ট্যাগ ইলিশ

  • ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞা

    ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞা

    প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে আগামী ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন সারাদেশে ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ থাকবে। এ সময় ইলিশ পরিবহণ ও মজুদ, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময়ও নিষিদ্ধ থাকবে।

    নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে ইলিশের প্রধান প্রজনন এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মৎস্য বিভাগের সমন্বিত অভিযান জোরদার করা হবে। নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকা জেলেদের সরকার ভিজিএফ খাদ্য সহায়তা দেবে।

    মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান-২০২৬ বাস্তবায়ন এবং প্রধান প্রজনন মৌসুমে ইলিশ আহরণ বন্ধের সময় নির্ধারণে ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন সংক্রান্ত জাতীয় টাস্কফোর্স কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

    মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদের সভাপতিত্বে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।

    সভায় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের নদ-নদী ও সাগরে ইলিশ আহরণ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। একইসাথে এ সময় ইলিশ পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময়ের ওপরও নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ আহরণ ও বাজারজাত ঠেকাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হবে।

    সভাপতির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ‘ইলিশের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে মা ইলিশ রক্ষায় কোনো ধরনের ছাড় দেয়া হবে না। বরিশাল, চাঁদপুর ও ভোলাসহ ইলিশের প্রধান প্রজনন এলাকাগুলোতে নজরদারি ও অভিযান আরো জোরদার করতে হবে।’

    তিনি বলেন, ‘প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধের সিদ্ধান্ত কঠোরভাবে বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসন, নৌ পুলিশ, কোস্ট গার্ড ও মৎস্য বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রয়োজন হলে ইলিশের হটস্পটগুলোতে অতিরিক্ত নৌযান ও লজিস্টিক সহায়তা দেয়া হবে।’

    অবৈধভাবে ধরা ইলিশ বাজারজাত বন্ধে বরফকল, আড়ৎ ও বাজারগুলোতেও নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘চাঁদপুর মোহনাসহ ইলিশের প্রজননক্ষেত্রগুলোতে অবৈধ জাল অপসারণে কঠোর অভিযান চালাতে হবে। কোনো অবস্থাতেই নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা বা বাজারজাত করার সুযোগ দেয়া যাবে না।’

    মন্ত্রী বলেন, ‘মা ইলিশ সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে আগামী মৌসুমে ইলিশের উৎপাদন আরো বাড়বে।’

    সভায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এমপি বলেন, ‘ইলিশের উৎপাদন দিন দিন কমে যাওয়ার কারণ গবেষণার মাধ্যমে খুঁজে বের করতে হবে। কোথায় দুর্বলতা বা কার্যক্রমে ঘাটতি রয়েছে, তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

    অবৈধ জাল বন্ধের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘নিষিদ্ধ জাল উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারের পাশাপাশি জেলে প্রতিনিধিদেরও এসব জাল না কেনার বিষয়ে জেলেদের সচেতন করতে হবে।’

    তিনি বলেন, ‘নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা থেকে বিরত রাখতে সরকার জেলেদের প্রণোদনা দিচ্ছে। এই সহায়তা যেন প্রকৃত জেলেদের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে, তা নিশ্চিত করতে তদারকি বাড়ানো হবে।’

    ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে বিদেশ থেকে মাছ আমদানি করতে হচ্ছে—এমন পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা চিহ্নিত করে সবাইকে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ইলিশকে জাতীয় সম্পদ ও জিআই পণ্য হিসেবে রক্ষা এবং উৎপাদন বাড়াতে আগামী দিনে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নেয়া হবে।’

    সভায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: দেলোয়ার হোসেন, ‘বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো: মীর হোসেন, মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মো: খালেদ কনক এবং বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো: লতিফুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।’

    এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, র‌্যাব, কোস্ট গার্ড, বিমান বাহিনী, নৌ পুলিশ ও বিজিবির প্রতিনিধিরা সভায় অংশ নেন। মন্ত্রণালয় ও মৎস্য অধিদফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধি এবং জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির প্রতিনিধিরাও সভায় উপস্থিত ছিলেন।

  • কেন ভারত থেকে ইলিশ আমদানি হচ্ছে?

    কেন ভারত থেকে ইলিশ আমদানি হচ্ছে?

    বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ইলিশ উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশ। একসময় দেশের ইলিশ বিদেশেও রপ্তানি হতো। অথচ এখন দেশের বাজারের চাহিদা মেটাতে ভারত থেকে টনে টনে ইলিশ আমদানি করছেন ব্যবসায়ীরা। গত দুই মাসে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে প্রায় সাত কোটি টাকা মূল্যের ৩ লাখ ৫২ হাজার ৪৮৪ কেজি ইলিশ আমদানি করেছে ১৯টি প্রতিষ্ঠান। এই ইলিশের বড় অংশই এসেছে ভারতের গুজরাট থেকে।

    আমদানিকারক, কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারত থেকে আরো ইলিশ বাংলাদেশে আসছে। পশ্চিমবঙ্গ হয়ে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্তপথে এসব মাছ ঢুকছে।

    পশ্চিমবঙ্গ চিল্ড ফিশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদ বলেন, গত প্রায় দুই মাসে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে প্রায় ৫০০ টন ইলিশ বাংলাদেশে রপ্তানি হয়েছে।

    তার দাবি, এর প্রায় পুরোটাই গুজরাট থেকে এসেছে।

    প্রশ্ন উঠছে, দেশের ইলিশের মৌসুমে ভারত থেকে এত মাছ কেন আমদানি করতে হচ্ছে?

    বাজারে ইলিশের সংকট

    সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূল কারণ দামের পার্থক্য। বাংলাদেশে যে দামে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে, তার তুলনায় ভারত থেকে আমদানি করা মাছের দাম কয়েক গুণ কম পড়ে। ফলে ব্যবসায়ীদের জন্য আমদানি লাভজনক হয়ে উঠেছে।

    যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মনিরুল মামুন বলেন, মৎস্য অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়েই কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইলিশ আমদানি করছে। তবে কেন এই আমদানি করা হচ্ছে, সে বিষয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট ধারণা নেই।

    মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক বলেন, ব্যবসায়ীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সীমিত পরিসরে ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

    ইলিশ আমদানিকারকদের হয়ে কাজ করা একটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার মো. কামরুজ্জামান বলেন, বাজারে চাহিদার তুলনায় ইলিশের সরবরাহ কম। এ কারণে ব্যবসায়ীরা আমদানি করছেন।

    তার ভাষায়, লাভ না থাকলে ব্যবসায়ীরা আমদানি করতেন না।

    তবে ভারত থেকে ইলিশ আমদানি এবারই প্রথম নয়। গত বছরের জুলাইয়ে এ ধরনের আমদানি শুরু হয়েছিল।

    উৎপাদন কমছে বাংলাদেশে

    দেশে প্রায় দুই দশক ইলিশের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়ার পর গত তিন বছর ধরে তা কমছে। একই সঙ্গে মাছটির গড় ওজনও কমতে শুরু করেছে। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন গবেষকেরা।

    মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের হিসাবে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ৫ লাখ ৭১ হাজার টন ইলিশ উৎপাদিত হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরো কমে হয় ৫ লাখ ৪ হাজার টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আনুষ্ঠানিক হিসাব পাওয়া না গেলেও কর্মকর্তাদের ধারণা, উৎপাদন ৫ লাখ টনের নিচে নেমেছে।

    ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমান বলেন, নদীদূষণ, কারেন্ট জাল দিয়ে জাটকা নিধন, বালু উত্তোলনসহ নানা কারণে বাংলাদেশের জলসীমায় ইলিশের প্রাপ্যতা কমেছে। সাগর থেকে নদীতে ইলিশের আসার পথ বা মাইগ্রেটরি রুট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াও এর কারণ হতে পারে।

    তিনি বলেন, নানা ক্ষতিকর উপায়ে মাছ ধরা এবং কীটনাশক ব্যবহারের কারণে ইলিশের প্রজনন ও বেড়ে ওঠার স্থানও হুমকির মুখে পড়েছে। ইলিশের বর্তমান পরিস্থিতির কারণগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

    আমদানি করা ইলিশে বড় লাভ

    সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও আমদানিকারকদের কয়েকজনের তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে আসা ইলিশের সর্বোচ্চ ক্রয়মূল্য পড়ে কেজিপ্রতি দুই ডলার বা প্রায় ২৪৬ টাকা, কখনো এরও কম। এরপর কাস্টমসসহ বিভিন্ন শুল্ক ও অন্যান্য খরচ যোগ হলেও বাংলাদেশের বাজারে একই ওজনের ইলিশের তুলনায় দাম কম থাকে।

