কওমি

  • কওমি অকওমি বিরোধ কাম্য নয়

    কওমি অকওমি বিরোধ কাম্য নয়

    রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: “যে ব্যক্তি জাহেলিয়াতের স্লোগান বা গোত্রভিত্তিক অন্ধ অহংকারের দিকে মানুষকে ডাকবে, সে জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।”মুহাম্মদ আবুল হুসাইন

    ‘কওমী’ (قومي) একটি আরবি শব্দ, যার সাধারণ বা আভিধানিক অর্থ হলো ‘জাতীয়’ (National), গোত্রীয় বা সম্প্রদায়গত। এটি আরবি ‘কওম’ (قوم) শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ জাতি, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়। তবে বাংলাদেশে এবং ভারতীয় উপমহাদেশে ‘কওমী’ শব্দটি একটি বিশেষ পারিভাষিক অর্থে ব্যবহৃত হয়, যা বৈশ্বিক সাধারণ অর্থের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন:

    • বেসরকারি বা জাতীয় ঐতিহ্যবাহী: বাংলাদেশে ‘কওমী মাদ্রাসা’ বলতে এমন শিক্ষাব্যবস্থাকে বোঝায় যা সরকারি অনুদান বা নিয়ন্ত্রণ মুক্ত এবং সম্পূর্ণভাবে জনসাধারণ ও মুসলিম সম্প্রদায়ের সাহায্য-সহযোগিতায় পরিচালিত হয়।
    • ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য: এই অর্থে ‘কওমী’ বলতে বোঝায় যা নির্দিষ্ট কোনো সরকারের অধীনে নয়, বরং মুসলিম ‘কওম’ বা জাতির নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য জনমানুষের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।

    সহজ কথায়, বিশ্বজুড়ে আরবি ভাষায় ‘কওমী’ মানে ‘রাষ্ট্রীয় বা জাতীয়’ (যেমন: আল-শাবাব আল-কওমী বা জাতীয় যুব সংস্থা), কিন্তু আমাদের দেশে এর প্রায়োগিক অর্থ ‘বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা কওমের (জনসাধারণের) নিজস্ব’।

    ইসলামে নিজের গোত্র বা বংশকে কেবল পারস্পরিক পরিচিতি এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যম হিসেবে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যখনই এই গোত্র বা বংশের পরিচয় “জাতীয়তাবাদ” বা “অন্ধ দলপ্রীতি” (আসাবিয়্যাহ)-তে রূপ নেয়—যেখানে হক-বাতিলের তোয়াক্কা না করে কেবল নিজের দলের বা বংশের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করা হয়—তখনই তা ইসলামে কঠোরভাবে হারাম এবং জাহেলিয়াত হিসেবে গণ্য হয়।

    হারিস আল-আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: “যে ব্যক্তি জাহেলিয়াতের স্লোগান বা গোত্রভিত্তিক অন্ধ অহংকারের দিকে মানুষকে ডাকবে, সে জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।”

    সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! সে যদি সালাত (নামাজ) আদায় করে এবং সিয়াম (রোজা) পালন করে, তবুও?”

    রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “হ্যাঁ, সে যদি নামাজ পড়ে, রোজা রাখে এবং নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করে, তবুও (সে জাহান্নামী)। অতএব, তোমরা আল্লাহর দেওয়া নামে ডাকো, যিনি তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলিম, মুমিন এবং আল্লাহর বান্দা।” (মুসনাদে আহমাদ, তিরমিজি)

    হাদিসটি ইমাম আহমাদ তাঁর ‘মুসনাদ’ গ্রন্থে এবং ইমাম তিরমিজি (হাদিসটি হাসান ও সহিহ বলেছেন) সংকলন করেছেন।

    অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি, বর্তমানে কওমি ঘরানার আলেমরা নিজেদেরকে একটি স্বতন্ত্র গোষ্ঠিতে পরিণত করেছেন। তারা নিজেদেরকে একমাত্র ‘‘হকপন্থী ও সর্বশ্রেষ্ঠ’ এবং কওমী ঘরানার বাইরের আলেমদেরকে বিভ্রান্ত ও নিকৃষ্ট মনে করে থাকেন। তাদের কারণে আলেমদের মধ্যে অনৈক্য ও বিভেদ বাড়ছে।

