নির্জনা

  • খুলনায় নির্জনা হত্যা: আদালতে বাবার দায় স্বীকার, কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ

    খুলনায় নির্জনা হত্যা: আদালতে বাবার দায় স্বীকার, কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ

    খুলনায় কিশোরী নির্জনা হত্যা মামলায় বাবা আকাশ আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। আজ রোববার খুলনার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-১ এর বিচারক মো. আসাদুর জামান তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করেন। পরে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

    এর আগে শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে ডুমুরিয়া উপজেলার বাজারের একটি দোকান থেকে র‌্যাব ও খুলনা সদর থানা পুলিশ আকাশকে গ্রেপ্তার করে। এরও আগে গত ১০ জুলাই নির্জনার মা আরিফা ইয়াসমিন সীমা মেয়ে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

    মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও খুলনা থানার এসআই আমিনুল ইসলাম বলেন, শনিবার দুপুরে গ্রেপ্তারের পর আকাশকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। আজ সকালে স্বেচ্ছায় আদালতে জবানবন্দি দিতে চাইলে দুপুরের পর তাঁকে আদালতে নেওয়া হয়।

    পুলিশের একটি সূত্র জানায়, গত ৮ জুলাই সকাল ১০টার কিছুক্ষণ পর স্বামী রনির সঙ্গে চলে যাওয়ার জন্য নগরীর বসুপাড়া বাঁশতলা এলাকার বাড়ি থেকে বের হয় নির্জনা। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে রাস্তা থেকে তুলে বাড়িতে নিয়ে আসেন।

    ওই দিন বিকেলে মা সীমার সঙ্গে নির্জনার কথা কাটাকাটি হয়। এ সময় নির্জনা মায়ের গায়ে হাত তোলে। পরে মায়ের গলা টিপে ধরে নির্জনা। তখন বাবা আকাশ কাঠের চেলা দিয়ে শাসন করতে গেলে সেটি গিয়ে নির্জনার মাথায় লাগে বলে সূত্রটি জানায়। পরে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তাঁরা।

    এরপর লাশ গুম করার জন্য বাবা কালো রঙের লুঙ্গি দিয়ে মেয়ের হাত-পা বেঁধে ফেলেন বলে পুলিশ সূত্রের দাবি। পরে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে মরদেহটি দোতলা থেকে নিচে নামানো হয়। কয়েকবার মোটরসাইকেলে মরদেহ তোলার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত তা তুলতে সক্ষম হন তারা।

    পরে মোটরসাইকেলে করে মরদেহ নিয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘোরেন আকাশ। কোথায় মরদেহ ফেলা হবে, তা ঠিক করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত শহরতলীর প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার একটি নির্জন সড়কে লাশ ফেলে দেওয়া হয়। বাড়ি ফিরে রক্ত মুছে ফেলেন তাঁরা। রাতে উভয়েই কান্নাকাটি করেন এবং সকালে পালিয়ে যান।

    খুলনা সদর থানার ওসি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বস্তাবন্দী মরদেহ উদ্ধারের পর হত্যাকাণ্ডের কারণ প্রথমে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পিবিআই ও সিআইডিও প্রথমে পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি। ঘটনার দিন রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রকাশ করা হয়। পরদিন বিকেলে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা হয়।

    ওসি আরও বলেন, মা-বাবাকে একাধিকবার ফোন দিয়েও তাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে নির্জনার মা সীমাকে থানায় আনা হয়। প্রথমদিকে মেয়ে হত্যার বিষয়ে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি। পরে বিস্তারিত তথ্য দেন।

    পুলিশ জানায়, ঘটনার ছয় দিন পর আকাশের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। ১০ দিন পর ডুমুরিয়া উপজেলার বাজারের একটি চায়ের দোকান থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

  • মা-বাবার মারধরে মৃত্যু, বস্তাবন্দী লাশ ফেলে আসেন বাবা

    মা-বাবার মারধরে মৃত্যু, বস্তাবন্দী লাশ ফেলে আসেন বাবা

    খুলনার নিরালা প্রান্তিকা এলাকা থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় উদ্ধার হওয়া স্কুলছাত্রী আরফানা হোসেন নির্জনা (১৬) বাবার লাঠির আঘাতে মাথায় গুরুতর জখম হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা গেছে বলে জানিয়েছে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি)। পুলিশের দাবি, পারিবারিক কলহের জেরেই এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

    শনিবার (১১ জুলাই) সকালে কেএমপি সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান।

