জিয়াউর রহমান

  • পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হচ্ছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা

    পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হচ্ছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা

    শিক্ষা ও সাহিত্য ডেস্ক:

    শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা নিবন্ধ ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে আগামী শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে। সেই সঙ্গে তার তৎকালীন ঐতিহাসিক একটি ডায়েরির ছবিও বইয়ে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।

    এনসিটিবি জানিয়েছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ পাঠ্যপুস্তকে নতুন অধ্যায় হিসেবে এটি স্থান পাচ্ছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম স্মৃতিকথা হিসেবে বহুল আলোচিত এই দলিলকে পাঠ্যভুক্ত করার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটি (এনসিসিসি)।বিষয়টি নিশ্চিত করে এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বাসসকে বলেন, “আগামী বছরের শিক্ষাবর্ষ থেকে নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ বইয়ে জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধটি অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে এনসিসিসি চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। যার যতটুকু অবদান, তা নিরপেক্ষ ও নির্মোহভাবে পাঠ্যবইয়ে তুলে ধরতেই সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে।”

    শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাঠ্যবইয়ে নিবন্ধটি অন্তর্ভুক্তির ফলে শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম থেকে ভেসে আসা ঐতিহাসিক ‘উই রিভোল্ট’ ও কালুরঘাটের স্বাধীনতার ঘোষণার চাক্ষুষ স্মৃতি নির্মোহভাবে শিখতে পারবে, যা মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস তুলে ধরতে একটি বড় মাইলফলক।

    এ বিষয়ে বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বাসসকে বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের লেখা এই নিবন্ধের ঐতিহাসিক মূল্য আছে। এর মাধ্যমে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা স্বাধীনতার সংগ্রাম সম্পর্কে সচেতন হতে পারবে। পাঠ্যবইয়ে এটি অন্তর্ভুক্ত করা যৌক্তিক।’

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শাহ শামীম আহমেদ বাসসকে বলেন, ‘এই নিবন্ধ অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ ঘটনা জানার সুযোগ পাবে। অতীতে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে যেভাবে একপাক্ষিক ইতিহাস চর্চা করা হয়েছে, বর্তমান সরকারের নির্মোহ ও নিরপেক্ষ ইতিহাস তুলে ধরার দৃষ্টিভঙ্গি সেই মানসিকতার অবসান ঘটাবে।’

    শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২৪ আগস্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে সচিবের সভাপতিত্বে জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

    এনসিটিবির কারিকুলাম সংশ্লিষ্টরা জানান, নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ পাঠ্যপুস্তকের ২২ নম্বর গদ্যের লেখক পরিচিত অংশে জিয়াউর রহমানকে মহান স্বাধীনতার ঘোষক, সাবেক রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান, জেড ফোর্সের অধিনায়ক, ১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার ও ‘বীর উত্তম’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে এই প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধকে সর্বাত্মক ‘জনযুদ্ধ’ হিসেবে চিহ্নিত করে ২৫ মার্চের

    গণহত্যার পর শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হলে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল মুক্তিকামী মানুষের জন্য ‘তূর্যধ্বনির মতো’।

    এনসিটিবি জানায়, প্রবন্ধটির মূল বর্ণনা শুরুর আগে কিছু ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। ব্যাখ্যায় ১৯৭২ সালে ‘দৈনিক বাংলা’য় প্রকাশিত ‘একটি জাতির জন্ম’ ও ১৯৮০ সালে অধুনালুপ্ত ‘দৈনিক দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধ দুটিকে মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য দলিল হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তি বা দলের কৃতিত্ব নয়। এতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদকে বাংলাদেশের ইতিহাসের অনিবার্য নাম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

    কারিকুলাম সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, গদ্যের প্রবন্ধে ১৯৭১ সালের মার্চে চট্টগ্রাম থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা ও সম্মুখসমরের আত্মত্যাগের এক অনন্য আলেখ্য চিত্রিত হয়েছে।

    প্রস্তাবিত প্রবন্ধের মূল কথায় যা আছেÑ

    মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র দায়িত্ব গ্রহণের অনুভূতির কথা বর্ণনা করতে গিয়ে নিবন্ধে জিয়াউর রহমান লিখেছেন— ‘সবাই আমরা যুদ্ধ করেছি। সৈনিক, জনগণ সবাই। জাতির চরম সংকটের মুহূর্তে কাউকে না কাউকে সামনে এগিয়ে আসতে হয়। নিতে হয় দায়িত্ব। আমি কেবল সেই দায়িত্ব পালন করেছি। নেতারা যখন উধাও হয়ে গেল— সিদ্ধান্ত দেওয়ার কেউ থাকল না, তখন জাতির পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত আমাকে ঘোষণা করতে হলো… ২৬ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে সেই চূড়ান্ত সময়টি এলো, যার জন্য গোটা মাস আমরা রুদ্ধশ্বাস হয়ে প্রতীক্ষা করছিলাম।’চট্টগ্রামে পকিস্তানি বাহিনীর ষড়যন্ত্র অনুধাবন এবং ১ মার্চ থেকে শুরু হওয়া সন্দেহজনক গতিবিধির বিবরণ দিয়ে মেজর জিয়া উল্লেখ করেন— ‘১ মার্চ থেকে ২০তম বেলুচ রেজিমেন্টের রহস্যজনক গতিবিধি থেকে আমরা সুস্পষ্ট আঁচ করতে পারছিলাম কী ঘটতে যাচ্ছে… ১৩ মার্চ নেতাদের সঙ্গে ইয়াহিয়ার গোলটেবিল বৈঠক শুরু হলো। এর মধ্যেই পাকিস্তানি জেনারেলরা একের পর এক বিমানে আসতে লাগলেন… এ ছিল সর্বাত্মক হামলার এক ভীতিকর পূর্বাভাস… দ্রুত ঘনিয়ে এলো পঁচিশ-ছাব্বিশের সেই রাত। রাত ১১টায় চট্টগ্রাম বন্দরে জেনারেল আনসারীর কাছে রিপোর্ট করার জন্য ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার আমার কাছে নির্দেশ পাঠালেন। নৌবাহিনীর একটি ট্রাক পাঠানো হলো আমাকে এসকর্ট করে নিয়ে যাওয়ার জন্য…’

    নিবন্ধে জিয়াউর রহমান আরও লেখেন, ‘আগ্রাবাদের এক ব্যারিকেডের সামনে ট্রাক থেমে গেল… ঠিক সে সময়ে মেজর খালিকুজ্জামান সেখানে আমার সঙ্গে দেখা করলেন। অনুচ্চ স্বরে বললেন, ওরা ক্যান্টনমেন্টে হামলা শুরু করেছে। শহরেও অভিযান চালিয়েছে। হতাহত হয়েছে বহু নিরীহ মানুষ। যে সময়ের জন্য এতদিন অপেক্ষা করছিলাম, সে সময় এসে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলাম, ‘উই রিভোল্ট’। নির্দেশ দিলাম, ষোলশহরে ছুটে যাও। পাকিস্তানি অফিসারদের আটক করো। যুদ্ধের জন্য তৈরি করে রাখো ব্যাটালিয়নের সবাইকে।’

    জিয়াউর রহমান লিখেছেন— ‘ষোলশহরে এসে মুহূর্তে একটি রাইফেল কেড়ে নিলাম তাদের একজনের কাছ থেকে… ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেন্টারে এলাম। লে. কর্নেল চৌধুরী এবং ক্যাপ্টেন রফিকের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম। সিভিল টেলিফোন সার্ভিসের একজন অপারেটরকে টেলিফোনে পেলাম। তাকে বললাম: ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অষ্টম ব্যাটালিয়ন স্বাধীনতা যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, এ সংবাদটি যেন সে চট্টগ্রামের ডিসি, কমিশনার, পুলিশের ডিআইজি আর রাজনৈতিক নেতাদের জানিয়ে দেয়। কারণ টেলিফোনে আমি তাদের কাউকে পাচ্ছিলাম না।

    টেলিফোন অপারেটর দারুণ আনন্দ প্রকাশ করল আমার কথায় এবং ঐ গভীর রাতেই সবার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করল সে।’

    তিনি আরও লেখেন, ‘সেই মুহূর্তটি ছিল জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ব্যাটালিয়নের সব অফিসার আর জোয়ানদের এক জায়গায় একত্র করে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিলাম। বললাম, আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে নেমেছি। তারা এই ঘোষণাটির জন্যই উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছিল। সঙ্গে সঙ্গে সবাই উল্লাসধ্বনি করে সাড়া দিল। পর মুহূর্তেই সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। রাত তখন ২টা ১৫ মিনিট। ২৬শে মার্চ ১৯৭১। জাতির জন্যে অবিস্মরণীয় সেই মুহূর্তটি।’

    পটিয়ার পাহাড়ে প্রথম মুক্তাঞ্চল গঠন ও সামরিক কৌশলের বর্ণনা দিয়ে মেজর জিয়া লেখেন— ‘রাত ৪টায় রেললাইন ধরে পটিয়ার পাহাড়ের দিকে যাত্রা করলাম। পথে ইপিআর-এর একশজন আমাদের সাথে যোগ দিল… ২৬শে মার্চের মধ্যেই তিনশ সদস্যের বাহিনীকে চট্টগ্রাম পাঠানো হলো হানাদারের মোকাবিলার জন্য। প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। সেই প্রথম সম্মুখসমর, পাকিস্তানি শিবিরে তখন আতঙ্ক। তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলো।’

    কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ঐতিহাসিক স্বাধীনতা ঘোষণার স্মৃতিচারণ করে নিবন্ধে জিয়াউর রহমান লিখেছেন—‘দিনটি ছিল ২৭শে মার্চ… সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রেডিও স্টেশনে এলাম। হাতের কাছে একটি এক্সারসাইজ খাতা পাওয়া গেল। তার একটি পৃষ্ঠায় দ্রুতহাতে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম ঘোষণার কথা লিখলাম— স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বভার নিয়েছি, সে কথাও লেখা হলো সেই প্রথম ঘোষণায়… বেতার তরঙ্গের সে ঘোষণা বিশ্বের প্রায় প্রতিটি রেডিওতে ধরা পড়ল। আর বিশ্ববাসী সেই প্রথম শুনলো: বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের ঘোষণা নিয়ে যুদ্ধে নেমেছে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে…২৭শে মার্চ, সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে ইথারে ঘোষণাটি উচ্চারিত হওয়ার পর মুহূর্তেই বিশ্বমানচিত্রে অঙ্কিত হয়ে গেল ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ কথাটি। ‘সে ছিল সত্যি এক অলৌকিক ব্যাপার!’

    শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বাসস’কে বলেন, ‘এনসিসিসি সভায় নিবন্ধটি সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ও নির্মোহ ইতিহাস জানতে পারবে।’

  • হঠাৎ কেন বিটিভির লোগো বদলের সিদ্ধান্ত?

    হঠাৎ কেন বিটিভির লোগো বদলের সিদ্ধান্ত?

    বছরে ২০০ কোটি টাকার বেশি লোকসানের মুখে ধুঁকতে থাকা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৯৮০ সালে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকারের আমলে রঙিন সম্প্রচার যুগে প্রবেশ করে বিটিভি। ওই বছরই শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের হাতে যুক্ত হয় বিটিভির রঙিন লোগো। ৪৬ বছরে চিরচেনা এই লোগোটি গেঁথে গেছে অনেকের হৃদয়ে। সেই লোগো কেন পরিবর্তনের চিন্তা করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

    গত রবিবার রাতে বিটিভির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বলা হয়, ‘ফিরছে নতুন রূপে বিটিভি। বাংলাদেশ টেলিভিশনের লোগো নির্মাণের গৌরবোজ্জ্বল অংশীদার হতে পারেন আপনিও। আপনার আইডিয়া অথবা লোগো ডিজাইন পাঠিয়ে দিন এই ঠিকানায়—logo@btv.gov.bd। জমা দেওয়ার শেষ তারিখ : ১০ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬।’ এ ঘোষণার পর সোশ্যালে শুরু হয়েছে আলোচনা। কেউ কেউ বিটিভির অনুষ্ঠানের মান বাড়ানোরও তাগিদ দিচ্ছেন।

