কবরে কী

  • প্রথম রাত কবরে কী ঘটে

    প্রথম রাত কবরে কী ঘটে

    ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, মানুষের মৃত্যুর পর থেকে কেয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত সময়কে বলা হয় ‘বরজখ’। এটি দুনিয়ার জীবন ও পরকালের মধ্যবর্তী এক জগৎ। মৃত্যুর পর মানুষের পরকালীন জীবনের সূচনা হয় কবর থেকেই। স্বজনেরা দাফন শেষে ফিরে যাওয়ার পর মৃত ব্যক্তির জন্য শুরু হয় এক ভিন্ন বাস্তবতা, যেখানে তাকে মুখোমুখি হতে হয় নানা পরীক্ষা ও জিজ্ঞাসাবাদের।

    কবরের গুরুত্ব বোঝাতে হজরত উসমান (রা.)-এর একটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়। তিনি কবরের পাশে দাঁড়ালে কাঁদতেন। এর কারণ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কবরকে পরকালের প্রথম ধাপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সেখানে মুক্তি লাভ করতে পারলে পরবর্তী ধাপগুলো সহজ হয়ে যায়। আর সেখানে সফল হতে না পারলে পরবর্তী পরীক্ষাগুলো আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

    কবরের প্রথম অভিজ্ঞতা ও চাপ
    দাফন শেষে স্বজনেরা যখন কবরস্থান ছেড়ে চলে যান, তখন মৃত ব্যক্তি তাদের জুতার শব্দও শুনতে পান বলে হাদিসে বর্ণনা রয়েছে। এরপর কবরের জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতাগুলোর একটি হলো কবরের চাপ, যা ইসলামি পরিভাষায় ‘দাবগাতুল কবর’ নামে পরিচিত।

    ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, কবরের মাটি মৃত ব্যক্তিকে চারদিক থেকে চেপে ধরে। এ অভিজ্ঞতা থেকে কেউ সম্পূর্ণ মুক্ত নন। তবে নেককার ও পাপী ব্যক্তির ক্ষেত্রে এর প্রকৃতি ও তীব্রতা ভিন্ন হয়ে থাকে বলে বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে। নেককারের জন্য তা মমতাময়ী আলিঙ্গনের মতো হলেও পাপীর জন্য তা অত্যন্ত কঠিন বলে বর্ণনা করা হয়েছে।মদিনার বিশিষ্ট সাহাবি সাদ ইবনে মুয়াজ (রা.)-এর মৃত্যুর পর মহানবী (সা.) কবরের চাপ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘কবরের একটি চাপ আছে; যদি কেউ এই চাপ থেকে রেহাই পেত, তবে সাদ ইবনে মুয়াজ রেহাই পেত।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ২০৫৪)

    এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, কবরের চাপ পরকালীন জীবনের একটি অবধারিত অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচিত।

    মুনকার ও নাকিরের জিজ্ঞাসাবাদ
    কবরের পরবর্তী পর্যায়ে মৃত ব্যক্তির কাছে উপস্থিত হন দুই ফেরেশতা—‘মুনকার’ ও ‘নাকির’। হাদিসে তাদের চেহারা ও কণ্ঠস্বরের কঠোরতার বর্ণনা পাওয়া যায়। তারা মৃত ব্যক্তিকে বসিয়ে তিনটি মৌলিক প্রশ্ন করেন। প্রশ্নগুলো হলো—তোমার রব কে? তোমার ধর্ম কী? আর মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে তুমি কী বলতে?

    সুনানে আবু দাউদের ৪৭৫৩ নম্বর হাদিসে এই জিজ্ঞাসাবাদের বিবরণ এসেছে।

    ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, কেবল পার্থিব জ্ঞান, মুখস্থবিদ্যা কিংবা মুখে বলা কোনো উত্তর দিয়ে এ পরীক্ষায় সফল হওয়া সম্ভব নয়। বরং দুনিয়ার জীবনে যার ঈমান দৃঢ় ছিল এবং যে ইসলামি নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করেছে, আল্লাহ তাকে সঠিক উত্তর দেওয়ার সামর্থ্য দান করবেন।

    পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ মুমিনদের ইহকাল ও পরকালে (কবরে) শাশ্বত বাণীর ওপর সুদৃঢ় রাখেন…।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ২৭)

    এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে কাসির বলেছেন, কবরের মধ্যে মুনকার ও নাকিরের প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার সময় মুমিনদের অবিচল রাখা এবং সঠিক উত্তর দেওয়ার তাওফিক দেওয়ার বিষয়টি এখানে তুলে ধরা হয়েছে। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৪/৫০৬, দারু তাইয়িবাহ, রিয়াদ, ১৯৯৯)

    নেক আমল যেভাবে পাশে থাকবে
    কবরের জীবনে মানুষের দুনিয়ার আমল বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ইসলামি বর্ণনায় নেক আমলকে এমন এক সঙ্গী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা মৃত্যুর পরও মানুষের পাশে থাকবে এবং তাকে সুরক্ষা দেবে।

    বর্ণনা অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখার পর তার নামাজ মাথার কাছে, রোজা ডান পাশে, জাকাত বাঁ পাশে এবং দান-সদকা ও মানুষের সঙ্গে সদাচরণের মতো ভালো কাজগুলো পায়ের কাছে অবস্থান নেয়। ফেরেশতারা যে দিক দিয়েই আসতে চান, আমলগুলো সেদিক থেকে তাকে রক্ষা করার ভূমিকা পালন করে। (আল-কুরতুবি, আত-তাজকিরাহ বি-আহওয়ালিল মাওতা ওয়া উমুরিল আখিরাহ, পৃষ্ঠা ১৫৪, মাকতাবাতুল বুখারি, কায়রো, ২০০৮)

    অর্থাৎ, মানুষের জীবদ্দশায় করা ভালো কাজগুলোই পরকালীন জীবনে তার জন্য কল্যাণের কারণ হতে পারে। তাই ইসলামি শিক্ষায় ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ, দান-সদকা এবং নৈতিক জীবনযাপনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

    জান্নাতের বাগান, নাকি জাহান্নামের গর্ত
    মুনকার ও নাকিরের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পর মৃত ব্যক্তির পরকালীন অবস্থার বিষয়ে হাদিসে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। সঠিক উত্তর দিতে পারলে আসমান থেকে ঘোষণা আসে, ‘আমার বান্দা সত্য বলেছে।’ এরপর তার কবর প্রশস্ত করে দেওয়া হয়। সেখানে জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দেওয়া হয় এবং জান্নাতের দিকে একটি দরজা খুলে দেওয়া হয়। সেই দরজা দিয়ে জান্নাতের সুগন্ধ ও প্রশান্তির বাতাস প্রবেশ করে।

    অন্যদিকে, প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর দিতে ব্যর্থ হলে তার জন্য কবরের পরিস্থিতি কঠিন হয়ে ওঠে। হাদিসের বর্ণনায় এ অবস্থাকে জাহান্নামের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

    মহানবী (সা.) কবরের পরিণতি সম্পর্কে বলেছেন, ‘কবর হলো জান্নাতের বাগানগুলোর মধ্য থেকে একটি বাগান অথবা জাহান্নামের গর্তগুলোর মধ্য থেকে একটি গর্ত।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৬০)

    দাফনের পর স্বজনদের করণীয়
    মৃত ব্যক্তির কবরজীবনের শুরুতে স্বজন ও উপস্থিত মুসল্লিদেরও কিছু করণীয় রয়েছে। ইসলামি নির্দেশনা অনুযায়ী, দাফন শেষ করেই কবরস্থান ত্যাগ না করে কিছু সময় মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা সুন্নত।

    মহানবী (সা.) কোনো মৃত ব্যক্তির দাফন সম্পন্ন করার পর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সাহাবিদের উদ্দেশে বলতেন, ‘তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও এবং সে যেন (জিজ্ঞাসাবাদের সময়) অবিচল থাকতে পারে, সেই দোয়া করো; কারণ এখনই তাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩২২১)

    এ কারণে দাফনের পর মৃত ব্যক্তির মাগফিরাত কামনা এবং কবরের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় তার অবিচল থাকার জন্য দোয়া করাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

    কবরের জীবন মানুষের দৃষ্টির আড়ালে থাকা এক অদৃশ্য জগৎ। ইসলামি বিশ্বাসে এটি মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাই দুনিয়ার জীবনকে শুধু পার্থিব অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ঈমান, ইবাদত, নৈতিকতা ও মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে পরকালের প্রস্তুতি নেওয়ার শিক্ষা দেয় ইসলাম।