    ইসলাম-পূর্ব আরবে (জাহেলী যুগে) মানুষের মূল নীতিই ছিল: “তোমার ভাই (গোত্রের লোক) জালেম হোক বা মজলুম হোক, তাকে অন্ধভাবে সাহায্য করো।” অর্থাৎ, নিজের গোত্রের লোক অন্যায় করলেও তার পক্ষ নিয়ে অন্য গোত্রের ওপর আক্রমণ করা হতো।

    ইসলাম এসে এই অন্ধ জাতীয়তাবাদকে উপড়ে ফেলে ন্যায়বিচারের সার্বজনীন নীতি প্রতিষ্ঠা করে। ইসলাম বলে, নিজের বাবা, সন্তান বা গোত্র যদি অন্যায় করে, তবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সত্যের পক্ষ নিতে হবে।

    ইসলামে দেশপ্রেম (নিজের জন্মভূমিকে ভালোবাসা এবং তার কল্যাণ কামনা করা) এবং জাতীয়তাবাদ (বংশ বা ভৌগোলিক সীমানার ভিত্তিতে নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা এবং অন্ধ পক্ষাবলম্বন করা)—এই দুটির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে:

    • অনুমোদিত ভালোবাসা: নিজের পরিবার, গোত্র বা দেশকে ভালোবাসা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও নিজের জন্মভূমি মক্কাকে ভীষণ ভালোবাসতেন।
    • নিষিদ্ধ জাতীয়তাবাদ: যখন এই ভালোবাসা অন্ধ রূপ নেয় এবং মানুষ বলতে শুরু করে “আমার জাতি বা দেশ ভুল করলেও আমি তার পক্ষেই থাকব” অথবা “আমাদের বংশই সেরা, বাকিরা নিকৃষ্ট”—তখনই তা ‘জাহেলিয়াত’ বা হারাম জাতীয়তাবাদে রূপ নেয়।

    সারসংক্ষেপ: আপনার উত্থাপিত পয়েন্টটি সম্পূর্ণ সঠিক। ইসলামে বংশীয় বা গোত্রীয় অহংকার এবং সেই ভিত্তিতে দলাদলি করা স্পষ্ট হারাম। একজন মুসলমানের আসল পরিচয় সে মুসলিম এবং উম্মাহর অংশ; বংশ বা গোত্র কেবল একটি সামাজিক পরিচিতি মাত্র।

    ইসলামী পরিভাষায় এবং আকাবিরদের সোনালী ইতিহাসে এই ধরনের সংকীর্ণ মানসিকতার কোনো স্থান নেই। কওমি ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা ও পূর্বসূরি আকাবিরদের মূল আদর্শ যেখানে ছিল উদারতা এবং উম্মাহর ঐক্য, সেখানে বর্তমান সময়ে এসে কোনো কোনো মহলে যে সংকীর্ণতা বা দলপ্রীতি দেখা যাচ্ছে, তা মূলত পূর্বে আলোচিত সেই ‘আসাবিয়্যাহ’ বা অন্ধ গোষ্ঠীপ্রীতিরই একটি আধুনিক রূপ।

    ইসলামে ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ বা সঠিক পথের পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। ঈমানের মূল বিষয়গুলো ঠিক রেখে ফিকহী বা কার্যগত বিষয়ে (যেমন: হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী, হাম্বলী, কিংবা সালাফী ও আহলে হাদিস ভাইদের মধ্যে) মতপার্থক্য থাকাটা স্বাভাবিক এবং এটি সাহাবিদের যুগ থেকেই চলে আসছে।

    • কোনো নির্দিষ্ট মাদ্রাসা, দল, বা সিলসিলার সাথে যুক্ত থাকাই পরিত্রাণের একমাত্র গ্যারান্টি হতে পারে না।
    • পূর্বসূরি ওলামায়ে কেরাম কখনোই নিজেদের মতামতকে একমাত্র ধ্রুব সত্য এবং অন্যদের মতামতকে বাতিল বা নিকৃষ্ট মনে করতেন না। তারা বলতেন: “আমার মতামত সঠিক, তবে এতে ভুলের সম্ভাবনা আছে; আর অন্যের মতামত ভুল মনে হলেও তাতে সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা আছে।”

