উন্নয়নশীল

  • বিদেশে বাণিজ্য সম্প্রসারণে জোর ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর

    বিদেশে বাণিজ্য সম্প্রসারণে জোর ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর

    স্বল্পোন্নত (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। এর অংশ হিসেবে রপ্তানি বাজার ধরে রাখা, নতুন বাজারে প্রবেশ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে একের পর এক উদ্যোগ নিচ্ছে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো। একই সঙ্গে বর্তমান রপ্তানি বাজারগুলো সম্প্রসারণে বিভিন্ন চুক্তি, পণ্য প্রদর্শনীসহ দ্বিপক্ষীয়-বহুপক্ষীয় সভা-সেমিনারেও অংশ নিচ্ছেন ব্যবসায়ী নেতারা। দেশের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে কথা বলে এসব বিষয়ে জানা গেছে।

    এই সময়ের মধ্যে বিদেশে বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে আলোচনায় এসেছে হংকংয়ে বাংলাদেশ অ্যাপারেল রোডশো, বাটেক্সপো ২০২৬, জাপান ডেস্ক চালু, মালয়েশিয়ায় ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের (ডিসিসিআই) ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল পাঠানো। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিসহ (সেপা) বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির পাশাপাশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন করে সাজানো হয়েছে সরকারি উদ্যোগও। এসব উদ্যোগের পেছনে এলডিসি উত্তরণও ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

    রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪৮.৩৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের ৪৮.৩০ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় মাত্র ০.১৭ শতাংশ বেশি। সে হিসাবে দেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এখনো খুব সীমিত। একই সময়ে তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরতা অব্যাহত রয়েছে। তবে সেই নির্ভরতা কমিয়ে পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে চান সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্যমতে, বর্তমানে বিশ্বের ৩৭টি দেশে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি হচ্ছে। তবে ভ্যালু অ্যাডিশন ও উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানিতে পিছিয়ে দেশ। এই বাস্তবতায় সবচেয়ে সক্রিয় উদ্যোগগুলো আসছে পোশাক খাত থেকে।

    এর মধ্যে নতুন আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও ব্র্যান্ডকে আকৃষ্ট করতে আগামী ২৮ অক্টোবর বিজিএমইএ হংকংয়ে বাংলাদেশ অ্যাপারেল রোডশো আয়োজন করছে। পাশাপাশি এক যুগ পরে আবারও আগামী ১৮-১৯ নভেম্বর ঢাকায় বাটেক্সপো ২০২৬ আয়োজন করছে সংগঠনটি। এতে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, ক্রেতা, বিনিয়োগকারী, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের এক ছাতার নিচে আনতে চায় বিজিএমইএ।

    জাপানের বাজারেও নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে দেশের পোশাকশিল্প। গত ২৩ সেপ্টেম্বর বিজিএমইএ জাপান ডেস্ক চালু করেছে। এর লক্ষ্য জাপানি ক্রেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর যোগাযোগ, বাজার গবেষণা, ক্রেতা শনাক্তকরণ ও ব্যবসায়িক সমস্যা সমাধানে সহায়তা করা।

    এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (সেপা) বিষয়ে আগস্টে দুই দেশ নীতিগত সমঝোতায় পৌঁছেছে। এই চুক্তি বাংলাদেশকে এলডিসি-পরবর্তী সময়ে শুল্ক সুবিধা ধরে রাখার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

    মালয়েশিয়ার বাজারেও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সরাসরি তৎপরতা বাড়ছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) ৩৯ সদস্যের প্রতিনিধিদল সম্প্রতি মালয়েশিয়া সফর করেছে। দলটি সেখানে বিটুবি বৈঠক এবং মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ আকর্ষণে কাজ করেছে বলে জানা গেছে।

    সরকারও এই বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাণিজ্য চুক্তির পরিধি বাড়াচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৫টি দেশ ও বাণিজ্য জোটের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্য চুক্তি বা বাজার-সুবিধা নিয়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বা আরসিইপিতে যুক্ত হওয়ার উদ্যোগও চলছে।

    বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের নির্ধারিত সময় ২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে বাড়িয়ে তিন বছর পেছানোর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এটি ২০২৯ সালের নভেম্বরে নেওয়ার জন্য জাতিসংঘের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় আছে। বাংলাদেশের এসব উদ্যোগের পেছনে এলডিসি উত্তরণের পর সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়ানোর ও একটি পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ী নেতারা। কারণ, এলডিসিভুক্ত হিসেবে বাংলাদেশ বিভিন্ন বাজারে বিশেষ শুল্ক সুবিধা এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থারও কিছু বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছে। এলডিসি উত্তরণের পর এসব সুবিধা কমে যেতে পারে। এ ছাড়া অনেক বাজারে রুলস অব অরিজিন, শ্রম ও পরিবেশগত মান এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতার গুরুত্ব বাড়বে।

    জানতে চাইলে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি শিহাব উদ্দৌজা চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, বিজিএমইএর সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো মূলত বাজার সম্প্রসারণেরই অংশ। প্রথমত, জাপানের সঙ্গে আমাদের ইপিএ সম্পাদিত হয়েছে, যা এখন সংসদে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) চুক্তি সম্পাদিত হলে সংশ্লিষ্ট দেশের বায়ারদের আস্থা অর্জিত হয় এবং তারা ব্যবসা বাড়াতে উৎসাহিত হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ইতোমধ্যেই জাপান থেকে তিন-চারটি বড় প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসেছে, যারা আমাদের দেশে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চায়।

    শিহাব উদ্দৌজা চৌধুরী আরো বলেন, বিজিএমইএর সাম্প্রতিক উদ্যোগের একটি মূল উদ্দেশ্য হলোÑআমাদের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি গ্রহণ এবং বাজার সম্প্রসারণ। ইউরোপ ও আমেরিকার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে আমাদের একটি শক্তিশালী বিকল্প বা তৃতীয় বাজার গড়ে তুলতে হবে।

    তবে উদ্যোগগুলোকে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের প্রস্তুতির পরিবর্তে নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ বলে মন্তব্য করে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, এক অর্থে সে রকম নয়। তবে আবার কিছুটা এলডিসির প্রস্তুতির সঙ্গে সম্পৃক্তও বটে। তিনি বলেন, এলডিসি থেকে আমাদের উত্তরণ করতেই হবে। এই বিষয়ে বর্তমান সরকার অত্যন্ত আন্তরিক এবং এ জন্য তিন বছরের একটি কৌশলগত সময় নেওয়া হয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে একাধিক কমিটি গঠন করেছে এবং এসব কমিটির একাধিক বৈঠকও হয়েছে।