    একজন কর্মকর্তা বলেন, এ কারণে আমদানিতে ব্যবসায়ীদের ভালো লাভ হচ্ছে। গত দুই মাসে বাজারে ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় যশোর অঞ্চলে আমদানি করা মাছও ব্যাপকভাবে বিক্রি হচ্ছে।

    ঢাকার বাজারের সাম্প্রতিক চিত্রেও ইলিশের উচ্চমূল্য দেখা গেছে। ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৫০০ গ্রামের বেশি ওজনের ইলিশের দাম চাওয়া হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা। এক কেজির বেশি ওজনের মাছের দাম প্রায় ২ হাজার ৮০০ টাকা। ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রামের ইলিশ ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা এবং ৭০০ গ্রামের মাছ প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

    মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। বাংলাদেশে বিশ্বের মোট ইলিশের প্রায় ৬০ শতাংশ উৎপাদিত হয়।

    মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় অবশ্য দাবি করে, বর্তমানে বিশ্বে উৎপাদিত ইলিশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়।

    উৎপাদন বাড়ানোর প্রকল্প, প্রশ্ন কার্যকারিতা নিয়ে

    ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ২০২০ সালে ছয় বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। এতে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু উৎপাদন কমতে থাকায় প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে।

    মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক বলেন, গত সরকারের সময়ে প্রকল্পটি কতটা কাজে লাগানো হয়েছে বা কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ইলিশের উৎপাদন কমার কারণও বের করতে হবে।

    ভারত থেকে ইলিশ আমদানির বিষয়ে তিনি বলেন, ইলিশ আমদানি নিষিদ্ধ নয়। আগেও বিভিন্ন সময়ে অল্প পরিমাণে ইলিশ এসেছে। এবার বাজারে ইলিশ কম থাকায় ব্যবসায়ীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সীমিত পরিসরে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

    তার মতে, ইলিশ সাগরের মাছ। প্রজননের জন্য নদীতে আসে। ভারতের জেলেরা হয়তো সাগর থেকেই বেশি মাছ ধরে ফেলছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের মজুত কমছে। এসব কারণেই অল্প পরিমাণে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

    গুজরাটে ইলিশের জোগান বেশি

    বাংলাদেশে যে ইলিশ আসছে, তার বড় অংশ গুজরাটের। পশ্চিমবঙ্গের মাছ রপ্তানিকারক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদ বলেন, এ বছর গুজরাটে ইলিশের জোগান অনেক বেশি হয়েছে। এতে সেখানে উদ্বৃত্ত মাছ তৈরি হয়েছে এবং দামও কমেছে।

    তিনি বলেন, বাংলাদেশে শুধু ইলিশের নয়, ইলিশের ডিমেরও বড় চাহিদা রয়েছে। গুজরাটের ইলিশ আকারে বড় এবং ডিমে ভরা থাকে। বাংলাদেশে ইলিশের ডিম প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশের বাজারেও রপ্তানি করা হয়।

    মাকসুদের তথ্য অনুযায়ী, গুজরাটের ভারুচ থেকে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার পাইকারি বাজার হয়ে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত পর্যন্ত ইলিশের এই বাণিজ্যিক পথ বিস্তৃত হয়েছে।

    ভারুচের ভাদভূতের কাছে মাছ ব্যবসায়ীদের সংগঠনের সভাপতি চিমন ট্যান্ডেল বলেন, গত পাঁচ বছর ধরে সেখানে ইলিশের উৎপাদন ভালো হচ্ছে। সাধারণত এসব মাছ পশ্চিমবঙ্গে পাঠানো হয়। সেখান থেকে বাংলাদেশেও রপ্তানি করা হয়।

    তার ভাষ্য, ভাদভূত থেকে সরাসরি রেফ্রিজারেটেড ট্রাকেও বাংলাদেশে ইলিশ পাঠানো হয়। পরিমাণ কম হলে ট্রেনের কনটেইনার ব্যবহার করা হয়। তবে বড় চালান সাধারণত ট্রাকে যায়।

    চিমন ট্যান্ডেলের হিসাবে, প্রতিদিন ভারুচ থেকে তিনটি ট্রাক ছাড়ে। প্রতিটি ট্রাকে গড়ে ২৫০টি বাক্স থাকে। প্রতি বাক্সে থাকে ৬০ কেজি ইলিশ।