    কুরআন ও হাদিসে আলেমদেরকে উম্মাহর পথপ্রদর্শক এবং নবীগণের উত্তরাধিকারী বলা হয়েছে। কিন্তু যখন পথপ্রদর্শকদের মধ্যেই কাদা ছোড়াছুড়ি, অহংকার এবং অন্যকে তুচ্ছজ্ঞান করার প্রবণতা বাড়ে, তখন সাধারণ মানুষের মাঝে দ্বীনের প্রতি এক ধরনের অনীহা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) দ্বীনি বিষয়ে কঠোরতা ও সংকীর্ণতা পরিহার করে সহজীকরণ ও মানুষকে কাছে টানার নির্দেশ দিয়েছেন।

    পূর্বে আমরা যে হাদিসটি আলোচনা করেছি—যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) গোত্র বা বংশের ভিত্তিতে অন্ধ অহংকারকে ‘জাহেলিয়াত’ বলেছেন—বর্তমান যুগে তার প্রয়োগ কেবল বংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমান যুগে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, পীর-মুরিদির সিলসিলা বা মাদ্রাসার ঘরানাকে কেন্দ্র করে যদি কেউ অন্ধ দলপ্রীতি তৈরি করে এবং নিজের দলের বাইরের সব সৎ মানুষকেও ‘ভ্রান্ত বা নিকৃষ্ট’ মনে করে, তবে তাও এক প্রকার সাংগঠনিক বা ঘরানাভিত্তিক আসাবিয়্যাহ, যা ইসলামে পুরোপুরি নিন্দনীয়।

    উম্মাহর এই সংকটের মাঝেও কওমি ঘরানা এবং অন্যান্য ঘরানার মধ্যেও এমন অনেক উদারপন্থী, মুখলিস ও দূরদর্শী আলেম আছেন, যারা উম্মাহর ঐক্যের জন্য কাজ করছেন। তারা অন্য ঘরানার আলেমদের ইলম ও আমলকে শ্রদ্ধা করেন এবং পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি দূর করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাই সংকীর্ণতা যাদের মধ্যে রয়েছে, সমালোচনাটা মূলত সেই বিশেষ মানসিকতার প্রতি, পুরো ঘরানার প্রতি নয়।

    ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে ব্যক্তিকে তার দল বা ঘরানা দিয়ে নয়, বরং তার ইলম, তাকওয়া এবং কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণের মানদণ্ডে মূল্যায়ন করতে। ওলামায়ে কেরামের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি ও বিভেদ দূর করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও উম্মাহর বৃহত্তর ঐক্য ফিরিয়ে আনা এই সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

    ইসলামে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক গবেষণার (ইজতিহাদ) সুযোগ থাকার কারণে মতপার্থক্য হওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ি এবং বড় বড় ইমামদের মধ্যেও দ্বীনের বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য ছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে আমাদের বর্তমান যুগের মতো কাদা ছোড়াছুড়ি বা হিংসা-বিদ্বেষ ছিল না।

    ইসলামী শরীয়তে মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে যে সুনির্দিষ্ট আদব ও নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়েছে, তাকে ‘আদাবুল ইখতিলাফ’ (آداب الاختلاف) বা মতপার্থক্যের শিষ্টাচার বলা হয়। নিচে এর মূল নীতিমালাগুলো আলোচনা করা হলো:

    ১. নিয়তের ইখলাস (বিশুদ্ধ উদ্দেশ্য)

    যেকোনো দ্বীনি আলোচনায় মূল উদ্দেশ্য হতে হবে সত্যকে উন্মোচন করা, নিজের অহংকার প্রকাশ বা অন্যকে হারিয়ে দেওয়া নয়। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলতেন:

