ইরান

  • ইরান ও মক্কা চুক্তির দেশগুলো আলোচনা চালাবে, হরমুজে সমাধানের ঘোষণা নেই

    ইরান ও মক্কা চুক্তির দেশগুলো আলোচনা চালাবে, হরমুজে সমাধানের ঘোষণা নেই

    ইরান ও মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির তিন সদস্য দেশ সোমবার, ২৬ অক্টোবর নিরাপত্তা আলোচনা চালিয়ে যেতে একমত হয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে সমঝোতার ঘোষণা আসেনি। পাকিস্তানের এক কর্মকর্তা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি নিয়ে একটি অপ্রকাশিত প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

    স্বাভাবিক চলাচল ফেরানো এখনো ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। যৌথ বিবৃতিতে আরও আলোচনার ঘোষণা থাকলেও বাস্তবায়নের সময়সূচি নেই।

    ইরান ও আরব উপদ্বীপের মাঝখানে হরমুজ প্রণালি, নাসার টেরা উপগ্রহ থেকে তোলা। পাবলিক ডোমেইন, নাসা, উইকিমিডিয়া কমন্স।

    সংক্ষেপে

    • সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান সোমবার তেহরানে ইরানের নিরাপত্তা নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেন। আয়োজক ছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজায়ী।
    • চার দেশের যৌথ বিবৃতিতে শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা আছে। কোনো তারিখ, বাস্তবায়নব্যবস্থা বা সমঝোতা নেই। পাকিস্তানের এক কর্মকর্তা বলেন, ওয়াশিংটনের সম্মতি নিয়ে বৈঠকেই একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। গৃহীত হলে চুক্তির দেশগুলো ও কাতার এর নিশ্চয়তা দিতে পারে।
    • অতিথি তিন দেশ আগস্টে সই হওয়া মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির সদস্য। এর অধীনে এক সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলা তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে।
    • হরমুজ প্রণালি বন্ধ রয়েছে। জুনে প্রণালি খোলার জন্য করা সমঝোতা স্মারক কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভেঙে পড়ে। এখন এর শর্ত নিয়ে বিরোধ: ইরান বলছে, প্রণালি খুলতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ শেষ করাসহ অন্য শর্ত পূরণ করতে হবে। ওয়াশিংটন এসব শর্ত মেনে নেওয়ার ঘোষণা দেয়নি। শনিবার ইরান নিজে নতুন প্রস্তাব পাঠানোর কথা অস্বীকার করে।
    • সোমবার সকালের লেনদেনে তেলের দাম কমে। ওই সকালের একটি প্রতিবেদনে আগের ২৪ ঘণ্টায় আটটি জাহাজ প্রণালি পার হওয়ার কথা বলা হয়। যুদ্ধের আগে দৈনিক গড় ছিল প্রায় ৬০।

    তেহরানে বৈঠক

    বৈঠকের প্রস্তাব দেয় পাকিস্তান, ইরানের সমর্থনে তা অনুষ্ঠিত হয়। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির গত সপ্তাহে নিজের তেহরান সফরে এই পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন। সৌদি আরব পাঠায় যুবরাজের ছোট ভাই প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমানকে। তুরস্ক পাঠায় জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ইব্রাহিম কালিনকে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও ছিলেন। আলোচনার আগে অতিথিরা প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে দেখা করেন।

    ইরানের ভাষ্যে আলোচ্যসূচিতে ছিল আঞ্চলিক নিরাপত্তা, এ বছর ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পরিণতি এবং ফিলিস্তিন ও লেবানন। পাকিস্তানের এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, বৈঠকের মূল লক্ষ্য আঞ্চলিক অনাক্রমণ নেটওয়ার্ক গড়া। আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা, হুতিদের হামলা, প্রণালি ও অবরোধও ছিল। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, সফরের মাধ্যমে নতুন করে উত্তেজনা ঠেকাতে যোগাযোগের পথ খোলা হবে। এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানান, রোববার কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা তেহরানে একই বিষয় নিয়ে কাজ করছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে।

    পেজেশকিয়ান অতিথিদের বলেন, ইরান আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে প্রস্তুত এবং অঞ্চলের দেশগুলোর নিজেদের মধ্যেই মতভেদ মেটাতে চায়। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র চায় না বলেও তিনি আবার জানান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বৈঠকটিকে অঞ্চলের দেশগুলোর নিজেদের গড়া নিরাপত্তা কাঠামোর পথে বাস্তব পদক্ষেপ বলেন। একই দিনে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান টেলিভিশন ভাষণে সতর্ক করেন, ইরানে নতুন হামলা অঞ্চলকে সহিংসতার নতুন চক্রে টেনে নেবে। দিনের শেষে রেজায়ী বলেন, এমন সহযোগিতা অনেক আগেই শুরু হওয়া উচিত ছিল।

    আলোচনায় প্রতিরক্ষা চুক্তি

    অতিথি তিন দেশ ৭ আগস্ট মক্কায় মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে। সই করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট, সৌদি যুবরাজ ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। এর মূলনীতি সম্মিলিত প্রতিরক্ষা: এক সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলা সবার ওপর হামলা। পাকিস্তান গত সপ্তাহে চুক্তিটি অনুসমর্থন করেছে। সোমবারের বৈঠক নিয়ে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, তুরস্কের অনুসমর্থনের প্রক্রিয়া তখনো চলছিল।

