তত্ত্বাবধায়ক সরকার

  • তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা নিয়ে নতুন ‘আইডিয়া’

    তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা নিয়ে নতুন ‘আইডিয়া’

    নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপদ্ধতি নিয়ে নতুন একটি ‘আইডিয়া’ বা ধারণা পেয়েছে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। আজ শনিবার সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনের অধ্যাপক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের সঙ্গে কমিটির মতবিনিময়ে নতুন এ ধারণা উঠে আসে। সংসদ দুই কক্ষের হলে উচ্চকক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা যায় কি না—এমন একটি ধারণা সভায় আলোচনায় আসে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার রূপরেখা কেমন হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।কমিটির সভা শেষে বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের এ কথা জানান। সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে বেলা ১১টায় বৈঠক শুরু হয়। দুপুরে এক ঘণ্টার বিরতি দিয়ে বৈঠক শেষ হয় বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে। এতে ৪৪ জন অংশ নেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকে বিচার বিভাগের জন্য স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, প্রধান ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনকে সাংবিধানিক সংস্থা করা, মৌলিক অধিকারের পরিধি বাড়ানো, নিম্নকক্ষের মেয়াদ ৪ বছর ও উচ্চকক্ষের মেয়াদ ৬ বছর করা, ৬৪ জেলা থেকে ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সদস্যদের নিয়ে উচ্চকক্ষ গঠন করা, সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি ভোট দেওয়া, নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগে নিরপেক্ষ বাছাই কমিটির বিধান করা, অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব বিচার বিভাগের হাতে দেওয়ার মতো প্রস্তাব এসেছে।

    অবশ্য বাংলাদেশের মতো দেশে উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা আছে কি না, সে প্রশ্নও কেউ কেউ তুলেছেন। এর বদলে একটি উপদেষ্টা পরিষদ করা যায় কি না, সে প্রস্তাবও এসেছে। এ ছাড়া সরকারি হিসাব, সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির মতো কয়েকটি কমিটির বাইরে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি বিরোধী দল থেকে দেওয়া; সংসদীয় কমিটির ক্ষমতা বাড়াতে সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন করার প্রস্তাবও দিয়েছেন কেউ কেউ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে সরাসরি সংবিধান সংশোধন হয়ে যায় কি না—এ বিষয়েও আলোচনা হয়। বেশির ভাগ মত দিয়েছেন, এ ক্ষেত্রে সংসদকে সংশোধনী আকারে রায় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

    তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা
    বৈঠক শেষে সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া এবং কর্মপরিধি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে একটি নতুন ‘আইডিয়া’ এসেছে। ধারণাটি সম্পর্কেও তিনি সাংবাদিকদের জানান।নতুন আইডিয়াটি এ রকম—যদি সংসদের উচ্চকক্ষ গঠিত হয়, এর মেয়াদ নিম্নকক্ষের সঙ্গে শেষ হবে না। উচ্চকক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া রাখা যায় কি না, সে আলোচনা এসেছে। এ ক্ষেত্রে যদি উপরাষ্ট্রপতির পদ সৃজন করা হয়, তাহলে উপরাষ্ট্রপতিকে উচ্চকক্ষের স্পিকারের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। বিকল্প হিসেবে এসেছে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্মতিতে উচ্চকক্ষের স্পিকার নির্বাচিত হবেন। তাঁকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা যায় কি না এবং অন্য উপদেষ্টাদেরও সরকারি ও বিরোধী দলের সম্মতিতে উচ্চকক্ষ থেকে নিযুক্ত করা—সেটার একটা বিধান থাকতে পারে।

    সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এ রকম মতামত এসেছে। এটা বিবেচনা করা যায়। তবে আরও প্রস্তাব এলে কমিটি তাদের প্রতিবেদনে সেগুলো তুলে ধরবে। এ বিষয়ে সবাইকে লিখিত মতামত দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

    সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সবার বক্তব্য ছিল বিচার বিভাগ এবং রাষ্ট্রপতিকে বাইরে রেখে ঐকমত্যের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা প্রয়োজন। এটা নিয়ে ‘থিওরিটিক্যাল’ আলোচনা ছিল। কমিটি বলেছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে লিখিত মতামত দিলে সুবিধা হবে। কমিটি প্রত্যেকের মতামতগুলো দেখবে। তাঁরা চান সমঝোতার মধ্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি ঠিক হোক।

    নোট অব ডিসেন্ট প্রসঙ্গ
    অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে যেসব ক্ষেত্রে বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্ন মত) আছে, সেখানে ছাড় দেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এখনো সে রকম কোনো সিদ্ধান্ত তাঁরা নেননি। তিনি বলেন, তাঁরা বিরোধী দলকে আহ্বান জানাচ্ছেন। যদি বিরোধী দল কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট শিথিল (ভিন্ন মত) করার কথা বলে, সেটা কমিটিতে এসে বিরোধী দলকে বলতে হবে। তখন কমিটি এটা বিবেচনা করতে পারে।

    বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ‘স্টিউটারি কনস্টিটিউশনাল বোর্ড’ নামে একটা নতুন ‘ডেফিনেশন’ তাঁরা দিতে চেয়েছেন। সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর গঠন, কর্মপরিধি, প্রতিষ্ঠাগুলো কীভাবে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে—সে রকম কোনো চিন্তাভাবনা করা যায় কি না, এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সংবিধানের মৌলিক কাঠামো তত্ত্ব, নির্বাহী বিভাগ ও আইন প্রণয়নসংক্রান্ত কার্যক্রমের ওপর বিচার বিভাগের পর্যালোচনার ক্ষমতা, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের এখতিয়ার নিয়েও বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন।

    সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এ বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে আগের সরকারের জারি করা অধ্যাদেশে বিভিন্ন ত্রুটি থাকায় সেটিকে আইনে পরিণত করা হয়নি। পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি কমিটির আলোচনায় রয়েছে।

    লক্ষ্য অর্জন গুরুত্বপূর্ণ
    এর আগে দুপুরে বৈঠক থেকে বের হয়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে ২০১১ সালে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তদের নেতৃত্বে সংসদীয় সংবিধান সংশোধন কমিটির বৈঠকেও তিনি কথা বলেছিলেন। অনেক প্রত্যাশা নিয়ে তিনি সে বৈঠকে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরে প্রতারিত হয়েছেন। এবার আশা করছেন, ভালো পরিবর্তন পাবেন। গণ–অভ্যুত্থানের প্রত্যাশাটা যেন মাথায় থাকে, সেটা তিনি সবার কাছে ‘আপিল’ করেছেন।

    আসিফ নজরুল বলেন, বিরোধী দলগুলোর মতের ভিত্তিতে যেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি ঠিক করা হয়। তিনিসহ আরও কেউ কেউ বিরোধী দলকে আলোচনার প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার কথা বলেছেন। কমিটি বলেছে, তারা এ বিষয়ে অনেক রকম চেষ্টা করেছে।

    এক প্রশ্নের জবাবে আসিফ নজরুল বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ হবে নাকি সংবিধান সংশোধন কমিটি হবে, এটা একটা রাজনৈতিক বিরোধ। এটার মধ্যে তিনি যেতে চান না। তবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি মনে করেন, সংবিধানে যেকোনো পরিবর্তনই একটা সংস্কার, যদি সেটা ইতিবাচক হয়। লক্ষ্য অর্জন করা যাচ্ছে কি না, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন।

    বৈঠকে অন্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান, অধ্যাপক মুহাম্মদ একরামুল হক, অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন খান, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সংসদ সদস্য এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, আইনজীবী সমিতির সম্পাদক মোহাম্মদ আলী, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক, রাগীব রউফ চৌধুরী, সুব্রত চৌধুরী, মনজিল মোর্শেদ প্রমুখ।

    বৈঠকে কমিটির সদস্যদের মধ্যে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন ও সাকিলা ফারজানা অংশ নেন।