    “আমি যখনই কারো সাথে বিতর্ক করেছি, তখনই আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি যেন আল্লাহ সত্যকে আমার প্রতিপক্ষের মুখ দিয়ে প্রকাশ করেন (যাতে আমি তা মেনে নিতে পারি)।”

    ২. ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সংকীর্ণতা পরিহার

    ইসলামের মৌলিক বিষয় (আকিদা) ছাড়া শাখা-প্রশাখামূলক বা ফিকহী বিষয়ে (যেমন: সালাতের নিয়ম, আমিন জোরে বা আস্তে বলা ইত্যাদি) একাধিক সঠিক মত থাকার সুযোগ রয়েছে।

    • কোনো একটি মতকে নিজের জন্য পছন্দ করার অর্থ এই নয় যে, অন্য মতটি বাতিল বা নিকৃষ্ট।
    • সাহাবিদের যুগে একদল সাহাবি আসরের সালাত পথিমধ্যে পড়েছিলেন, অন্য দল বনু কুরাইজায় গিয়ে পড়েছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো দলকেই তিরস্কার করেননি।

    ৩. ঢালাওভাবে কাফের, ফাসেক বা গোমরাহ বলার প্রবণতা বর্জন

    বর্তমানে সামান্য মতপার্থক্যের কারণেই একে অপরকে ‘ভ্রান্ত’, ‘বাতিল’ বা ‘জাহান্নামী’ বলে ফতোয়া দেওয়ার একটি ভয়াবহ প্রবণতা দেখা যায়। অথচ হাদিসে এসেছে, কেউ যদি তার কোনো মুসলিম ভাইকে কাফের বলে এবং সে যদি বাস্তবে তা না হয়, তবে সেই ফতোয়া ফতোয়াদানকারীর নিজের ওপরই বর্তায় (সহিহ বুখারি)। তাই সুনির্দিষ্ট শরয়ী দলীল ছাড়া কাউকে বিভ্রান্ত আখ্যা দেওয়া যাবে না।

    ৪. ‘আল-ইনসাফ’ বা ন্যায়পরায়ণতা রক্ষা করা

    কারো সাথে মতের অমিল হলেও তার ভেতরের ভালো গুণ, দ্বীনের জন্য তার কুরবানি এবং তার ইলমের অবমূল্যায়ন করা যাবে না। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: “কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদের এমন উত্তেজিত না করে যে, তোমরা ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করবে।” (সূরা আল-মায়েদাহ: ৮)। অর্থাৎ, প্রতিপক্ষের ভালো কাজেরও স্বীকৃতি দিতে হবে।

    ৫. ‘মায়রুফ’ বা স্বীকৃত বিষয়ে কঠোরতা না করা

    ইসলামী ফিকহের একটি বড় নীতি হলো—যেসব বিষয়ে ওলামায়ে কেরামের মাঝে প্রাচীনকাল থেকেই একাধিক মতামত চলে আসছে (ইখতিলাফী বিষয়), সেসব বিষয়ে সাধারণ মানুষকে কোনো একটি মত মানার জন্য জোরাজুরি করা বা তা নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ করা নিষিদ্ধ।

    ৬. ভাষার শালীনতা ও গীবত পরিহার

    ইসলামে যে কারো পেছনে তার সমালোচনা বা গীবত করা হারাম। অথচ বর্তমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক ঘরানার মানুষ অন্য ঘরানার আলেমের চরিত্র হনন ও ব্যঙ্গাত্মক উপনাম দিতে দ্বিধাবোধ করছে না। মতপার্থক্য প্রকাশ করতে হবে অত্যন্ত নরম ও সুন্দর ভাষায়, যুক্তি দিয়ে; গালি বা উপহাস দিয়ে নয়।

    একবার ইমাম শাফেয়ী (রহ.) তাঁর প্রিয় ছাত্র ইউনুস ইবনে আবদিল আলার সাথে একটি ফিকহী বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন। বিতর্কের পর ছাত্র রাগ করে বাড়ি চলে যান। রাতে ইমাম শাফেয়ী স্বয়ং ছাত্রের বাড়িতে গিয়ে হাত ধরে বললেন, “হে ইউনুস! একটি মাত্র মাসআলায় আমাদের মিল হয়নি দেখে কি আমাদের শত বছরের ভাই ভাই সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে যাবে?”