    মৎস্যজীবী দীপকভাই মাচ্ছি বলেন, গুজরাটে ইলিশের মৌসুম জুনের মাঝামাঝি থেকে নবরাত্রি পর্যন্ত। বর্তমানে সেখানে প্রতি কেজি ইলিশের দাম ৬০০ থেকে ৭০০ ভারতীয় রুপি। তিন মাসের মৌসুমে ছোট আকারের জেলেদের কেউ কেউ প্রায় পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করেন বলে দাবি তাঁর।

    গুজরাটে সবচেয়ে বেশি ইলিশ পাওয়া যায় ভাদভূতের কাছে, যেখানে নর্মদা নদী সাগরে মিশেছে। এ ছাড়া জম্বুসার ও হানসোটেও ইলিশ পাওয়া যায়।

    পশ্চিমবঙ্গের বাজারেও বাংলাদেশি ক্রেতা

    হাওড়ার কালীবাবুর বাজার মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রথীকান্ত বার দাবি করেন, এ বছর বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরাও পশ্চিমবঙ্গের বাজারে গিয়ে খুচরা পরিমাণে ইলিশ কিনছেন। তাদের কেনা মাছের পরিমাণ প্রায় দেড় থেকে তিন মেট্রিক টন। তবে তারাও গুজরাট ও মহারাষ্ট্র থেকে আসা বড় আকারের ইলিশ বেশি পছন্দ করছেন।

    পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি মৎস্যজীবী সংগঠনের নেতা জয়কৃষ্ণ হালদার ইলিশের জোগানের এই পরিবর্তনের জন্য জলদূষণ ও শিল্পভিত্তিক মাছ ধরাকে দায়ী করেছেন।

    তিনি বলেন, নিষিদ্ধ গাছের ওষুধের ব্যবহার এবং শহরের বর্জ্য পানিতে ফেলা বন্ধ করতে বারবার বলা হলেও তা মানা হচ্ছে না। পাশাপাশি প্রায় সারা বছর বড় মোটরচালিত নৌযান দিয়ে শিল্পভিত্তিক মাছ ধরার কারণে সাধারণ জেলেদের মাছের জোগানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

    অন্যদিকে বাংলাদেশ গত অর্থবছরে ইলিশ রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ করতে পারেনি। কর্মকর্তাদের হিসাবে, ১ হাজার ২০০ টন রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সে বছর ১১০ টনেরও কম ইলিশ রপ্তানি হয়েছে।

    ফলে একদিকে দেশে ইলিশের উৎপাদন ও সরবরাহ কমছে, অন্যদিকে বাজারের চাহিদা মেটাতে ভারত থেকে আমদানি বাড়ছে। ইলিশ উৎপাদনে দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব ধরে রাখতে হলে উৎপাদন কমার কারণ চিহ্নিত করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা এখন আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

  • দুর্গাপূজায় পদ্মার ইলিশ চেয়ে বাংলাদেশকে ভারতের চিঠি

    দুর্গাপূজায় পদ্মার ইলিশ চেয়ে বাংলাদেশকে ভারতের চিঠি

    ভাষা, সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের মিলের কারণে দুই বাংলার মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের আবেগঘন সম্পর্ক রয়েছে। সেই সম্পর্কের অন্যতম প্রতীক পদ্মার ইলিশ। আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে আবার পদ্মার ইলিশ চেয়ে আবেদন জানিয়েছে ভারতের ব্যবসায়ীরা।

    দীর্ঘদিন ধরে ইলিশ রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরার লাখ লাখ ইলিশপ্রেমীর আগ্রহ পূরণ হচ্ছে না। এ অবস্থায় পূজার বাজারে বাংলাদেশের ইলিশ পাঠানোর অনুমতি চেয়ে বাংলাদেশ সরকারের কাছে চিঠি দিয়েছে ভারতের ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন।

    বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছরের ধারাবাহিকতায় এবারও ভারতের এই ব্যবসায়ী সংগঠন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পৃথকভাবে চিঠি পাঠিয়েছে।

    শুধু চিঠি নয়, বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সফরও করেছেন ভারতের ফিশ ইমপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা। তারা বাংলাদেশের বাণিজ্য সচিবের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। পাশাপাশি কলকাতায় নিযুক্ত বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার মো. খালেদের সঙ্গেও আলোচনা করেছেন।

