নৈতিক

  • পরিবারের ভূমিকায় সন্তানের নৈতিক চরিত্র গঠন

    পরিবারের ভূমিকায় সন্তানের নৈতিক চরিত্র গঠন

    কবি হাফিজ ইব্রাহিম বলেছেন, ‘মা একটি বিদ্যালয়; তাকে যথাযথভাবে গড়ে তুলতে পারলে, একটি সৎ ও উত্তম জাতি গড়ে উঠবে।’ মানুষের জীবনের প্রথম বিদ্যালয় পরিবার। আরো বিশেষায়িত করে বললে, মা। একজন শিশু পৃথিবীতে আসার পরপরই প্রথম মাকে দেখে। মায়ের সঙ্গেই তার সময় কাটে হেসেখেলে। হাসিকান্নার ভেতর দিয়ে দেখতে দেখতে সে পরিবারের অন্যদের সঙ্গে পরিচিত হতে থাকে। বাবাকে চেনে। চিনতে শুরু করে দাদা-দাদি, নানা-নানি, ভাই-বোন ও প্রতিবেশীদের। এভাবেই শিশু আচার-আচরণ ও মূল্যবোধ শিখতে শুরু করে পরিবার ও আপনজনদের কাছ থেকে। তাই ইসলাম পরিবারকে শুধু একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই নয়, বরং ঈমান, নৈতিকতা, আদব-কায়দা ও মানবিক গুণাবলি গঠনের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠশালা হিসেবে দেখে।পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা কর, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর।’ (সুরা আত-তাহরিম : ৬) এই আয়াতে মহান আল্লাহ আখিরাতের ব্যাপারে সতর্কবার্তা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিভাবকদের ওপর অর্পিত একটি মহান দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষা, উত্তম চরিত্র ও আল্লাহভীতি শেখানো মা-বাবার প্রধান কর্তব্য।

    শিশুর প্রথম ভাষা, প্রথম আচরণ, প্রথম ভালোবাসা, প্রথম শৃঙ্খলা এবং প্রথম ধর্মীয় চেতনার সূচনা হয় পরিবারের মধ্যেই। তাই একটি পরিবারের পরিবেশ যেমন হবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও অনেকাংশে তেমনই গড়ে উঠবে। অন্যত্র আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর তোমার পরিবারকে সালাতের নির্দেশ দাও এবং তুমি নিজেও এর ওপর অবিচল থাকো।’ (সুরা ত্বহা : ১৩২) অর্থাৎ, ইসলামি শিক্ষা শুরু হবে পরিবার থেকেই। ঘরে যদি নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের পরিবেশ গড়ে ওঠে, তবে সন্তান স্বাভাবিকভাবেই সেই আদর্শে বেড়ে উঠবে।

    রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (বুখারি : ৮৯৩; মুসলিম : ১৮২৯) আরেকটি হাদিসে তিনি বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম।’ (তিরমিজি : ৩৮৯৫)

    এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, প্রকৃত ধার্মিকতা শুধু ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পরিবারের সঙ্গে উত্তম আচরণও ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

    বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির বিস্তার, ভোগবাদী সংস্কৃতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা নতুন প্রজন্মকে নানা নৈতিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। অনেক অভিভাবক সন্তানের জন্য উন্নত শিক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তি ও আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করলেও নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেন না। ফলে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও চরিত্রবান মানুষের সংখ্যা আশানুরূপ বাড়ছে না।

    শিশুর মন উর্বর জমির মতো। সেখানে যে বীজ বপন করা হবে, ভবিষ্যতে সেই ফলই পাওয়া যাবে। পরিবারে যদি সত্য, ন্যায়, সততা, ধৈর্য, দয়া, ক্ষমাশীলতা ও তাকওয়ার চর্চা হয়, তবে সন্তানও সেসব গুণ অর্জন করবে। আর যদি পরিবারে মিথ্যা, অশান্তি, রূঢ়তা ও অবহেলার পরিবেশ বিরাজ করে, তবে তার নেতিবাচক প্রভাব শিশুর মনোজগতে গভীরভাবে পড়বে।

    ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখি, মহানবী (সা.)-এর পরিবার ছিল আদর্শ পরিবারের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সেখানে পরস্পরের প্রতি দয়া, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ ছিল। আখলাক ও ইবাদতের পরিবেশ পূর্ণমাত্রায় বিরাজ করত। সেই আদর্শ অনুসরণ করেই সাহাবায়ে কিরাম মানবতার শ্রেষ্ঠ প্রজন্মে পরিণত হয়েছিলেন। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার সন্তানকে উপকারী শিক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে অবহেলা করে এবং তাকে তার খেয়ালখুশিমতো চলতে দেয়, সে তার প্রতি চরম অন্যায় করে। অধিকাংশ সন্তানের বিপথগামিতার কারণ হলো মা-বাবার অবহেলা এবং তাদের দ্বীনের ফরজ ও সুন্নাহ শিক্ষা না দেওয়া।’ (তুহফাতুল মাওদুদ বি আহকামিল মাওলুদ)

    এই বক্তব্য আজও সমান প্রাসঙ্গিক। সন্তানকে শুধু সফল পেশাজীবী হিসেবেই নয়, বরং একজন সৎ, দায়িত্বশীল ও আল্লাহভীরু মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই প্রতিটি পরিবারের লক্ষ্য হওয়া উচিত। আজ আমাদের প্রয়োজন এমন পরিবার, যেখানে প্রতিনিয়ত কোরআন তিলাওয়াত শোনা যায়। প্রতিটি সন্তানকে জামাতে নামাজের গুরুত্ব শেখানো হয়। মিথ্যা ও প্রতারণাকে ঘৃণা করতে শেখানো হয়। বড়দের সম্মান এবং ছোটদের স্নেহ করতে শেখানো হয়। এমন পরিবারই ইসলামি সভ্যতার ভিত্তি এবং একটি কল্যাণময় সমাজ নির্মাণের প্রথম ধাপ।

    মনে রাখতে হবে, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার পরিবারে। পরিবার যদি আদর্শ হয়, সমাজ হবে আদর্শ। সমাজ আদর্শ হলে রাষ্ট্রও ন্যায়, ইনসাফ ও মানবিকতায় সমৃদ্ধ হবে। আসুন, আমরা আমাদের প্রতিটি পরিবারকে ইসলামি মূল্যবোধের আলোয় আলোকিত করি। কারণ, একটি সুশিক্ষিত, সচ্চরিত্র ও তাকওয়াসম্পন্ন পরিবারই পারে একটি নৈতিক, সমৃদ্ধ ও শান্তিময় জাতি গড়ে তুলতে।