    আজকের ওলামায়ে কেরাম ও সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে যদি আকাবিরদের এই উদারতা ও শিষ্টাচার ফিরে আসে, তবেই কেবল উম্মাহর ঐক্য সম্ভব।

  • কওমি মাদ্রাসায় শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে নির্দেশনা জারি

    কওমি মাদ্রাসায় শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে নির্দেশনা জারি

    কওমি মাদ্রাসায় ছাত্র-ছাত্রীদের শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ। একই সঙ্গে দেশের ছয়টি কওমি মাদ্রাসা বোর্ডের অধিভুক্ত সব মাদ্রাসায় ছাত্র-ছাত্রী সুরক্ষা কমিটি গঠন বা পুনর্গঠন করে তা অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

    শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) আল-হাইআতুল উলয়ার চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসানের নির্দেশে জারি করা এক নির্দেশনায় এসব কথা বলা হয়। সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কওমি মাদ্রাসায় ছাত্র নির্যাতন এবং কতিপয় ব্যক্তির অনৈতিক কার্যকলাপসংক্রান্ত সংবাদ ও অভিযোগ প্রচারের প্রেক্ষাপটে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

    নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীর সংশোধন ও কল্যাণই শাসনের একমাত্র উদ্দেশ্য হতে হবে। কোনো অবস্থাতেই তা প্রতিশোধমূলক হওয়া যাবে না। রাগের অবস্থায় শিক্ষার্থীকে শাস্তি না দেওয়ার পাশাপাশি শাসনের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রথমে নম্রভাবে সতর্ক করা, প্রয়োজন হলে মৃদু ভর্ৎসনা এবং এরপর রাগ-ধমকের সুযোগ রাখা হয়েছে। একান্ত প্রয়োজন হলে সর্বশেষ ধাপে অভিভাবককে ডেকে লিখিতভাবে অবহিত করে অভিভাবকসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

    তবে কোনো অবস্থাতেই ছাত্র-ছাত্রীকে শাস্তিস্বরূপ প্রহার করা যাবে না বলে নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে। লাঠি, বেত বা অন্য কোনো যন্ত্র দিয়ে আঘাত করা, মুখমণ্ডল, মাথা বা স্পর্শকাতর অঙ্গে আঘাত করা এবং হাড় ভাঙা, রক্তপাত বা দাগ সৃষ্টি হয় এমন যেকোনো শাস্তি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

    এর পাশাপাশি প্রকাশ্যে অপমান, গালমন্দ, তিরস্কার, কটু ভাষা বা ঘৃণাসূচক উপনামে সম্বোধনসহ যেকোনো ধরনের মানসিক নির্যাতনমূলক আচরণ পরিহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব নির্দেশনা লঙ্ঘনকারী শিক্ষক বা শিক্ষিকাকে শরিয়ত ও প্রচলিত বিধি অনুযায়ী জবাবদিহির আওতায় আনা হবে বলে জানানো হয়েছে।আল-হাইআতুল উলয়া বলেছে, কোনো ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে অপরাধ বা অনৈতিক কাজে জড়িত থাকলে তার সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করা এবং অপরাধীকে কোনো ধরনের প্রশ্রয় না দেওয়াই তাদের নীতি। তবে বিচ্ছিন্ন ঘটনার ভিত্তিতে সমগ্র কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং ব্যক্তিবিশেষের অপরাধের দায় মাদ্রাসা, বোর্ড বা সামগ্রিক আলেম-উলামা ও ছাত্রসমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যৌক্তিক নয় বলেও নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

    সাত দিনের মধ্যে তদন্ত

    প্রতিটি মাদ্রাসায় ছাত্র-ছাত্রী সুরক্ষা কমিটি গঠন বা পুনর্গঠন করে সক্রিয় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অসদাচরণ, নির্যাতন বা হয়রানির অভিযোগ কমিটির কাছে জানানোর সুযোগ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

