ট্যাগ এঅই

  • এআইয়ের ধাক্কায় ৮০% আয় কমেছে ফ্রিল্যান্সারদের

    এআইয়ের ধাক্কায় ৮০% আয় কমেছে ফ্রিল্যান্সারদের

    বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে তিন লাখ তরুণ ফ্রিল্যান্সার বছরে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করছেন। গত কয়েক বছরের অনানুষ্ঠানিক হিসাব এটি। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের উত্থানের ফলে ছোটখাটো ডিজিটাল কাজের ভবিষ্যৎ এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

    দেশের ফ্রিল্যান্সারদের বড় একটি অংশ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিদেশি ক্লায়েন্টদের জন্য ডেটা এন্ট্রি, অনুবাদ, ট্রান্সক্রিপশন এবং ছবি এডিটিংয়ের মতো সহজ ও ছোটখাটো কাজ করে থাকে।

    কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন মুহূর্তের মধ্যে ডিজাইন তৈরি, কোডিং, ছবি এডিটিং এবং অন্যান্য ডিজিটাল কাজগুলো করে ফেলতে পারছে। আর এতে ফ্রিল্যান্সারদের আয় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

    ফ্রিল্যান্সাররা জানিয়েছেন, বিদেশি ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে আগের মতো নিয়মিত কাজের প্রস্তাব আসছে না। আর যেসব কাজ পাওয়া যাচ্ছে, এআইয়ের কল্যাণে সেগুলো শেষ করতে আগের চেয়ে অনেক কম সময় লাগছে।

    ডিজিটাল সেবাবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পুরো ফ্রিল্যান্সিং বাজারের চিত্রই বদলে দিচ্ছে।

    এখন আমেরিকার মতো দেশের কোনো কোম্পানি থেকে ১০ ডলারের একটি লোগো ডিজাইনের কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা এখন ক্ষীণ। কারণ এআই টুল ব্যবহার করে ক্লায়েন্টরা নিজেরাই এখন লোগোর প্রথম সংস্করণটি তৈরি করে ফেলছেন।

    তার বদলে, তারা এখন এআই দিয়ে তৈরি পুরো মাল্টিমিডিয়া ক্যাম্পেইনটিকে নিখুঁত ও কাস্টমাইজ করার জন্য কোনো দক্ষ ফ্রিল্যান্সারকে ১০০ ডলার দিতেও দ্বিধা করছেন না।

    ডিজিটাল বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ কাজ থেকে জটিল কাজের দিকে সরে আসার এই প্রক্রিয়াটি হয়তো অনেক স্বল্প বেতনের চাকরি বিলুপ্ত করে দেবে, কিন্তু যারা এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবেন, তাদের জন্য অনেক বেশি লাভজনক সুযোগের দুয়ার খুলে যাবে।

    আয়ের ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে

    দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে বাংলাদেশের কয়েকজন ফ্রিল্যান্সার জানিয়েছেন, তাদের কাজের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। বিশেষ করে গ্রাফিক ডিজাইন, ছবি এডিটিং, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, কনটেন্ট প্রোডাকশন ও ফটোগ্রাফির মতো প্রচলিত কাজগুলোর চাহিদা অনেক কমে গেছে।

    ২০১১ সাল থেকে ফ্রিল্যান্সিং করছেন এমরাজিনা ইসলাম। তিনি জানান, একটি বড় ক্লায়েন্ট হারানোর পর তার আয় ৮০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে।

    তিনি বলেন, ‘আমরা ২০১২ সাল থেকে একটি কোম্পানির কাজ করতাম। একপর্যায়ে আমাদের টিমে ১৫ জন কর্মী ছিল।’

    ওই কোম্পানি তাদের অফিস এবং ল্যাপটপের সুবিধাও দিত। এমনকি কোভিড মহামারির সময়ে ওই কোম্পানির ব্যবসার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে তাদের টিমের সদস্য সংখ্যাও বেড়েছিল।

    কিন্তু এই ফ্রিল্যান্সার আক্ষেপ করে বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আসার পর আমাদের পুরো ব্যবসাটাই বন্ধ হয়ে গেছে।’

    এমরাজিনার টিম আগে যে ধরনের কাজ করতো—যেমন গ্রাফিক ডিজাইন, ইমেজ এডিটিং এবং প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট—এখন তার সবই এআই দিয়ে করা হচ্ছে।

    তিনি জানান, এই প্রভাব কেবল ডিজাইনের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। ওয়েব ডেভেলপমেন্টের কাজও বদলে গেছে। আগে যেসব কাজে বিশাল বড় টিমের প্রয়োজন হতো, এখন এআই টুল ব্যবহার করে খুব অল্প মানুষই সেই কাজগুলো সেরে ফেলছে।

    তিনি আরও বলেন, যারা সাধারণ কনটেন্ট রাইটিং, ফটো এডিটিং এবং ডেটা এন্ট্রির মতো মৌলিক দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল, তারা এখন সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছেন।

    প্রায় ২০ বছর ধরে ফটোগ্রাফির সঙ্গে যুক্ত ইউসুফ তুষার জানান, এআই দিয়ে তৈরি ছবি বাণিজ্যিক ফটোগ্রাফির চাহিদাকে অনেকটা কমিয়ে দিয়েছে। আগে পণ্য বা মডেলের ছবি কিংবা স্টক ফটোগ্রাফির জন্য ক্লায়েন্টরা ফটোগ্রাফারদের ওপর নির্ভর করতেন।

    কিন্তু এখন অনেক কোম্পানি কোনো প্রকার শুটিং বা ঝক্কি ছাড়াই এআই ব্যবহার করে প্রয়োজনমতো ছবি তৈরি করে নিচ্ছে।

    ইউসুফ তুষার বলেন, ‘আমার আয়ের বড় একটা অংশ এখন নেই। কারণ ক্লায়েন্টরা মনে করেন, বিজ্ঞাপনের জন্য ছবি প্রয়োজন হলে তারা সেটা এআই দিয়েই বানিয়ে নিতে পারবেন।’

    ইউসুফ তুষার জানান, এআইয়ের প্রভাবে তার আয় প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে।

    তুষারের মতে, স্টক ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে এই ধস সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ার মতো। ক্যালেন্ডার বা অন্যান্য বাণিজ্যিক কাজের জন্য ক্লায়েন্টরা এখন আর ছবি কেনার প্রয়োজন বোধ করছেন না।

    তিনি বলেন, এই পরিবর্তনটি অনেকটা আগেরকার প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মতো।

    ‘আমরা যখন ফিল্ম ক্যামেরা থেকে ডিজিটাল ক্যামেরায় অভ্যস্ত হচ্ছিলাম, তখনও একটা ধাক্কা এসেছিল। তবে এআইয়ের প্রভাব তার চেয়ে অনেক বেশি বড়।’

    প্রায় ১৪ বছর ধরে ফ্রিল্যান্সিং করছেন ঢাকার ফ্রিল্যান্সার কাজী মামুন। তিনি জানান, বাজারে কাজের সুযোগ কমে গেছে, অথচ অল্প যেটুকু কাজ বাকি আছে, তা পাওয়ার প্রতিযোগিতা আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে।

    মামুন জানান, তার নিজের কাজের পরিমাণ প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে। তবে দীর্ঘদিনের সরাসরি ক্লায়েন্ট থাকার কারণে তিনি পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দিতে পারছেন। তার পাঁচ সদস্যের টিম এখন আপওয়ার্ক বা ফাইভারের মতো বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে সরাসরি নতুন ক্লায়েন্ট খোঁজার ওপর বেশি জোর দিচ্ছে।

    মামুন বলেন, ‘অনেকের কাজের পরিমাণ অর্ধেকে নেমে এসেছে, কারও আবার ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এমনকি অনেকে ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।’

    তিনি আরও বলেন, ‘ক্লায়েন্টরা এখন অনেক কাজ নিজেরাই করার চেষ্টা করছেন। ছোটখাটো প্রজেক্টের জন্য তারা আগের মতো এখন আর ফ্রিল্যান্সারদের নিয়োগ দিচ্ছেন না।’

    এআইয়ের সুবাদে বাড়ছে উচ্চ আয়ের কাজের সুযোগ

    সাধারণ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের বদলে অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসগুলোতে এখন এআই-নির্ভর কাজের চাহিদা এবং পারিশ্রমিক দুটোই বাড়ছে।

    আপওয়ার্কের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে তাদের প্ল্যাটফর্মে এআই-সংক্রান্ত কাজের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজ বেড়েছে ৫২ শতাংশ।

    যারা এআই নিয়ে কাজ করছেন, তারা সাধারণ কাজ করা ফ্রিল্যান্সারদের তুলনায় গড়ে ৪০ শতাংশের বেশি পারিশ্রমিক পাচ্ছেন।

    তবে বাংলাদেশে এর প্রভাব কিছুটা ভিন্নভাবে দেখা যাচ্ছে, কারণ দেশের যে ফ্রিল্যান্সাররা মূলত এন্ট্রি-লেভেল বা সাধারণ মানের কাজ করেন, তাদের সেই কাজগুলো এখন এআই খুব সহজেই করতে পারছে।

    এমরাজিনা ইসলাম বলেন, ‘কেউ যদি এআই-তে খুব দক্ষ হয়ে ওঠে, তবে তার ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল। আর যে এআই শিখবে না, সে পিছিয়ে পড়বে।’

    প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর বলেন, বৈশ্বিক সেবা খাতের বাজার দ্রুত এআই-নির্ভর হয়ে উঠছে। এই বাজারে টিকে থাকার মতো দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বাংলাদেশকে এখনই জরুরি ভিত্তিতে মনোযোগ দিতে হবে।

    প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনা জরুরি

    ফ্রিল্যান্সার এমরাজিনা বলেন, আগে যেসব সাধারণ কাজের চাহিদা ছিল, সেগুলোর ভবিষ্যৎ খুব একটা উজ্জ্বল নয়। তাই স্থানীয় ফ্রিল্যান্সারদের মূল দক্ষতার পাশাপাশি এখন যৌক্তিক চিন্তাভাবনা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের ওপর জোর দিতে হবে।

    বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সিং ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির (বিএফডিএস) চেয়ারম্যান তানজিবা রহমান বলেন, এআই ফ্রিল্যান্সিং বাজারকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, আমাদের দেশের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না।

    তানজিবা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বাংলাদেশে আমরা বর্তমানে যে ধরনের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি, তা মূলত প্রাথমিক পর্যায়ের (এন্ট্রি লেভেল)। আর এ কারণেই আমরা এখন আর আগের মতো কাজ পাচ্ছি না।’

    তার মতে, ভয়ের কারণ এটা নয় যে এআই সব ফ্রিল্যান্সিং কাজ শেষ করে দেবে। বরং আসল ঝুঁকি হলো, আমাদের ফ্রিল্যান্সাররা যদি এমন সব কাজেই সীমাবদ্ধ থাকেন যা এআই এখন সহজেই করতে পারে, তাহলেই বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।

    তিনি গণিত, পরিসংখ্যান, গবেষণাসহ এমন কিছু বিশেষায়িত ক্ষেত্রের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে এখনো অনেক সুযোগ রয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সাররা সেখানে খুব একটা কাজ করেননি।

    তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, যেসব কাজে সৃজনশীলতা ও মানবিক বিচার-বিবেচনার প্রয়োজন হয়, ক্লায়েন্টরা এখনো সেগুলোকে গুরুত্ব দেন।

    তানজিবা আরও যোগ করেন, ‘আমাদের দুটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। প্রথমত, উচ্চতর দক্ষতা অর্জন করা; এবং দ্বিতীয়ত, দেশে এমন মেন্টর বা প্রশিক্ষক তৈরি করা, যারা ফ্রিল্যান্সারদের আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার মতো তথ্য ও দিকনির্দেশনা দিতে পারবেন।’