    চুক্তির সদস্যদের জড়িয়ে হামলার পর এই বৈঠক হলো। গত মাসে হুতিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের কিছু এলাকা দখলের পর সৌদি আরব তাদের ওপর হামলা বাড়িয়েছে। ইরান-সমর্থিত হুতিরা বারবার সৌদি তেল স্থাপনায় আঘাত করেছে। সোমবার তারা সৌদি পাম্পিং স্টেশন ও রিয়াদ বিমানবন্দরে আবার হামলার দাবি করে। সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সৌদি আরব তা নিশ্চিত করেনি। চুক্তির রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি অক্টোবরের শুরুর দিকে রিয়াদে জরুরি বৈঠক করে সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় একমত হয়।

    আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের প্রেসিডেন্ট চুক্তিটিকে ইতিবাচক বলেছেন। মিসরের সংসদ সোমবার ভোট দিয়ে প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিকে অনুমতি দিয়েছে, রিয়াদ চাইলে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় সামরিক সহায়তা দিতে। কায়রো চুক্তিতে যোগ দেওয়ার কথাও বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছে।

    বৈঠকের বাইরে সমঝোতার শর্ত

    সংঘাতের আট মাসে ইরানি বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ও ইরানের নিজের বন্ধ রাখার কারণে হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ। লিখিত শর্তগুলো রয়েছে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় হওয়া জুনের ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকে: জাহাজ চলাচল ফিরবে, অবরোধ উঠবে, এরপর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে। দুই পক্ষ হামলা আবার শুরু করায় কয়েক সপ্তাহেই সমঝোতা ভেঙে পড়ে। এখনো এর শর্ত নিয়ে বিরোধ রয়ে গেছে। সোমবারের বৈঠকের আগে ইরান একটি সীমা জানায়। এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, স্থায়ীভাবে যুদ্ধ শেষ করতে তেহরানের শর্ত যুক্তরাষ্ট্র না মানা পর্যন্ত অতিথি তিন দেশের সঙ্গে পারমাণবিক বিষয়ে আলোচনা হবে না। শর্তের মধ্যে অবরোধ তুলে নেওয়া ও তেল নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা আছে।

    ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ৪ অক্টোবর বলেন, স্মারকের সাত শর্ত পূরণ না হলে প্রণালি বন্ধ থাকবে। ১৭ অক্টোবরের বিবৃতিতে আরাগচি বলেন, অবরোধ, তেল নিষেধাজ্ঞা ও শত্রুতা শেষ হলে সাত দিনের মধ্যে প্রণালি খুলে দেওয়ার ইরানের প্রস্তাব বহাল আছে।

    প্রতিবেদনে আসা প্রস্তাবগুলোর প্রেরক ও তারিখ আলাদা। পাকিস্তানের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, কূটনীতির চেষ্টায় ট্রাম্পের সম্মতি নিয়ে মুনির সোমবারের বৈঠকে ইরানকে একটি প্রস্তাব দিয়েছেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ের জন্য কিছু আছে। গৃহীত হলে চুক্তির দেশগুলো ও কাতার নিশ্চয়তাদাতা হতে পারে। বৈঠকের আগে আল আরাবিয়া জানিয়েছিল, তেহরান পাকিস্তানের মাধ্যমে ওয়াশিংটনে নতুন প্রস্তাব পাঠিয়েছে। শনিবার ইরানের তাসনিম বার্তা সংস্থা মধ্যস্থতাকারীদের কাছে নতুন ইরানি প্রস্তাব পাঠানো অস্বীকার করে। এই অস্বীকৃতি পাকিস্তানি কর্মকর্তার বর্ণিত সোমবার ইরানকে দেওয়া প্রস্তাবের আগের। প্রকাশিত বিবরণে দুটি একই প্রস্তাব কি না, তা প্রতিষ্ঠিত হয় না। আলাদাভাবে ইসলামাবাদে ইরানের রাষ্ট্রদূত বলেন, অবরোধ শেষ হলে প্রণালি খুলতে ইরান প্রস্তুত বলে জানিয়েছিল, কিন্তু ট্রাম্প তা প্রত্যাখ্যান করেন।

    সপ্তাহান্তজুড়ে ট্রাম্প নিজের বক্তব্যে দুই পথই খোলা রেখেছেন। ইরানের সঙ্গে চুক্তি সম্ভব বলে তিনি জানান। তাঁর মতে, যেকোনো চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন স্থায়ীভাবে ঠেকাতে হবে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ৮ অক্টোবর প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে বলেন, যুদ্ধ শেষ করতে ইরানকে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে। শুক্রবার ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আরেকটি সামরিক অভিযান চালাতে পারে। ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবার হামলা করলে উপসাগরের সমুদ্রতলের তারে হামলার বিস্তারিত পরিকল্পনা করেছে তেহরান। ফ্লোরিডার এক সমাবেশেও ট্রাম্প বলেন, তেহরান রাজি না হলে যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালাতে পারে। এ বছরের ইরানবিরোধী অভিযানের নাম অনুসারে তিনি একে আরেকটি এপিক ফিউরি বলেন। রোববারও তিনি নিজেকে চুক্তি ও নতুন পদক্ষেপের মধ্যে সিদ্ধান্তহীন বলে বর্ণনা করেন। মধ্যস্থতাকারীদের সময়সূচির সামনে দুটি নির্বাচন: ইসরায়েলে মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর নির্বাচন হয়েছে; যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ৩ নভেম্বর। চুক্তির দেশগুলো যে অন্তর্বর্তী উদ্যোগ এগিয়ে নিচ্ছে, তার লক্ষ্য ওই সময়সীমা।

    ২৪ ঘণ্টায় আট জাহাজের চলাচল

    সোমবার সকালের লেনদেনে ব্রেন্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে বলে ডিটিএন জানায়। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল সময় ২৬ অক্টোবর সকাল ৯টা ২৭ মিনিটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জাহাজ পর্যবেক্ষণের তথ্য দিয়ে বলা হয়, আগের ২৪ ঘণ্টায় আটটি জাহাজ হরমুজ পার হয়েছে। যুদ্ধের আগে দৈনিক গড় ছিল প্রায় ৬০। এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের চলাচলের হিসাব; নিয়মিত দিনে আটটি জাহাজ চলার হার নয়।

    যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী আলাদাভাবে বলেছে, প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর তারা হরমুজ দিয়ে ১৫০ কোটি ব্যারেল তেল বের করতে সহায়তা করেছে। পুঞ্জীভূত তেলের পরিমাণ ও এক দিনের জাহাজের সংখ্যা ভিন্ন সময় ও এককের হিসাব। এগুলো সরাসরি একই কার্যক্রমের পরিমাপ নয়।

    এরপর কী

    • চার দেশ আলোচনা চালিয়ে যেতে একমত হয়েছে। দ্বিতীয় বৈঠকের তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।
    • ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে নির্বাচন হয়েছে। আঞ্চলিক কূটনীতির পাশাপাশি ফল ও পরবর্তী সরকার গঠনের আলোচনা চলবে।
    • ওয়াশিংটনকে অবরোধনীতি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তেহরানকে জাহাজ চলাচল ও গ্রহণযোগ্য শর্ত নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাকিস্তানি কর্মকর্তার বর্ণিত প্রস্তাব প্রকাশ করা হয়নি।
    • দ্বিতীয় বৈঠক বা ওই প্রস্তাব গ্রহণের প্রকাশ্য জবাব ঘোষিত আলোচনার পরের পরীক্ষা হবে। আলোচনাকে স্বাগত জানানোর বক্তব্য নিজে থেকে জাহাজ চলাচলের সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করে না। যৌথ বিবৃতিতে এমন কোনো সমঝোতা ঘোষণা করা হয়নি।
  • হরমুজে ২ মার্কিন জাহাজ ও ৮ তেলবাহী ট্যাংকারে ইরানের হামলা

    হরমুজে ২ মার্কিন জাহাজ ও ৮ তেলবাহী ট্যাংকারে ইরানের হামলা

    ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তাদের বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে দুটি মার্কিন জাহাজ ও আটটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে।

    আইআরজিসি বরাত দিয়ে ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানোর পর এর জবাব হিসেবে তারা এসব জাহাজে হামলা চালিয়েছে। বিবৃতিতে মার্কিন বাহিনীকে ‘সন্ত্রাসী মার্কিন সেনাবাহিনী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

    আইআরজিসি আরো জানায়, তারা আরো ১০টি ‘নিয়ম লঙ্ঘনকারী জাহাজকে’ লক্ষ্যবস্তু করেছে। এসব জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের ‘উসকানি ও সমর্থনে’ হরমুজ প্রণালির একটি ‘নিষিদ্ধ ও অনিরাপদ এলাকায়’ প্রবেশের চেষ্টা করছিল বলে অভিযোগ করেছে ইরান।

    আইআরজিসি বলেছে, হরমুজ প্রণালি এখনো তাদের ‘শক্তিশালী ও কর্তৃত্বপূর্ণ নজরদারি ও ব্যবস্থাপনার’ আওতায় রয়েছে।

    সূত্র: আল জাজিরা

  • মক্কা চুক্তিকে ইরানের বিরুদ্ধে মনে করি না, বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত আমাদের চিন্তিত করে না: ইরানের রাষ্ট্রদূত

    মক্কা চুক্তিকে ইরানের বিরুদ্ধে মনে করি না, বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত আমাদের চিন্তিত করে না: ইরানের রাষ্ট্রদূত

    বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে চলেছে উল্লেখ করে ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমি বলেছেন, ‘তাই বাংলাদেশের কোনো সিদ্ধান্ত আমাদের চিন্তিত করে না। আমরা মক্কা চুক্তিকে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো চুক্তি মনে করি না।’

    আজ বুধবার সকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইরানের রাষ্ট্রদূত এ কথা বলেন। তিনি এদিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

    ইরানের রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমরা মনে করি, এই মক্কা চুক্তি আসলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার দুর্বলতার একটি লক্ষণ।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের সৌদি আরবের সঙ্গে কোনো চ্যালেঞ্জ বা বিরোধিতা নেই। তুরস্ক ও পাকিস্তানের কথা বললে, তারা ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের খুব ভালো বন্ধু। আর সৌদি আরবের সঙ্গেও আমাদের সুসম্পর্ক রয়েছে, এটি এমন একটি দেশ, যার সঙ্গে আমরা ভালো সম্পর্ক বজায় রেখে চলছি। তাই মক্কা চুক্তি নিয়ে আমাদের কোনো উদ্বেগ বা চিন্তা নেই।’

    যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের সময় ইরান কোনো আরব দেশের ভূখণ্ডকে নিশানা করেনি বলে জানান রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমি। তিনি বলেন, ‘ আপনারা জানেন, ইরান এবং আমেরিকার সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় আমরা কেবল এই সব আরব দেশগুলোতে অবস্থিত আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিগুলোতে আক্রমণ করেছি। আমরা কখনো কোনো আরব দেশের ভূখণ্ড বা মাটিতে আক্রমণ করিনি।’

    বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মক্কা চুক্তিটি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থে গঠিত হচ্ছে। তাই যেসব মুসলিম দেশ এতে যোগ দিচ্ছে, তারা কি পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থই পূরণ করছে না—এমন প্রশ্নের জবাবে ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমি বলেন, ‘না, বিষয়টি তা নয়। মক্কা চুক্তি এমন একটি সময়ে গঠিত হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ও তাদের মিত্রদের নিরাপত্তা দেওয়া নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় রয়েছে।’

    এখন বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব ও জর্ডানের মতো আরব দেশগুলোর কাছে আমাদের প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্র কি আপনাদের কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা দিতে পেরেছে?