    অভিযোগ পাওয়ার পর সাত দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত চলাকালে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার কথাও বলা হয়েছে।

    কোনো মাদ্রাসায় সুরক্ষা কমিটি না থাকা, নিষ্ক্রিয় থাকা বা অভিযোগ পাওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসার ইলহাক স্থগিত বা বাতিলের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

    ইসলাহী কার্যক্রম ও অভিভাবক সমাবেশ

    নির্দেশনায় প্রতিটি মাদ্রাসায় শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত ইসলাহী মজলিস আয়োজনের কথা বলা হয়েছে। নবনিযুক্ত শিক্ষকদের জন্য বাধ্যতামূলক তারবিয়াতি মজলিসের ব্যবস্থা এবং অভিভাবক-সমাবেশের আয়োজন বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

    অভিভাবকদের সঙ্গে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের যোগাযোগ ও আস্থার সম্পর্ক জোরদার করা এবং কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা দ্রুত কর্তৃপক্ষের নজরে আনার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

    মনিটরিং সেল ও হটলাইন

    মাদ্রাসার কার্যক্রম তদারকির জন্য প্রতিটি বোর্ডকে পৃথক মাদ্রাসা মনিটরিং সেল গঠন এবং অভিযোগ গ্রহণে পৃথক হটলাইন চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

    কোনো অভিযোগ পাওয়ার পর বোর্ড, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও সুরক্ষা কমিটিকে সমন্বিতভাবে তাৎক্ষণিক নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর চরিত্র ও বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়েও সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

    একই সঙ্গে মিথ্যা অপবাদ, ভিত্তিহীন সংবাদ বা মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার নিরপরাধ শিক্ষক, শিক্ষিকা, মুহতামিম বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বোর্ডগুলোর আইনজীবী প্যানেলের মাধ্যমে আইনগত প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজনে আল-হাইআতুল উলয়ার কেন্দ্রীয় হটলাইন নম্বর ০১৭০০-৭৬৩১৭৮ (হোয়াটসঅ্যাপ)-এ যোগাযোগ করা যাবে বলে নির্দেশনায় জানানো হয়েছে।

    আল-হাইআতুল উলয়ার চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসান স্বাক্ষরিত নির্দেশনায় দেশের ছয়টি কওমি মাদ্রাসা বোর্ড ও তাদের অধিভুক্ত মাদ্রাসাগুলোকে অনতিবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়েছে।

    নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, গত ১২ সেপ্টেম্বর আল-হাইআতুল উলয়ার চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির ৬৯তম সভা এবং এর আগে ২৯ জুলাই অনুষ্ঠিত সংশ্লিষ্ট সাবকমিটির সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নির্দেশনাটি প্রণয়ন করা হয়েছে। এটি তৈরির ক্ষেত্রে হাকিমুল উম্মত খ্যাত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী ও শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মদ যাকারিয়া কান্ধলভীসহ উলামায়ে দেওবন্দের তা‘লিম-তারবিয়তসংক্রান্ত রচনাবলি এবং প্রসিদ্ধ দীনি প্রতিষ্ঠানগুলোর ফতোয়া অনুসরণ করা হয়েছে বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

  • শাপলা গণহত্যার ছবি সংগ্রহশালায়, ডাকসু নেতাদের প্রশংসা

    শাপলা গণহত্যার ছবি সংগ্রহশালায়, ডাকসু নেতাদের প্রশংসা

    শিক্ষা ডেস্ক:

    ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে পরিচালিত গণহত্যা থেকে শুরু করে ২০২৪ সালে জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান—বাংলাদেশের আওয়ামী ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অধ্যায়গুলো স্থান পেয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায়। সংগ্রহশালায় শাপলা চত্বরে পরিচালিত নির্মম নির্যাতন এবং ছাত্রদের প্রতিরোধের ছবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। ডাকসুর এই সময়োপযোগী ও সাহসী উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে সাধুবাদ জানিয়েছেন দেশের কওমি অঙ্গনের আলেম সমাজ।২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমবেত আলেম, মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ওপর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের চালানো বর্বর দমনপীড়নই মূলত পরবর্তী ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রতিরোধের ভিত গড়ে দিয়েছিল। শাপলা চত্বরের সেই আত্মত্যাগ ও ক্ষোভের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে কোটা সংস্কার আন্দোলন রূপ নেয় সর্বাত্মক ফ্যাসিবাদবিরোধী এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানে। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময়ের এই লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত পতন ঘটে কর্তৃত্ববাদী শাসনের।প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের শাপলা গণহত্যায় অন্তত ৬১ জন শহীদ ও নিখোঁজ হন। আর ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শক্তির বুলেটে প্রাণ হারান এক হাজার চার শতাধিক মানুষ।

    আলেম নেতারা জানান, দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনা থেকেই। ডাকসুর সংগ্রহশালায় শাপলা চত্বরের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষিত হওয়ায় তরুণ প্রজন্ম জাতীয় ইতিহাসের এই অন্ধকার অধ্যায় ও ত্যাগের প্রকৃত সত্য জানতে পারবে। একই সঙ্গে কেবল ছবির প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ না থেকে জাতীয় ইতিহাস ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনে আলেম-ওলামাদের ত্যাগ ও অবদানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযথ মূল্যায়ন করারও আহ্বান জানান তারা।ডাকসু নেতাদের ধন্যবাদ জানিয়ে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নায়েবে আমির ও খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী বলেন, হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনের বিভিন্ন চিত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় ডাকসুর নেতারা রেখেছেন। আমরা এটাকে সাধুবাদ জানাই। কারণ, ২০১৩ সালে হেফাজতের ওপর যে ম্যাসাকার হয়েছে, এই ইতিহাস বাংলাদেশের সব মানুষের জানার প্রয়োজন আছে। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই একসময় দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকবেন। আমি মনে করি, যারা এই সংগ্রহশালায় এগুলো রেখেছে, তারা খুবই ভালো কাজ করেছে। এজন্য তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই।

    ডাকসুর সংগ্রহশালায় শাপলা গণ-আন্দোলনের স্মৃতিস্মারক যুক্ত করা বাংলাদেশের ইতিহাসকে পূর্ণাঙ্গভাবে দেখার একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ বলে মনে করেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের শাপলা সেকশনের গবেষক মুহিম মাহফুজ। তিনি বলেন, এজন্য আমি আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাতে চাই। কারণ, আমি শাপলাকে বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণআন্দোলনের প্রথম পর্ব এবং চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের সূচনাবিন্দু হিসেবে দেখি। ২০১৩ সালে শাপলা আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটেছিল, তার ধারাবাহিকতায় পরবর্তী বছরগুলোতে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম এগিয়েছে এবং চূড়ান্তভাবে ৩৬ জুলাই স্বৈরাচার পতনের মাধ্যমে তা সফল পরিণতি লাভ করেছে।

    তিনি আরও বলেন, তাই শাপলার ইতিহাস ছাড়া জুলাইয়ের ইতিহাস পূর্ণতা পাবে না। শাপলাকে ইতিহাসের যথাযথ জায়গায় স্থান দেওয়া মানে মহান জুলাই বিপ্লবের ঐতিহাসিক পটভূমি বুঝতে নতুন প্রজন্মকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেওয়া। আমি আশা করব, পরবর্তী ডাকসু নেতারা এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে এবং আরও সমৃদ্ধ করতে উদ্যোগী হবে।ডাকসুর মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থানে আলেম সমাজের অবদান এবং ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনাবলির আলোকচিত্র সংরক্ষণ নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার এ উদ্যোগের জন্য ডাকসু কর্তৃপক্ষকে ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সের আহ্বায়ক মাওলানা আশরাফ উদ্দিন মাহদি।তিনি বলেন, শাপলা চত্বরের সেই রাত বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি বেদনাবিধুর অধ্যায়। ডাকসুর সংগ্রহশালায় প্রদর্শিত আলোকচিত্রগুলো সেই রাতের সংঘাত, আহত মানুষের অসহায়ত্ব এবং ঘটনাস্থলের ভয়াবহ পরিস্থিতির স্মৃতি সামনে এনেছে। শাপলা চত্বরের সেই রাতের ঘটনাবলি নতুন প্রজন্মের সামনে সঠিক ইতিহাস হিসেবে তুলে ধরতে তথ্য-প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।

