পাঠ্যপুস্তক

  • পাঠ্যবই ছাপার অবস্থা করুণ !

    পাঠ্যবই ছাপার অবস্থা করুণ !

    শিক্ষা ডেস্ক:

    মধ্যরাতে রাজধানীর ছয়টি ছাপাখানা পরিদর্শনে গিয়ে নতুন বই ছাপার মারাত্মক গলদ হাতেনাতে ধরলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

    সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রাত ১২টার পর হঠাৎ তিনি মাতুয়াইল এলাকার ছয়টি প্রেস পরিদর্শন করেন। প্রেসগুলো হলো—মৌসুমী অফসেট প্রেস, ফায়িজা প্রিন্টিং প্রেস, শৈলী প্রিন্টার্স, বর্ণশিখা অফসেট প্রিন্টার্স, সোনালী ওয়েব প্রিন্টার্স এবং ন্যাশনাল প্রিন্টার্স।

    গভীর রাতে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘গোয়েন্দাদের তথ্যের ভিত্তিতে হঠাৎ পাঠ্যবই ছাপার মারাত্মক খারাপ অবস্থা দেখলাম। ছাপার মান খারাপ।”

    প্রেস পরিদর্শনের সময় শিক্ষামন্ত্রী পাঠ্যবই ছাপার কাজের বাস্তব পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখেন। তিনি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন।

    এ সময় মন্ত্রী বইয়ের গুণগত মান এবং ছাপার কাজের সার্বিক অগ্রগতি যাচাই করেন। শিক্ষার্থীদের হাতে সময়মতো মানসম্মত পাঠ্যবই পৌঁছে দিতে ছাপার কাজে নির্ধারিত মান বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এ ছাড়া বই ছাপার ক্ষেত্রে গুণগত মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেন শিক্ষামন্ত্রী।

    এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, ইবতেদায়ি, মাধ্যমিক ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য মোট ৩০ কোটি ৯২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩৯ কপি বই ছাপানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

    এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য ৮ কোটি ২১ লাখ ৬৭ হাজার ৭৩০ কপি বই ছাপানো হবে। ইবতেদায়ির প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির জন্য ছাপানো হবে ৩ কোটি ৩২ লাখ ৯৬ হাজার ৪০০ কপি বই। আর ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির জন্য প্রায় ১৮ কোটি বই ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

    মাধ্যমিক পর্যায়ে নবম শ্রেণির বইয়ের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ শ্রেণির জন্য ৫ কোটি ৫৬ লাখ ২৭ হাজার ২৩৫ কপি বই ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ৯ হাজার ৪ কপি ব্রেইল বই ছাপানো হবে।

    ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে কয়েকটি নতুন বিষয় যুক্ত হচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণিতে ‘খেলাধুলা’ ও ‘আমাদের সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘আনন্দময় শিক্ষা’ ও ‘কারিগরি শিক্ষা’ বিষয়ের বই ছাপানো হবে। নতুন বিষয়গুলোর বইসহ সংশোধিত ও পরিমার্জিত অন্যান্য বইও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ছাপিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

    এনসিটিবি সংশ্লিষ্টরা জানান, এবার পাঠ্যবই ছাপাতে সরকারের ব্যয় হবে ১ হাজার ৮৯০ কোটি ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৩২৮ টাকা।

  • পাঠ্যপুস্তক: রাজনৈতিক দলিল নয়, জাতি গঠনের নকশা

    পাঠ্যপুস্তক: রাজনৈতিক দলিল নয়, জাতি গঠনের নকশা

    উপসম্পাদকীয়

    একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তার অনেকখানি নির্ধারিত হয় সেই জাতির শ্রেণিকক্ষের ভেতরে। আর শ্রেণিকক্ষের সবচেয়ে নীরব অথচ সবচেয়ে শক্তিশালী শিক্ষক হলো পাঠ্যপুস্তক। পাঠ্যপুস্তক যদি শিশুকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে, তাহলে একটি আত্মবিশ্বাসী জাতি গড়ে ওঠে। আর যদি সেখানে বৈষম্য, সংকীর্ণতা কিংবা অযৌক্তিক সামাজিক ধারণার প্রতিফলন ঘটে, তবে সেই ক্ষতি বহু বছর ধরে সমাজকে বহন করতে হয়।

    একটি শিশুর কাছে পাঠ্যপুস্তকে যা লেখা থাকে, সেটিই অনেক সময় চূড়ান্ত সত্য। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশুর আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদাবোধের ভিত্তি তৈরি হয় শৈশবেই। বিশ্বব্যাপী গবেষণাগুলো দেখিয়েছে, বিদ্যালয়ের পাঠ্যবস্তু, শিক্ষক এবং পরিবার—এই তিনটি উৎসই শিশুদের আত্মবিশ্বাস গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। ফলে পাঠ্যপুস্তক শুধু তথ্য নয়; এটি একটি মানসিক ও সামাজিক নির্মাণের উপকরণ।

    আজও আমাদের সমাজে রান্না, গৃহপরিচর্যা কিংবা পারিবারিক দায়িত্বকে অনেকেই নারীর একক কাজ হিসেবে ভাবেন। অথচ উন্নত বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থায় এগুলোকে লাইফ স্কিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন ছেলে যেমন রান্না শিখবে, তেমনি একজন মেয়েও আর্থিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তি বা নেতৃত্ব শিখবে। শিক্ষা যদি সমাজকে পরিবর্তন না করে, তবে সেই শিক্ষা শুধু পরীক্ষার খাতা পূরণের জন্যই রয়ে যায়।

    আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট পাঠ্যবই নয়, প্রণয়ন পদ্ধতিতে। আমাদের দেশে পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের আলোচনা প্রায়ই শুরু হয় বই ছাপার পর। অথচ প্রশ্ন হওয়া উচিত—বই লেখার আগেই কি পর্যাপ্ত গবেষণা হয়েছিল? বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জাতীয় পর্যায়ে কয়েকজন বিশেষজ্ঞের মতামতের মধ্যেই পুরো প্রক্রিয়া সীমাবদ্ধ থাকে। মাঠপর্যায়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক কিংবা গবেষকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অনেক সময় নীতিনির্ধারণ পর্যন্ত পৌঁছায় না। ফলে যে কারিকুলাম সচিবালয়ের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে নিখুঁত বলে মনে হয়, সেটি প্রত্যন্ত গ্রামের একটি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে গিয়ে বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক কোনো অফিসকক্ষে বসে তৈরি হয় না; এটি তৈরি হয় শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষণার সম্মিলিত অভিজ্ঞতা থেকে।

    তাহলে কীভাবে হওয়া উচিত কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন? বাংলাদেশে পাঠ্যক্রম তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটি নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। প্রথমেই যে শ্রেণির জন্য বই তৈরি হবে, সেই শ্রেণিতে পাঠদান করেন—এমন শহর ও গ্রামের অন্তত দুটি করে মডেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ শিক্ষকদের মতামত সংগ্রহ করতে হবে। একই সঙ্গে ওই বয়সের শিশুর মানসিক বিকাশ, ভাষাগত সক্ষমতা ও শেখার পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করেছেন—এমন শিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী, ভাষাবিজ্ঞানী, বিষয়বিশেষজ্ঞ এবং কারিকুলাম গবেষকদের সম্পৃক্ত করতে হবে।

    এরপর খসড়া পাঠ্যক্রম তৈরি করে সেটি বিভিন্ন গণমাধ্যম, শিক্ষা-সংক্রান্ত ওয়েবসাইট এবং উন্মুক্ত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করতে হবে, যাতে শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী, গবেষক এবং সাধারণ নাগরিক যুক্তিসংগত মতামত দেওয়ার সুযোগ পান।

    প্রথমে অন্তত এক বছরের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে নতুন কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তক পাঠ্য করা উচিত। এ উদ্দেশ্যে জাতীয় অনলাইন কারিকুলাম ফিডব্যাক প্ল্যাটফর্ম চালু করা যেতে পারে, যেখানে নিবন্ধিত শিক্ষকরা নির্ধারিত ফরম্যাটে মতামত, সমস্যা ও সমাধানের প্রস্তাব জমা দেবেন। সেই মতামত বিশ্লেষণ করবেন গবেষক ও কারিকুলাম বিশেষজ্ঞরা। এরপর প্রয়োজনীয় সংশোধন করে চূড়ান্ত পাঠ্যক্রম অনুমোদন দেওয়া হবে।

    বিশ্বের উন্নত শিক্ষাব্যবস্থাগুলো দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—কারিকুলাম কখনো একদিনে তৈরি হয় না।

    ফিনল্যান্ডে জাতীয় মূল কাঠামো তৈরির পর স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ও বিদ্যালয়গুলো নিজেদের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ্যক্রম অভিযোজিত করে। শিক্ষকরা শুধু বাস্তবায়নকারী নন; তারা কারিকুলাম উন্নয়নেরও অংশীদার।

    সিঙ্গাপুরে নতুন পাঠ্যক্রম চালুর আগে বহু বছর ধরে গবেষণা, পাইলটিং, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক এবং বিদ্যালয় একসঙ্গে কাজ করে।

    অস্ট্রেলিয়ান কারিকুলাম প্রণয়নের সময় খসড়া জনমতের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। হাজার হাজার শিক্ষক, গবেষক, অভিভাবক ও নাগরিকের মতামত বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত সংস্করণ প্রকাশ করা হয়।

    যুক্তরাজ্যেও জাতীয় কারিকুলাম সংশোধনের সময় ব্যাপক পরামর্শ, গবেষণা ও জনমত গ্রহণের দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।

    এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়—শিক্ষাব্যবস্থার স্থায়িত্ব আসে অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে, ক্ষমতার কেন্দ্রীয়করণ থেকে নয়।একটি দেশের সরকার বদলাতে পারে। রাজনৈতিক দর্শনও পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু পাঠ্যপুস্তক এমন হওয়া উচিত নয়, যা প্রতি কয়েক বছর পরপর নতুন আদর্শের পরীক্ষাগারে পরিণত হয়। শিক্ষার্থীর প্রয়োজন স্থিতিশীলতা, গবেষণাভিত্তিক জ্ঞান এবং নিরপেক্ষ ইতিহাস। কারণ শিক্ষা কোনো মন্ত্রণালয়ের একক সম্পদ নয়; শিক্ষা একটি জাতির সম্মিলিত বিবেক। আর সেই বিবেকের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল হওয়া উচিত আমাদের পাঠ্যপুস্তক।