পাট

  • পাট চাষে ভালো ফলন, ২২০০ কোটি টাকা বিক্রির প্রত্যাশা

    পাট চাষে ভালো ফলন, ২২০০ কোটি টাকা বিক্রির প্রত্যাশা

    একসময় যে পাট ছিল বাংলার অর্থনীতির অন্যতম প্রাণ। সেই ‘সোনালি আঁশ’ এবার যেন নতুন করে হাসি ফুটিয়েছে ফরিদপুরের কৃষকের মুখে। সবুজ মাঠ পেরিয়ে পাট এখন উঠেছে হাটে। পচানো, ধোয়া ও শুকানোর পর পরিপক্ব আঁশের গন্ধে মুখর জেলার হাট-বাজার। আর ভালো ফলনের সঙ্গে বাজারে চড়া দাম—দুইয়ের সমন্বয়ে এ বছর পাটচাষিদের ঘরে ফিরছে স্বস্তি।

    চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে পাটের আবাদ হয়েছে ফরিদপুরে। অনুকূল আবহাওয়া, পর্যাপ্ত পানি এবং কৃষকদের যথাযথ পরিচর্যায় শুধু ফলনই নয়, পাটের আঁশের রং ও গুণগত মানও হয়েছে বেশ ভালো।

    কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার মেট্রিক টন পাট উৎপাদিত হয়েছে। বর্তমান বাজারদর অব্যাহত থাকলে ফরিদপুর থেকেই কৃষকদের পাট বিক্রির সম্ভাব্য আয় ২২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

    কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ফরিদপুরে ৮৭ হাজার ৩২৮ হেক্টর জমিতে পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে প্রায় ৮৭ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। মৌসুমের শুরু থেকে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পাটের পরিচর্যায় বড় ধরনের কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়নি। পাশাপাশি পাট জাগ দেওয়ার সময় খাল-বিল ও জলাশয়ে পর্যাপ্ত পানি থাকায় আঁশের মানও হয়েছে চমৎকার।

    বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে কানাইপুর হাটসহ জেলার বিভিন্ন প্রধান পাটের হাট ঘুরে দেখা যায়, নতুন পাটের বেচাকেনায় বেশ প্রাণচাঞ্চল্য। হাটে কৃষকের ভিড়, পাটের স্তূপ আর দরদামে ব্যস্ত ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁক-ডাকে মুখর চারপাশ।

    গত কয়েক সপ্তাহের তুলনায় পাটের দরও বেড়েছে। কানাইপুর, তালমা, কাদিরদী, সাতৈর ও বড়গাসহ জেলার বিভিন্ন হাটে বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ পাট প্রায় ৪ হাজার ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ভালো দাম পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন কৃষকরা। বছরের পর বছর মাটি, পানি, রোদ আর শ্রমের সঙ্গে লড়াই করে যে ফসল ঘরে তুলেছেন, এবার তার ন্যায্য মূল্য মিলছে—এটাই যেন তাদের মুখের হাসির সবচেয়ে বড় কারণ।ফরিদপুর সদর উপজেলার পাটচাষি লাভলু মিয়া বলেন, ‘এবার পাট ও আঁশ দুটোই চমৎকার হয়েছে। সার, কীটনাশক আর সেচ খরচ কিছুটা বেশি হলেও বাজারে ৪ হাজার ৬০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করতে পেরে খুব খুশি। উৎপাদন খরচ বাদ দিয়েও এবার ভালো লাভ থাকছে।’

    আরেক কৃষক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘পাটের ভালো দাম পাওয়ায় সংসারের খরচ, সন্তানদের পড়াশোনা এবং আগের দেনা মেটানো সহজ হয়ে গেছে। এমন দাম পুরো মৌসুমজুড়ে থাকলে আমাদের মতো পাটচাষিদের ভাগ্যের আমূল পরিবর্তন ঘটবে।’

    তবে বাজারে পাটের চড়া দাম স্বস্তি যেমন এনেছে কৃষকের জীবনে, তেমনি কিছুটা চাপ তৈরি করেছে ব্যবসায়ী ও মধ্যস্থতাকারীদের ওপর। হাটে নতুন পাটের আমদানি কিছুটা কমে যাওয়ায় কৃষকদের কাছ থেকে তুলনামূলক বেশি দামে পাট কিনতে হচ্ছে তাদের। ফলে কৃষক কাঙ্ক্ষিত দাম পেলেও মিল বা ফ্যাক্টরিতে সরবরাহ করার পর আগের মতো মুনাফা থাকছে না বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

