উদ্যোক্তা

  • নেপালি সাগর কলা চাষে তরুণ উদ্যোক্তা

    নেপালি সাগর কলা চাষে তরুণ উদ্যোক্তা

    স্বল্প খরচ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকায় কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় দিন দিন বাড়ছে কলার আবাদ। উৎপাদিত নেপালি সাগর জাতের কলার চাহিদা ও খ্যাতিও ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। টাঙ্গাইলের মধুপুর থেকে চারা সংগ্রহ করে বাণিজ্যিকভাবে ২৫ বিঘা জমিতে নেপালি সাগর জাতের কলা চাষ ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত হয়ে সচ্ছলতা ফিরেছে ভেড়ামারা উপজেলার ধরমপুর ইউনিয়নের কাজীহাটা ব্লকের কাজীহাটা গ্রামের আব্দুল আওয়ালের ছেলে তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা মো. আসিফ আওয়াল উৎসের।

    গত বছর প্রথমবার চাষ করেই ভালো ফলন পান তিনি। বড় আকারের কাঁদি ও আকর্ষণীয় গড়নের কলা ব্যাপারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এতে উৎসাহিত হয়ে এবার কলাবাগানের পরিধি আরও বাড়িয়েছেন তিনি।

    সরেজমিনে দেখা যায়, তার অধিকাংশ কলাগাছে ফল ধরেছে। বাগানজুড়ে কলার কাঁদি ঝুলছে। এ সাফল্যে আসিফ আওয়াল উৎসের মুখে তৃপ্তির হাসি। প্রতিনিয়ত আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে মানুষ তার কলাবাগান দেখতে আসছেন। অনেকে তার কাছ থেকে কলা চাষের বিষয়ে পরামর্শও নিচ্ছেন। নিয়মিত সার ও কীটনাশক প্রয়োগসহ প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করে আসছেন তিনি।

    তার সাফল্য দেখে এলাকার অন্য যুবকরাও নেপালি সাগর জাতের কলা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। মাটি ও আবহাওয়া এ জাতের কলা চাষের উপযোগী হওয়ায় একবার চারা রোপণ করে বছরে তিনবার কলা বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন এই তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা। নেপালি সাগর ছাড়াও তিনি সবরি, চাঁপা, চিনি চাম্পা ও জি নাইনসহ বিভিন্ন জাতের কলার আবাদ করে থাকেন।

    আসিফ আওয়াল উৎস জানান, একবার চারা রোপণ করে তিনবার কলার ফলন পাওয়া যায়। খরচ কম অথচ লাভ বেশি হওয়ায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে নেপালি সাগর জাতের কলার আবাদ করছেন।

    তিনি বলেন, ‘এ বছর আমি ২৫ বিঘা জমিতে নেপালি সাগর জাতের কলা আবাদ করেছি। এ জাতের কলা বড়, সুস্বাদু ও রং সুন্দর হওয়ায় দেশের সব জেলাতেই এর চাহিদা অনেক বেশি। প্রথমবারেই খরচের টাকা বাদ দিয়ে দ্বিগুণ লাভ হয়েছে। ওই জমি থেকে এখনো দুইবার কলা পাওয়া যাবে।’

    স্থানীয় কৃষক আব্দুর রাজ্জাক জানান, ধান চাষে লাভ খুব কম। কিন্তু কলা চাষে খরচের প্রায় দ্বিগুণ আয় হয়। তাই এখন অনেকেই এ চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। পাশাপাশি কলাবাগানে অনেকের জীবিকার সুযোগও তৈরি হয়েছে।

    কলাবাগান পরিচর্যাকারী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমি আসিফ ভাইয়ের কলাবাগান নিয়মিত পরিচর্যা করি। কলার কাঁদি বা থোড় যখন বড় হতে শুরু করে, তখন বাতাসের কারণে কিংবা ওজনের চাপে গাছ যেন হেলে বা ভেঙে না পড়ে, সেজন্য বাঁশ বা লাঠি দিয়ে শক্ত খুঁটি বা সাপোর্ট দেওয়ার কাজের দিকে আমাকে বেশি নজর রাখতে হয়।’

    স্থানীয় তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা স্বজল ইসলাম জানান, কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত থাকলেও তিনি কখনো কলার আবাদ করেননি। তাই আসিফ আওয়াল উৎসের কাছে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিতে এবং তাঁর ২৫ বিঘা জমির নেপালি সাগর জাতের কলাবাগান দেখতে এসেছেন।

    উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. সদরুল ইসলাম জানান, বর্তমানে ভেড়ামারায় কলার চাষ বেড়েছে। কলা চাষে লাভ হওয়ায় চাষিরা এ ফসলের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। কাজীহাটা ব্লকে আসিফ আওয়াল উৎস ২৫ বিঘা জমিতে নেপালি সাগর জাতের কলা আবাদ করছেন। উপজেলা কৃষি বিভাগ থেকে তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হয় এবং বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হয়। উপজেলার চাহিদা মিটিয়ে তিনি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় কলা সরবরাহ করে থাকেন।

    ভেড়ামারা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. মাহমুদা সুলতানা পলি জানান, কলাচাষিদের বিভিন্ন সমস্যা ও সমাধানে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক মাঠে কাজ করছেন। আসিফ আওয়াল উৎস এবার ২৫ বিঘা জমিতে নেপালি সাগর জাতের কলা চাষ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। তাকে কলা চাষে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কলায় কার্বাইড ও বিষাক্ত স্প্রে ব্যবহার না করার জন্যও চাষিদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

  • বারান্দায় মাশরুম চাষে স্বাবলম্বী সবুজ

    বারান্দায় মাশরুম চাষে স্বাবলম্বী সবুজ

    বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার পানবাড়িয়া গ্রামের যুবক সবুজ শিকদার (৩৪)। জীবিকার খোঁজে ১৭ বছর গ্রামের বাইরে ছিলেন। গত বছর নিজ গ্রামে ফেরেন তিনি। মাত্র ১০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে নিজ ঘরের বারান্দায় শুরু করেন মাশরুম চাষ। এখন সেই মাশরুমই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। প্রতি মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা আয় করছেন তিনি।

    বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার বাধাল ইউনিয়নের পানবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা ইছহাক আলী শিকদারের ছেলে সবুজ শিকদার। ২০০৭ সালে জীবিকার খোঁজে বাড়ি ছেড়েছিলেন। দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে কাটিয়েছেন।

    এক সময় ওষুধের ব্যবসা করলেও, গত বছর তিনি নতুন কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। সবুজ সাভারের মাশরুম ইনস্টিটিউট থেকে ১২ দিনের একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে মাশরুম চাষ শুরু করেন। নিজের ঘরের বারান্দার মাত্র ১২ হাত জায়গায় তিনি ‘মেসার্স সাইবা পিও-টি জাতের মাশরুম’ প্রকল্প চালু করেন। বর্তমানে তিনি একসঙ্গে ৬২২টি মাশরুম ব্যাগে চাষ করছেন এবং প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে তিন কেজি মাশরুম উৎপাদন করতে সক্ষম।

    সবুজ স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি মাশরুম ৪০০ টাকায় বিক্রি করেন, আর মাশরুম গুঁড়া বিক্রি করেন প্রতি কেজি ৩ হাজার টাকা দরে। তিনি দারাজ, পাঠাও, স্কুট এক্সপ্রেসসহ বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাশরুম সরবরাহ করছেন। এছাড়াও ৫০০ গ্রাম ইস্পন প্যাক ২৫ টাকায়, ১ কেজি ৫০ টাকায় এবং ২ কেজির প্যাকেট ১০০ টাকায় বিক্রি করছেন।

    পানবাড়িয়া গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, সবুজ ভাই আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। আগে কেউ ভাবেনি যে ঘরের বারান্দায় বসেই এত কিছু করা যায়। এখন গ্রামের অনেক যুবকই মাশরুম চাষে আগ্রহী হচ্ছে।

    স্থানীয় নারী উদ্যোক্তা শিরিন বেগম বলেন, মাশরুম চাষ করে সবুজ এখন ভালো আয় করছেন। এমন উদ্যোগে যদি সরকারি প্রশিক্ষণ ও সহায়তা পাওয়া যায়, তাহলে আরও অনেকেই এগিয়ে আসবেন এবং স্বাবলম্বী হবে।

    সবুজ শিকদার বলেন, প্রথমে মাত্র ১০ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করেছিলাম। এখন প্রতি মাসে গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় হচ্ছে। যদি সরকারি সহযোগিতা পাই, তাহলে আরও বড় আকারে চাষ করতে পারব। আমার স্বপ্ন অনেক বড়। এই বারান্দার ছোট পরিসর থেকে শুরু করে একদিন আমি এই মাশরুম চাষকে অনেক বড় একটি শিল্পে পরিণত করতে চাই।

    তিনি বলেন, আমি চাই আমার মতো আরও অনেক বেকার যুবক এই মাশরুম চাষে আগ্রহী হোক এবং স্বাবলম্বী হোক। সরকারি সহযোগিতা পেলে এই চাষকে আমি দেশের প্রতিটি ঘরে ছড়িয়ে দিতে চাই।

    কচুয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা শেখ নাইমুর রশিদ লিখন বলেন, মাশরুম চাষ এখন একটি লাভজনক কৃষি উদ্যোগ। খুব অল্প জায়গায়, অল্প খরচে এটি চাষ করা যায়। সবুজ যা করছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আমরা চাই আরও যুবক তার মতো উদ্যোগ গ্রহণ করুক। কৃষি অফিস থেকে আমরা সব সময় তাদের পাশে আছি। মাশরুম পুষ্টিকর হওয়ায় বাজারে এর

    চাহিদাও হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে। সবুজের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে অন্যদের জন্য একটি বড় অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