    বিষয়টি নিয়ে আগামীর সময় যোগাযোগ করে বিটিভির মহাপরিচালক কাজী জেসিনের সঙ্গে। গত ৭ আগস্ট বিটিভিতে মহাপরিচালক পদে যোগ দিয়েছেন কাজী জেসিন। লোগো পরিবর্তনবিষয়ক যে বিজ্ঞাপনটি প্রকাশিত হয়েছে, তার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন তিনি। তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। কাজী জেসিন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের তিনজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। তারা বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিব রহমান পার্থকে ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

    কাজী জেসিন মহাপরিচালকের দায়িত্ব নেওয়ার পর গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। গত ২৫ আগস্ট নিজের ফেসবুক পোস্টে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কাজী জেসিন বলেন, বিটিভিকে শুধু আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়া নয়, বরং আরও আধুনিক, অনন্য ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে চান প্রধানমন্ত্রী।

    তবে কী লোগো পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই বিটিভিকে নতুন রূপে সাজানোর কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে? কাজী জেসিনের ভাষ্য, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিটিভিকে ক্ষমতাসীন দলের প্রচারযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি দর্শক হারিয়েছে এবং বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে পড়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পরও বিটিভিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের সূচনা হয়নি। অতীতে কোনো সরকার বিটিভিকে নিয়ে এতটা গুরুত্ব দিয়ে ভাবেনি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠানটির পরিবর্তনে উদ্যোগ নিয়েছেন। এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে বিটিভিকেও নতুনভাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

    বিটিভির রঙিন লোগো অনুমোদন করেছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তার সময়েই দর্শকদের জন্য প্রথমবার রঙিন সম্প্রচারে যায় রাষ্ট্রীয় এই টেলিভিশনটি। ফাইল ছবি

    জিয়াউর রহমানের অনুমোদিত লোগো কেন হঠাৎ পরিবর্তন?

    ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর ঢাকার তৎকালীন ডিআইটি ভবনের নিচতলায় বিটিভির যাত্রা শুরু হয়। এরপর সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশের জন্মের পরের বছর যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ টেলিভিশন। ১৯৭৫ সালে ডিআইটি ভবন থেকে বিটিভিকে রামপুরায় নিজস্ব ভবনে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৮০ সালে দর্শকদের রঙিন পর্দা উপহার দেওয়ার মাধ্যমে নতুন যুগে পদার্পণ করে বিটিভি। বর্তমানে চ্যানেলটির সম্প্রচার এইচডি (হাই ডেফিনিশন) এবং টেরিস্ট্রিয়াল, স্যাটেলাইট ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে।

    লেখক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব খ ম হারুন আগামীর সময়কে বলেন, ‘মনে রাখতে হবে বর্তমান লোগোটিতে শিল্পী কামরুল হাসান ও মুস্তাফা মনোয়ারের হাতের স্পর্শ আছে। শিল্পী ইমদাদ হোসেন ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে বিটিভির লোগো নির্মাণে ভূমিকা রাখেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৮০ সালে বিটিভি যখন রঙিন যুগে প্রবেশ করে, তখন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আগের লোগোটিকে আবার নতুন রূপে অঙ্কিত করেন।’

    প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অনুমোদন করা লোগোটি বর্তমান বিএনপি সরকার কেন পরিবর্তন করতে চাইছে— এই প্রশ্ন তুলে খ ম হারুন বলেন, ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন ১৯৮০ সালের ১ ডিসেম্বর রঙিন যুগে প্রবেশ করে। সেদিন রঙিন টেলিভিশন এবং মুস্তাফা মনোয়ার পরিকল্পিত বিটিভির রঙিন লোগো (১৯৭১-এর মূল লোগোর নতুন রূপ) উদ্বোধন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এখন হঠাৎ লোগোটি পরিবর্তন করা কেন এত জরুরি হলো?’

