ট্যাগ ওসি

  • ‘পুলিশ কিছু করতে পারবে না’ অডিও ভাইরাল, ওসি প্রত্যাহার

    ‘পুলিশ কিছু করতে পারবে না’ অডিও ভাইরাল, ওসি প্রত্যাহার

    শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে পুলিশ কিছুই করতে পারবে না—এমন বক্তব্যের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

    পুলিশের একাধিক সূত্র অডিওর কণ্ঠটি তাঁর বলে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে। তবে আজ বৃহস্পতিবার জারি করা ডিএমপির আদেশে প্রত্যাহারের কারণ হিসেবে ‘প্রশাসনিক কারণ’ উল্লেখ করা হয়েছে।

    ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদের সই করা ওই আদেশে রাকিবুল হাসানকে ডিএমপির সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। আদেশটি আজ থেকেই কার্যকর হবে। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

    গতকাল বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। এতে ওসি পরিচয়ে এক ব্যক্তিকে সরকার, প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর সমালোচনা করতে শোনা যায়। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং ওসি পদায়নে টাকা লেনদেনের অভিযোগও করেন তিনি।

    অডিওতে ওই ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘জানি যে শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে আসতেছে। কিচ্ছু হবে না আসলে, কিচ্ছু হবে না। আপনারা তো চিন্তা করতে পারছেন, রাস্তার পুলিশ কত দুর্বল। ভয়ানক দুর্বল। আসা উচিত। ডিসেম্বর দেরি হয়ে গেছে। এই মাসে আসা উচিত ছিল। চলে আসলি এই পুলিশ কিচ্ছু করতে পারবে না।’

    অডিওতে ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে বলতে শোনা যায়, ‘সিনিয়র অফিসার সব বিএনপি করতেছে। আমরা তো বিএনপি করতেছি না। সব সিনিয়ররা বিএনপি করতেছে, আমরা বিএনপি করতেছি না। এই করার জন্য তো আমরা ডিপার্টমেন্টে আসি নাই। তোমরা খাবা-দাবা, … নিয়ে থাকবা, আর আমরা এখানে বসে বসে কাজ করব, তা তো হবে না।’

    মনির নামে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার গাড়িচালক থানার ওসি পদায়ন করছেন বলেও বলা হয় ওই অডিওতে। অডিও তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘এগুলো সহ্য করা যায়? আর কী বলব? যারা পেস্টিং পাইতেছে তার (মনির) কাছে টাকা দিচ্ছে, সকাল বেলা পেস্টিং হইতেছে।’

    ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে উদ্দেশ করে অডিওর বক্তা বলেন, তাঁর লজ্জা থাকা উচিত। তাঁর চাকরি ছিল না। এখন যে পদে আছেন, সেখানে এক বছর থাকতে পারলে ১০০ কোটি টাকা এমনিতেই হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

    ওসি পদায়ন নিয়ে অডিওতে ওই ব্যক্তিকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) কমিশনার যারা ছিল, তারা ওসি পেস্টিংয়ে টাকা নেয় নাই। যত ওসি বেনজীরের আমলে ছিল, টাকায় কোনো সময় বদলি হয় নাই।’ এখানে তিনি সাবেক আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। অডিওতে এই পুলিশ কর্মকর্তাকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘ডিএমপি, ঢাকা, বাংলাদেশের রাজধানী, ক্যাপিটাল সিটি। এখানকার ওসিরা টাকা দিতে যাবে কেন? এখানে ওসিরা এমনিই যাবে। তোমাদের কাজ করে নিয়ে তোমরা টাকা উঠিয়ে নিবা।’ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কীভাবে কাজ করে দিয়েছেন, সেই অভিজ্ঞতার বিষয়ে ওসি রাকিবুলকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি ভাটারায় একটা কাজ করে দিছি এক স্যারকে। স্যার এক কোটি টাকা নিছে। আমি তো জানতাম না।… (অস্পষ্ট কথা) আমার সাথে শুধু সম্পর্কটা আছে। এই হলো অবস্থা! এইভাবে চাকরি করা যাবে নাকি? অযোগ্য লোকগুলোরে কোন জায়গা ঢুকায় (পদায়ন দেয়) আর যোগ্য লোকগুলোকে চিপা-চাপায় রাখছে।’

  • ২০১৮ সালের রাতের ভোট; শতাধিক ওসিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হচ্ছে

    ২০১৮ সালের রাতের ভোট; শতাধিক ওসিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হচ্ছে

    ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বহুল আলোচিত ‘রাতের ভোট’-এ দায়িত্ব পালনকারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে সরকার। ওই নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারদের (এসপি) বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে বাধ্যতামূলক অবসর, ওএসডি এবং সম্পদ অনুসন্ধানসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার পর এবার মাঠপর্যায়ের দায়িত্বে থাকা ওসিদের ভূমিকা পর্যালোচনায় নেওয়া হয়েছে। চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় প্রাথমিকভাবে শতাধিক ওসিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

    পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় দেশের ৬৪ জেলার বিভিন্ন থানা এবং তৎকালীন ছয়টি মহানগর পুলিশের অধীন থানাগুলোর ওসিদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তাদের বর্তমান পদায়ন, পদমর্যাদা, চাকরির অবস্থা ও প্রশাসনিক অবস্থান যাচাই করা হচ্ছে। যাচাই শেষে শতাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বাধ্যতামূলক অবসরসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

    সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিস্তারিত তালিকা পাঠানো হয়েছে। তালিকায় বর্তমানে কর্মরত কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অবসরে যাওয়া, পদোন্নতি পাওয়া কিংবা অন্য ইউনিটে কর্মরত কর্মকর্তাদের তথ্যও রয়েছে।

    পুলিশ সদর দপ্তরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমাদের সময়কে বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুযায়ী ২০১৮ সালের নির্বাচনে ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ পরিদর্শকদের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখন পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

    পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ওই নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালনকারী অনেক ওসি ইতোমধ্যে অবসরে গেছেন। কেউ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বা সহকারী পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি পেয়েছেন, আবার কারও পদোন্নতি আটকে আছে। ওই সময় ভোটের আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করার অভিযোগে মাঠপর্যায়ে ওসিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

    সরকার এর আগে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালনকারী ৩৩ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে। তাদের অধিকাংশই তখন পুলিশ সুপার (এসপি) বা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (ডিসি) ছিলেন। সরকারি আদেশে জনস্বার্থে অবসরের কথা উল্লেখ করা হলেও সংশ্লিষ্টদের মতে, ওই নির্বাচনে তাদের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবার থানা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্বও পর্যালোচনায় এসেছে। তবে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তখন দায়িত্ব পালনকারী কয়েকজন এসপির বিরুদ্ধে এখনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের বেশির ভাগই বর্তমানে পলাতক বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

    স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে গতকাল পর্যন্ত ১২৩ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় জেলার এসপি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ৩৩ জন রয়েছেন। বাকিদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলমান রয়েছে এবং তাদের চাকরিচ্যুতির প্রক্রিয়াও এগিয়ে চলছে। একই সঙ্গে ২০১৮ সালের নির্বাচনে ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের বর্তমানে কোনো থানায় ওসি হিসেবে পদায়ন করা হচ্ছে না বলেও সূত্র জানিয়েছে।

    সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, নির্বাচনের সময় মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রধান দায়িত্ব ছিল ওসিদের ওপর। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন এসপি ও পুলিশ কমিশনারদের নির্দেশনায় ভোটের আগের রাতে ব্যালটে সিল মারা ও ব্যালট বাক্স ভর্তি করার কাজে তারা সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেন। এ কাজে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের কাছ থেকে এসপি ও পুলিশ কমিশনারদের পাশাপাশি কিছু ওসিও অর্থ নিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

    ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো অভিযোগ করেছিল, ভোটের আগে তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চালানো হয়, নির্বাচনী প্রচারে বাধা দেওয়া হয় এবং ভোটের আগের রাতেই বহু কেন্দ্রে ব্যালট বাক্স ভর্তি করা হয়। যদিও তৎকালীন সরকার ও নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিল, এরপরও ‘রাতের ভোট’ শব্দটি দেশের রাজনৈতিক অভিধানে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেয়।

    আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের রাতে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে ব্যালটে সিল মেরে বাক্সে ভরে রাখা হয়। রাত ১০টা থেকে শুরু হয়ে এই কার্যক্রম চলে ভোর ৩টা পর্যন্ত।

    প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ওই নির্বাচনে ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়ে। ১২২টি কেন্দ্রে ভোটের হার ছিল ৯৯ শতাংশ বা তার বেশি এবং ৭ হাজার ৬৮৯টি কেন্দ্রে ভোট পড়ে ৯০ থেকে ৯৯ শতাংশ। পাশাপাশি ভোটের দিন বিপুলসংখ্যক ভোটারকে কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।