চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁওয়ে সড়কে ভাসমান ভ্যান বসানো ও চাঁদা আদায়কে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে ফজলুল আমিন নামে এক যুবদল নেতাকে মারধরের পর হত্যার অভিযোগ উঠেছে।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকাল ১১টার দিকে চান্দগাঁও থানার ওমর আলী মাতব্বর বাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
স্বজনদের অভিযোগ, ভ্যান বসানো চাঁদা নেওয়ার প্রতিবাদ করায় নিজ দলের কর্মী হিসেবে পরিচিত শাহজাহান ও তার ছেলে সিফাতের সঙ্গে ফজলুল আমিনের বিরোধ হয়। একপর্যায়ে তাকে ধাক্কা ও ঘুষি মারা হলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
নিহত ফজলুল আমিন ৬ নম্বর পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ড যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। অভিযুক্ত শাহাজাহান চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির এক সদস্যের অনুসারী এবং কৃষক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত মো. শাহজাহান (৪৫) ও তার ছেলে সিফাতকে (২০) আসামি করে চান্দগাঁও থানায় মামলা করেছেন নিহতের পরিবার।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই এলাকায় ভাসমান ভ্যান বসানো নিয়ে আগে থেকেই বিরোধ ছিল। স্থানীয়দের বৈঠকে নির্দিষ্ট স্থানে ভ্যান না বসানোর সিদ্ধান্ত হলেও শুক্রবার সেখানে আবার ভ্যান বসানো হলে ফজলুল আমিন বাধা দেন। এ নিয়ে শাহজাহানের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়। ঘটনার আগের দিন ভ্যান সরিয়ে দেওয়া হলেও পরে আবার তা বসানো হয়। ভ্যান বসানোর পেছনে প্রভাবশালী এক নেতার নির্দেশের কথা বলা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এক যুবক বলেন, ‘চলাচলের রাস্তায় ভ্যান না বসাতে বলেন। এ নিয়ে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে তাকে ঘুষি মারা হলে তিনি মাটিতে পড়ে যান। আমরা তাকে হাসপাতালে পাঠাই। মারামারি বেশি হয়নি, তবে ঘুষির আঘাতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে জানতে পারি, হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়েছে।’
৬ নম্বর পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ড যুবদলের জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘ভাসমান ভ্যান থেকে চাঁদা আদায়ের বিষয়টি নিয়ে ফজল আমিন শাহজাহানের কাছে জানতে চেয়েছিল বলে শুনেছি। গরিব মানুষ ভাসমান দোকান বসিয়ে জীবিকা চালায়, তাদের কাছ থেকে কেন চাঁদা নেওয়া হচ্ছে এমন প্রশ্নের পর তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। পরে শাহজাহান ফজল আমিনকে ধাক্কা ও ঘুষি মারে বলে আমরা জানতে পেরেছি। এরপর তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।’
নিহতের ছেলে বলেন, ‘আমার বাবা সারাজীবন এলাকার মানুষের জন্য কাজ করেছেন। আমরা চাই, তার মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং যারা জড়িত তাদের বিচার হোক। ৫ আগস্টের পর এলাকায় নতুন করে নেতৃত্বে আসা কিছু ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের বিষয়ে দলীয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।’
চান্দগাঁও থানার ওসি জসিম উদ্দিন বলেন, ‘দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মামলাটি রেকর্ড করা হয়েছে। মামলায় আরও ৫ থেকে ৭ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং বিরোধের প্রকৃত কারণ কী, তা তদন্ত করা হচ্ছে।’
এদিকে, ফজলুল আমিনের মরদেহ এলাকায় আনার পর স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। নিজ দলের কর্মীর হাতে তার মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। স্বজন ও স্থানীয়রা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন।
ঘরের ফলস ছাদে অস্ত্রসহ লুকিয়ে ছিলেন ‘সন্ত্রাসী’ মোবারক হোসেন ওরফে গলা কাটা মোবারক। দরজার বাইরে ছিল পুলিশ। ঘরে পুলিশ সদস্যরা ঢোকার চেষ্টা করতেই গুলি ছুড়তে থাকেন মোবারক। পরপর ছয়টি গুলি ছোড়েন তিনি। পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে। অভিযানের একপর্যায়ে মোবারককে প্রাণে বাঁচতে আত্মসমর্পণ করতে বলে পুলিশ। জবাবে মোবারক বলেন, ধরা দেওয়ার আগে তিনি নিজের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চান।
গত বুধবার চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর এলাকায় ‘সন্ত্রাসী’ মোবারককে ধরতে অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানের সময় মোবারকের সঙ্গে পুলিশের সদস্যদের কথোপকথনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশের এক সদস্য মোবারকের উদ্দেশে বলছেন,‘জীবন বাঁচাতে চাইলে অস্ত্র ফেলে দে। আমাদের হাতে ধরা দে। আমরা জীবন বাঁচাব। আমরা খবর পাইছি, তোরে বাইরে কেউ মারার জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা তোরে বাঁচানোর জন্য আসছি।’
তখন জবাবে মোবারক বলেন, ‘অস্ত্র দিলে সমস্যা হবে।’ এরপর পুলিশের ওই সদস্য আবার বলেন, ‘মোবারক, তোর ভালোর জন্য আসছি। তুই সারেন্ডার কর। তোর বাঁচার সুযোগ নেই। তোকে আমরা বাঁচানোর জন্য আসছি। তুই অস্ত্র ফেল, সময় নষ্ট করিস না। বের হওয়ার এখান থেকে আর কোনো সুযোগ নেই। পুলিশ বর্তমানে কাউকে মারে না।’
গ্রেপ্তারের আগে অভিযানে থাকা পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে ফলস ছাদে লুকিয়ে থাকা মোবারকের কথোপকথন চলছে ছবি: ভিডিও থেকে
এরপরও মোবারক বলেন, ‘অস্ত্র ফেলব না।’ তখন ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশের একজন বলেন, ‘অস্ত্র দিলে কেউ মারবে না তোকে। কেন মারব? আমি ওসি বলছি, অস্ত্রটা দিয়ে দে।’ মোবারক তখন পুলিশকে সরে যেতে বলেন।
জবাবে পুলিশ সদস্যরা বলেন, ‘না, যাব না। মোবারক, অস্ত্রটা দে। অস্ত্রটা ফেল। নিচে নাম, আগে নিচে নাম।’ একপর্যায়ে মোবারক বলেন, ‘আপনারা কসম করেন, আমাকে কিছু করবেন না।’
পুলিশ সদস্যরা তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেন, ‘কিছু করব না। খোদার কসম, কিছু করব না। এই মুরুব্বির (ঘরে থাকা বৃদ্ধ) কাছে অস্ত্র দে, চিন্তা থাকবে না। মুরুব্বির কাছে অস্ত্রটা দে।’ পুলিশ সদস্যদের একজন তখন বলেন, ‘আমাদের কাছে কিন্তু চায়না রাইফেল, এসএমজি—সবকিছুই আছে। মোবারক, ইমন (ডেভিড ইমন) গ্রেপ্তার হয়েছে। ইমনের চেয়ে তুই বড় সন্ত্রাসী না।’
জবাবে মোবারক বলেন, ‘স্যার, আমি একটু পরে বলব স্যার। একটা অনুরোধ…আপনারা কসম করেন, আমাকে কিছু করবেন না।’ তখন এক পুলিশ সদস্য আবারও বলেন, ‘কসম করলাম তো। খোদার কসম, কিছু করব না। কিছু করব না। অস্ত্র ফেলে দে। খোদার কসম, কিছু করব না আমরা। তোর কিচ্ছু হবে না।’
জবাবে মোবারককে বলতে শোনা যায়, ‘থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ, ভালো হইছে।’ এরপর পুলিশের ওই সদস্য ঘরে থাকা বৃদ্ধকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘মুরুব্বি, অস্ত্রটা নিয়ে আসেন। মুরুব্বি, অস্ত্র নিয়ে নেন।’
মোবারকের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম নগরে হত্যা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা রয়েছে। তিনি বিদেশে পলাতক চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মোবারকের সঙ্গে তাঁর তিন সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে ৩টি পিস্তল, ২৩ রাউন্ড পিস্তলের গুলি ও ৪টি শটগানের গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। মোবারককে গ্রেপ্তারের অভিযানে নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মোহাম্মদ তারেক আজিজ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মোবারক অভিযানের সময় পুলিশ সদস্যদের গুলি ছুড়তে থাকেন। মোবারকের ছোড়া গুলিতে তিনি নিজেসহ পাঁচজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তবে শেষ পর্যন্ত মোবারককে ফলস ছাদ থেকে নামিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়।
চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশের হামজারবাগে এক প্রবাসী ব্যবসায়ীর বাড়ি লক্ষ্য করে দুই রাউন্ড গুলির ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টা আগে বিদেশি একটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে ওই ব্যবসায়ীর ছেলের কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে পরিবারের সবাইকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। নম্বরটি ব্লক করে দেওয়ার পর রাতেই বাড়িতে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে।
সোমবার রাত ১১টার দিকে হামজারবাগ এলাকায় হাজী মোহাম্মদ ইউসুফের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। গুলি দুটি বাড়ির গেটে লাগে। তবে এতে কেউ হতাহত হননি। ঘটনার পর আতঙ্কে বাড়ির বাসিন্দারা দীর্ঘ সময় ঘরের বাইরে বের হতে পারেননি। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
বাড়ির মালিক মোহাম্মদ ইউসুফ জানান, তাঁর বড় ছেলে মোহাম্মদ শওকত দুবাইপ্রবাসী। সোমবার দুপুরে শওকতের হোয়াটসঅ্যাপে বিদেশি একটি নম্বর থেকে ভয়েস রেকর্ড পাঠানো হয়। এতে এক ব্যক্তি নিজেকে কাতারপ্রবাসী পরিচয় দিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন।
ওই ব্যক্তি বলেন, তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অনেক টাকা রয়েছে। ৫০ লাখ টাকা দিতে হবে। টাকা নেওয়ার জন্য একজনকে পাঠানো হবে। তাঁর হাতে টাকা তুলে দিতে হবে। টাকা না দিলে পরিবারের সবাইকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়।
বিষয়টি বাবাকে জানান শওকত। ইউসুফ তাঁকে কোনো উত্তর না দিয়ে নম্বরটি ব্লক করে দিতে বলেন। এরপরই হোয়াটসঅ্যাপ থেকে ভয়েস রেকর্ডটি মুছে ফেলা হয়। এর কয়েক ঘণ্টা পর রাত ১১টার দিকে তাঁদের বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি করা হয়।
ইউসুফ বলেন, ‘গুলি করার সময় বিকট শব্দ হয়। সবাই ভয় পেয়ে ঘরে বসে ছিলাম। পরে নিচে নেমে দেখি বাড়ির গেটে গুলির চিহ্ন। দুটি গুলি গেটে লেগেছে।’
তিনি জানান, গুলি করার সময় বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীকে অস্ত্রের ভয় দেখানো হয়। এ কারণে তিনি দ্রুত গেট বন্ধ করে ভেতরে চলে যান। ফলে হামলাকারীদের কাউকে শনাক্ত করতে পারেননি।
মোহাম্মদ ইউসুফের বাড়ি ফটিকছড়ি উপজেলায়। প্রায় ২৫ বছর ধরে তাঁরা হামজারবাগের নিজস্ব বাড়িতে বসবাস করছেন। ইউসুফ নিজেও দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলেন। তাঁর ছেলে শওকত কয়েক মাস আগে দুবাই থেকে দেশে ফিরেছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, বাড়িটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আজিজুর রহমান আজিজের শ্বশুরবাড়ি। আজিজ চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুদিন পর তিনি গ্রেপ্তার হন। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের সুযোগ নিয়ে কে বা কারা বাড়িটি লক্ষ্য করে দুই রাউন্ড গুলি করেছে। আতঙ্ক সৃষ্টির জন্যই গুলি করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি।’
ওসি বলেন, ‘চাঁদা দাবির ভয়েস রেকর্ডের বিষয়টিও আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। গুলির ঘটনা, চাঁদা দাবি এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত—সবকিছু তদন্ত করা হচ্ছে।’
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে পুলিশের একাধিক দল। তবে এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছেন বাড়ির মালিক। মঙ্গলবার দুপুরে বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ব্যবসায়ী কিংবা প্রবাসীদের মুঠোফোনে হুমকি দেওয়া হতো লাখ থেকে কোটি টাকা চাঁদার জন্য। এরপর বাহকের মাধ্যমে নগদে সংগ্রহ করা হতো চাঁদাবাজির সেই টাকা। চাঁদার টাকা সংগ্রহের জন্য ছিল এলাকাভেদে পৃথক ব্যক্তি। তাঁরা মূলত ইউসুফ নামের এক ব্যক্তিকে চাঁদাবাজির সেই টাকা জমা দিতেন। তিনি এসব টাকা হুন্ডি এবং কয়েকটি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিতেন চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের কাছে।
পুলিশ ও চাঁদাবাজির শিকার ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। গত বুধবার সকালে যশোর থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পথে ইমনকে তিন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ইমন পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে। বৃহস্পতিবার ইমনকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
২০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে গত সোমবার সকালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বড় দিঘিরপাড় এলাকার ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিনের নির্মাণাধীন ভবনে হামলা ও ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ ওঠে ইমনের অনুসারীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় মামলা করার পর ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। এর আগে ১৩ জুলাই ২ কোটি টাকা চাঁদার জন্য নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোডে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ডিডিএনে হামলা ও ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ ওঠে ইমনের অনুসারীদের বিরুদ্ধে। এই দুটি ঘটনার পর মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করে চাঁদাবাজি বন্ধ এবং ইমনকে গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়। যদিও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে চাঁদাবাজিসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন ইমন।
চাঁদা দাবির আগে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ
পুলিশ জানায়, চাঁদা চাওয়ার আগে কোনো ব্যক্তির আয়ের উৎস, বর্তমান সম্পদ, নির্মাণাধীন ভবনের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন ইমনের লোকজন। পরিবারের সদস্যদের জীবনবৃত্তান্তও সংগ্রহ করা হয়। তথ্য সংগ্রহের জন্য এলাকাভিত্তিক সোর্স রয়েছে ইমনের।
তথ্য সংগ্রহের পর চাঁদার জন্য বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে ফোন করা হয় নির্ধারিত ব্যক্তিকে। কয়েক লাখ টাকা থেকে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হয়। ওই ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের কে কোথায় থাকেন, কী করেন, সব জানানো হয়। দাবি অনুযায়ী চাঁদা না দিলে গুলি করার হুমকি দেন ডেভিড ইমন। নির্ধারিত সময়ে টাকা না পেলে হামলার ঘটনাও ঘটে।
তথ্য সংগ্রহের পর চাঁদার জন্য বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে ফোন করা হয় নির্ধারিত ব্যক্তিকে। কয়েক লাখ টাকা থেকে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হয়। ওই ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের কে কোথায় থাকেন, কী করেন, সব জানানো হয়। দাবি অনুযায়ী চাঁদা না দিলে গুলি করার হুমকি দেন ডেভিড ইমন।
ইমনকে চলতি মাসের শুরুতে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দেওয়া এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। তিনি নগরের দক্ষিণ পাহাড়তলীর বড় দিঘিরপাড় এলাকার বাসিন্দা। ইমন গ্রেপ্তার হলেও এখনো ভয়ে রয়েছেন সেই ব্যবসায়ী।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ওই ব্যবসায়ী প্রথম আলোকে বলেন, জুন মাসের শেষের দিকে বিদেশি একটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের সহযোগী পরিচয় দিয়ে ডেভিড ইমন তাঁকে ফোন করেন। তাঁর নির্মাণাধীন একটি বহুতল ভবন ও বিভিন্ন ব্যবসার কথা বলে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন ইমন। ওই সময় ওই ব্যবসায়ীর ছেলেমেয়েরা কে কোথায় পড়াশোনা করেন, তারও বিস্তারিত বর্ণনা দেন। চাহিদামতো টাকা না দিলে ব্যবসায়ীর কলেজপড়ুয়া বড় ছেলেকে শেষ করে দেওয়ার হুমকি দেন।
অস্ত্র হাতে ইমনছবি: সংগৃহীত
ওই ব্যবসায়ী জানান, নিরুপায় হয়ে বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। এর মধ্যে রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ছিলেন। কয়েকজনের মাধ্যমে ইমনকে ফোন করা হয়। কিন্তু কারও কথা শুনতে নারাজ ছিলেন ইমন। ইতিমধ্যে নির্মাণাধীন ভবনে হামলা চালানো হয়। মারধর করা হয় নিরাপত্তা প্রহরীকে।
ওই ব্যবসায়ী বলেন, ‘এরপর আমাকে আবার ফোন করা হয়। চাঁদা দেওয়ার মতো এত টাকা নেই জানিয়ে আমি তাঁকে অনুনয়-বিনয় করে চাঁদা কমানোর অনুরোধ করি। শেষে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা নির্ধারিত হয়। ইমন তখন বলেন, আমার লোকজন নগদে টাকা নেবে। যেখান থেকে বলা হবে, সেখান থেকে নিতে পারবে।’
‘তাদের একটি দল তথ্য সংগ্রহ করে, আরেকটি দল নগদ টাকা গ্রহণ করে, আরেকটি হামলা-ভাঙচুর কিংবা গুলিবর্ষণের মতো ঘটনায় জড়ায়। প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা আলাদা দল রয়েছে।’
কাজী মোহাম্মদ তারেক আজিজ, অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার, চট্টগ্রাম
পরে বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে ফোন করে ইমনের লোক পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি নগরের অক্সিজেন এলাকায় টাকা নিয়ে যেতে বলেন বলে জানান ওই ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ‘আমি যেতে রাজি না হওয়ায় একটি অটোরিকশায় করে দুই যুবক বড় দিঘিরপাড়ে আমার বাসার সামনে আসে। নগদ পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে তারা আবার একই গাড়িতে করে চলে যায়।’
এই ব্যবসায়ীর মতো আরও অন্তত পাঁচজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। তাঁরা সবাই নগদে বাহকের কাছে চাঁদার টাকা পরিশোধ করেছেন। তবে নাম প্রকাশ করে এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে তাঁরা রাজি হননি। কারণ জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, ইমন জামিনে বেরিয়ে এলে তাঁদের ক্ষতি করতে পারেন। তা ছাড়া ইমনের অনেক সহযোগী এখনো বাইরে রয়েছেন।
ইউসুফকে খুঁজছে পুলিশ
পুলিশ জানায়, চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় ইমনের লোকজন চাঁদার নগদ টাকা সংগ্রহ করে নিয়ে যেতেন নগরের জিইসি মোড় এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে। সেখানে ইউসুফ নামের এক ব্যক্তিকে জমা দিতেন। পরে তিনি এসব টাকা ইমনের নির্দেশমতো হুন্ডি কিংবা ব্যাংক হিসাবে পাঠাতেন।
ইমনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য মিলেছে জানিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, ইউসুফকে ধরার চেষ্টায় রয়েছে পুলিশ। তাঁকে পেলে চাঁদাবাজির টাকা কোথায় যায়, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসবে।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী মোহাম্মদ তারেক আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইমন জানিয়েছেন, ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে কৌশল হিসেবে নগদে চাঁদার টাকা নিতেন। এসব টাকা যাঁরা সংগ্রহ করতেন, তাঁরা সাধারণত ওই এলাকার নন। অন্য কোনো এলাকা থেকে এসে চাঁদার টাকা সংগ্রহ করা হতো।
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, তাদের একটি দল তথ্য সংগ্রহ করে, আরেকটি দল নগদ টাকা গ্রহণ করে, আরেকটি হামলা-ভাঙচুর কিংবা গুলিবর্ষণের মতো ঘটনায় জড়ায়। প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা দল রয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, রিমান্ডে আনার পর ইমনের কাছ থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। ইতিমধ্যে পুলিশ তাঁর কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধার করেছে। চাঁদাবাজি কিংবা হামলার শিকার ভুক্তভোগী লোকজন পুলিশকে এ বিষয়ে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে পারেন।
ক্রিকেট ছেড়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে
ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। তাঁর বাবা মো. মুসা ওমানপ্রবাসী ছিলেন। কয়েক বছর আগে মারা গেছেন।
স্থানীয় লোকজন জানান, স্কুলে পড়ার সময় থেকেই ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় ইমনের। কাঞ্চননগর থেকে সাইকেলে করে ফটিকছড়ি কলেজ মাঠে এসে অনুশীলন করতেন। পরে নগরের অক্সিজেন মোড়ে খালার বাসায় থেকে নিয়মিত ক্রিকেট প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। খেলতেন চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমিতে। অনুশীলন করতেন কাজীর দেউড়ি স্টেডিয়ামে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের মাধ্যমে তাঁর দলে যুক্ত হন। সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ গত বছরের ১৫ মার্চ ঢাকা থেকে গ্রেপ্তারের পর সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী হয়ে ওঠেন ইমন।
২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন, একই বছরের ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যাসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী ঘটনায় আলোচিত হন মোবারক হোসেন ইমন। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে অন্তত ১৫টি।
পুলিশের ভাষ্য, ইমন ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র বহন করেছেন—এমন তথ্য রয়েছে। অস্ত্র ব্যবহারে তিনি দক্ষ। বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় সন্ত্রাসী ও মোটরসাইকেল ভাড়া করার দায়িত্বও তাঁর ছিল। পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া দুজনের একজন ইমন। অন্যজন মোহাম্মদ রায়হান। এর আগে দেশে সন্ত্রাসী দলটির নেতৃত্ব দিতেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। তিনি কারাগারে যাওয়ার পর ইমন ও রায়হান দলটির নেতৃত্বে আসেন।
পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছেন। মোহাম্মদ রায়হান ও ইমন বড় সাজ্জাদের হয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করে আসছেন।
গ্রেপ্তার হওয়ার কয়েক দিন আগে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল ইমনের কাছে। এ সময় তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি টাকা নিই এটা ঠিক, তবে সব বড়লোকদের কাছ থেকে।’ সন্ত্রাসের পথ কেন বেছে নিয়েছেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার ছোটবেলা থেকে ইচ্ছা ছিল বড় ক্রিকেটার হব, নয়তো বড়লোক হব। বড়লোক হওয়ার জন্য এই পথে আছি।’
স্ত্রী আর তিন ছেলের সবাই থাকেন মধ্যপ্রাচ্যের সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরে। আবদুর রহমান (৬৫) একাই থাকতেন চট্টগ্রামের চন্দনাইশের গ্রামের বাড়িতে। গতকাল সোমবার ছেলেরা ফোন করে তাঁর সংযোগ পাচ্ছিলেন না। ওই দিন বিকেলে তাঁর ছোট ছেলের স্ত্রী বাবার বাড়ি থেকে খোঁজ নিতে এসে দেখেন, ঘরের দরজা বন্ধ। এলাকার লোকজনের সহায়তায় দরজা খোলার পর দেখা যায়, আবদুর রহমানের পচা-গলা লাশ পড়ে আছে খাটে।
চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের নগরপাড়া গ্রামের মিয়া সওদাগরের ছেলে আবদুর রহমান নিজেও দুবাইয়ে থাকতেন। দেড় বছর আগে দেশে আসেন তিনি। এরপর আর ফিরে যাননি। বাড়িতে একা থাকতেন, নিজের রান্না নিজে করতেন। গত শুক্রবার শেষবার তাঁকে গ্রামের একটি চা–দোকানে দেখা গিয়েছিল। এরপর গতকাল তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় গাউছিয়া কমিটির মানবিক টিমের সহায়তায় তাঁর লাশ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ।
পুলিশ জানায়, তিন-চার দিন আগে আবদুর রহমানের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাঁর মরদেহে পচন ধরেছিল। নানা স্থানে পোকা ধরে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। চেহারাও বিকৃত হয়ে গেছে বলে পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা জানান। পুলিশ জানায়, আবদুর রহমানের স্ত্রী, তিন ছেলে ও বড় ছেলের স্ত্রী দুবাইয়ে থাকেন। তাঁর স্ত্রী দুর্ঘটনায় আহত হওয়ায় তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
চন্দনাইশ উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান সোলাইমান ফারুকী বলেন, আবদুর রহমান এলাকায় অনেকটা একা চলাফেরা করতেন। সবার সঙ্গে তেমন যোগাযোগ ছিল না।
চন্দনাইশ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) রিটন মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, খবর পেয়ে গতকাল সন্ধ্যা ৬টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন, লাশের চোখে–মুখে পোকা ধরেছে। দুই হাতের চামড়া খুলে পড়েছে। দুর্গন্ধে টেকা যাচ্ছে না। তাঁর মৃত্যু বেশ কয়েক দিন আগে হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে রিটন মিয়া বলেন, তিনি গত শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে বাড়ির পাশে চায়ের দোকান থেকে চা খেয়ে গেছেন। এরপর তাঁকে আর বাইরে দেখা যায়নি।
প্রতিবেশীরা জানান, গত জানুয়ারি মাসে চন্দনাইশের বাড়িতে আবদুর রহমানের মেজ ছেলের বিয়ে হয়। বিয়ের পর পরিবারের সবাই দুবাইয়ে ফিরে গেলেও আবদুর রহমান যাননি। মেজ ছেলের স্ত্রী দোহাজারীতে নিজের বাবার বাড়িতে থাকেন। সেখান থেকে মাঝেমধ্যে এসে শ্বশুরকে দেখে যান তিনি। গত সোমবার তিনি খোঁজ নিতে এসে আবদুর রহমানকে মৃত অবস্থায় পান।
পরিদর্শক রিটন মিয়া বলেন, ছোট ছেলের স্ত্রী পুলিশকে জানায়, দুবাই থেকে ছেলেরা বাবাকে বারবার ফোন করে খবর পাচ্ছিলেন না। তাই সোমবার খোঁজ নিতে এসে মেজ ছেলের স্ত্রী শ্বশুরের লাশ দেখতে পান। তিনি স্ট্রোক করেছেন কিনা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে জানা যাবে।
চট্টগ্রামে ২০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন নামের এক ব্যবসায়ীর নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবনে ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণ করেছে সন্ত্রাসীরা। আজ রোববার সকাল আটটার দিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বড় দিঘিরপাড়–ভাটিয়ারী লিংক রোড–সংলগ্ন আবাসিক এলাকায় এ ঘটনা ঘটেছে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আজ সকালে মুখে মাস্ক পরা ৮ থেকে ১০ সশস্ত্র ব্যক্তি ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিনের বাড়ির সামনে টেম্পোতে এসে নামে। তখন ১০ তলা নির্মাণাধীন ভবনটিতে শ্রমিকেরা কাজ করছিলেন। সশস্ত্র ব্যক্তিরা ভবনে ঢুকে শ্রমিকদের মারধর করতে থাকে। এরপর ভবনের দরজা–জানালা ভাঙচুর করে। একপর্যায়ে হাসান সাকি নামের এক নির্মাণশ্রমিককে কিরিচ দিয়ে কুপিয়ে আহত করে তারা। এ সময় মারধর করা হয় ভবনের নিরাপত্তাকর্মীসহ কয়েকজন শ্রমিককেও। পরে যাওয়ার সময় সন্ত্রাসীরা তিনটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়।
ব্যবসায়ীর নির্মাণাধীন ভবনে সন্ত্রাসীদের হামলার পর স্থানীয় লোকজনের ভিড়ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী মো. তারেক আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে বাড়িটিতে হামলার ঘটনা তাঁরা দেখেছেন। আসামিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
ঘটনার শিকার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের চাল ও চিনির পাইকারি ব্যবসা রয়েছে। হাটহাজারী থানার বড় দিঘিরপাড় এলাকায় তাঁর পাইকারি দোকান রয়েছে। সম্প্রতি তিনি ১০ তলা বহুতল ভবনে নির্মাণকাজ শুরু করেন। জানতে চাইলে জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এক মাস ধরে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে আমার কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করছে সন্ত্রাসীরা। শহরে একটি ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনার পর সবাই প্রতিবাদ করলে তারা একটু নীরব ছিল। এক সপ্তাহ ধরে আবার ফোন করছে চাঁদার জন্য। বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে জানানো হয়েছিল। রোববারের ঘটনায় থানায় মামলা করব।’ কারা তাঁকে হুমকি দিয়েছে জানতে চাইলে, তিনি নাম জানেন না বলে জানিয়েছেন।
স্থানীয় লোকজন জানান, শুধু জসিমের নির্মাণাধীন ভবন নয়, বড় দিঘিরপাড় এলাকায় নির্মাণাধীন ৮ থেকে ১০টি ভবনে ফোন করে চাঁদা নিয়েছে সন্ত্রাসীরা। স্বাধীনতার পর তাঁদের এলাকায় এভাবে চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেনি।
সন্ত্রাসীদের মারধরের শিকার হন নির্মাণাধীন ভবনের দুই শ্রমিক ছবি: সংগৃহীত
উল্লেখ্য, ১৩ জুলাই নগরের চকবাজার অ্যাকসেস রোডে ডিডিএন নামের একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। পরে র্যাব পুলিশ অভিযান চালিয়ে ২০ জনকে গ্রেপ্তার করে। ঘটনার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সশস্ত্র দল হঠাৎ ডিডিএনের কার্যালয়ে ঢুকে পড়ে। দেশি অস্ত্রধারী ব্যক্তিরা অফিসের কম্পিউটার, কর্মকর্তা–কর্মচারীদের মুঠোফোন ও বিভিন্ন আসবাব ভাঙচুর করে। একজনকে কুড়াল দিয়ে কম্পিউটার ও অন্যান্য সরঞ্জামে আঘাত করতে দেখা যায়। এ সময় তারা কর্মকর্তা–কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখায়। সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ইমন এই চাঁদা দাবি করেছেন বলে মামলায় বলা হয়। তবে ঘটনার পর ফেসবুকে একটি অডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে মুঠোফোনের এক প্রান্ত থেকে ইমন পরিচয় দিয়ে একজনকে বলতে শোনা যায়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তাঁরা ছুরি ও কিরিচ নিয়ে হামলা করেন না। তাঁদের হামলার ধরন কেমন, তা পুরো চট্টগ্রামবাসী জানে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে নাঈম (১৫) নামে এক কিশোরকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগে নুরুল ইসলাম ইরান (৫০) নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করেছে উত্তেজিত জনতা। ইরানকে চিহ্নিত মাদক কারবারি বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা। এ সময় তার বাড়িঘর ও মাদক সেবনের আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত বেশ কয়েকটি ঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
শনিবার রাতে উপজেলার মুরাদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ ভাটেরখীল গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত ইরান ওই এলাকার নুরুল হকের ছেলে। পুলিশ বলছে, তার বিরুদ্ধে হত্যা ও মাদক আইনে চারটি মামলা রয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২০ জুলাই রাতে ইরানের কিছু ইয়াবা হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় নাঈম ও ইমরান (২০) নামে দুইজনকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় ইরান ও তার সহযোগীরা।
অভিযোগ রয়েছে, সেখানে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। নাঈমকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে গুরুতর আহত অবস্থায় বাড়ির সামনে ফেলে রাখা হয়। আর ইমরানকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে তার পরিবারের কাছে টাকা দাবি করা হয়। পরে ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার পর তাকে ছাড়িয়ে নেওয়া হয় বলে পরিবারের দাবি।
গুরুতর আহত নাঈমকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার বিকেলে তাঁর মৃত্যু হয়।
নাঈমের জানাজা শনিবার বিকেল ৫টার দিকে অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, জানাজার পর মাইকে নাঈমের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ জানানো হয়। এ সময় ইরান কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়েন বলে অভিযোগ ওঠে। এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে চার গ্রামের কয়েকশ মানুষ ইরানকে খুঁজতে বের হন।
স্থানীয়দের দাবি, রাতে তাকে পাশের একটি বাড়ির গোয়ালঘর থেকে ধরে আনা হয়। রাত ১১টার দিকে উত্তেজিত জনতা তাকে গণপিটুনি দেয়। একপর্যায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।
পুলিশ জানায়, ইরানকে হত্যার পর তার বাড়িঘর ও মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ থাকা কয়েকটি স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। রোববার দুপুরেও মুরাদপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল থেকে আলতাপ (৪৫) ও বাদশা (৫০) নামে দু’জনকে আটক করেছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, তারা ইরানের সহযোগী। আলতাপকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। আহত বাদশাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
নিহত নাঈমের চাচা মো. ফারুক বলেন, ‘নাঈম দরিদ্র পরিবারের ছেলে। সে ভালো ছেলে ছিল। ইরানের ইয়াবা হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় তাকে ও ইমরানকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। নাঈমের নখ ও শরীরের চামড়া তুলে নেওয়া হয়।’
ইমরানের মা হাসিনা বেগম বলেন, ‘ইরানের লোকজন আমার ছেলেকে ধরে নিয়ে যায়। অনেক অনুরোধ করেও তাকে ছাড়াতে পারিনি। পরে ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার পর তাকে ছাড়িয়ে আনি।’
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ইমরান বলেন, ‘আমাকে বাড়ি থেকে জিম্মি করে নিয়ে যাওয়া হয়। আমার সামনে নাঈমকে কুপিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। পরে আমার পরিবারের কাছে টাকা দাবি করা হয়। ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার পর আমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।’
নিহত ইরানের ছেলে রিফাত বলেন, তাঁদের ২২টি বসতঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘরের মালামাল লুটের পাশাপাশি একটি সিএনজি, দুটি পাওয়ারটিলার, একটি ভ্যান ও তিনটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ, স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা এ হামলা ও অগ্নিসংযোগে জড়িত।
তবে মুরাদপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. এজাহারুল ইসলাম এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ইরান দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে তাঁর সঙ্গে বিএনপির কোনো নেতা-কর্মীর সম্পৃক্ততা ছিল না।
সীতাকুণ্ড থানার ওসি মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, নাঈম হত্যার ঘটনায় শনিবার থানায় মামলা হয়েছে। পরে নাঈমের জানাজা শেষে উত্তেজিত এলাকাবাসী ইরানকে হত্যা করে। তাঁর বাড়িঘর ও মাদক কারবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ থাকা কয়েকটি স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, ইরান দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা ও মাদক আইনে চারটি মামলা রয়েছে। গত ৮ এপ্রিল সীতাকুণ্ড পৌরসভা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ শামীমকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে হত্যার ঘটনাতেও ইরানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেন।
বন্যায় চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার নয় ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকার ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তলিয়ে গেছে আমনের বীজতলা, আউশ ধান, সবজি ক্ষেত ও পানের বরজ। অতিবৃষ্টিতে আমনের বীজতলা, পানের বরজ ও সবজি ক্ষেতের ক্ষয়ক্ষতি আরো বেশি হয়েছে। হাজার হাজার কৃষকের স্বপ্নের ফসলি জমি ভাসিয়ে দিয়েছে। তাদেরই একজন পদুয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম পদুয়ার মালি পাড়ার কৃষক জসিম।তিন ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করে কোনো রকমে সংসার চালাতেন। পরিবারের দুঃখ ঘোচানোর আশায় বিভিন্ন সমবায় সমিতি, এনজিও ও বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে প্রায় ৮০০ শতক জমিতে লাউ, চিচিঙ্গা, তিতকরলা, বরবটি, পেঁপে, ঢেঁড়স, কলা, চালকুমড়া, আউশ ও আমন ধানের চাষ করেন তিনি।
সম্প্রতি টানা প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় তার চাষ করা ফসলি জমির পুরো অংশ পানিতে তলিয়ে যায়। এতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় বন্যা-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংক ও সংস্থার ঋণের কিস্তি পরিশোধ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি উপজেলার ৯ হাজার ৪০০ কৃষকের ১৫০ হেক্টর শস্যক্ষেত, পাঁচ হেক্টর পানের বরজ এবং ৩৬০ হেক্টর আউশ ও আমনের বীজতলা বন্যার পানিতে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ১৪ লাখ ১০ হাজার ৫০০ টাকা।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক জসিম বলেন, পরিবারের সুখের আশায় প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে এক লাখ, পদক্ষেপ থেকে দুই লাখ, মুসলিম এইড থেকে তিন লাখ এবং ইসলামী ব্যাংক থেকে তিন লাখ টাকা ঋণ নিয়ে বিভিন্ন প্রজাতির সবজি চাষ এবং আউশ ও আমনের বীজতলা করেছিলাম। কিন্তু বন্যার পানি ঢুকে ক্ষেতের সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে। একদিকে সংসারের খরচ, অন্যদিকে ঋণ পরিশোধ—এই দুই সমস্যা কীভাবে সামলাব, তা ভেবে হতাশ হয়ে পড়ছি। এ মুহূর্তে সরকার আমাদের পাশে এসে না দাঁড়ালে মরণ ছাড়া কোনো পথ আছে বলে মনে হচ্ছে না।
স্থানীয় কৃষক চাষী মিয়া বলেন, উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কৃষিপণ্য উৎপাদন করেন জসিম। তার কৃষি কার্ড থাকলেও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাকে কোনো ধরনের ঋণ দেয় না। বন্যার পানিতে তার সবজি ক্ষেতের সবকিছু ধ্বংস হয়ে তিনি সর্বস্বান্ত হয়েছেন। তাই সরকারের উচিত এই বিপদের সময়ে তার পাশে এসে দাঁড়ানো।
স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আজিম বলেন, এবারের বন্যায় জসিমের সবজি ক্ষেতের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে তার অনেক সময় লাগবে। একদিকে তিনি ঋণগ্রস্ত, অন্যদিকে বন্যায় সর্বস্বান্ত হয়েছেন। বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংক ও সংস্থায় তাকে প্রতি মাস ও সপ্তাহে কিস্তি দিতে হয়। বন্যার পর সেই কিস্তির টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় তাকে প্রতিনিয়ত লাঞ্ছনার মুখে পড়তে হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাজী শফিউল ইসলাম বলেন, টানা বৃষ্টিতে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বর্তমানে মাঠপর্যায়ে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নিরূপণের কাজ চলছে। সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা এলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নির্বাচন করে তা বিতরণ করা হবে। একই সঙ্গে পরিবেশ স্বাভাবিক হলে কৃষকেরা যাতে দ্রুত পুনরায় আবাদ শুরু করতে পারেন, সে জন্য তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, চট্টগ্রামে বন্যায় প্রায় সাত লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে এক লাখ মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের কাজও শুরু হয়েছে।
আজ শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকায় বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণকালে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে চাল, রান্না করা খাবার ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু হয়েছে; পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
বন্যার কারণে অনেক সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এগুলো দ্রুত মেরামতের জন্য এরই মধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং কিছু সড়কে কাজও শুরু হয়েছে।
ত্রাণ বিতরণ শেষে অর্থমন্ত্রী পতেঙ্গা থেকে চন্দনাইশের উদ্দেশে রওনা দেন। পরে তিনি সাতকানিয়া, লোহাগড়া ও বাঁশখালীসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করবেন।
চট্টগ্রাম বিভাগে গত পাঁচ দিনের অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড় ধসের দুর্যোগে এ পর্যন্ত ৩০ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয় বলছে, দুর্গত এলাকার মানুষের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নগদ অর্থ, চাল ও শিশু খাদ্য বাবদ জরুরি ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম বিভাগের ক্ষয়ক্ষতি ও জেলা প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপের সর্বশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
সেখানে দেখা যায়, দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে পর্যটন জেলা কক্সবাজারে, সেখানে ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এছাড়া চট্টগ্রাম ও বান্দরবান জেলায় ৫ জন করে এবং রাঙ্গামাটি জেলায় ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। খাগড়াছড়ি জেলায় এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
বন্যা ও পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের জন্য পাঁচ জেলায় মোট ১ হাজার ৪২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে।
এর মধ্যে চট্টগ্রামে ৪১১টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৮ হাজার ৩৪০ জন, রাঙ্গামাটিতে ২১টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ হাজার ২০৬ জন, খাগড়াছড়িতে ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং বান্দরবানে ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২ হাজার ১৭৩ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
তবে কক্সবাজার জেলায় ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত থাকলেও সেখানে বর্তমানে কোনো আশ্রিত লোক নেই। দুর্গতদের সহায়তায় গত ৭ ও ৯ জুলাই দুই দফায় বিশেষ বরাদ্দ দেওয়ার তথ্য দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
এর মধ্যে গত ৭ জুলাই প্রতিটি জেলায় (চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) ১০ লাখ টাকা করে মোট ৫০ লাখ টাকা নগদ এবং ২০০ মেট্রিক টন করে মোট ১ হাজার মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ৯ জুলাই শিশুদের জন্য বিশেষ সহায়তা হিসেবে চট্টগ্রামে ২৫ লাখ টাকা, কক্সবাজারে ২০ লাখ টাকা এবং রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে ১০ লাখ টাকা করে মোট ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
একই দিনে চট্টগ্রামে ৩০০ মেট্রিক টন, কক্সবাজারে ২৫০ মেট্রিক টন এবং বাকি তিন জেলায় ২০০ মেট্রিক টন করে মোট ১ হাজার ১৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়।
গত কয়েকদিন ধরে টানা বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের এই পাঁচ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসের ঘটনায় প্রাণহানির পাশাপাশি বহু পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনগুলোর পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া পাহাড়ের পাদদেশে ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরত লোকজনকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য নিয়মিত মাইকিং ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
পাশপাশি, বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া দুর্গত মানুষদের জন্য সুপেয় পানি, উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং শিশু খাদ্যসহ তিন বেলা খাবারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।