    কানাইপুর হাটের ব্যবসায়ী লিয়াকত মুন্সি বলেন, ‘কয়েক সপ্তাহ আগেও আমরা ৪০০০-৪২০০ টাকা মণ দরে পাট কিনেছি। এখন হাটে পাটের সরবরাহ কম থাকায় কৃষকদের কাছ থেকে ৪ হাজার ৬০০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। এতে কৃষকরা ভালো লাভ পাচ্ছেন। তবে বিভিন্ন ফ্যাক্টরি ও মিলে বিক্রি করে তেমন লাভ থাকছে না।’

    ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ শাহদুজ্জামান জানান, অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের সঠিক পরিচর্যার কারণে এবার জেলাজুড়ে পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। পাশাপাশি আঁশের গুণগত মানও ভালো হয়েছে।

    তিনি বলেন, ‘আবহাওয়া সম্পূর্ণ অনুকূলে থাকা এবং কৃষকদের সঠিক পরিচর্যার ফলে এ বছর পাটের বাম্পার ফলন ও ভালো গুণগত মান অর্জন সম্ভব হয়েছে। বাজারে বর্তমান চড়া দাম বজায় থাকলে ফরিদপুর থেকে ২২০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ স্থানীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হবে।’

    কৃষি বিভাগের এ কর্মকর্তা মনে করেন, পাট বিক্রি থেকে বড় অঙ্কের অর্থ কৃষকের হাতে গেলে তা শুধু কৃষকের পরিবারেই স্বস্তি আনবে না, এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও। কৃষকের আয় বাড়লে বাড়বে ক্রয়ক্ষমতা, সচল হবে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা।

    ফরিদপুরের মাঠে তাই এখন শুধু পাটের আঁশ নয়, কৃষকের স্বপ্নও শুকাচ্ছে রোদে। হাটে হাটে সোনালি আঁশের স্তূপ যেন বলে দিচ্ছে—মাটির সঙ্গে যে মানুষের বন্ধন, তার গল্প কখনো পুরোনো হয় না। ভালো ফলন আর ন্যায্য দাম মিললে সেই মাটিই কৃষকের ঘরে এনে দিতে পারে স্বচ্ছলতার আলো।

    এবার ফরিদপুরের পাটের মাঠে সেই আলোরই যেন দেখা মিলছে। সোনালি আঁশের রঙে রাঙা হচ্ছে কৃষকের মুখ, আর তার সঙ্গে আশার আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠছে জেলার গ্রামীণ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ।

  • উন্নত মানের আঁশ ও ভালো দামের আশা কৃষকদের

    উন্নত মানের আঁশ ও ভালো দামের আশা কৃষকদের

    একসময় খালটি ছিল মৃতপ্রায়। বছরের পর বছর পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষার পানিও সেখানে আর স্থায়ী হতো না। পানি না থাকায় পাট জাগ দেওয়া নিয়ে প্রতি মৌসুমেই চরম দুর্ভোগে পড়তেন স্থানীয় কৃষকরা। অনেককে কয়েক কিলোমিটার দূরে পুকুর ভাড়া নিয়ে কিংবা অন্যের জলাশয়ে অতিরিক্ত খরচ করে পাট পচাতে হতো। সেই দুর্ভোগ এখন অনেকটাই অতীত। সরকারি উদ্যোগে খাল পুনঃখননের পর এবার বর্ষার পানিতে থইথই করছে খাল। আর সেই পানিতেই দল বেঁধে মনের আনন্দে পাট জাগ দিচ্ছেন কৃষকরা। উন্নতমানের আঁশ ও ভালো দামের প্রত্যাশায় তাদের মুখে এখন স্বস্তির হাসি।


    ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের বড়ভাগ দক্ষিণপাড়া স্লুইসগেটসংলগ্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কয়েক সপ্তাহ আগেও যে খালটি ছিল আগাছা আর পলিতে ভরাট, এখন সেখানে টইটম্বুর পানি। খালের দুই তীরে সারি সারি লাগানো বনজ ও ফলজ গাছের চারা পুরো এলাকাকে দিয়েছে এক মনোরম রূপ। খালের পানিতে সারিবদ্ধভাবে ডুবিয়ে রাখা হয়েছে পাটের আঁটি। কেউ নতুন করে পাট নামাচ্ছেন, কেউ আবার পচা পাট তুলে আঁশ ছাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দীর্ঘদিন পর এমন দৃশ্য দেখে স্থানীয় প্রবীণরাও সন্তোষ প্রকাশ করছেন।