    জালিল রাহিমি, ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত

    এ প্রসঙ্গে ইরানের রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, অতীতের বছরগুলোতে এই অঞ্চলের দেশগুলোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা সব সময় স্পষ্ট ছিল। তারা বলত, ‘আমাদের সামরিক ঘাঁটি করার জন্য জমি দাও এবং আমাদের কাছ থেকে অস্ত্র কেন, তাহলে আমরা তোমাদের নিরাপত্তা দেব।’ যুক্তরাষ্ট্র এই একই অজুহাত দিয়ে ইরানে হামলা চালিয়েছিল—যেন তারা ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও সরকার পরিবর্তন করতে পারে, ইরানের ইউরেনিয়াম দখল করতে পারে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি বন্ধ করতে পারে এবং বিশ্বে তাদের সামরিক শক্তি প্রদর্শন করতে পারে।

    জালিল রাহিমি বলেন, ‘কিন্তু আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন, ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। আমাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এখনো আমাদের হাতেই আছে। আর গত রাতেও আমাদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত ও ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থিত আমেরিকান সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে আঘাত হেনেছে।’

    বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মক্কা চুক্তিটি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থে গঠিত হচ্ছে। তাই যেসব মুসলিম দেশ এতে যোগ দিচ্ছে, তারা কি পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থই পূরণ করছে না—এমন প্রশ্নের জবাবে ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমি বলেন, ‘না, বিষয়টি তা নয়। মক্কা চুক্তি এমন একটি সময়ে গঠিত হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ও তাদের মিত্রদের নিরাপত্তা দেওয়া নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় রয়েছে।’

    যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি বা সমুদ্রপথ খোলার জন্য কোটি কোটি ডলার খরচ করেছে উল্লেখ করে ইরানের রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমার দৃষ্টিতে, এই মক্কা চুক্তি আসলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরাজয়ের একটি সম্পূরক অংশমাত্র। এই অঞ্চলের মুসলিম দেশগুলো এখন বুঝতে পেরেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের স্তূপ তাদের প্রকৃত নিরাপত্তা দিতে পারে না। তাই আমরা মক্কা চুক্তিকে ইরানের বিরুদ্ধে মনে করি না এবং এটি নিয়ে আমরা একেবারেই চিন্তিত নই।’

    ইরান কি এই মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার জন্য কোনো প্রস্তাব দিয়েছে বা দেবে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমি বলেন, ‘আমরা যোগ দেওয়ার জন্য নিজ থেকে কোনো প্রস্তাব জমা দিইনি। তবে মক্কা চুক্তির সদস্যদেশগুলো যদি আমাদের যুক্ত হওয়ার আহ্বান বা প্রস্তাব দেয়, তাহলে আমরা তা বিবেচনা করব।’

    আজ থেকে প্রায় ১০ বছর আগে ইরান মক্কা চুক্তির মতোই একটি প্রস্তাব দিয়েছিল জানিয়ে দেশটির রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমরা একটি পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত মধ্যপ্রাচ্য গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলাম, যেন মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র না থাকে। কিন্তু ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র কি সেই প্রস্তাব সমর্থন করেছিল? না, করেনি। আমাদের দ্বিতীয় প্রস্তাবটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যের সব ইসলামিক দেশগুলোর মধ্যে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করা। কিন্তু তখন আরব দেশগুলো এই প্রস্তাব সমর্থন করেনি, কারণ, তারা ভেবেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্যই তাদের নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট।’

    ‘এখন বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব ও জর্ডানের মতো আরব দেশগুলোর কাছে আমাদের প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্র কি আপনাদের কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা দিতে পেরেছে? আপনাদের আকাশসীমা অতিক্রম করে আমাদের যে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তেল আবিবের দিকে গেছে, যুক্তরাষ্ট্র কি সেগুলো থামাতে পেরেছে?,’ বলেন তিনি।

  • শক্তিশালী অবস্থানে থেকে যুদ্ধ শেষ করতে চাই: ইরানি প্রেসিডেন্ট

    শক্তিশালী অবস্থানে থেকে যুদ্ধ শেষ করতে চাই: ইরানি প্রেসিডেন্ট

    যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কয়েক মাস ধরে চলা যুদ্ধ এখনই শেষ করার আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। কূটনৈতিক আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ার মধ্যেই তিনি বলেছেন, ইরান এখন ‘শক্তিশালী অবস্থানে’ রয়েছে।

    গতকাল শুক্রবার চিকিৎসকদের সঙ্গে এক বৈঠকে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘যেহেতু আমরা এখন শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে আছি, তাই এখনই এই যুদ্ধ শেষ করা আমাদের জন্য ভালো।’

    পেজেশকিয়ান আরও বলেন, ‘পুরো বিশ্ব আমাদের বিজয় স্বীকার করছে। সবাই বলছে, যুক্তরাষ্ট্র সব ধরনের নিয়মকানুন লঙ্ঘন করে আমাদের স্কুল, হাসপাতাল ও অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে। এ কারণে তারা এখন বিশ্বজুড়ে ঘৃণিত।’

    গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা সমঝোতা স্মারকের পক্ষেও সাফাই গেয়েছেন পেজেশকিয়ান। ইরানের পার্লামেন্টের কট্টরপন্থী সদস্যরা অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর সরকার ওই সমঝোতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড় দিয়েছে।

    জবাবে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘এই সমঝোতার একটি ধারাও তাঁরা দেখাতে পারবেন না, যেখানে আত্মসমর্পণের কথা বলা হয়েছে; বরং সব প্রতিশ্রুতি অপর পক্ষকেই পূরণ করতে হবে।’

    তবে সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের সামরিক নেতৃত্ব নতুন কোনো হুমকি এলে পাল্টা হামলার জন্য প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছে।

    ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহিকে উদ্ধৃত করে দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে, স্থল, সমুদ্র, আকাশ, বিমান প্রতিরক্ষা, এমনকি সাইবার হামলা চালাতেও ইরানের বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। নতুন কোনো হুমকি এলে বিধ্বংসী জবাব দেওয়া হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

    হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনা

    ওমান ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা গত শুক্রবার ফোনে কথা বলেছেন। ওমানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই মন্ত্রী আলোচনা ও কূটনৈতিক সংলাপ আবার শুরু করার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন।

    ইরান গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ এখনো আংশিক বন্ধ করে রেখেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে নৌ অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে।

    মার্কিন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ অংশ দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকারের গোপন বহর চলাচল করছে। এসব ট্যাংকারকে মার্কিন নৌবাহিনী পাহারা দিচ্ছে। এর ফলে প্রতিদিন ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি ব্যারেল তেল রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে বলে এসব প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

    নতুন নিষেধাজ্ঞার হুমকি

    আলোচনায় বসতে ইরান আগ্রহী কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের সুযোগ সীমিত হয়ে এসেছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা আসলে শেষ পর্যন্ত কী ঘটে, তা দেখার অপেক্ষায় আছি।’

    ট্রাম্প আরও বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি এবং এর আশপাশের স্থলভূমিসহ পুরো অঞ্চলের ওপর আমাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তারা একটি চুক্তি করতে চায়। কিন্তু আমার মতে, তারা সঠিক চুক্তি করার জন্য এখনো প্রস্তুত নয়।’

    ইরানকে সহায়তা দেওয়া দেশগুলোর বিরুদ্ধেও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। এর মধ্যেই মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, কঠোর নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানের সরকারকে ‘ধসিয়ে দেওয়া’ হবে।

  • ইরানকে চাপে ফেলতে নতুন কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের

    ইরানকে চাপে ফেলতে নতুন কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের

    ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান ও কূটনৈতিক উদ্যোগে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার পর ফের কঠোর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশলে ফিরছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের ওপর নতুন করে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালানোর পরিবর্তে নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করা এবং নৌ অবরোধের মাধ্যমে দেশটির অর্থনীতিকে চাপে রাখার পথ বেছে নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।

    ইরানের অর্থনীতিতে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কতটা গভীর হয়েছে—এমন পরিসংখ্যান ও তথ্য ট্রাম্পের সামনে তুলে ধরা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। তাদের ধারণা, নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করার মাধ্যমে।

    তেহরানকে পরমাণু কর্মসূচি ও অন্যান্য ইস্যুতে ছাড় দিতে বাধ্য করা সম্ভব না হওয়ায় সামরিক হামলার পথ বেছে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তাতেও প্রত্যাশিত রাজনৈতিক ফল না আসায় কূটনৈতিক আলোচনার মধ্য দিয়ে একটি অন্তর্বর্তী শান্তি সমঝোতার চেষ্টা হলেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মতপার্থক্য কাটেনি।

    সোমবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। নতুন করে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালানোর বিষয়ে আমি এখনই আগ্রহী নই।’ ইরানও জানিয়ে দিয়েছে, শুধু অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করা সম্ভব হবে না। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই মার্কিন কৌশলকে ব্যর্থতার লক্ষণ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

    হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধ আরও জটিল হয়েছে। জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ এই পথটির ওপর দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

    প্রণালিটি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি করেছে ইরান। ট্রাম্প এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এর ফলে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা আবারও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। হরমুজ প্রণালি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ বেড়েছে এবং তেলের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

    অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক তৎপরতার ব্যয়, জ্বালানির দাম এবং মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের ওপর চাপ—সবকিছু মিলিয়ে ওয়াশিংটনের জন্য পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে। মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারে ঘাটতি তৈরি হওয়ার বিষয়েও সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান অর্থনৈতিক চাপের কৌশল মূলত সামরিক সংঘাতের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ ইরানকে আলোচনায় বসাতে না পারলে ওয়াশিংটনের সামনে আবার সামরিক পদক্ষেপের প্রশ্নটি ফিরে আসতে পারে বলে মত বিশ্লেষকদের।

  • ইরান যাওয়ার পথে মরুভূমিতে ১৯ আফগানের মৃত্যু

    ইরান যাওয়ার পথে মরুভূমিতে ১৯ আফগানের মৃত্যু

    ইরানে প্রবেশের চেষ্টার সময় মরুভূমির তীব্র গরমে ও তৃষ্ণায় ১৯ জন আফগান অভিবাসীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। খবর গালফ নিউজের।

    আফগানিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নিমরোজ প্রদেশের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বাদঘিস প্রদেশ থেকে আসা ওই ১৯ জন পুরুষ অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ইরানে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু পথিমধ্যে তীব্র গরম ও পানির অভাবে তারা মরুভূমিতে আটকা পড়েন এবং তৃষ্ণা ও তাপজনিত কারণে মারা যান।

    নিমরোজের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের পরিচালক হাবিবুল্লাহ এলহাম জানান, নিখোঁজদের সন্ধানে পরিচালিত উদ্ধার অভিযানে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় নিমরোজের রিগ লালো মরুভূমি থেকে ১৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

    এর আগে নিকটবর্তী ‘মৃত্যুর উপত্যকা’ নামে পরিচিত দাশ্ত-এ মার্গো মরুভূমি থেকে আরও ৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। সর্বশেষ ১৪ জনের মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে ওই দলের ১৯ জন অভিবাসীরই মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়।

    প্রাদেশিক মুখপাত্র আব্দুল মুতাওয়াকিল তাওয়াহিদি জানান, স্থানীয় প্রশাসন ও বাসিন্দারা দুর্গম ওই এলাকা থেকে মরদেহগুলো উদ্ধার করে স্থানান্তর করেছেন।

    নিহত অভিবাসীরা সবাই বাদঘিস প্রদেশের একটি নির্দিষ্ট গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। মূলত কাজের সন্ধানে ও উন্নত অর্থনৈতিক জীবনের আশায় তারা দেশত্যাগ করে ইরানে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিলেন। ইরান ও পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী নিমরোজ প্রদেশটি আফগান অভিবাসীদের জন্য অন্যতম প্রধান একটি ট্রানজিট রুট। তবে বিশাল বালিয়াড়ি, বরফাবৃত নয় বরং রুক্ষ ল্যান্ডস্কেপ এবং গ্রীষ্মকালে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি তাপমাত্রা থাকার কারণে এই অঞ্চলের মরুভূমি পারাপার অত্যন্ত বিপজ্জনক।

    মানবাধিকার ও মানবিক সাহায্যকারী সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করে আসছে যে গ্রীষ্মের এই সময়ে মরুভূমি পাড়ি দেওয়ার সময় পানিশূন্যতা, চরম আবহাওয়া এবং অতিরিক্ত ক্লান্তির কারণে অভিবাসীরা মারাত্মক জীবনঝুঁকির মুখে পড়েন। আফগানিস্তান থেকে অবৈধ ও বিপজ্জনক এই অভিবাসন রুটগুলোর ভয়াবহতারই একটি করুণ উদাহরণ এই ঘটনা।

  • ইরান-সৌদি ‘গোপন সমঝোতা’, নেপথ্যে পাক সেনাপ্রধান?

    ইরান-সৌদি ‘গোপন সমঝোতা’, নেপথ্যে পাক সেনাপ্রধান?

    সৌদি আরবকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে রক্ষা করতে গোপনে তেহরান ও রিয়াদের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি-সদৃশ সমঝোতা করাতে মধ্যস্থতা করেছে পাকিস্তান। ইসরাইলভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস অব ইসরাইল চাঞ্চল্যকর এক রিপোর্টে এমন দাবি করেছে।
    রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই সমঝোতার বিনিময়ে ইরানের তেল গোপনে পাকিস্তানে রপ্তানির ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে সহায়তা করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের মধ্যস্থতায় গত মার্চের শেষ দিকে এই সমঝোতা হয়েছে। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায় চলছিল।

    যৌথ তেল পরিবহন উদ্যোগকে কাজে লাগিয়ে মধ্যস্থতা
    বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনজন কর্মকর্তার বরাতে টাইমস অব ইসরাইল জানিয়েছে, আসিম মুনির ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) প্রধান আহমাদ বাহিদির সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত একটি তেল পরিবহন উদ্যোগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার বিষয়টি সামনে এনে এই সমঝোতায় মধ্যস্থতা করেন।
    রিপোর্টে দাবি করা হয়, গত বছরের শেষ দিক থেকে এই যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে নীরবে ইরান থেকে পাকিস্তানে তেল পরিবহন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিটি দুই সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে যুক্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইরানি বন্দর অবরোধের মধ্যেও তাদের জন্য বিপুল আর্থিক সুবিধা তৈরি করেছে।

    সমঝোতার পর সৌদির ওপর হামলা কমে যায়
    যুদ্ধের প্রথম মাসে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশ বারবার ইরানের হামলার মুখে পড়ে। তবে সমঝোতা হওয়ার পর সৌদি আরবের ওপর হামলা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এ তথ্য দিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের একজন কূটনীতিক, একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আরেকজন কর্মকর্তা।
    তবে প্রায় তিন মাস কোনো উল্লেখযোগ্য হামলা না হওয়ার পর গত সপ্তাহান্তে ইরান সৌদি আরবের দিকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
    এরপর আসিম মুনির আইআরজিসি প্রধান আহমাদ বাহিদিকে সতর্কবার্তা পাঠান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, মুনির জানান যে, এ ধরনের হামলা অব্যাহত থাকলে তাদের যৌথ তেল পরিবহন উদ্যোগের কার্যক্রম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এরপর থেকে সৌদির দিকে ইরানের আর কোনো ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়নি।

    কেন সক্রিয় ছিল পাকিস্তান?
    প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলমান যুদ্ধে পাকিস্তান ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় রয়েছে। একই সঙ্গে সৌদির সঙ্গে পাকিস্তানের একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে- দুই দেশের যেকোনো একটির ওপর আগ্রাসনকে উভয় দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
    এ ছাড়া সৌদির সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা এবং রিয়াদকে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইসলামাবাদের ওপর আরও নির্ভরশীল করে তোলার আগ্রহও পাকিস্তানের ছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এ কারণেই আসিম মুনির এই মধ্যস্থতায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

    সমালোচনার মুখে সমঝোতা
    মধ্যপ্রাচ্যের এক কূটনীতিক এই সমঝোচনার সমালোচনা করে বলেছেন, এটি কার্যত এমন একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে, যা চলমান যুদ্ধে হামলার লক্ষ্যবস্তু না হওয়ার বিনিময়ে ইরান আঞ্চলিক দেশগুলোর কাছে যে অর্থ বা সুবিধা দাবি করছে, তাকে এক ধরনের “মুক্তিপণ” হিসেবে বৈধতা দিয়েছে।
    তবে গোপন এই সমঝোতার বিষয়ে পাকিস্তান, সৌদি আরব কিংবা ইরানের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

  • ৮৫ মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরানের ড্রোন হামলা

    ৮৫ মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরানের ড্রোন হামলা

    বাহরাইন ও কুয়েতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ৮৫টি সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস জানিয়েছে, তাদের নৌ ও বিমানবাহিনী যৌথভাবে এই হামলা চালায়। তাদের দাবি, হামলায় বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের ঘাঁটি এবং কুয়েতের আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

    আইআরজিসি আরো জানায়, এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাদের প্রথম পাল্টা জবাব। তাদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি ও ইসলামাবাদ চুক্তি লঙ্ঘন করে হরমোজগান ও মাহশাহরে কিছু উপকূলীয় ঘাঁটি এবং বেসামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে।

    তাদের দাবি, ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতার দাফন অনুষ্ঠানের গুরুত্ব কমিয়ে দিতেই যুক্তরাষ্ট্র এই হামলা চালিয়েছে।

  • যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইরান ফিরছে মাথা উঁচু করে

    যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইরান ফিরছে মাথা উঁচু করে

    ‘যদি কোনো কিছুকে তুমি পুরোটা হৃদয় দিয়ে চাইতে পারো, তাহলে পুরো মহাবিশ্ব তোমাকে সেটা পাইয়ে দিতে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়’ — পাউলো কোয়েলহোর আলকেমিস্টের এই উক্তি জগদ্বিখ্যাত বললেও কম হয়।

    তবে ব্রাজিলিয়ান এই কথাসাহিত্যিকের এই উক্তিটাকে আজ চাইলে ইরান প্রশ্নবিদ্ধ করলেও পারে। তারাও তো চেয়েছিল নকআউটের চৌকাঠ ছুঁতে, মনপ্রাণ দিয়েই চেয়েছিল; তাহলে কেন তাদের ক্ষেত্রে হলো তার ঠিক ১৮০ ডিগ্রি উল্টো বিষয়টা! গোটা মহাবিশ্ব ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো বটে, কিন্তু এই ষড়যন্ত্র গেল তাদের বিপক্ষে।

    ইরান চাইলে প্রশ্ন করতেই পারে, ‘এভাবেও স্বপ্ন ভেঙে যায়?’ একবার হলে হতো, দুবারও মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু তাই বলে তিন বার? ইরানের সামনে হিসেবটা ছিল পরিষ্কার। শেষ ম্যাচে মিশরকে হারাতে পারলেই শেষ ৩২-এ পৌঁছে যেত পশ্চিম এশিয়ার এই দেশ। গড়া হয়ে যেত ইতিহাসও, কখনোই যে নকআউটে খেলা হয়নি তাদের!

    সোজা খালিলজাদেহর পায়ে ভর করে সে স্বপ্ন দেখতে শুরুও করেছিল তারা। যোগ করা সময়ে মিশরের জালে বল জড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। তবে বাঁধ সাধল ভিএআর, আর এমন এক নিয়ম, যার দেখা মেলে কালেভদ্রে। সাধারণত মনে করা হয় পাস রিসিভ করার সময় একজন ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দিতে পারলেই বুঝি অফসাইডকে ফাঁকি দেওয়া যায়। সে ধারণা যে ভুল, আসল নিয়মে যে অন্য কিছু বলা আছে, সেটা জানানোর জন্যই যেন এমন দৃশ্যের অবতারণা ঘটে।

    খালিলজাদেহ যখন বলটা পায়ে পেলেন, তখন তার সামনে গোলমুখে দাঁড়িয়ে মিশরের এক ডিফেন্ডার, তার অনেক পেছনে মিশরের গোলরক্ষক, আর ভগ্নাংশের ব্যবধানে পেছনে ফরোয়ার্ড হামজা আবদেলকারিম। সামনে এক ডিফেন্ডার দাঁড়িয়ে, তাহলে তো অফসাইডের কোনো ঝামেলা নেই, তাহলে আর কী, তার শট যখন আছড়ে পড়ল জালে, তখন উদযাপন শুরু হয়ে গেছে সিয়াটল থেকে তেহরান পর্যন্ত। হবেই তো, প্রথমবার বিশ্বকাপের নকআউট নিশ্চিত বলে কথা।

    ঠিক তখন বাঁধ সাধল ভিএআর। অফসাইড! কারণ? অফসাইডের নিয়ম হচ্ছে, সামনে দুইজন ডিফেন্ডার থাকতে হয়, গোলকিপার সবসময় সামনে থাকেন বলেই সে সংখ্যাটা প্রায় সময় নেমে আসে ১-এ। ভুলটা সেখানেই হয়। ইরানও কি সে ফাঁদেই পা দিয়েছিল? সে যাই হোক, ভুলটা হয়েছে জায়গামতোই। যার ফল, ভাগ্যটা গেল ঝুলে। অনেকগুলো সুযোগ ছিল তাদের সামনে, তার কোনো একটার ফল পক্ষে এলেই কেল্লাফতে!