    তিনি আরও বলেন, সবুজের মতো কেউ যদি এই উদ্যোগ শুরু করতে চায়, তাহলে প্রশিক্ষণ, পরামর্শ বা যে কোনো সহযোগিতায় আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।

  • মাহিদার চায়ের কপে সন্তানদের স্বপ্ন

    মাহিদার চায়ের কপে সন্তানদের স্বপ্ন

    মাহিদা বেগম (৪০)। স্বামী মৃত আবু বকর হাওলাদার । ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে গত এক মাস আগে মারা গেছেন আবুবকর। স্বামীকে হারিয়ে এখন তিন সন্তান নিয়ে অভাবে দিন কাটাচ্ছেন তিনি। তবে সন্তানদের স্বপ্ন বাঁচাতে ও সংসারের অভাব দূর করতে ভাড়ায় নেওয়া একটি চায়ের দোকানই একমাত্র সম্বল। সন্তানের স্বপ্ন বুনছেন চায়ের কাপে।

    খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের শিমুল তলা এলাকার মো.আবু বকর হাওলাদারের সঙ্গে বরিশালের ইব্রাহিম হাওলাদের মেয়ে মাহিদা বেগমের বিয়ে হয় প্রায় ২৪ বছর আগে। তাদের ঘরে ২ মেয়ে ও এক ছেলে সন্তান রয়েছে। বড় মেয়ে আফসান আক্তার মিম মাদারীপুর সরকারী কলেজে অর্নাসের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। ছোট মেয়ে মোসা. আফরিন কুলপদ্বী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্রী। ছেলে আরিয়ান আহম্মেদ মাহিমের বয়স আড়াই বছর।

    সংসারের অভাব দূর করতে স্বামী-স্ত্রী মিলে ৯ বছর আগে বাড়ির কাছেই শিমুল তলা বাজার এলাকায় একটি চায়ের দোকান দেন। ভালোই চলছিলো দোকান। হঠাৎ পাঁচ বছর আগে আবু বকর অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার পর জানতে পারেন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন তিনি। শেষের দুই বছর বেশি অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে যান তিনি। এরপর তার চিকিৎসার জন্য ঋণ করে ও অন্যের সহযোগিতায় কোনভাবে চলছিলো দিন। গত ১৫ সেপ্টেম্বর মারা যান আবু বকর হাওলাদার। এরপর একাই সংসার আর দোকানের হাল ধরেছেন মাহিদা বেগম।

    ভাড়া নেয়া দোকানে চা বিক্রির পাশাপাশি পান ও সামন্য কিছু বিস্কুট বিক্রি করেন তিনি। দোকানটি বেশ বড় হলেও সেলসগুলো ফাকা পড়ে আছে। টাকার অভাবে প্রয়োজনীয় মালামাল তুলতে পারেন না তিনি। শুধু চা বিক্রির টাকায় দুই মেয়ের পড়াশুনাসহ সংসারের সব খরচ জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তার। তাছাড়া প্রায় তিন লাখ টাকার মতো দেনা থাকায় মাহিদা বেগম এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

    মাহিদা বেগমের মেয়ে আফরিন বলেন, আমার আর আমার বোনের পড়াশুনার খরচ জোগাড় করতে মায়ের খুব কষ্ট হয়। এই চায়ের দোকান থেকেই যা আয় হয়, তা দিয়ে আমাদের সংসারের পুরো খরচ জোগাড় করতে হয়। বাবা দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। তার চিকিৎসার জন্য অনেক দেনা করতে হয়েছে।

    মাহিদা বেগম বলেন, এই চায়ের দোকান দিয়েই আমার সব খরচ জোগাড় করতে হয়। প্রতিদিন এক হাজার টাকার মতো বিক্রি হয়। খরচ বাদ দিয়ে অল্প কিছু আয় থাকে। তা দিয়েই পুরো সংসার চালাতে হয়। দুই মেয়ের পড়াশুনার খরচ জোগাড় করতে হয়। ছেলে ছোট। আমাকে সহযোগিতা করার মতো কেউ নেই। যদি কেউ আমার দোকানের বিক্রির জন্য কিছু মালামাল কিনে দেয় তাহলে আমি তা বিক্রি করে একটু আয় করতে পারতাম। এতে আমার অনেক উপকার হতো। আমার দুই মেয়ের পড়াশুনাটা ঠিকমতো চালাতে পারতাম।

    মাদারীপুর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক নাজনীন আফরোজ বলেন, মাহিদা বেগম চাইলে ঋণ নিতে পারবেন। এছাড়াও এখানে বিভিন্ন ধরণের ট্রেনিং হয়। ট্রেনিং নিয়েও তিনি কাজ করে আয় করতে পারবেন। কয়েকদিন আগেই ইউনিয়নগুলোতে ভিজিডি’র কার্ড দেয়া হয়ে। এরপর দিলে তিনি চাইলে তাকেও দেয়া হবে।