দৃষ্টিভঙ্গি

  • প্রবীণদের যত্নে বদলাতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি

    প্রবীণদের যত্নে বদলাতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি

    আজকের বিশ্ব এক অভূতপূর্ব জনমিতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি এবং জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির ফলে মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের এবারের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল—‘The Age of Longevity: Rethinking Systems for Longer Lives (দীর্ঘায়ুর যুগ : দীর্ঘ জীবনের জন্য ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস)’। এই প্রতিপাদ্যটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রবীণদের দীর্ঘ জীবনকে কেবল সংখ্যায় নয়; বরং মর্যাদাপূর্ণ, সুস্থ ও সক্রিয় রাখাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

    বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

    ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা যৌথ পরিবার এবং পারিবারিক বন্ধনের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যেখানে প্রবীণদের যত্ন নেওয়ার মূল দায়িত্ব পালন করে পরিবার। তবে দ্রুত নগরায়ণ, অর্থনৈতিক পরিবর্তন এবং একক পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এই সনাতন পারিবারিক মডেলটি ভেঙে পড়ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ বা চার কোটিরও বেশি মানুষ প্রবীণদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবেন। যেখানে আমাদের স্বাস্থ্য খাত এখনো প্রধানত মা ও শিশু স্বাস্থ্য রক্ষায় বেশি মনোযোগী, সেখানে এই বিশাল প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা বা ‘জেরিয়াট্রিক কেয়ার (Geriatric Care)’-এর অভাব অত্যন্ত প্রকট। ফলস্বরূপ, বার্ধক্যজনিত বহুবিধ দীর্ঘস্থায়ী রোগ (যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রম) নিয়ে অনেক প্রবীণই একাকিত্ব ও সঠিক চিকিৎসার অভাবে ভুগছেন।

    হাসপাতালের ভূমিকা

    বাংলাদেশের সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে অত্যন্ত প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছে বারডেম জেনারেল হাসপাতাল (BIRDEM General Hospital)। ডায়াবেটিস এবং হরমোনজনিত রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি হাসপাতালটি প্রবীণদের নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধানে একটি বিশেষায়িত জেরিয়াট্রিক ডে কেয়ার ইউনিট (Geriatric Day Care Unit Department) পরিচালনা করছে। বারডেমের এই উদ্যোগটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি আদর্শ মডেল—

    • সমন্বিত সেবা : বার্ধক্যের কারণে রোগীরা একই সঙ্গে একাধিক জটিলতায় (Comorbidities) ভোগেন। বারডেমের প্রবীণ বিভাগে একজন রোগীকে এক ছাতার নিচে বহুমুখী চিকিৎসকের পরামর্শ প্রদানের চেষ্টা করা হয়।

    • ডে কেয়ার ধারণা : পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালে ভর্তি না হয়েও দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে এসে প্রয়োজনীয় থেরাপিউটিক সেবা, শারীরিক পরীক্ষা এবং বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নেওয়ার সুবিধা রয়েছে এখানে।

    • প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা : চিকিৎসকদের জেরিয়াট্রিক মেডিসিনে দক্ষ করতে এবং নার্সদের বিশেষায়িত সেবার প্রশিক্ষণ দিতে বারডেম অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

    তবে বারডেমের মতো সীমিত কিছু প্রতিষ্ঠানের একার পক্ষে দেশব্যাপী এই বিশাল চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এমন জেরিয়াট্রিক কেয়ার ইউনিট প্রতিটি জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে ছড়িয়ে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

    আমাদের করণীয়

    জাতিসংঘের এই বছরের প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে বাংলাদেশকে একটি ‘প্রবীণবান্ধব’ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন—

    চিকিৎসা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন : দেশের প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে প্রবীণদের জন্য আলাদা জেরিয়াট্রিক ওয়ার্ড এবং দ্রুত টিকিট ও ওষুধ প্রাপ্তির জন্য বিশেষ কাউন্টার চালু করা উচিত।

    অবকাঠামোগত উন্নয়ন : রাস্তাঘাট, গণপরিবহন ও ফুটপাথ এমনভাবে তৈরি করা দরকার, যেন লাঠি বা হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী প্রবীণরাও স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারেন।

    সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী : সরকারি ‘বয়স্ক ভাতা’র পরিধি এবং টাকার পরিমাণ আরো বৃদ্ধি করা প্রয়োজন, যাতে প্রবীণরা ন্যূনতম আর্থিক স্বাধীনতা ভোগ করতে পারেন।

    পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা : প্রবীণরা সমাজের বোঝা নন, বরং তাঁদের অভিজ্ঞতা আমাদের সম্পদ। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং দায়িত্বশীলতার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

    দীর্ঘায়ু পাওয়া একটি আশীর্বাদ, কিন্তু সেই দীর্ঘ জীবন যদি রোগাক্রান্ত এবং অবহেলার হয়, তবে তা অভিশাপে পরিণত হয়। বাংলাদেশ আজ যে জনমিতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে এখনই বিনিয়োগ না করলে ভবিষ্যৎ প্রবীণ সমাজ এক গভীর সংকটে পড়বে। আসুন, জাতিসংঘের এই আহ্বানকে সামনে রেখে আমরা আমাদের স্বাস্থ্য ও সামাজিক ব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্বিন্যাস করি, যেন আমাদের অগ্রজরা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সম্মানের সঙ্গে, সুস্থ শরীরে এবং হাসিমুখে বেঁচে থাকতে পারেন।