ট্যাগ গুম

  • সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের সমালোচনা করলেও বর্তমানে কেউ গুম হচ্ছেন না: রিজভী

    সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের সমালোচনা করলেও বর্তমানে কেউ গুম হচ্ছেন না: রিজভী

    বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বর্তমানে বিরোধী দলের অনেকেই সরকারের বা শীর্ষ নেতৃত্বের সমালোচনা করছেন। কিন্তু কাউকে গুম হতে হচ্ছে না। মূলত এটাই বাকস্বাধীনতা ও প্রকৃত গণতন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ।

    বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ১৯তম কারামুক্তি দিবস উপলক্ষ্যে উত্তরাঞ্চল ছাত্র ফোরাম এ আলোচনা সভার আয়োজন করে।

    রিজভী বলেন, তারেক রহমান তখন রাজনীতিতে নবীন। তাকে বন্দি করার মূল উদ্দেশ্য ছিল জাতীয়তাবাদী রাজনীতি যেন আর কোমর সোজা করে দাঁড়াতে না পারে। এটি কোনো ছোটখাটো বা কেবল দেশীয় ষড়যন্ত্র ছিল না; বরং এটি ছিল দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের যৌথ বহিঃপ্রকাশ।

    তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের কৃতিত্ব, সততা, নিষ্ঠা, উৎপাদন, উন্নয়ন, পররাষ্ট্রনীতি, অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা এবং একটি জাতিকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার ঐতিহাসিক অর্জনের সফলতার পতাকাই বহন করছেন তারেক রহমান।

    অতীতের স্মৃতিচারণ করে রিজভী বলেন, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের দুর্ভিক্ষ, লুটপাট, সহিংসতা, বিরোধী দল দমন, রক্তপাত, পত্রিকা ও রাজনৈতিক দল বন্ধ করে মানুষকে এক রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে জিয়াউর রহমান গণতন্ত্রের অবারিত দ্বার উন্মুক্ত করেছিলেন। সেখানে মানুষ নির্ভয়ে কথা বলার ও মুক্তকণ্ঠে আওয়াজ তোলার স্বাধীনতা পেয়েছিল। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান সেই গণতন্ত্রের অর্জনেরই নিশ্চয়তা।

    তিনি বলেন, আল্লাহ যার সহায় এবং জনগণ যার পাশে থাকে, কোনো চক্রান্তই তাদের পরাস্ত করতে পারে না। সেদিন তারেক রহমানের ওপর শুধু মানসিক বা কারাবন্দিত্বের অত্যাচারই চালানো হয়নি, তাকে শারীরিকভাবেও নির্মম নির্যাতন করা হয়েছে। সেই শারীরিক আঘাতের ক্ষত তিনি আজও বহন করে চলেছেন।

    তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা করে রিজভী বলেন, ২০১৮ সাল থেকে তিনি গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ ও উদ্বুদ্ধ করেছেন। শেখ হাসিনার ভয়ংকর দুঃশাসনের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্রের দরজা খোলার আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। তৃণমূলের ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে গুম, হত্যা ও নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন। ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ সংগঠনের মাধ্যমে কিংবা অঙ্গসংগঠনের মাধ্যমে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছে নিয়মিত সহানুভূতি ও সহায়তা পৌঁছে দিয়েছেন।

    তিনি আরও বলেন, তারেক রহমানকে নিয়ে অনেক অপপ্রচার চালানো হয়েছে এবং এখনো চলছে। কিন্তু জনগণ দেখছে, তিনি আজ প্রধানমন্ত্রী হয়ে দিন-রাত শুধু ঘরে বসে বা ঘুমিয়ে থাকেননি। দেশের মানুষের কাছে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে পূরণ করে যাচ্ছেন।

    রুহুল কবির রিজভী বলেন, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে রুখে দিতে দেশীয় নানা চক্রান্ত সক্রিয় ছিল। কিন্তু জনগণ এবং মহান আল্লাহ সঙ্গে থাকলে কেউ যে ক্ষতি করতে পারে না, তা আজ প্রমাণিত হয়েছে।

    তিনি বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ২০১৮ সাল থেকে তারেক রহমান দেশের গ্রাম থেকে শুরু করে শহর পর্যন্ত প্রতিটি অঞ্চলে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের হাতে অত্যাচারিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন এবং দেশ রক্ষার কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেছেন।

    হাসিনা মেগা প্রকল্পের নামে কিছু দৃশ্যমান কাজ দেখালেও বাকি অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন, যা তার দলীয় নেতাকর্মীদের পকেটে গেছে বলে অভিযোগ করেন রিজভী। অন্যদিকে, তারেক রহমান জনগণের টাকা জনগণের কাছেই ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ করছেন বলে দাবি করেন তিনি। এর প্রমাণ হিসেবে কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’, পরিবারগুলোর জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং দেশব্যাপী ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মতো বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন।

    রিজভী বলেন, বর্তমানে বিরোধী দলের অনেকেই সরকারের বা শীর্ষ নেতৃত্বের সমালোচনা করছেন। কিন্তু কাউকে গুম হতে হচ্ছে না। মূলত এটাই বাকস্বাধীনতা ও প্রকৃত গণতন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ।

    তিনি বলেন, তারেক রহমান আগামী পাঁচ বছরের জন্য যে উন্নয়ন ও পরিবর্তনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন, তা ছাত্রসমাজসহ দেশের সর্বস্তরের জনগণের কাছে ছড়িয়ে দিতে হবে।

    রিজভী আরও বলেন, তারেক রহমানের শ্রদ্ধেয় বাবা ও মা যে দেশ গড়ার দূরদর্শী অঙ্গীকার নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন, তারেক রহমান আজ সেই আদর্শিক পথই অনুসরণ করে এগিয়ে চলেছেন।

    প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী এবং উত্তরাঞ্চল ছাত্র ফোরামের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মীর হেলাল। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চল ছাত্র ফোরামের নেতাকর্মীসহ বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা।

  • গুমের আগে কোথায় কীভাবে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, রোমহর্ষক বর্ণনা প্রকাশ্যে

    গুমের আগে কোথায় কীভাবে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, রোমহর্ষক বর্ণনা প্রকাশ্যে

    বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জোরপূর্বক গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অন্যতম। সরকারবিরোধী আন্দোলনে দলের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২০১৫ সালের ১০ মার্চ তৎকালীন বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব সালাহউদ্দিনকে ঢাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। দুই মাস নিখোঁজ থাকার পর ১১ মে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে তার সন্ধান মেলে।

    আজ ৩০ আগস্ট, আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। বিশ্বব্যাপী জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ, তাদের পরিবারের প্রতি সংহতি প্রকাশ এবং রাষ্ট্রগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে ২০১১ সাল থেকে প্রতি বছর এই দিনটি পালন করা হয়।

    ২০১০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আন্তর্জাতিক কনভেনশন কার্যকর হওয়ার পর থেকে দিবসটি পালনের সূচনা হয়। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো-‘ভিকটিম ফার্স্ট, অ্যাকশন নাও’ (প্রথমে ভুক্তভোগী, এখনই পদক্ষেপ)।

    ‘গুম প্রতিরোধ’ দিবস পালনের প্রেক্ষাপটে আজ সামনে এসেছে দেশের সবচেয়ে আলোচিত গুমের ঘটনাটি। অনেকেরই জানার আগ্রহ-ঠিক কীভাবে, কোন পরিস্থিতিতে, কোন জায়গা থেকে সালাহউদ্দিন আহমদকে গুম করা হয়েছিল?

    ঢাকার উত্তরায় যার ফ্ল্যাট থেকে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গুম হয়েছিলেন তিনি বাসসকে সেই ঘটনার রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন।

    দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক বছর পূর্তির দিন ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি উপলক্ষে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালনকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। ৩ জানুয়ারি রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করা নিয়ে সরকার ও বিএনপি মুখোমুখি অবস্থান নেয়। বিকল্প হিসেবে আওয়ামী লীগ রাজধানীর ১৬ জায়গায় অবস্থান কর্মসূচি এবং বিএনপি নয়াপল্টনে সমাবেশ করার প্রস্তুতি নেয়।

    তবে বিএনপির নেতাকর্মীরা যাতে ঢাকায় প্রবেশ করে কর্মসূচিতে অংশ নিতে না পারেন, সে জন্য রাজধানীর প্রবেশমুখে কড়াকড়ি আরোপ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গোয়েন্দা সংস্থা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের রাখে কড়া নজরদারিতে। ৪ জানুয়ারি গুলশান কার্যালয়ে অবস্থান নেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে বিএনপির প্রায় সব সিনিয়র নেতাকে এক এক করে গ্রেপ্তার করে চলেছে সরকার।

    এরই মধ্যে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছিলেন সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই তাকেও পুলিশ গ্রেপ্তার করে। সংঘাতময় পরিস্থিতিতে বেগম খালেদা জিয়া লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ওই অবস্থায় যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমদকে দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

    সেই দায়িত্ব পালনকালে সালাহউদ্দিন আহমদকে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিয়ে যায় এবং গুম করে রাখে। ৬২ দিন নিখোঁজ থাকার পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় তার সন্ধান মেলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ে।

    গুম হওয়ার আগে তিনি কোথায় কীভাবে ছিলেন-সেই নির্মম ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও সাক্ষী সালাহউদ্দিন আহমদের একজন ঘনিষ্ঠজন সৈয়দ হাবিব হাসনাত। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ভেল্লাপাড়ার মিয়াবাড়ির কৃতী সন্তান সৈয়দ হাবিব হাসনাত সে সময়ে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

    সৈয়দ হাবিব হাসনাতের বর্ণনায়, ‘সালাহউদ্দিন ভাইয়ের সঙ্গে আমার আগে থেকেই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সরকারের এজেন্সি, গোয়েন্দা সংস্থা ও র‌্যাব-পুলিশ তাকেও গ্রেপ্তার করার জন্য বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি শুরু করে এবং সন্দেহজনক সব জায়গায় হন্যে হয়ে তাকে খুঁজতে থাকে। এ অবস্থায় তিনি গুলশানে নানা কায়দায় বিভিন্ন ফ্ল্যাটে অবস্থান করে এবং স্থান বদল করে দলের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। এরই মধ্যে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলে যায় যে, তার গুলশানে অবস্থানের বিষয়টি গোয়েন্দা সংস্থা নিশ্চিত হয়ে যায়; যদিও তিনি ঠিক কোন বাড়ি বা কোন ফ্ল্যাটে আছেন, তা তখনও তারা নিশ্চিত হতে পারেনি। তবে নিশ্চিত হওয়া মাত্রই তাকে ধরে ফেলবে-এমনটাই ছিল পরিস্থিতি।’

    তিনি বলেন, ‘গুলশানকেন্দ্রিক গোয়েন্দা তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার পর সালাহউদ্দিন ভাই দলের পরামর্শে দ্রুত এলাকা বদলের সিদ্ধান্ত নেন। আমি তখন একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করি, গুলশানে তিনি যেখানে থাকেন, তার কিছুটা দূরেই ছিল আমার অফিস। দল ও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে তাকে স্থান বদলের জন্য বিকল্প কয়েকটি জায়গার কথা বলা হলে, তিনি আমার উত্তরার ফ্ল্যাটেই যাওয়ার মনস্থির করেন। ফেব্রুয়ারি মাসের সম্ভবত শেষ দিন, দুপুরে লাঞ্চ করতে যাব-এমন সময় সালাহউদ্দিন ভাই ফোন করলেন। তিনি বললেন, দ্রুত গুলশান থেকে সরে পড়তে হবে এবং তিনি আমার উত্তরার ফ্ল্যাটে উঠতে চান। আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, কোনো সমস্যা নেই, আপনাকে আমিই নিয়ে যাব। সন্ধ্যার পরই আসব, প্রস্তুত থাকবেন।’

    ‘কথামতো বিকেল ৫টার দিকে আমি গাড়ি নিয়ে বের হলাম। গুলশানে তিনি যে বাড়িতে ছিলেন, তা আমরা খুব ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ছাড়া আর কেউ জানত না। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, সালাহউদ্দিন ভাইয়ের স্ত্রী এবং দলের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ নেতা শুধু বিষয়টি জানতেন। আমি ওই বাড়ির কিছুটা অদূরে গিয়ে ড্রাইভারকে বললাম, পাশে একটি মিষ্টির দোকান আছে, তুমি গিয়ে মিষ্টি খাও। কারণ, ড্রাইভারকে তো কিছু বুঝতে দেওয়া যাবে না। আমি নিজে ড্রাইভ করে গাড়ি নিয়ে বাড়িটির নিচে গেলাম এবং সালাহউদ্দিন ভাইকে ফোন করলাম। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি নেমে এলেন, তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপি নেতা তাবিথ আউয়াল। তাদের দুজনকে পেছনের সিটে বসিয়ে আমি উত্তরার উদ্দেশে গাড়ি চালাতে শুরু করলাম। উত্তরা যাওয়ার পথে এমন সব রুট বেছে নিলাম, যেদিকে কোনো পুলিশের চেকপোস্ট ছিল না। তাদের নিয়ে গাড়ি চালিয়ে সন্ধ্যার কিছু পর উত্তরার বাড়িতে পৌঁছলাম। সেখানে তো দারোয়ানদের জানতে দেওয়া যাবে না। তাই সেখানে দায়িত্বে থাকা দারোয়ানকে ডেকে বললাম, আমি তো ওপরে যাচ্ছি, তুমি আমার জন্য দুই প্যাকেট সিগারেট নিয়ে এসো, আমি গেটেই দাঁড়াচ্ছি।’

    ‘দারোয়ান বাইরে পা রাখা মাত্রই আমি গাড়ির দরজা খুলে দিলাম-সালাহউদ্দিন ভাই এবং তাবিথ নেমে গেলেন। বললাম, দ্রুত অমুক তলার অত নম্বর ফ্ল্যাটে উঠে যান। সেখানে একজন বাবুর্চি ও সহকারীকে আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম, তাদের বলে দিলাম-‘মেহমান এখানে থাকবেন, সব ধরনের সেবাযত্ন তোমরা করবে।’ এরপর অন্যান্য ব্যবস্থা সম্পন্ন করে আমি সেখান থেকে বেরিয়ে আমার স্ত্রীকে নিয়ে অন্য একটি ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠলাম। তারপর সেই ফ্ল্যাট থেকেই সালাহউদ্দিন ভাই দলের নির্দেশনা অনুযায়ী আন্দোলন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি ও ভিডিও বার্তা পাঠাতে থাকলেন। আন্দোলন চলছিল, সরকারও তাকে খুঁজছিল-এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল।’

    হাবিব হাসনাত বলেন, ‘১০ মার্চ আমি উত্তরায় যাই। সন্ধ্যার পর উত্তরা এলাকার প্রতিদিনের দৃশ্যপট কেমন, তা আমার ভালোভাবেই পরিচিত। সেদিন উত্তরা এলাকায় ঢোকার পর থেকেই একধরনের অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করলাম; কিছু সড়কের বাতি নেভানো, কোথাও কোথাও এক গুমোট পরিবেশ এবং আশপাশে কোনো মানুষের দেখা মিলছে না। আবাসিকের দোকানপাটগুলোও বন্ধ। এলাকার ভেতরে কয়েকটি খেলার মাঠ আছে, যেগুলোতে সন্ধ্যার পর থেকেই তরুণরা খেলাধুলা করে, কিন্তু আজ দেখলাম সেখানেও কেউ নেই! আমার মনে দারুণ এক খটকা লাগল। বাড়ির অদূরে যেতেই দেখা গেল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জোরালো অবস্থান। আমি সাহস সঞ্চয় করে বাড়ির ভেতরে ঢুকলাম। দারোয়ানটাকে খুব মনমরা দেখলাম, কিন্তু সে কিছু বলল না। ফ্ল্যাটের দরজায় গিয়েই চমকে উঠলাম-দরজা ভাঙা! আমাকে দেখেই ভেতর থেকে হাউমাউ করে কেঁদে সামনে এল বাবুর্চি আর সহকারী। তারা দুজন কাঁদতে কাঁদতে বলল, মেহমানকে তুলে নিয়ে গেছে!’

    ‘আমি ঠিক কী করব, বুঝে উঠতে পারছিলাম না! দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমি যদি ধরা পড়ি, আমাকেও গুম করা হবে-সেটা বুঝতে বাকি রইল না। আবার আমি যদি বাইরে না থাকি, তাহলে সালাহউদ্দিন ভাইয়ের আসলে কী ঘটেছে, তা বলারও কেউ থাকবে না। এই চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিলাম, দ্রুত দেশ ছাড়তে হবে। আমার ভিসা করা ছিল; ওপরের আরেকটি ফ্ল্যাটে আমার স্ত্রী থাকত, তাকে সে অবস্থাতেই সঙ্গে নিয়ে এক কাপড়ে এয়ারপোর্টে চলে গেলাম, আমার সহযোগীরা দ্রুত টিকিটের ব্যবস্থা করল। বিমান যখন দুবাই এয়ারপোর্টে, তখনই উত্তরা থানার ওসির ফোন পেলাম-তিনি আমাকে খুঁজছেন!’

    হাবিব হাসনাতের বর্ণনায়, ‘আমেরিকায় বাঙালি কম থাকে-এমন একটি এলাকায় গিয়ে উঠলাম। সেখান থেকে সালাহউদ্দিন ভাইয়ের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ এবং ম্যাডাম খালেদা জিয়ার সঙ্গে ফোনে কথা হতো। এরই মধ্যে সরকারের তরফে সালাহউদ্দিন ভাইকে তুলে নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করা হলো। ভাবী হাসিনা আহমদ নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সালাহউদ্দিন ভাইকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নেয়নি, বরং তিনি ‘আত্মগোপনে গেছেন’-এমন অপপ্রচার চালিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে। এর মধ্যে একদিন ম্যাডাম খালেদা জিয়া অন্য একজনকে দিয়ে ফোন করিয়ে আমাকে বললেন, আমি যেন আমেরিকা বা দুবাইয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করি। সংবাদ সম্মেলন করে বলি যে, সালাহউদ্দিন ভাইকে আমার উত্তরার বাসা থেকে তুলে নিয়ে গেছে, তিনি আমার ফ্ল্যাটেই ছিলেন এবং সেখান থেকে নিখোঁজ হয়েছেন। আমিও সেভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম; কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরই গোয়েন্দা সংস্থা থেকে ফোন করে আমাকে বলা হলো-“চুপ! একদম চুপচাপ থাকবেন। যদি একটি কথাও বলেন, তাহলে চিরজীবন আর দেশেও আসতে পারবেন না।’ এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হলো! এই কারণে আর সংবাদ সম্মেলন করা হয়নি। এভাবেই আমেরিকার মাটিতে কেটেছে আমার অনেক দিন।’

    তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর এ দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করেছে, জীবন দিয়েছে, রক্ত দিয়েছে। ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে নেপথ্যে থেকে ভূমিকা রাখতে গিয়ে আমি নিজেও সে সময়ে জীবন নিয়ে শঙ্কার মধ্যে ছিলাম। আল্লাহর রহমতে, তারুণ্যের রক্তে ভেজা অভ্যুত্থানে আমরা সেই জালিমের শাসন থেকে মুক্তি পেয়েছি। এখন আমাদের সবার উচিত বিভেদ-বিভক্তি এড়িয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এ দেশের মানুষের জন্য কাজ করা, দেশকে সমৃদ্ধশালী করে তোলা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণের উদ্দেশ্যে সবাইকে হাতে হাত মিলিয়ে ও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। এ জন্য ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে, ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির ঐক্য ধরে রাখতে হবে। এই ঐক্য বিনষ্ট হলে আমরা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হব-কথাটি আমাদের সব সময়ই মনে রাখতে হবে।’

    ইতিহাসের দিকে ফিরে দেখা

    সালাহউদ্দিন আহমদকে উঠিয়ে নেওয়ার আগে ৭ মার্চ তাঁর দুই চালক শফিক ও খোকন এবং ব্যক্তিগত সহকারী ওসমান গণিকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। পরদিন ৮ মার্চ সালাহউদ্দিনের খোঁজে গুলশানের ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে এবং ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালায় র‌্যাব (উল্লেখ্য, সেই অফিস ও ফ্ল্যাটের মালিক সৈয়দ হাবিব হাসনাত)। এরপর ১০ মার্চ উত্তরার ফ্ল্যাট থেকে সালাহউদ্দিন আহমদকে তুলে নেওয়া হয়। এর মাঝে একাধিকবার তাঁর গুলশানের বাসায় তল্লাশি চালানো হয়েছে এবং বাসার গেটে সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা পাহারা বসানো হয়েছিল।

    ১৮ মার্চ ঢাকার দুটি জাতীয় দৈনিকে (প্রথম আলো ও নিউ এজ) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সালাহউদ্দিনকে যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই নিয়ে গেছে, এ বিষয়ে ওই এলাকায় একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া গেছে। যে বাসা থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়, সেই এলাকার নিরাপত্তাকর্মী ও একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী পত্রিকা দুটির কাছে এর বর্ণনা দিয়েছেন।’

    উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের নিরাপত্তাকর্মী ও কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে ঢাকার কয়েকটি গণমাধ্যম সে সময় প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, সালাহউদ্দিনকে ধরে নিয়ে যাওয়ার আগে ওই বাসার কাছেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পিকআপ দাঁড়িয়ে ছিল। ওই পিকআপে আসা সদস্যরা সেখানে কর্তব্যরত ৩ নম্বর সেক্টর কল্যাণ সমিতির নিয়োগ করা নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে ১৩-বি নম্বর সড়কটির অবস্থান জানতেও চেয়েছিলেন। ওই বাড়ির নিরাপত্তারক্ষীরা জানান, অজ্ঞাতপরিচয় অস্ত্রধারীরা সালাহউদ্দিনকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে গেছে।

    তবে ঘটনার শুরু থেকেই বিষয়টি নিয়ে একধরনের উপহাস করে আসছিলেন তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা। সে বছর ১৪ মার্চ রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা তাকে (সালাহউদ্দিনকে) অ্যারেস্ট করার জন্য খুঁজছি। তিনি কোথায়, তার জবাব খালেদা জিয়ারই দিতে হবে। সালাহউদ্দিন আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে বিবৃতি দিচ্ছিলেন। কিন্তু সবাই জানে, তিনি ওখান থেকেই (গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়) বিবৃতি দিয়েছেন। আট বস্তা ময়লার সঙ্গে তাঁকেও কোথাও পাচার করে দেওয়া হয়েছে কি না, সেই জবাব খালেদা জিয়ারই দিতে হবে।’

    এরপর সরকারের মন্ত্রী-এমপিরাও সালাহউদ্দিন কোথাও লুকিয়ে রয়েছেন-এমন ইঙ্গিত করে বা সরাসরি উল্লেখ করে ঢালাও বক্তব্য দিতে থাকেন। ১৩ মে মেঘালয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় সালাহউদ্দিন আহমদের খোঁজ মেলার পরও সেই বক্তব্যের রেশ থামেনি।

    ওইদিনই (১৩ মে) রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা (প্রয়াত) সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সালাহউদ্দিন আহমদ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটি গুম, অন্তর্ধান কিংবা নিখোঁজ নয়-এটি আত্মগোপন। আত্মগোপন আর গুম এক জিনিস নয়। এটি স্পষ্ট হয়ে গেছে-এই আত্মগোপন দলীয় প্রধানের নির্দেশেই করা হয়েছে।’

  • কাউকে গুম করেনি সরকার, ভবিষ্যতেও করতে দেবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

    কাউকে গুম করেনি সরকার, ভবিষ্যতেও করতে দেবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

    বিএনপি সরকার কাউকে গুম করেনি এবং ভবিষ্যতেও কাউকে গুম করতে দেবে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, নতুন গুমবিরোধী আইনের মাধ্যমে দেশে মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব।

    রোববার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত আন্তর্জাতিক গুম দিবসের আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

    স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গুমের ঘটনায় শেখ হাসিনার কোনো অনুশোচনা নেই। বরং জুলাইয়ের ঘটনাকে ‘জঙ্গি হামলা’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। এটিকে তিনি বিশ্বব্যাপী লজ্জাজনক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন।

    তিনি বলেন, দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগেরও বিচার নিশ্চিত করা হবে।

    নিজে গুমের শিকার হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘নিজে গুমের শিকার হওয়ার পর এই আইন দুর্বল হোক, সেটা কী চাইতে পারি?’ তিনি বলেন, বিএনপি সরকার কাউকে গুম করেনি এবং ভবিষ্যতেও কাউকে গুম করতে দেবে না।

    বিরোধী দলের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক বর্জন ও ওয়াকআউটের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওয়াকআউট কোনো সমাধান নয়। বরং সব বিষয়ে আলোচনা করা উচিত। কোনো কিছু না বলে বা না শুনে ওয়াকআউট করলে জাতি তাদের বক্তব্য থেকে বঞ্চিত হবে।

    জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা হবে।

    স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, আগের তুলনায় গুমবিরোধী আইন আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব। গুমের শিকার ব্যক্তিরা মামলা করলে সরকার তাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে বলেও জানান তিনি।

  • গুম-খুনের শিকার ও জুলাই শহীদ পরিবারের ৭৪ জনকে চাকরির নিয়োগপত্র দিলেন প্রধানমন্ত্রী

    গুম-খুনের শিকার ও জুলাই শহীদ পরিবারের ৭৪ জনকে চাকরির নিয়োগপত্র দিলেন প্রধানমন্ত্রী

    গুম-খুনের শিকার এবং জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত পরিবারের ৭৪ সদস্যকে চাকরির নিয়োগপত্র দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

    শনিবার দুপুরে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের করবী হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাদের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ১০ জনের হাতে প্রধানমন্ত্রী নিজে নিয়োগপত্র তুলে দেন।

    প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, গুম-খুনের শিকার পরিবার এবং জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত পরিবারের ৭৪ সদস্যকে আজ চাকরির নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১০ জনের হাতে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগপত্র তুলে দেন।

    নিয়োগপত্র পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন গুমের শিকার ইফতেখার আহমেদ দিনারের ভাই ইশফাক আহমেদ, নুরুজ্জামান জনির ভাই মনিরুজ্জামান হীরা, আনোয়ার হোসেন মাহবুবের ভাই আনান হোসেন নূর, সেলিম রেজা পিন্টুর ভাই হাসনাইন রেজা এবং খালেদ হোসেন সোহেলের স্ত্রী শাম্মী সুলতানা।

    এ ছাড়া জুলাই অভ্যুত্থানে আহত দৃষ্টিশক্তিহীন যোদ্ধা আলাল আহমেদ, শহীদ আলভীর বাবা মো. আবুল হোসাইন, শহীদ আহনাফের মা জারতাজ পারভীন, আহত যোদ্ধা কাজী সাইমুম সিরাজ এবং ইসরাফিল ইসলামের ভাই মাহবুব আলমসহ অনেকে নিয়োগপত্র পেয়েছেন।

    নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের কয়েকজন প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তারা গুম-খুনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের দাবি জানান।

    অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর আহ্বায়ক ও প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।

    অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, উপপ্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি, হাসান শিপলু, সুজাউদ্দৌলা, শাহাদাৎ স্বাধীন, সহকারী প্রেস সচিব একেএম নাজমুল হক, শাহরিয়ার পামির এবং ‘বিএনপি আমার পরিবার’-এর সদস্য মোকছেদুল মোমিন মিথুনসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

  • গুম-খুন-নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোকে সহায়তায় আলাদা অধিদপ্তর: মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী

    গুম-খুন-নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোকে সহায়তায় আলাদা অধিদপ্তর: মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী

    গত ১৭ বছরে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোকে মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান। তিনি বলেন, এসব পরিবারের জন্য নতুন করে একটি অধিদপ্তর করা হবে এবং তাদের গেজেটভুক্ত করে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হবে।

    আজ শনিবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত দোয়া ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আহমেদ আজম খান এসব কথা বলেন। বেগম খালেদা জিয়া স্মৃতি ফাউন্ডেশন এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

    আহমেদ আজম খান বলেন, ‘নির্যাতিতদের পরিবারগুলোর জন্য সরকার কিছু করতে চায়। এ-সংক্রান্ত নতুন করে একটি অধিদপ্তর করা হবে এবং তাদের গেজেটভুক্ত করে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।’

    প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানে যারা গ্যাজেটভুক্ত হওয়ার কথা…অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় তড়িঘড়ি করে সেটা ক্লোজ করে দিয়েছে। কিন্তু আমরা বঞ্চিতদের মূল্যায়ন করতে সেটা আবার ওপেন করেছি। মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বিএনপির অনেক লোককে বাদ দেওয়া হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শক্তি যাদের বঞ্চিত করেছে, আমরা তাদের মূল্যায়ন করব।’

    বর্তমান গ্যাস, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকটকে বিগত সরকারের রেখে যাওয়া সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আজ বিরোধী দল এই ৫ মাসেই বলছেন আমরা ব্যর্থ। অথচ ১৮ বছরের জঞ্জাল পরিষ্কার করা তো ১৮ মাসেও সম্ভব নয়। আজকের বিদুৎ, গ্যাস ও অর্থনৈতিক সংকট এগুলো কি আমাদের তৈরি? এগুলো ফ্যাসিবাদী সরকারের তৈরি।’

    মন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বদ্ধপরিকর যে, এ দেশকে বিনির্মাণ করবেন। কিন্তু যারা নানা রকম ষড়যন্ত্র করছে তাদের বলব, আপনারা আওয়ামী রেজিমে যাবেন না।’ তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর এই দেশকে বিনির্মানে নেতৃত্বে আসা একজন ব্যক্তির প্রতি মানুষের প্রত্যাশা ছিল, তবে তিনিও যেমন নিন্দিত হয়ে বিদায় নিয়েছেন, তাঁর কন্যাও তেমন নিন্দিত, ফ্যাসিবাদী হয়ে বিদায় নিয়েছেন। অপরদিকে আরেকটি পরিবার জিয়াউর রহমান নিজের জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। আরাম করে জীবন উপভোগ করেননি, লড়াই করে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। তিনি ভগ্ন বাহিনীকে নতুন করে গঠন করেছেন। যার প্রতি মানুষের আশা থাকবার কথা ছিল না, তার জীবনের কর্ম দিয়ে মানুষের মনে আশা জাগিয়েছেন।

    মন্ত্রী বলেন, ‘খালেদা জিয়া জীবিতকালে যেমন ইতিহাস ছিলেন, মৃত্যুর পরও ইতিহাস হয়ে আছেন। দেড় কোটির বেশি মানুষ তাঁর জানাযায় উপস্থিত হয়েছেন। ১০ কোটির বেশি মানুষ টিভিতে জানাজা দেখেছেন। আর ১৫ কোটি মানুষ ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন বলেছেন। এমন জনপ্রিয়তা পৃথিবীর ইতিহাসে একটা বিরল ঘটনা। যতবার নির্বাচনে এসেছেন, তিনি ততবারই মানুষের ভালোবাসা পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।’

    সভায় প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। তিনি বলেন, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া হচ্ছেন একটা অসমাপ্ত ইতিহাস…আমরা যারা উনার সাথে কাজ করেছি, তারা সবাই উনার কাছে মায়ের মতো ভালোবাসা পেয়েছি। আমার মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে উনার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তখন উনি বলেছিলেন, “আলাল তোমার মা মারা গেছে তুমি জেলে থাকতে, আমার মাও মারা গেছে আমি জেলে থাকতে।” এই কথা শুনে আমার মন শান্ত হয়ে গেছিল। শোক ভুলে গিয়েছিলাম।’

    বেগম খালেদা জিয়া স্মৃতি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এম জাহাঙ্গীর আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য শিরিন সুলতানা ও সেলিনা সুলতানা নিশিতা; বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাছের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ ও কৃষকদের সহসভাপতি জামাল উদ্দিন খান মিলন।