    বিটিভির এখন কী কী করা উচিত, সে বিষয়ে কিছু পরামর্শও দেন এই টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব। তিনি বলেন, ‘এখন দরকার বিটিভির অনুষ্ঠানে বৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা এবং মেধাবী মানুষদের দিয়ে নতুন নতুন কনটেন্ট তৈরি করা। তথাকথিত অডিশন প্রথা বাতিল করে গুণী শিল্পীদের আলাদাভাবে তালিকাভুক্ত করা; বিটিভির ত্রৈমাসিক অনুষ্ঠান পরিকল্পনা এবং সেই ভিত্তিতে টিভি গাইড পুনরায় প্রকাশের ব্যবস্থা করা; বিটিভির সব চ্যানেলের শূন্য পদ পূরণসহ সব স্তরে দুর্নীতিমুক্ত করা। নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং শিল্পী সম্মানী কাঠামো যুগোপযোগী করা।’

    এ ছাড়া টেলিভিশন সংযোগ ও টেলিভিশন সেটের ওপর আরোপিত লাইসেন্স ফির যথাযথ হিসাব রাখা, পাবলিক সার্ভিস ব্রডকাস্টিং অর্গানাইজেশন হিসেবে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরশীল না হওয়া এবং বিটিভির ওয়েবসাইটকে আরও জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শও দেন তিনি।

    বিটিভির আয় ও ব্যয় কত?

    ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত করসহ বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মোট আয় হয়েছে ৮ কোটি ৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এর বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ২৫৪ কোটি ১৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। গত ২২ জুন জাতীয় সংসদে নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হুদার প্রশ্নের জবাবে সাবেক তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এ তথ্য জানিয়েছিলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর টেবিলে তা উপস্থাপন করা হয়।

    সাবেক তথ্যমন্ত্রী জানান, ওই অর্থবছরে বিটিভির মোট আয়ের মধ্যে বিজ্ঞাপন শাখা থেকে রাজস্ব আয় হয়েছে ৫ কোটি ৭ লাখ ৯ হাজার ৪১৭ টাকা। একই সঙ্গে তিনি বিটিভির গত পাঁচ অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের চিত্র তুলে ধরেন।

    মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে বিটিভির আয় ছিল ৩৪ কোটি ৫ লাখ ৯৯ হাজার টাকা, ব্যয় ২৮০ কোটি ৮১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে আয় ৪০ কোটি ২৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং ব্যয় ২৮৫ কোটি ৪৭ লাখ ২৭ হাজার টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয় ৩০ কোটি ৮৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকা, ব্যয় ৩৭০ কোটি ৬১ লাখ ৫১ হাজার টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আয় দাঁড়ায় ৪৪ কোটি ২১ লাখ ২২ হাজার টাকা, ব্যয় ২৯৮ কোটি ৫৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় ছিল ২৭ কোটি ৬৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং ব্যয় ৩০৭ কোটি ৯২ লাখ ২২ হাজার টাকা।

  • মোজাফফর হোসেনের বিচার হবে সেনা আইনে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

    মোজাফফর হোসেনের বিচার হবে সেনা আইনে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

    প্রয়াত রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মেজর মোজাফফর হোসেনের বিচার সেনা আইনে হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

    আজ সোমবার বিকেলে রাজধানীর পিলখানায় বিজিবি সদরদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দরবার শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

    সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, একই অপরাধে একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুটি পৃথক আইনে বিচার করার সুযোগ নেই। তাই তাকে বেসামরিক বিচার প্রক্রিয়ার পরিবর্তে সেনা আইনের আওতায় বিচারের জন্য সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

    স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মেজর অবসরপ্রাপ্ত মোজাফফর ও তার অন্য সহযোগীদের যে বিচার, সেটা তখনকার সময়ে সামরিক আদালতে হয়েছে। সেখানে কিছু ফাইন্ডিংস আছে। তিনি পলাতক ছিলেন, দীর্ঘ দিন ভিন্ন নাম ধারণ করে পার্শ্ববর্তী দেশে পলাতক ছিলেন।

    তিনি বলেন, ‘দেশে আসার পরে আমরা যখন জানতে পেরেছি। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থার ইনফরমেশনের ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতার করে সেনা আইনে বিচারের জন্য সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। জেনারেল কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে তার বিচার সম্পন্ন হবে। আগে একই মামলায় যাদের বিচার ও দণ্ড কার্যকর হয়েছে, সেই রায়ের আলোকে তার বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত রয়েছে তা জেনারেল কোর্ট মার্শাল বিবেচনা করবে।’

    এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

  • ঠান্ডা মাথায় রাষ্ট্রপতি জিয়াকে প্রথম গুলিটি করেন মোজাফফর!

    ঠান্ডা মাথায় রাষ্ট্রপতি জিয়াকে প্রথম গুলিটি করেন মোজাফফর!

    ঠান্ডা মাথায় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে লক্ষ্য করে প্রথম গুলিটি করেছিলেন মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেন—মামলার নথিতে এমনটাই উল্লেখ রয়েছে। প্রায় সাড়ে চার দশক ছদ্মবেশে পলাতক থাকার পর রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস থেকে তাকে গ্রেফতার করেছে ডিবি।

    গোয়েন্দাদের দাবি, মেয়ের কর্মস্থল ও নাকের নিচের একটি তিলকে সূত্র ধরে পরিচালিত অভিযানে ধরা পড়েন জিয়া হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত এই আসামি।

    খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেন ১৯৮১ সালের ৩১ মে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থানের অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী। তিনি ছিলেন কিলিং স্কোয়াডের সক্রিয় সদস্য। ১৯৮১ সালের ৩০ মে গভীর রাতে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে হামলা চালিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে। হত্যাকাণ্ডের সামরিক তদন্তের পর দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় যে ১৩ জন সেনা কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়েছিল, মোজাফফর হোসেন ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। ঘটনার পর থেকেই তিনি দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে ফেরারি ছিলেন।

    মামলার নথি, তদন্তের বিবরণী থেকে জানা যায়, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজের সেই কালরাতে মেজর মোজাফফরের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর। আক্রমণের সময় সার্কিট হাউজে হানা দিয়ে মেজর মোজাফফর ও ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন সরাসরি রাষ্ট্রপতির কক্ষের দিকে অগ্রসর হন। মোজাফফরই প্রথম ব্যক্তি ছিলেন যিনি সশরীরে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে কক্ষের বাইরে এনে শনাক্ত করেন। শুধু শনাক্ত করাই নয়, ঠান্ডা মাথায় তিনি রাষ্ট্রপতিকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালান বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত করার পরপরই মোজাফফর চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে ফোনে ইংরেজিতে একটি ঐতিহাসিক বার্তা দেন, ‘দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিল্ড’। ১৯৮১ সালের ৩১ মে যখন সরকারি বাহিনী পুনরায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়, তখন বিদ্রোহের মূল হোতা মেজর জেনারেল মঞ্জুরসহ অনেকেই গ্রেফতার হন এবং পরে মঞ্জুর নিহত হন। তবে মেজর মোজাফফর হোসেন এবং মেজর এসএম খালেদ কৌশলে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

    এতদিন পর কীভাবে ধরা পড়ল ইতিহাসের এই খলনায়ক, জানতে চাইলে অভিযানে থাকা ডিবির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়াতে অপরাধীরা কত ধরনের কৌশল অবলম্বন করতে পারে, তার অন্যতম উদাহরণ এই মোজাফফর। নিজের অবয়ব, চালচলন, এমনকি পেশা ও বাসস্থান পরিবর্তন করে সে দীর্ঘদিন একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিচয়ে ছদ্মবেশে অবস্থান করছিল। এ কারণে পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনীর কাছে তার অবস্থান সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ক্লু ছিল না। তবে অপরাধ যতই নিখুঁত হোক না কেন, অপরাধীর কোনো না কোনো চিহ্ন বা সূত্র থেকেই যায়। এটাই নির্মম নিয়তি। আর সেই সূত্র ধরেই এত বছর পর তাকে ডিবি গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে।

    গ্রেফতারের সূত্র জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, ডিবির বিশ্বস্ত টিম জানতে পারে, গোয়েন্দা কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে তার মেয়ের কর্মস্থলের সূত্র ধরে অনুসন্ধান শুরু করেন। জানা যায়, তার মেয়ে একটি বেসরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠানে (এয়ারটেল) চাকরি করেন। কয়েক মাস ধরে মেয়ের কর্মস্থল এবং গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে গোয়েন্দারা একটি সম্ভাব্য বাড়ির ঠিকানা চিহ্নিত করেন। বাড়িটি চিহ্নিত করার পর ডিবি কর্মকর্তারা বেশ কিছুদিন ধরে দূর থেকে লক্ষ্য রাখেন এবং ছদ্মবেশে সার্বিক পরিবেশ ও মোজাফফরের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেন। গোয়েন্দাদের কাছে মোজাফফরের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের একটি ক্লু আগে থেকেই নথিবদ্ধ ছিল। তার নাকের ঠিক নিচে একটি আঁচিল বা তিল সদৃশ কালো দাগ রয়েছে। চেহারা পরিবর্তন করলেও এই জন্ম চিহ্নটি পরিবর্তনের সুযোগ তার ছিল না। অভিযানে যাওয়ার আগে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এই চিহ্নটিকে তাদের প্রধান শনাক্তকরণ সূত্র হিসাবে নির্ধারণ করেন।

    বুধবার গভীর রাতে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। করা হয় অভিযানের চূড়ান্ত পরিকল্পনা। গোয়েন্দা দল ছদ্মবেশে বাসার দরজায় কড়া নাড়ে। ভেতর থেকে দরজা খোলার পর অত্যন্ত নাটকীয় ও সুকৌশলে এগোয় পুরো প্রক্রিয়া। দরজা খেলার পর গোয়েন্দারা সরাসরি কোনো অভিযান বা গ্রেফতারবিষয়ক কোনো ভয়ভীতি না দেখিয়ে অতিথির মতো স্বাভাবিক আচরণ করেন। মেয়ের নাম ধরে জানতে চান অমুক (তার মেয়ে, যিনি এয়ারটেলে কাজ করেন) বাসায় আছেন কিনা। এ সময় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা নিজেদের ‘এয়ারটেল অফিস’ থেকে আসা কর্মী হিসাবে পরিচয় দেন।

    তবে এত রাতে অফিসের লোক বাসায় আসায় স্বাভাবিকভাবেই ঘরের ভেতর থেকে কৌতূহল ও কিছুটা সন্দেহ তৈরি হয়। এজন্য বাসার ভেতর থেকে একজন বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি দরজা খুলে এগিয়ে এসে জানতে চান, ‘এত রাতে অফিসের কাজ কেন? আমাকে বলুন কী বিষয়। গোয়েন্দারা তখন কৌশলগতভাবে বয়োজ্যেষ্ঠ লোকটির চেহারা পর্যবেক্ষণ করেন। বাড়ির অল্প আলোতেও কর্মকর্তাদের চোখ এড়ায়নি তার নাকের নিচে থাকা সেই পরিচিত তিল বা আঁচিলটি। এ সময় কর্মকর্তারা বলেন, ‘মুরব্বি, আমরা তো আপনাকে চিনি না, আপনি কে? আমরা যার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি, তার সঙ্গে দেখা করতে দিন।’ সরল বিশ্বাসে এবং কিছুটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সেই ব্যক্তি উত্তর দেন ‘আমি মোজাফফর। মেয়ের বাবা’। মুখ থেকে একথা শোনার পর আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করেনি ডিবির চৌকশ দল। পলকের মধ্যে পকেট থেকে বের হয়ে আসে হ্যান্ডকাফ। অতঃপর মোজাফফরের দুই হাত বন্দি হয়ে যায় ডিবির শিকলে। চোখের পলকে দীর্ঘদিনের ছদ্মবেশী ও সুচতুর পলাতক আসামির হাতজোড়া অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে আইনের খাঁচায়। এরপর হতভম্ব চাহনি আর অপ্রস্তুত আত্মসমর্পণ বুঝিয়ে দেয়, ডিবির এই নিখুঁত অপারেশন কতটা নিঁখুত ও পরিপক্ব ছিল।

    গোয়েন্দা সূত্রে মোজাফফরের সাড়ে চার দশকের পলাতক জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা গেছে। গ্রেফতার এড়াতে মোজাফফর দীর্ঘদিন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ছদ্মনামে আত্মগোপন করেছিলেন। নিজেকে আড়াল করতে তিনি নিজের আসল পরিচয় সম্পূর্ণ মুছে ফেলেন। বছরের পর বছর ধরে তিনি ভুয়া নাম, পরিচয় এবং জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে চলতেন। এতদিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ফাঁকি দিলেও শেষ রক্ষা হয়নি। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ডিবি পুলিশ বনানী ডিওএইচএস এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে।

    ডিএমপি ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘তিনি একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি ছিলেন। তাই প্রয়োজনীয় আইনি আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাকে সেনাবাহিনীর নিজস্ব জুডিশিয়াল প্রসেস বা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’

    ১৯৮১ সালের ৩১ মে যখন সামরিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয় এবং সেনাবাহিনীর তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর নিহত হন, তখন মোজাফফর বুঝতে পারেন তার বাঁচার কোনো পথ নেই। তাই তিনি তার আরেক সহযোগী মেজর এসএম খালেদ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কৌশলে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রবেশ করেন। গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে তিনি দীর্ঘ সময় কাটান। ১৯৯৭-১৯৯৮ সালের দিকে তিনি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অবস্থান করেন এবং সেখান থেকেই পরবর্তী জীবনের ছক আঁকেন।

    মোজাফফর হোসেন তার নিজস্ব আসল পরিচয় পুরোপুরি মুছে ফেলেছিলেন। তিনি সম্পূর্ণ নতুন একটি ছদ্মনাম ধারণ করেন এবং নিজের চেহারা ও বেশভূষায় পরিবর্তন আনেন। দীর্ঘ ৪৫ বছরে তার পারিবারিক যোগাযোগ এবং পুরোনো চেনা পরিমণ্ডলের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলেন, যাতে কোনোভাবেই কল ট্র্যাকিং বা নজরদারির মাধ্যমে তার সন্ধান না মেলে। জীবনের শেষভাগে এসে তিনি অত্যন্ত গোপনে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। বসবাস শুরু করেন রাজধানীর সবচেয়ে সুরক্ষিত ও অভিজাত এলাকাগুলোর একটি বনানী ডিওএইচএসে। একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা হিসাবে ডিওএইচএস এলাকাটি তার চেনা পরিবেশ হলেও, সেখানে তিনি নিজেকে একজন সাধারণ, বয়োবৃদ্ধ এবং রাজনীতিবিমুখ নাগরিক হিসাবে পরিচিত করে তুলেছিলেন। আশপাশের মানুষ বা প্রতিবেশীরা কেউই কল্পনাও করতে পারেনি যে, তাদের পাশে বসবাসকারী এই বৃদ্ধই আসলে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম চাঞ্চল্যকর রাষ্ট্রপতি হত্যাকাণ্ডে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত প্রধান ঘাতক।

    পলাতক অবস্থায় তিনি কেবল ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। ভারতের ভুয়া নাগরিকত্ব বা জাল নথির সাহায্যে তিনি পাসপোর্ট তৈরি করেছিলেন। এই ভুয়া আন্তর্জাতিক নথির ওপর ভর করে তিনি বিশ্বের একাধিক দেশ সফর করেছেন এবং বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। ফলে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা (ইন্টারপোল) বা বাংলাদেশের গোয়েন্দারা তার আসল নামে খোঁজ করেও দীর্ঘদিন কোনো হদিস পাননি।