    পুলিশ কমিশনার বলেন, নিহত নির্জনার মা আরিফা ইয়াসমিন সীমা শুক্রবার ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তিনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন।

    যেভাবে ঘটে হত্যাকাণ্ড

    পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন বিকেলে নির্জনার সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে মা তাকে চড় মারেন। ঘরের ভেতরে চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে বাবা মো. আলিম হোসেন আকাশ সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তিনি একটি কাঠের লাঠি দিয়ে নির্জনার মাথায় আঘাত করেন। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

    পরে মা-বাবা মিলে মরদেহ একটি প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে ছেঁড়া লুঙ্গি দিয়ে পেঁচিয়ে মোটরসাইকেলে করে নগরীর নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর সড়কে ফেলে রেখে আসেন বলে পুলিশের দাবি।

    গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার একটি সাততলা ভবনের সামনে বস্তাবন্দী অবস্থায় মরদেহটি দেখতে পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশে খবর দেন। পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠায়।

    তদন্তের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিহত ছাত্রীর পরিচয় শনাক্ত করে পুলিশ। সে সোনাডাঙ্গা থানার বসুপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং খুলনা ইকবালনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

    পুলিশ কমিশনার বলেন, তদন্তের একপর্যায়ে নিহত ছাত্রীর মা আরিফা ইয়াসমিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি প্রথমে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন। পরে হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। পরবর্তী সময়ে আদালতেও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

    পারিবারিক বিরোধের দাবি পুলিশের

    সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার বলেন, নির্জনার ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। সেই পারিবারিক বিরোধ থেকেই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। তবে তদন্ত এখনো চলছে।

    মা গ্রেপ্তার, বাবা পলাতক

    পুলিশ জানায়, ঘটনার ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে নির্জনার মা আরিফা ইয়াসমিনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রধান অভিযুক্ত বাবা মো. আলিম হোসেন আকাশ পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

    পুলিশ কমিশনার বলেন, ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মো. রেজাউর রহমানের নেতৃত্বে একটি বিশেষ দল এই ঘটনায় তদন্ত ও আসামি গ্রেপ্তারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

    উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সন্ধ্যায় খুলনা থানায় আটক নিহত নির্জনার মা আরিফা ইয়াসমিন এই প্রতিবেদককে বলেছিলেন, ‘গত ২১ এপ্রিল বাড়ি থেকে পালিয়ে তেরখাদা উপজেলার পালেরহাট আজগরা গ্রামের বাসিন্দা আতিয়ার রহমানের ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান রনিকে বিয়ে করে নির্জনা। এর তিন দিন পর আমাকে ফোন দিয়ে বলে আমি ভালো আছি। পরে আমরা জানতে পারলাম ছেলের চরিত্র ভালনা। তাকে ১৭ দিন পর বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়। ওই ছেলে প্রায় মেয়ের সাথে যোগাযোগ রাখত।’

    আরিফা ইয়াসমিন আরও বলেন, এ আগে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় নির্জনা পালিয়ে ফকিরহাট উপজেলার বারইপাড়া এলাকার ইকলাসুরের ছেলে মনিরুজ্জামান মনিকে বিয়ে করে। সেখানে একদিন থাকার পর বাড়িতে ফিরে আসে।

    ফেসবুকে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ

    পুলিশের দাবি, পলাতক বাবা আলিম হোসেন আকাশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করেছেন। তিনি একটি চিঠি প্রকাশ করে দাবি করেন, নির্জনা স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তবে ওই চিঠির সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

    এ ছাড়া যেদিন রাতে নির্জনার মরদেহ উদ্ধার হয়, সেদিনই তার ফেসবুক আইডি থেকে একটি স্ট্যাটাস দেওয়া হয়, যেখানে লেখা ছিল, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কোনো পরিকল্পনা আছে, সকল কষ্ট এবং দুঃখে আলহামদুলিল্লাহ।’

    সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলীম হোসেন আকাশের প্রোফাইল ঘেঁটে দেখা যায়, তিনি নিয়মিত টিকটকার হিসেবে সক্রিয় ছিলেন এবং স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে বিভিন্ন টিকটক ভিডিও তৈরি করে ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করতেন।

    আলীম হোসেন নিজেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার ও ব্যবসায়ী হিসেবে দাবি করলেও তার পেশার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান জানান, প্রাথমিক তদন্তে তাদের ধারণা নির্জনার বাবা একজন মাদকাসক্ত। বর্তমানে পলাতক বাবাকে খুঁজে বের করতে পুলিশ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে।