ভালো দাম পাওয়ার আশায় হিমাগারে আলু রেখেছিলেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। কিন্তু মৌসুমের শেষ দিকে এসেও বাজারে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত দাম। উল্টো ক্রেতাসংকট ও দরপতনে হিমাগার থেকে আলু বের করতেও আগ্রহ হারাচ্ছেন তারা। উৎপাদন, পরিবহন ও সংরক্ষণ খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজি আলুতে খরচ পড়েছে ২৩-২৪ টাকা। অথচ বর্তমানে বিক্রি করতে হচ্ছে ১০-১২ টাকায়। এতে প্রতি কেজিতে ১১-১৪ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের।
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার হিমাগারগুলোতে এখনো বিপুল পরিমাণ আলু অবিক্রীত পড়ে আছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব আলু খালাস করা নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। গত বছরের লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার আশায় এবার আলু সংরক্ষণ করলেও নতুন করে লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা।
ব্যবসায়ীরা জানান, সাধারণত এক বস্তায় ৬৫ কেজি আলু কেনা হয়। বাছাইয়ের পর বিক্রিযোগ্য থাকে প্রায় ৬০ কেজি। উৎপাদন, পরিবহন ও হিমাগার ভাড়াসহ প্রতি কেজিতে খরচ পড়ে ২৩-২৪ টাকা। অথচ বর্তমানে বাজারে আলুর দাম নেমে এসেছে ১০-১২ টাকায়।
জানা গেছে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আলু সংরক্ষণের জন্য রয়েছে দুটি সরকারি ও চারটি বেসরকারি হিমাগার। এর মধ্যে পাকুন্দিয়ায় একটি সরকারি ও দুটি বেসরকারি, জেলা সদরে একটি সরকারি এবং ভৈরবে দুটি বেসরকারি হিমাগার রয়েছে।
হিমাগারে পড়ে আছে হাজার হাজার বস্তা
সম্প্রতি পাকুন্দিয়ার পূর্বাচল হিমাগার ও এগারসিন্দুর কোল্ড স্টোরেজ ঘুরে দেখা যায়, মৌসুমের শেষ সময়েও হিমাগারগুলোতে আলু খালাসের তেমন ব্যস্ততা নেই। ভেতরে সারি সারি সাজানো আলুর বস্তা। কেউ বস্তা খুলে আলু বের করছেন, কেউ করছেন পরিচর্যা। তবে বাজারে ক্রেতা না থাকায় অধিকাংশ কৃষক ও ব্যবসায়ী আলু বের করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
হিমাগার কর্তৃপক্ষ জানায়, চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিল মাসে এসব আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। সাধারণত ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত আলু খালাসের সময় নির্ধারিত থাকে। কিন্তু এবার বাজারে ব্যাপক সরবরাহ ও দরপতনের কারণে এখনো বিপুল পরিমাণ আলু হিমাগারে রয়ে গেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব আলু খালাস হওয়ার সম্ভাবনা কম।
হোসেনপুর থেকে আসা আলু ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি এগারসিন্দুর কোল্ড স্টোরেজে ২ হাজার ২০০ বস্তা আলু রেখেছিলেন। কেনা, পরিবহন ও হিমাগার ভাড়াসহ প্রতি কেজিতে খরচ পড়েছে ২৩-২৪ টাকা। শুরুতে বাজারদর ছিল ১৬-১৭ টাকা। এখন তা ১০-১১ টাকায় নেমেছে। এতে প্রতি কেজিতে ১১-১২ টাকা লোকসান হচ্ছে।
পাকুন্দিয়ার সুখিয়া গ্রামের আলুচাষি রিপন মিয়া বলেন, কৃষিতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। অনেক কষ্ট করে আলু উৎপাদন করে হিমাগারে রেখেছিলাম ভালো দাম পাওয়ার আশায়। এখন ভরা মৌসুমেও ক্রেতা নেই, দামও কমে গেছে। এতে আমরা বিপাকে পড়েছি।
গাজীপুরের শ্রীপুর থেকে আসা ব্যবসায়ী আবদুল কাদির বলেন, দুই দিন আগে এগারসিন্দুর কোল্ড স্টোরেজ থেকে ১৩ টাকা কেজি দরে আলু কিনেছি। এখনো হিমাগার থেকে বের করিনি। এরই মধ্যে কেজিতে দুই টাকা দাম কমে গেছে। হিমাগার থেকে আলু বের করে গাজীপুরে নেওয়া পর্যন্ত পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ যোগ হলে আরও লোকসান গুনতে হবে।
খালাসের অপেক্ষায় ৫৫ হাজার বস্তা
পূর্বাচল হিমাগারের ব্যবস্থাপক দেলোয়ার হোসেন জানান, তাদের হিমাগারে ৫ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৪ হাজার মেট্রিক টন খালাস হয়েছে। অবশিষ্ট আলুর বেশির ভাগই বীজ আলু।
এগারসিন্দুর কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. আলতাফ হোসেন জানান, এ বছর তাদের হিমাগারে ১ লাখ ৩৯ হাজার ১৭৪ বস্তা আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। ৭ নভেম্বর পর্যন্ত খালাস হয়েছে ৮৩ হাজার ৫০০ বস্তা। এখনো ৫৫ হাজার ৬৭৪ বস্তা আলু রয়ে গেছে। দরপতনের কারণে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আলু উত্তোলনের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব আলু খালাস হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
বেশি উৎপাদন, কমেছে দাম
পাকুন্দিয়া উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় প্রতিবছর গড়ে ১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়। গত অর্থবছরে বেশি দামের আশায় কৃষকেরা ১ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। অনুকূল আবহাওয়ায় প্রতি হেক্টরে প্রায় ৩০ টন করে ফলন হয়। তবে সারা দেশে আলুর উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় বাজারে দরপতন ঘটে। এতে কৃষকেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।
পাকুন্দিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নূরে ই আলম বলেন, একই ফসলের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে কৃষকদের শস্য বহুমুখীকরণ করতে হবে। রবি মৌসুমে আলুর পাশাপাশি সরিষা ও গম চাষে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি অল্প জমিতে ভুট্টা, পেঁয়াজ ও শীতকালীন শাকসবজি আবাদ করা যেতে পারে। এতে একটি ফসলে লোকসান হলেও অন্য ফসলের লাভ দিয়ে তা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। শস্য বহুমুখীকরণের মাধ্যমে কৃষকের আর্থিক ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
তবে উৎপাদিত আলু দেশের বাইরে রপ্তানির ব্যবস্থা না করা গেলে এবং সঠিক বাজারজাতের অভাবে পাট, আখের মতো সম্ভাবনাময় এই ফসল আবাদও আশঙ্কাজনক হারে কমে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
