ধানের দাম

  • রংপুরে বোরো ধানের দামে ধস, খরচই উঠছে না কৃষকের

    রংপুরে বোরো ধানের দামে ধস, খরচই উঠছে না কৃষকের

    রংপুর বিভাগের হাটগুলোতে বোরো ধান প্রতি মণ ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে—যেখানে উৎপাদন খরচ মণপ্রতি ৯২০ থেকে ৯৫০ টাকা; ভালো ফলনের মৌসুমে নগদ অর্থের প্রয়োজনে কৃষকেরা দ্রুত ধান ছাড়ছেন, প্রতিবেদন করেছে ডেইলি স্টার (২৬ মে)। ঈদ সামনে রেখে এই দামের ধসে উত্তরাঞ্চলের শস্যভাণ্ডারে উৎসবের আমেজ ম্লান হয়ে পড়েছে।

    লালমনিরহাটের দুরাকুটি হাটে আট মণ ধান নিয়ে এসেছিলেন ৬৫ বছর বয়সী কৃষক মনসুর আলী, আশা ছিল প্রতি মণ ১,০০০ থেকে ১,০৫০ টাকায় বিক্রি করবেন। প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর তিনি ৮১০ টাকায় বিক্রি করেন। গত বছর একই হাটে তিনি ১,০৫০ টাকা দরে ধান বিক্রি করেছিলেন।

    “মাঠে ফসল দেখে মন খুশিতে ভরে যায়, কিন্তু হাটে এসে দাম দেখে শুধু হতাশা,” বলেন মনসুর। তিনি এ বছর ১০ বিঘা জমিতে বোরো চাষ করেছেন, ইতোমধ্যে সাত বিঘা কেটেছেন। বিঘাপ্রতি ফলন ২২ মণ—গত মৌসুমের তুলনায় বিঘায় প্রায় এক মণ বেশি।

    আদিতমারি উপজেলার শালমারা গ্রামের ৬০ বছর বয়সী নবীন চন্দ্র বর্মণও একই দশায়। এ মৌসুমে ১৬ বিঘায় বোরো চাষ করে মণপ্রতি প্রায় ৯৫০ টাকা খরচের বিপরীতে তাঁকে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায় ধান ছাড়তে হয়েছে। গত বছর একই ধান বিক্রি হয়েছিল ১,০৫০ টাকায়; এরপর খরচ বেড়েছে, অথচ দাম কমেছে। “আগে জানলে ধান নিয়ে হাটে আসতাম না,” বলেন তিনি।

    রংপুর সদরের গোপীনাথপুর গ্রামের ৫৫ বছর বয়সী আতোয়ার রহমানের বেলায়ও খরচ আর বাজারমূল্যের ফারাকটা একইরকম। মণপ্রতি ৯২০ টাকা উৎপাদন খরচের বিপরীতে তিনি ৩০ মণ ধান বিক্রি করেছেন মাত্র ৮০০ টাকা দরে। ২০ বিঘা জমিতে চাষ করে এর মধ্যে ১৫ বিঘা ফসল ঘরে তুলেছেন।

    পাইকাররা ডেইলি স্টারকে বলেছেন, গুদামে গত মৌসুমের পুরনো স্টক জমে থাকায় তাঁরা সীমিত পরিমাণে ধান কিনছেন। “পুরনো স্টক শেষ হলে পুরোদমে ধান কেনা শুরু করব,” বলেন লালমনিরহাটের পাইকার সোলায়মান আলী। রংপুরের আরেক পাইকার সুনীল চন্দ্র সেন—যিনি নিজেও কৃষক—জানিয়েছেন, গুদামে জায়গা না থাকায় কম দামে কিনতে হচ্ছে।

    কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) জানিয়েছে, এ মৌসুমে রংপুর বিভাগের আট জেলায়—লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী ও ঠাকুরগাঁও—মোট ৬,৮৩,৭৯৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৪১ লাখ টন। রংপুর বিভাগীয় খাদ্য বিভাগ অনুযায়ী, সরকার এ বছর কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ৭১,৪৮৩ টন ধান এবং মিলারদের কাছ থেকে ২,৪৬,২৪৬ টন চাল কেনার পরিকল্পনা করেছে। সরকারি ক্রয়মূল্য কেজিপ্রতি ৩৬ টাকা—যা খোলাবাজারের দামের চেয়ে বেশি—তবে পরিমাণ সীমিত এবং কেবল কৃষি অফিসের তালিকাভুক্ত কৃষকদের কাছ থেকেই কেনা হয়, ফলে বেশিরভাগ কৃষক এতে ধান বেচতে পারেন না।

    শুধু রংপুরেই নয়—এই বোরো মৌসুমে সারা দেশেই শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে আর ধানের দাম কমেছে; অনেক কৃষক বিঘাপ্রতি ২৫,০০০ থেকে ২৬,০০০ টাকা উৎপাদন খরচই তুলতে পারছেন না, প্রতিবেদন করেছে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড। সরকারের সারা দেশের ক্রয় পরিকল্পনা—কেজিপ্রতি ৩৬ টাকায় ৫ লাখ টন—মোট ফসলের সামান্য অংশই ছুঁতে পারে।

    পীরগাছা উপজেলার চৌধুরাণী গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী আক্কেল আলীর কাছে ফলন আর দামের এই ব্যবধান এবারের ঈদকেই বদলে দিয়েছে। “এই বছর আমাদের ঘরে ঈদ নেই,” ডেইলি স্টারকে বলেন তিনি। “ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছি না, তাই আমরা সবাই গভীরভাবে মর্মাহত।”