের মনে করিয়ে দেয়,সূর্য পৃথিবীর খুব কাছে অবস্থান করছে। অথচ উত্তর গোলার্ধে যখন চরম গ্রীষ্মের দাপট চলে, ঠিক তখনই আমাদের পৃথিবী নামক গ্রহটি সূর্য থেকে তার কক্ষপথের সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানে অবস্থান করে।

    জ্যোতির্বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই দূরবর্তী মহাজাগতিক মুহূর্তকে বলা হয় Aphelion(অপসূর)। প্রতিবছর জুলাই মাসের শুরুর দিকে গরমের ক্লান্তিতা আমাদের অনেক দিন ভুগতে হয়। মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার (NASA) হিসাব অনুযায়ী, জুলাইয়ে অপসূরকালে সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯ কোটি ৪৫ লাখ মাইল বা ১৫ কোটি ২০ লাখ কিলোমিটারে। অন্যদিকে, কনকনে শীতের মাস জানুয়ারির শুরুতে পৃথিবী থাকে সূর্যের সবচেয়ে কাছে, যা Perihelion (অনুসূর) নামে পরিচিত। তখন এই দূরত্ব কমে দাঁড়ায় ৯ কোটি ১৪ লাখ মাইল বা ১৪ কোটি ৭০ লাখ কিলোমিটারে। অর্থাৎ, দূরত্বের এই ব্যবধান প্রায় ৩১ লাখ মাইল বা ৫০ লাখ কিলোমিটারের বিশাল এক ব্যবধান!

    সাধারণ হিসাব অনুযায়ী মনে হয়, আলোর বা মোমবাতির কাছাকাছি থাকলে যেমন গরমের আঁচ বেশি লাগে, সূর্য থেকে দূরে গেলে তেমনই ঠান্ডা পড়ার কথা। কিন্তু প্রকৃতির মহাজাগতিক সিস্টেম ভিন্ন নিয়মে। ঋতু পরিবর্তনের এ সময়কে সূর্য থেকে দূরত্বের ভূমিকা নগণ্য; আসল রহস্য পৃথিবীর নিজের অক্ষের মধ্যে।

    আমাদের পৃথিবী মহাশূন্যে একদম খাড়া বা সোজা হয়ে ভাসে না। এটি কিছুটা বেকে থাকে, তার ঘূর্ণন অক্ষকে কক্ষপথের সমতলের সঙ্গে প্রায় ২৩ দশমিক ৫ (২৩ দশমিক ৪) ডিগ্রি কোণে হেলে রেখে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। এই চিরন্তন হেলানো ভঙ্গিমাই মহাবিশ্বে সৃষ্টি করে তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার রঙবদল।

    মহাকাশে ভ্রমণের পথে যখন উত্তর গোলার্ধ সূর্যের দিকে হেলে থাকে, তখন সেখানে নেমে আসে গ্রীষ্মকাল। হেলে থাকার কারণে সূর্যের প্রখর রশ্মি সোজা বা লম্বাভাবে ভূপৃষ্ঠের ওপর এসে পড়ে। একই সঙ্গে বাড়ে দিনের পরিধি। দীর্ঘদিন ধরে একটানা খাড়া আলো পাওয়ার ফলে ভূপৃষ্ঠ ও বায়ুমণ্ডলে তাপ জমা হয় প্রচুর পরিমাণে। তাই সূর্য দূরে থাকলেও তার কিরণের তীব্রতায় পৃথিবী উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। উল্টো চিত্র দেখা যায়, যখন কোনো গোলার্ধ সূর্য থেকে বাইরের দিকে হেলে থাকে। তখন আলো পড়ে তির্যকভাবে, অর্থাৎ বাঁকা হয়ে। তির্যক আলো বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে তার তীব্রতা হারায় এবং দিনের স্থায়িত্ব কমে আসে—তৈরি হয় শীতের আবহ। পৃথিবীর এই উপবৃত্তাকার কক্ষপথের কারণে দূরত্বের তারতম্যে সূর্য বিকিরণের পরিমাণেও কিছুটা তারতম্য ঘটে। অনুসূর ও অপসূরের দূরত্বের এই ৩ দশমিক ৪ শতাংশ পার্থক্যের কারণে পৃথিবীতে আসা সৌরশক্তির পরিমাণে পার্থক্য হয় মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশের মতো। যদি দূরত্বের পার্থক্য মুখ্য হতো, তবে সারা পৃথিবীতে একসঙ্গে জুলাই মাসে চরম গ্রীষ্ম থাকত। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না; উত্তর গোলার্ধে যখন প্রচণ্ড দাবদাহ, দক্ষিণ গোলার্ধের অস্ট্রেলিয়া বা দক্ষিণ আফ্রিকায় তখন শান্ত, শীতল শীতকাল।

  • বিজ্ঞানীদের হিসাবে কবে শেষ হবে পৃথিবী

    বিজ্ঞানীদের হিসাবে কবে শেষ হবে পৃথিবী

    আকাশ ভরা নক্ষত্র, সূর্য আর অসংখ্য গ্রহ-উপগ্রহ নিয়ে গড়ে উঠেছে এই মহাবিশ্ব। তারই একটি ক্ষুদ্র অংশ আমাদের পৃথিবী। সূর্যের মতো অগণিত নক্ষত্র, পৃথিবীর মতো অসংখ্য গ্রহ, উপগ্রহ, ধূমকেতু ও নানা অজানা বস্তু ছড়িয়ে আছে মহাশূন্যের বিস্তীর্ণ পরিসরে।

    কিন্তু এসব মহাজাগতিক বস্তুর ভবিষ্যৎ কী? তারা কি চিরকাল এভাবেই টিকে থাকবে, নাকি সময়ের প্রবাহে এক দিন তাদেরও পতন ঘটবে? একে অপরকে প্রদক্ষিণ করতে থাকা গ্রহ-নক্ষত্র কি কোনো একসময় হারিয়ে যাবে, নাকি অন্য কোনো উৎস থেকে জন্ম নেবে নতুন মহাজাগতিক অস্তিত্ব?

    এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। মহাবিশ্বের সৃষ্টি, বিবর্তন ও সম্ভাব্য শেষ পরিণতি নিয়ে চলছে নানা অনুসন্ধান। নতুন নতুন গবেষণায় উঠে আসছে ব্রহ্মাণ্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা তত্ত্ব ও সম্ভাবনা।

    তবে সম্প্রতি মহাবিশ্বের শেষ পরিণতির সম্ভাব্য সময় নিয়ে নতুন ধারণা দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রায় ৩৩.৩ বিলিয়ন বছর পর মহাবিশ্ব ধ্বংসের পথে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটি, চীনের সাংহাই জিয়াও টং ইউনিভার্সিটি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা গবেষণাটি করেছেন।

    গবেষণা অনুযায়ী, একসময় মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ থেমে যেতে পারে। এরপর শুরু হবে সংকোচন প্রক্রিয়া। শেষ পর্যন্ত সবকিছু একটি একক বিন্দুর দিকে ধাবিত হবে। এ ঘটনাকে বলা হয় ‘বিগ ক্রাঞ্চ’। এটি অনেকটা ‘বিগ ব্যাং’-এ

    বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা।

    বর্তমানে মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীসহ অন্যান্য গ্রহের অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়তে আরো প্রায় ২০ বিলিয়ন বা ২০০০ কোটি বছর সময় রয়েছে।

    গবেষণাটি এমন একটি তত্ত্বের ওপর তৈরি, যেখানে মহাবিশ্বকে একটি প্রসারিত রাবার ব্যান্ডের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এ ধারণা অনুযায়ী মহাবিশ্ব যত বেশি প্রসারিত হবে, একপর্যায়ে সেই প্রসারণের শক্তিকে হারিয়ে সবকিছু আবার ভেতরের দিকে সংকুচিত হতে শুরু করবে।

    এই তত্ত্বের কেন্দ্রে রয়েছে ডার্ক এনার্জি। বিজ্ঞানীদের মতে, মহাবিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ অংশজুড়ে থাকা এই রহস্যময় শক্তিই এই সম্প্রসারণের প্রধান চালিকাশক্তি।

    তবে নতুন গবেষণায় ধারণা করা হয়েছে, ডার্ক এনার্জি হয়তো স্থির নয়; সময়ের সঙ্গে এর পরিবর্তন হতে পারে। ফলে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ চিরকাল অব্যাহত থাকবে না। নতুন মডেল অনুযায়ী এটি আরো কিছু সময় প্রসারিত হবে। তবে ধীরে ধীরে এর গতি কমে আসবে।

    গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান আকারের চেয়ে প্রায় ৬৯ শতাংশ বড় হওয়ার পর মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ থেমে গিয়ে ধীরে ধীরে সংকোচন শুরু হতে পারে।

    তবে ওই সময় পৃথিবীর অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। অন্য এক গবেষণার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী প্রায় ২০ বিলিয়ন বছরের মধ্যে সূর্য বিলীন হবে এবং আমাদের ছায়াপথ ‘মিল্কিওয়ে’ কাছের ‘অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির’ সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়বে। আর এভাবেই এক দিন সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে।