ট্যাগ কারাগার

  • চিকিৎসা সংকটে কারাগারে বন্দিমৃত্যু বাড়ছে

    চিকিৎসা সংকটে কারাগারে বন্দিমৃত্যু বাড়ছে

    দেশের কারাগারগুলোতে বন্দি মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ১৪৩৩ জনেরও বেশি বন্দির মৃত্যু হয়েছে। কারাগারে এত বন্দি মারা যাওয়ার কারণ কী— এ বিষয়ে সন্তোষজনক জবাব পাওয়া যায়নি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে।

    বন্দি মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনভাবে বৃদ্ধি রহস্যের সঠিক ব্যাখ্যাও দিতে পারেননি কারাগারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। তারা বলছেন— চিকিৎসক সংকট, অপ্রতুল চিকিৎসা সামগ্রী, কারাগারে বিশেষায়িত হাসপাতাল না থাকা, বিদ্যমান হাসপাতালে জনবল সংকটসহ নানা কারণে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের কারাগারের বাইরে চিকিৎসার জন্য নিতে হয়। অনেকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় মারা যান। এসব মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।কারা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০২১ সালে ২০৫ জন, ২০২২ সালে ১৩২, ২০২৩ সালে ২২৭, ২০২৪ সালে ১৭৯, ২০২৫ সালে ৩৯০ এবং চলতি বছরে আগস্ট পর্যন্ত ৩০০ জনের বেশি বন্দি হাসপাতালে মারা গেছেন। বছরে গড়ে ২৬০ জন বন্দি মারা যান কারাগারে। আর গত ২০ মাসের গড় হিসাবে প্রতি মাসে মারা গেছেন ৩৪ জনের বেশি।

    মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এই সংখ্যা শুধু উদ্বেগেরই নয়, রীতিমতো আতঙ্কের। তারা আটক বা গ্রেপ্তার হওয়ার পর রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকে। কোনো বন্দির মৃত্যু অবহেলাজনিত কারণে হলে এসব মৃত্যুর দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না। জরুরিভিত্তিতে মৃত্যুর কারণগুলো শনাক্ত করে প্রতিকার করা জরুরি।

    কারা কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, বর্তমানে যেসব বন্দি কারাগারে আসছে, তার বেশিরভাগই মাদকাসক্ত ও মাদক মামলার আসামি। মাদকাসক্তরা কারাগারে প্রবেশের পরপরই অসুস্থ হয়ে পড়ে। মাদকাসক্তির মতো সংবেদনশীল অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসার জন্য কারাগারে বিশেষায়িত হাসপাতাল বা চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতায় এই বন্দিদের অনেকেই হাসপাতালে নেওয়ার পথে বা হাসপাতালে ভর্তির পর মারা যায়। এতে বন্দি মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা বাড়ছে।

    কারা অধিদপ্তর সূত্র আরো জানায়, দেশের ৭৪টি কারাগারে বন্দির সংখ্যা গত ১৩ সেপ্টেম্বর ছিল এক লাখ ৫১০২ জন। অথচ কারাগারে ধারণক্ষমতা মাত্র ৪৬ হাজার। এই বিশাল সংখ্যক বন্দির জন্য সব কারাগার মিলিয়ে স্থায়ী চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র দুজন। চিকিৎসক পদায়ন হলেও স্থায়ীভাবে কারাগারে কর্মরত থাকতে চান না। তারা পরবর্তীতে অন্যত্র চলে যান।

    কারাগারে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি বিষয়ে জানতে চাইলে আইজি (প্রিজন্স) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল আমার দেশকে বলেন, ‘কারাগারে বন্দির মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়। বর্তমানে কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে বন্দির সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। বিপুল সংখ্যক বন্দি থাকায় ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থাকতে পারে।

    তিনি আরো বলেন, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, বর্তমানে বন্দির সংখ্যার পাশাপাশি বন্দির প্রকৃতি পরিবর্তন হয়েছে। কারাগারগুলোতে ৩০ হাজারের বেশি বন্দি মাদকাসক্ত ও মাদক মামলার আসামি। তারা কারাগারে ঢোকার পর হার্টঅ্যাটাক ও স্ট্রোকসহ নানা প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। মাদকাসক্ত বন্দির জন্য কারাগারে আলাদা কোনো বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। তার দাবি, কারাগারে মাদকাসক্ত বন্দির মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়ে একটা স্টাডি হওয়া জরুরি।

    আইজি প্রিজন্স বলেন, ‘আমাদের বড় সংকট হচ্ছে প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক নেই। নার্স ও চিকিৎসা সরঞ্জামেও রয়েছে বড় ঘাটতি। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ১৪ হাজারের বেশি বন্দি । ঢাকার সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে সেখানে দিনে ২-৩ ঘণ্টার জন্য যান চিকিৎসক। তার পক্ষে এত বিপুল সংখ্যক বন্দির চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না।’

    তিনি আরো বলেন, ‘কারাগারে গেলে অনেক সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মানসিক চাপ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণেও অসুস্থ হয়ে পড়ে। বছরে গড়ে ৯ লাখের বেশি মানুষ কারাগারে প্রবেশ করে এবং বের হয়।

    বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে প্রতি হাজার জনসংখ্যায় গড় মৃত্যুর হার ছয়জনের বেশি। সে হিসেবে বছরে ৯ লাখ সংখ্যার টার্নওভারে এই মৃত্যুর হার খুব বেশি নয়।’

    আইজি প্রিজন্স বলেন, ‘পরিসংখ্যানগত তথ্য যাই হোক, আমরা কারাগারে কোনো মৃত্যু চাই না। আমরা সেবা করি, সেবার মান বাড়াতে চাই। আমরা চাই, কারাগারে সপ্তাহে সাতদিনই ২৪ ঘণ্টা ডাক্তার-নার্স থাকবেন। যেকোনো বন্দি অসুস্থ হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাবেন। কারাগারে চিকিৎসা সুবিধা বৃদ্ধি করতে সরকারও আন্তরিকভাবে কাজ করছে। বিদ্যমান অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে ৪৪টি নতুন অ্যাম্বুলেন্স দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও কেন্দ্রীয় কারাগার হাসপাতাল স্থাপনের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসক ও নার্স সংকট নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে কারাগারে বন্দিদের সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’

    ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে দুদিনে চার মৃত্যু

    ঢাকার কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে রোববার ও সোমবার চার বন্দির মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে রোববার অসুস্থ হয়ে পড়া আব্দুল মাবুদ (৫৮) নামে হাজতি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে মারা গেছেন। কেরানীগঞ্জ থেকে অসুস্থ অবস্থায় দুপুরে কারারক্ষী সাইফুল ইসলাম তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আব্দুল মাবুদের বাড়ি চট্টগ্রামের চন্দনাইশ থানার হামিমপুরে। তার বাবার নাম আব্দুল সোবাহান।

    একই দিন ঢাকার কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়া কয়েদি আব্দুল বারেক (৭০) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢামেক হাসপাতালে মারা যান। তিনি একটি হত্যা মামলায় বন্দি ছিলেন। তার বাড়ি নেত্রকোনায়, বাবার নাম আব্দুল খালেক। তার ছেলে দেলওয়ার বলেন, কারাগারে অত্যন্ত গরমসহ অজানা কারণে বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেখানে ভালো চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকায় আমার বাবাকে কারা কর্তৃপক্ষ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান।

    এদিকে সোমবার সকালে হাসপাতালে মারা যান কেরানীগঞ্জ কারাগার থেকে আনা অসুস্থ দুই কয়েদি রফিকুল ইসলাম (৫৪) ও আব্দুর রহিম (৬০)। মৃত্যুর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মো. হাবিবুর রহমান। রফিকুলের বাবার নাম মো. রজব আলী, বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুরের পত্রনবিশ গ্রামে। তিনি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি ছিলেন।

    এছাড়া ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাজাপ্রাপ্ত কারাবন্দি আব্দুর রহিম (৬০) সোমবার সকালে মারা যান। গত ৩ সেপ্টেম্বর তাকে অসুস্থ অবস্থায় কারারক্ষীরা ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি করেন। আব্দুর রহিম ঢাকার গেন্ডারিয়ার বাসিন্দা। তিনি অস্ত্র মামলায় সাত বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি ছিলেন।

    নিহতের মেয়ে বৃষ্টি আমার দেশকে বলেন, ‘আমার বাবা কাশিমপুর কারাগারে স্ট্রোক করেন। সেখানে ভালো চিকিৎসার সুযোগ না থাকায় কেরানীগঞ্জ পাঠানো হয়। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির পর মারা যান তিনি।’

    তিনি আরো বলেন, ‘বাবা অসুস্থ পর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাননি। সঙ্গে সঙ্গে ভালো চিকিৎসা হলে হয়তো তিনি প্রাণে যেতেন।’

    চিকিৎসক সংকট চরমে

    দেশের ৭৪ কারা হাসপাতালের জন্য অনুমোদিত চিকিৎসকের স্থায়ী পদ রয়েছে ১৪৮টি। তবে বর্তমানে এসব হাসপাতালে স্থায়ী চিকিৎসক আছেন মাত্র দুজন। স্থায়ী চিকিৎসক না থাকায় সংশ্লিষ্ট জেলার সিভিল সার্জনের দপ্তর থেকে কারা হাসপাতালে অস্থায়ী ভিত্তিতে চিকিৎসক পাঠানো হয়, এ সংখ্যা ১০১। কারা কর্মকর্তারা জানান, এসব অস্থায়ী চিকিৎসক সকালে এসে দুপুরের পর অথবা বিকালে চলে যান। এতে রাতে কোনো বন্দি অসুস্থ হলে তাদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দিতে বাইরের হাসপাতালে পাঠাতে হয়। জরুরিভিত্তিতে কল করেও কোনো চিকিৎসক পাওয়া যায় না।

    সংকট নিরসনে যত উদ্যোগ

    কারা কর্তৃপক্ষ বন্দি মৃত্যু কমাতে জরুরিভিত্তিতে বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। কারাবন্দিদের উন্নত ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে (কেরানীগঞ্জ) আধুনিক কেন্দ্রীয় কারাগার হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জেও কেন্দ্রীয় হাসপাতাল স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

    কারাগারে চিকিৎসা সংকট দূর করতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারা অধিদপ্তরের অধীনে ৫৫ জন ডিপ্লোমা নার্স নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। তাদের দ্রুতই পদায়ন করা হবে। শূন্যপদে স্থায়ী চিকিৎসক নিয়োগ এবং সিভিল সার্জন অফিসের মাধ্যমে সংযুক্ত

    চিকিৎসকদের সংখ্যা বাড়ানোর কাজ চলছে। কারা স্বাস্থ্যসেবা খাতে ৪৪টি নতুন অ্যাম্বুলেন্স কেনা হচ্ছে।

    এছাড়াও কারা কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং বন্দিদের প্রয়োজনীয় প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা ও রোগ নির্ণয়ের সুবিধা বাড়াতে কারা সদর দপ্তরে আধুনিক প্যাথলজি ল্যাবরেটরি স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কারাগারে বন্দিদের মানসিক স্বাস্থ্য, মাদকাসক্তি এবং সংক্রামক ব্যাধি ব্যবস্থাপনার জন্য ‘গাইডলাইন ফর প্রিজন হেলথ ইন্টারভেনশনস ইন বাংলাদেশ’ তৈরি করা হয়েছে। অসুস্থতা প্রতিরোধের অংশ হিসেবে কারাগারগুলোতে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ এ একটি মিনারেল ড্রিংকিং ওয়াটার প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নত করা হচ্ছে।

    কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০০৩ সালে বন্দিদের জটিল রোগের চিকিৎসা দিতে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২–এ হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়। ২০০ শয্যার এই হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকলেও চিকিৎসক, নার্সসহ লোকবলের অভাবে হাসপাতালটির পুরোপুরি কার্যক্রম চালু করা যায়নি।

    মানবাধিকার কর্মীদের উদ্বেগ

    কারাগারে বন্দি মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খান লিটন। তিনি আমার দেশকে বলেন, বন্দি মৃত্যুর হার বাড়ছে, এটা খুবই উদ্বেগের বিষয়। বন্দি মৃত্যুর বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষ আগে যেসব কথা বলেছেন, এখনো সেরকম কথাই বলছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে কারাগারে মৃত্যু বেড়েছে। এসব মৃত্যুর নেপথ্য কারণ খতিয়ে দেখা উচিত। কারা কর্তৃপক্ষ মৃত্যুর যেসব কারণ বলছে, সেটা না অন্য কোনো কারণ আছে যা আমরা জানি না।’

    নূর খান বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি বন্দি থাকা মানে তিনি রাষ্ট্রের হেফাজতে আছেন। তার মৃত্যুর দায় দিন শেষে রাষ্ট্রের। যদি তারা বলেন চিকিৎসক নেই, বিশেষায়িত হাসপাতাল নেই এটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। দেখতে হবে বন্দিদের থাকার ব্যবস্থা, খাবারের মান ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা সঠিক আছে কি না। আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা উচিত যে, কোন সময়, কোন বয়সি বন্দি বেশি মারা যাচ্ছে। সে আটকের সময় বা জিজ্ঞাসাবাদের সময় মারা যাচ্ছে কি না, সেটাও খতিয়ে দেখতে হবে। সব নাগরিকের জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।’

  • কারাগারে কুমির রাখার পরিকল্পনা স্থগিত

    কারাগারে কুমির রাখার পরিকল্পনা স্থগিত

    ইসরাইলের নেগেভ মরুভূমিতে অবস্থিত কেতজিওত কারাগারের চারপাশে কুমির রাখার পরিকল্পনা সাময়িকভাবে স্থগিত করে দিয়েছে ইসরাইলি আদালত। দেশটির উগ্র ডানপন্থী নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভিরের পরিকল্পনা অনুযায়ী গাজা থেকে আটক ফিলিস্তিনি বন্দিদের রাখা এই কারাগারের চারপাশে খনন করা পরিখায় কুমির ছাড়ার কথা ছিল। খবর আনাদোলুর।

    ইসরাইলের সরকারি সম্প্রচার মাধ্যম কান-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাণী অধিকার সংগঠন ‘লেট দ্য অ্যানিমালস লিভ’ এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আবেদন দাখিল করার পর রোববার সন্ধ্যায় জেরুজালেম জেলা আদালত এই সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

    বিচারক আভরাহাম রুবিন পরিবেশ সুরক্ষামন্ত্রী ইদিত সিলমানের এক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষকে যেকোনো পদক্ষেপ নিতে নিষেধ করেছেন। সিলমানের ওই সিদ্ধান্তে কুমিরকে ‘পোষা বন্যপ্রাণী’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছিল, যা আইনি কাঠামোয় কুমির স্থানান্তর ও কারাগারে রাখার অনুমতি দিত।

    কান জানায়, বেন-গাভির, সিলমান ও ইসরাইলি কারা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক আবেদন দাখিলের কয়েক ঘণ্টা পরই এই রায় আসে। এই বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে সিলমানের ১৫ জুলাইয়ের সিদ্ধান্ত, যার লক্ষ্য ছিল কারাগারে ‘প্রতিরোধমূলক ও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা’ হিসেবে কুমির ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া।

    আবেদনে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত কুমিরের আইনি মর্যাদা পরিবর্তন করে এবং সুরক্ষিত বন্যপ্রাণী হিসেবে তাদের ওপর প্রযোজ্য নিয়ন্ত্রণ ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থা প্রত্যাহার করে নেয়।

    কান-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরাইলি কারা কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যেই কারাগারের চারপাশে খাল খননসহ অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু করে দিয়েছিল, এবং জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় এই পাইলট প্রকল্পের জন্য প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ শেকেল (আনুমানিক ৬৯ লাখ মার্কিন ডলার) বরাদ্দ করেছিল।

    ২০২২ সালের শেষদিকে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বেন-গভির ফিলিস্তিনি বন্দিদের আটক পরিস্থিতি কঠোরতর করার তদারকি করে আসছেন, যার মধ্যে রয়েছে অনাহারে রাখা, চিকিৎসা অবহেলা, নির্যাতন ও একাকী বন্দিত্বের মতো নীতি। ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ ফিলিস্তিনি বন্দি—নারী ও শিশুসহ—ইসরাইলি কারাগারে কঠোর পরিস্থিতিতে আটক রয়েছেন, যাদের মধ্যে বহুজনের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ, যার কারণ হিসেবে অনাহার, নির্যাতন ও চিকিৎসা অবহেলাকে দায়ী করা হয়েছে।

  • খুলনায় নির্জনা হত্যা: আদালতে বাবার দায় স্বীকার, কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ

    খুলনায় নির্জনা হত্যা: আদালতে বাবার দায় স্বীকার, কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ

    খুলনায় কিশোরী নির্জনা হত্যা মামলায় বাবা আকাশ আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। আজ রোববার খুলনার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-১ এর বিচারক মো. আসাদুর জামান তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করেন। পরে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

    এর আগে শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে ডুমুরিয়া উপজেলার বাজারের একটি দোকান থেকে র‌্যাব ও খুলনা সদর থানা পুলিশ আকাশকে গ্রেপ্তার করে। এরও আগে গত ১০ জুলাই নির্জনার মা আরিফা ইয়াসমিন সীমা মেয়ে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

    মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও খুলনা থানার এসআই আমিনুল ইসলাম বলেন, শনিবার দুপুরে গ্রেপ্তারের পর আকাশকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। আজ সকালে স্বেচ্ছায় আদালতে জবানবন্দি দিতে চাইলে দুপুরের পর তাঁকে আদালতে নেওয়া হয়।

    পুলিশের একটি সূত্র জানায়, গত ৮ জুলাই সকাল ১০টার কিছুক্ষণ পর স্বামী রনির সঙ্গে চলে যাওয়ার জন্য নগরীর বসুপাড়া বাঁশতলা এলাকার বাড়ি থেকে বের হয় নির্জনা। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে রাস্তা থেকে তুলে বাড়িতে নিয়ে আসেন।

    ওই দিন বিকেলে মা সীমার সঙ্গে নির্জনার কথা কাটাকাটি হয়। এ সময় নির্জনা মায়ের গায়ে হাত তোলে। পরে মায়ের গলা টিপে ধরে নির্জনা। তখন বাবা আকাশ কাঠের চেলা দিয়ে শাসন করতে গেলে সেটি গিয়ে নির্জনার মাথায় লাগে বলে সূত্রটি জানায়। পরে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তাঁরা।

    এরপর লাশ গুম করার জন্য বাবা কালো রঙের লুঙ্গি দিয়ে মেয়ের হাত-পা বেঁধে ফেলেন বলে পুলিশ সূত্রের দাবি। পরে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে মরদেহটি দোতলা থেকে নিচে নামানো হয়। কয়েকবার মোটরসাইকেলে মরদেহ তোলার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত তা তুলতে সক্ষম হন তারা।

    পরে মোটরসাইকেলে করে মরদেহ নিয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘোরেন আকাশ। কোথায় মরদেহ ফেলা হবে, তা ঠিক করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত শহরতলীর প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার একটি নির্জন সড়কে লাশ ফেলে দেওয়া হয়। বাড়ি ফিরে রক্ত মুছে ফেলেন তাঁরা। রাতে উভয়েই কান্নাকাটি করেন এবং সকালে পালিয়ে যান।

    খুলনা সদর থানার ওসি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বস্তাবন্দী মরদেহ উদ্ধারের পর হত্যাকাণ্ডের কারণ প্রথমে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পিবিআই ও সিআইডিও প্রথমে পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি। ঘটনার দিন রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রকাশ করা হয়। পরদিন বিকেলে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা হয়।

    ওসি আরও বলেন, মা-বাবাকে একাধিকবার ফোন দিয়েও তাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে নির্জনার মা সীমাকে থানায় আনা হয়। প্রথমদিকে মেয়ে হত্যার বিষয়ে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি। পরে বিস্তারিত তথ্য দেন।

    পুলিশ জানায়, ঘটনার ছয় দিন পর আকাশের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। ১০ দিন পর ডুমুরিয়া উপজেলার বাজারের একটি চায়ের দোকান থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

  • দুর্নীতির মামলায় কাস্টমসের ১১ কর্মকর্তা কারাগারে

    দুর্নীতির মামলায় কাস্টমসের ১১ কর্মকর্তা কারাগারে

    সাড়ে ১৮ কোটি টাকার মানিলন্ডারিং ও প্রণোদনার ৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলায় ১১ কাস্টমস কর্মকর্তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।আসামিরা স্থায়ী জামিনের আবেদন করলে আজ রোববার ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. শাহজাহান কবির এ আদেশ দিয়েছেন।

    কারাগারে যাওয়া আসামিরা হলেন— এনবিআরের কাস্টমস বিভাগের সহকারী কমিশনার জাহাঙ্গীর কবির ও মবিন উল ইসলাম, সাবেক সহকারী কমিশনার মো. জয়নাল আবেদীন, রাজস্ব কর্মকর্তা জমির হোসেন, রাজস্ব কর্মকর্তা এ এইচ এম নজরুল ইসলাম, আমির হোসেন সরকার, গৌরাঙ্গ চন্দ্র চৌধুরী, ফরিদ উদ্দিন সরকার ও মো. মঞ্জুরুল হক, সাবেক রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আব্দুস সাত্তার ও বাসুদেব পালক।

    এ বিষয়ে দুদকের প্রসিকিউটর দেলোয়ার জাহান রুমির বলেন, ‘এই ১১ আসামি উচ্চ আদালত থেকে অন্তবর্তীকালীন জামিন পেয়ে গত ১৬ এপ্রিল তারা আত্মসমর্পণ করেন। ওইদিন আদালত তাদের ১২ জুলাই পর্যন্ত জামিন দেন। সে অনুযায়ী রোববার তারা স্থায়ী জামিন চেয়ে আবেদন করে। দুদকের পক্ষে আমরা বিরোধিতা করি। শুনানি শেষে আদালত জামিন বাতিল করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।

    পাঁচ দেশে রপ্তানির নামে সাড়ে ১৮ কোটি টাকার মানিলন্ডারিং ও প্রণোদনার ৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১১ কাস্টমস কর্মকর্তাসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর এই মামলা করেন দুদকের উপ-পরিচালক মো. আহসান উদ্দিন।

    মামলার বিবরণে বলা হয়— আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, কানাডা ও সিঙ্গাপুরে পণ্য রফতানি দেখিয়ে দো এম্পেক্স লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যাংক জমা হয়। শুধু তাই নয় ৩৪টি রফতানি চালানের মূল্যবাবদ প্রণোদনা হিসাবে প্রায় ৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা উত্তোলন ও আত্মসাৎ হয়েছে। অথচ বাস্তবে কোনো রফতানি হয়নি। ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দো এম্পেক্স লিমিটেডের মোট ৪১টি বিল অব এক্সপোর্ট দাখিল করে সরকারের প্রণোদনা গ্রহণ করে।

    যার মধ্যে ৭ বিল অব এক্সপোর্টের বিপরীতে কৃষি জাতীয় পণ্য রপ্তানির সত্যতা পাওয়া গেলেও ৩৪টি বিল অব এক্সপোর্টের বিপরীতে কোনো পণ্যই বিদেশে রফতানি হয়নি। অথচ পণ্য রফতানির বিপরীতে অগ্রিম হিসাবে পুরো অর্থ ২২ লাখ ১৮ হাজার ১৭.৪৪ মার্কিন ডলার অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে প্রত্যাবাসন হয়েছে। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ১৮ কোটি ৬০ লাখ ৯১ হাজার ৪০৪ টাকা। রপ্তানি দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ৩ কোটি ৭১ লাখ ৮১ হাজার টাকা নগদ প্রণোদনা উত্তোলন ও আত্মসাৎ করেছেন আসামিরা।