    বড়ভাগ গ্রামের কৃষক ইমদাদুল শেখ বাড়ির পাশের খালে পাট জাগ দিতে দিতে বলেন, ‘আগে পানির জন্য অনেক কষ্ট করতে হতো। অনেক দূরে নিয়ে গিয়ে পাট পচাতে হতো, এতে খরচও বেশি লাগত। এবার বাড়ির পাশেই খালে পাট জাগ দিতে পারছি। সময়ও বাঁচছে, খরচও কমছে। সরকারের এই উদ্যোগ আমাদের অনেক উপকার করেছে।’


    একই গ্রামের কৃষকরা জানান, আগে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় অনেক সময় পাট ঠিকমতো পচত না। এতে আঁশের মান খারাপ হতো এবং বাজারে কাঙ্ক্ষিত দামও পাওয়া যেত না। এবার সেই সমস্যা অনেকটাই দূর হয়েছে।
    মালা গ্রামের কৃষক কামরুল শেখ বলেন, ‘আমি এবার দেড় একর জমিতে পাট চাষ করেছি। আগে অন্যের পুকুর ভাড়া নিতে হতো। অনেক সময় সেচ দিয়ে পানি তুলে পাট জাগ দিতে হয়েছে। এতে অতিরিক্ত খরচ হতো। এবার খালেই সব কাজ করতে পারছি। এতে উৎপাদন খরচ কমেছে এবং ভালো আঁশ পাওয়ার আশা করছি।’


    স্থানীয়দের মতে, খাল পুনঃখননের সুফল শুধু পাট চাষেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বর্ষার পানি সংরক্ষণ হওয়ায় আগামী মৌসুমে সেচ সুবিধাও বাড়বে। পাশাপাশি মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল তৈরি হবে এবং এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও সমৃদ্ধ হবে।
    টগরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিয়া আসাদুজ্জামান বলেন, ‘খাল পুনঃখননের কারণে কৃষি ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কৃষকরা সরাসরি এর সুফল পাচ্ছেন। এমন উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে এলাকার কৃষি উৎপাদন আরও বাড়বে।’


    উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সাগর হোসেন সৈকত বলেন, ‘প্রকল্পটি ছোট হলেও বাস্তবায়নে কোনো ধরনের শৈথিল্য ছিল না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শতভাগ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।’


    আলফাডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত নূর মৌসুমী বলেন, ‘সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী যথাযথভাবে খালটি পুনঃখনন করা হয়েছে। এর সুফল ইতোমধ্যেই কৃষকরা পেতে শুরু করেছেন। এটি শুধু কৃষির উন্নয়নেই নয়, এলাকার জলাধার সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতেও জনস্বার্থ ও কৃষির উন্নয়নে এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’
    উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে এবং উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে সম্প্রতি বড়ভাগ দক্ষিণপাড়া স্লুইসগেট থেকে মিলন মোল্যার বাড়ি পর্যন্ত ৫৭০ মিটার খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। দেশব্যাপী খাল পুনঃখনন কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়িত এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ২৫ লাখ ৭৯ হাজার ১৪৮ টাকা।


    সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময় কাজের মান, স্বচ্ছতা এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের উপস্থিতি ও কাজের হিসাব-নিকাশ নিয়মিত যাচাই করা হয়। এতে শ্রমিক অনুপস্থিতিজনিত কারণে উদ্বৃত্ত থাকা ৩৭ হাজার ৩৭০ টাকা সরকারি বিধি অনুযায়ী কোষাগারে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যা সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

  • শ্রমিক সংকটে পচছে পাট

    শ্রমিক সংকটে পচছে পাট

    নাটোরের লালপুর উপজেলায় চলতি মৌসুমে পাটের বাম্পার ফলন হলেও তীব্র শ্রমিক সংকটের কারণে সময়মতো পাট কাটতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। এতে উৎপাদন ভালো হলেও আশানুরূপ লাভ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

    উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর লালপুরে ৮ হাজার ৬৬৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। অনুকূল আবহাওয়া ও উন্নত বীজ ব্যবহারের ফলে ফলনও হয়েছে আশাব্যঞ্জক। তবে শ্রমিক সংকটের কারণে সময়মতো পাট কাটতে না পারায় অনেক কৃষক দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

    স্থানীয় কৃষকদের মতে, বিঘাপ্রতি ৮ থেকে ১০ মণ পর্যন্ত পাট উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। বাজারে ভালো মানের পাটের দাম প্রতি মণ ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা। ফলে লাভের সম্ভাবনা থাকলেও সময়মতো পাট কাটা না গেলে আঁশের মান নষ্ট হয়ে দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

    আরবাব ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল্লাহ ও সুমন বলেন, “মজুরি বাড়িয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সময়মতো পাট কাটতে পারছি না।”

    চংধুপইল ইউনিয়নের কৃষক ফিরোজ আহম্মেদ জানান, জাগ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানি আছে। কিন্তু পাট কাটতে দেরি হলে আঁশের মান খারাপ হয়ে যাবে।

    দুড়দুড়িয়া এলাকার কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, “আগে সহজেই শ্রমিক পাওয়া গেলেও এখন অনেকেই অন্য পেশায় চলে যাওয়ায় কৃষিকাজে শ্রমিক সংকট তীব্র হয়েছে।’’

    একই কথা বলেন দুয়ারিয়া এলাকার কৃষক ইউনুস আলী ফরাজি। তিনি বলেন, “সময়মতো পাট কাটতে না পারলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।’’

    পাট ব্যবসায়ী আতিয়ার রহমান বলেন, “বাজারে পাটের দাম ভালো থাকলেও আঁশের মান ঠিক না থাকলে কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত দাম পাবেন না। তাই সময়মতো পাট কাটা ও জাগ দেওয়া জরুরি।’’

    এ বিষয়ে লালপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রীতম কুমার বলেন, পাটের উৎপাদন ভালো হলেও শ্রমিক সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষকদের সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত পাট কাটার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

    সব মিলিয়ে, বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা থাকলেও শ্রমিক সংকটের কারণে সেই সম্ভাবনা এখন দুশ্চিন্তায় পরিণত হয়েছে লালপুরের কৃষকদের কাছে।

  • পাট নেবে পাকিস্তান, আসবে খাদ্য পণ্য

    পাট নেবে পাকিস্তান, আসবে খাদ্য পণ্য

    দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্কের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে। উভয় দেশের মধ্যে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল এবং পাটের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও কৃষিপণ্য আমদানি-রপ্তানি সহজ করতে সরকারি পর্যায়ে একটি বড় ধরনের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হতে যাচ্ছে।


    সম্প্রতি বাংলাদেশের শিল্প মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ট্রেডিং কর্পোরেশন অব পাকিস্তান (টিসিপি)-এর চেয়ারম্যান আসিম আজিম সিদ্দিকীর নেতৃত্বে একটি পাকিস্তানি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরকালে এই বৈঠকে অংশ নেয়। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী আব্দুল মুক্তাদির এবং ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।


    পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন-এর সাথে আলাপকালে টিসিপি চেয়ারম্যান আসিম আজিম সিদ্দিকী জানান, পাকিস্তান বাংলাদেশে চাল, মসুর ডাল, ছোলা, সার, ভোজ্যতেল এবং অন্যান্য কৃষিপণ্য রপ্তানি করতে অত্যন্ত আগ্রহী। অন্যদিকে, পাকিস্তানের শিল্প খাতে বাংলাদেশের উন্নত মানের পাট এবং পাটজাত পণ্যের বিপুল চাহিদা রয়েছে।তিনি আরও জানান, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আইনি কাঠামো মেনে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে বাংলাদেশে পণ্য সরবরাহে সহায়তা করার প্রস্তাবও দিয়েছে পাকিস্তান। বৈঠকে উভয় পক্ষই পাকিস্তান-বাংলাদেশ যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে এবং বাণিজ্য প্রতিনিধি দল বিনিময় বাড়াতে সম্মত হয়েছে।

    টিসিপি চেয়ারম্যান বলেন, “আমাদের এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য জোরদার করা, খাদ্য সরবরাহে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং শিল্প খাতের অংশীদারিত্বকে সম্প্রসারিত করা।”বৈঠকে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী আব্দুল মুক্তাদির টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য শক্তিশালী বাণিজ্য সম্পর্কের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করা গেলে দুই দেশের জন্যই বিনিয়োগ ও ব্যবসার নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

    মন্ত্রী আরও জানান, বর্তমান সরকার ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ তৈরি, শিল্পায়ন ত্বরান্বিতকরণ এবং বাণিজ্য সহজীকরণের লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছে। এই সংস্কার প্রক্রিয়া দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে আরও প্রসারিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বৈঠকে বাংলাদেশে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দারসহ দুই দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

    অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইনের বর্তমান চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে এই উদ্যোগটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। পাকিস্তানের উদ্বৃত্ত কৃষি উৎপাদন বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান খাদ্যের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। বিশেষ করে চাল এবং ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে এটি বাংলাদেশের আমদানির উৎসকে আরও বহুমুখী করবে। বিপরীতভাবে, বাংলাদেশের পাটজাত পণ্য পাকিস্তানের টেক্সটাইল ও প্যাকেজিং শিল্পের জন্য সাশ্রয়ী ও কার্যকর সমাধান হতে পারে।

    প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকটি সই হলে দুই দেশের মধ্যকার আমলাতান্ত্রিক ও পদ্ধতিগত জটিলতা অনেকটাই দূর হবে। সরকারিভাবে সরাসরি বাণিজ্য চ্যানেল চালু হওয়ার ফলে লেনদেন আরও মসৃণ ও দ্রুত হবে, যা বাজারে পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

    খাদ্য ও কৃষি খাতের এই সমঝোতা কেবল পণ্য আদানপ্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। দুই দেশের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ এখন বাণিজ্যকে আরও সাশ্রয়ী ও দক্ষ করতে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয়ে কাজ করবে। তা হলো- পণ্যের ওপর শুল্কের হার কমিয়ে এনে আমদানি-রপ্তানি খরচ হ্রাস করা, দুই দেশের গুণগত মানদণ্ডের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা যাতে পণ্য খালাসে সময় কম লাগে এবং সরাসরি নৌ বা বিমান যোগাযোগের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা আরও উন্নত করা।

    এই উদ্যোগটি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। উভয় দেশই এখন তাদের প্রথাগত সম্পর্কের বাইরে গিয়ে কৃষি এবং হালকা শিল্পে একটি স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ চেইন গড়ে তুলতে চায়। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই সমঝোতা স্মারকটি আনুষ্ঠানিকভাবে সই হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা দুই দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ভলিউম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেবে।

  • পাট গবেষণা ইনসটিটিউটের ‘জাতীয় পরিবেশ পদক-২০২৫’ অর্জন

    পাট গবেষণা ইনসটিটিউটের ‘জাতীয় পরিবেশ পদক-২০২৫’ অর্জন

    পরিবেশ সংরক্ষণ, দূষণ রোধ, গবেষণা এবং পরিবেশ বিষয়ক শিক্ষা ও প্রচারে যারা/যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করে, তা মূল্যায়ন করতেই সরকার প্রতিবছর ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে এই সম্মানজনক পদক প্রদান করে থাকে।

    পরিবেশ বিষয়ক গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে অসাধারণ অবদানের জন্য বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনসটিটিউট ‘জাতীয় পরিবেশ পদক-২০২৫’ অর্জন করেছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় গত ৭ জুন এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে।

    ‘জাতীয় পরিবেশ পদক-২০২৫’ অর্জন করায় বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনসটিটিউটের (বিজেআরআই) মহাপরিচালক ড. নার্গীস আক্তার কৃষি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন।

    সেইসাথে তিনি বিজেআরআইয়ের সকল স্তরের বিজ্ঞানী/কর্মকর্তা এবং কর্মচারীগণকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এই অর্জনে বিজেআরআই পরিবার গর্বিত।

    ‘জাতীয় পরিবেশ পদক নীতিমালা-২০১২ (সংশোধিত ২০১৯)’ অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ‘পরিবেশ বিষয়ক গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন’ শ্রেণিতে স্থান পেয়েছে বিজেআরআই। পুরস্কার হিসেবে বিজেআরআই পাবে ২২ ক্যারেট মানের দুই তোলা ওজনের স্বর্ণের বাজার মূল্য, ৫০ হাজার টাকার চেক, একটি সম্মানসূচক ক্রেস্ট এবং সনদপত্র।

    বিজেআরআই’র প্রকাশনা কর্মকর্তা মো: মুবতাসিম ফুয়াদ জানান, পরিবেশ সংরক্ষণ, দূষণ রোধ, গবেষণা এবং পরিবেশ বিষয়ক শিক্ষা ও প্রচারে যারা/যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করে, তা মূল্যায়ন করতেই সরকার প্রতিবছর ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে এই সম্মানজনক পদক প্রদান করে থাকে।