    শাপলা স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মাদ কামাল উদ্দিন বলেন, ডাকসু তাদের সংগ্রহশালায় ২০১৩ সালের শাপলা গণহত্যার আলোকচিত্র প্রদর্শন করায় শাপলা স্মৃতি সংসদের পক্ষ থেকে আমরা ডাকসুকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা জানাই। একই সঙ্গে শাপলা স্মৃতি সংসদ প্রকাশিত ‘শহীদনামা’ এই সংগ্রহশালায় সংরক্ষণ করায় আমরা আনন্দিত ও কৃতজ্ঞ।

    তিনি আরও বলেন, আমরা প্রত্যাশা করি, শাপলা গণহত্যার স্মৃতি ও ইতিহাস সংরক্ষণে ডাকসু আগামী দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা, প্রদর্শনী, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আয়োজন করবে। শাপলাকে ঘিরে ইতিহাস ও স্মৃতি সংরক্ষণের এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হোক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

    জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মাহ পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুফতি শামসুদ্দোহা আশরাফী বলেন, ২০১৩ সালের হেফাজতের আন্দোলন ছিল ঐতিহাসিক আন্দোলন। দেশ, দেশের মূল্যবোধ, দেশাত্মবোধ, দেশের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও তাহজিব-তামাদ্দুনের হেফাজতের জন্য এটা ছিল এক গণআন্দোলন। এটা ছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে এবং নাস্তিক্যবাদের উত্থানের বিরুদ্ধে। মৌলিকভাবে এই আন্দোলন দেশ এবং জাতির সুরক্ষার জন্যই ছিল। সুতরাং এটাকে অবশ্যই দেশের ইতিহাসের একটা বড় অংশ হিসেবেই বিবেচনা করা জরুরি।

    ডাকসু কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা মনে করি ডাকসু কর্তৃপক্ষ সেটা করেছে। তা করার মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছে। আমরা আশা করি, আগামী দিনে শুধু সংগ্রহে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশ গঠনে যখনই সুযোগ আসবে, তখন হেফাজতের এই ভূমিকাকে স্মরণ করে সংশ্লিষ্টদের মূল্যায়ন করবে। দেশ গঠনে হেফাজতের যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের যথাযোগ্য সম্মান দেওয়া হবে—এই প্রত্যাশাটুকু আমরা রাখি। ডাকসু কর্তৃপক্ষকে আমরা অবশ্যই ধন্যবাদ জানাই তাদের এই উদ্যোগ গ্রহণের জন্য।

    জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রচার সম্পাদক মুফতি ইমরানুল বারী সিরাজী বলেছেন, ‘হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ কোনো রাজনৈতিক সংগঠন নয়; এটি বাংলাদেশসহ বিশ্বের মুসলিম তৌহিদী জনতার একটি অরাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠন। হেফাজতে ইসলাম সবসময় ইসলাম, দেশ ও মানবতার পক্ষে কাজ করে আসছে। ২০২৪ সালের আন্দোলন এবং ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ইতিহাসসহ দেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশের যেকোনো আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস রচনা করতে গেলে হেফাজতে ইসলামকে বাদ দিয়ে ইতিহাস রচনার কোনো সুযোগ নেই।’

    মুফতি ইমরানুল বারী সিরাজী আরও বলেন, ‘যারা হেফাজতে ইসলামের ভূমিকা মূল্যায়ন করবেন, আমরা তাদের সাধুবাদ জানাই। তারা অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। তবে হেফাজতে ইসলাম সবসময়ই দেশের জন্য, ইসলামের জন্য কাজ করে আসছে এবং ভবিষ্যতেও করে যাবে। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ইসলাম, দেশ ও মানবতার কল্যাণে তার কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে।’