    ভারতের ব্যবসায়ীদের দাবি, দুর্গাপূজার সময় দুই বাংলার মানুষের আবেগ ও ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের ইলিশের চাহিদা থাকে ব্যাপক। এ কারণে পূজার আগে সীমিত পরিমাণে হলেও পদ্মার ইলিশ রপ্তানির সুযোগ চান তারা।

    বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, পূজা উপলক্ষে ইলিশ মাছ রপ্তানির বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। তবে কী পরিমাণ ইলিশ রপ্তানি করা হবে তা এখনো ঠিক হয়নি। বাণিজ্য সচিব আতাউর রহমান খান বলেন, ভারতীয় ব্যবসায়ীদের চিঠি পেয়েছি। কী পরিমাণ ইলিশ রপ্তানি করা যায় তা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করা হবে।

    ভারতীয় ব্যবসায়ীদের চিঠিতে বলা হয়, ১৯৯৬ সালের পর থেকে প্রতি বছর গড়ে পাঁচ হাজার টন ইলিশ ভারতে রপ্তানি হচ্ছিল। কিন্তু ২০১২ সালের পর থেকে অজ্ঞাত কারণে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশ সরকার কেবল দুর্গাপূজার সময় নির্দিষ্ট এক মাসের জন্য ইলিশ রপ্তানির বিশেষ অনুমতি দিয়ে আসছে। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, এই স্বল্পমেয়াদি ও সীমিত অনুমতি শেষ পর্যন্ত কার্যকর কোনো সুফল বয়ে আনে না।

    ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোর সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ীদের পক্ষে ইলিশ রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। তাদের বিশ্বাস, স্থায়ীভাবে ইলিশ রপ্তানি উন্মুক্ত করা হলে দুই দেশের সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় হবে এবং ভারতের জনগণ, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মৎস্যপ্রেমী মানুষ কৃতজ্ঞচিত্তে তা স্মরণ রাখবে।

    চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, প্রতিবছর সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হলেও, এবার তা আরো আগে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি, রপ্তানির ক্ষেত্রে কোনো কঠোর সময়সীমা জুড়ে না দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা, যাতে সর্বোচ্চ পরিমাণে ইলিশ রপ্তানি করা সম্ভব হয়।

    অভিযোগ রয়েছে, অতীতে অনেক সময় শিল্পের বাইরের ব্যক্তিদেরও ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যার ফলে তারা কার্যকরভাবে কোনো ইলিশই ভারতে পাঠাতে পারেননি। তাই ভুঁইফোড় ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে কেবল প্রকৃত ও অভিজ্ঞ রপ্তানিকারকদেরই এই অনুমতি দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

    ভারতীয় ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে দীর্ঘ বিরতির পর ভারতে ৫০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ। এরপর ২০২০ সালে এক হাজার ৮৫০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হলেও পরিমাণ অনুযায়ী রপ্তানি হয়নি। ২০২১ সালে চার হাজার ৬০০ টন অনুমোদনের বিপরীতে ভারতে পাঠানো হয় ১২০০ টন ইলিশ।

    ২০২২ সালে দুই হাজার ৯০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে বাস্তবে রপ্তানি হয়েছে এক হাজার ৩০০ টন। ২০২৩ সালে তিন হাজার ৯৫০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হলেও ভারতে গেছে এক হাজার ৩০০ টন। ২০২৫ সালে দুই হাজার ৪২০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হলেও রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৫৭৭ টন। সর্বশেষ গত বছর এক হাজার ২০০ টন রপ্তানির অনুমোদনের বিপরীতে ভারতে গেছে মাত্র ১৫০ টন ইলিশ।

    পশ্চিমবঙ্গ ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মকসুদ আমার দেশকে বলেন, আমরা আশাবাদী, এ বছর বেশি পরিমাণ ইলিশ আনতে পারব। ইতোমধ্যে চিঠি দেওয়ার পাশাপাশি বাণিজ্য সচিবের সঙ্গে বৈঠক করেছি।

    তিনি আরো বলেন, রপ্তানির সময় এক মাস বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু এ সময় অনুমোদন পাওয়া সব মাছ আমরা আনতে পারি না। এজন্য সময়সীমা তুলে দেওয়ার পাশাপাশি ইলিশের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে দিলে ভালো হয়।