    তাই তাদের অপেক্ষা ছিল আজ সকালের। ক্রোয়েশিয়াকে হারতে হতো, ক্রোয়েশিয়া জিতল; জেতারই কথা ছিল অবশ্য। এরপর উজবেকিস্তান যখন ডিআর কঙ্গোকে চমকে দিয়ে প্রথম গোলটা করে বসল, তখন আশায় বুক বেধে বসেছিল ইরান। এরপর তিনটি গোল করে কঙ্গো চলে গেল শেষ ৩২-এ, ইরানের অপেক্ষাটা গিয়ে ঠেকল অস্ট্রিয়া-আলজেরিয়া ম্যাচে, এই ম্যাচে কোনো এক দল হেরে গেলেই ৩ পয়েন্ট নিয়ে অষ্টম দল হিসেবে নকআউটে চলে যেত ইরান।

    তাদেরকে প্রথমে আশা দিলেন অস্ট্রিয়ার মার্কো আর্নাতোভিচ, তার গোলে অস্ট্রিয়ানরা এগিয়ে গিয়েছিল। এরপর আলজেরিয়াকে সমতায় ফেরালেন রাফিক বেলঘালি। ৫৫ মিনিটে মার্সেল সাবিতজার গোল করলেন, ইরান একটু আশা দেখল, সেটাও উবে গেল ৫ মিনিট পর রিয়াদ মাহরেজ গোল করলে।

    ডেডলকটা গিয়ে ভাঙল যোগ করা সময়েরও চতুর্থ মিনিটে। রিয়াদ মাহরেজ আবারও গোল করে এগিয়ে দিলেন আলজেরিয়াকে। যেখানে চতুর্থ অফিসিয়াল অতিরিক্ত সময় দিয়েছেনই মোটে ৫ মিনিট, সেখানে ৯৪ মিনিটের গোলের জবাব আসে কী করে! ইরান শিবির থেকে শুরু করে তেহরানে বোধ হয় উৎসবটা শুরু হয়েই গিয়েছিল চূড়ান্তভাবে।

    সেটাতেও বাধ সাধল ভাগ্য। ৯৬ মিনিটে সাশা কালাইজিচের গোলে সমতা ফেরাল অস্ট্রিয়া। আলজেরিয়ারও ক্ষতিবৃদ্ধি হয়নি, দুই দলই চলে গেছে শেষ ৩২-এ। মাঝে কপাল পুড়ল ইরানের, প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ নকআউট ধরা দিতে দিতেও শেষমেশ গিয়ে ধরা দিল না।

    তবে ইরান চাইলে চোয়াল শক্ত করে নিজেদের অর্জনের দিকে তাকাতেই পারে। তিন ম্যাচ খেলেছে দলটি; নিউজিল্যান্ড, বেলজিয়াম, আর মিশরের মতো দলের বিপক্ষে ম্যাচ হারেনি একটিও। এই ড্রকে আপনি জয়ের সমান করেই দেখবেন, যখন আপনার মনে পড়বে প্রেক্ষাপটটা।

    যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের যুদ্ধের জেরে ইরান ফুটবল দলও বেশ ঝক্কিতে পড়েছে। একগাদা অফিসিয়ালকে ভিসা দেওয়া হয়নি। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা মিললেও থাকার অনুমতি পায়নি পুরো দল। তিনটি ম্যাচেই ইরান খেলেছে ভিন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে। ম্যাচের আগের দিন প্রত্যেক দলের জন্য স্টেডিয়ামে যাওয়ার অনুমতি থাকে। ইরান সেটাও পায়নি, পাবে কী করে, ম্যাচের আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ারই তো অনুমতি পায়নি তারা! দিনে দিনে গিয়ে খেলে দিনে দিনে ফিরতে হয়েছে মেক্সিকোতে। ম্যাচ শেষে রিকভারি খেলোয়াড়দের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজটা ইরানকে সারতে হয়েছে আরও এক বিমানযাত্রার ধকল সামলে এর পর!

    একে তো ‘শত্রু’র দেশে খেলার মানসিক চাপ, তার ওপর এমন বিমানযাত্রার শারীরিক চাপ… সব মিলিয়ে এতো প্রতিকূলতা ছিল সামনে। তা সামলে ইরান পারফর্ম করেছে। চলে গিয়েছিল নকআউটের হাতছোঁয়া দূরত্বেও। একে কি আপনি অর্জন বলবেন না?

    ইরানের এই যাত্রা তাই ব্যর্থ নয় কোনোভাবেই। কারণ তারা যে দেশে ফিরছে যুক্তরাষ্ট্রের মাটি থেকে অপরাজিত থেকে, সবচেয়ে বড় কথা, মাথা উঁচু করে!

  • ফিফার বিরুদ্ধে ক্ষোভ  ইরানি অধিনায়কের, কেউ আমাদের সাহায্য করছে না

    ফিফার বিরুদ্ধে ক্ষোভ ইরানি অধিনায়কের, কেউ আমাদের সাহায্য করছে না

    ইরানের অধিনায়ক মেহদি তারেমি তার দেশের বিশ্বকাপ অভিযানের ব্যবস্থাপনা নিয়ে ফিফা এবং সংস্থাটির সভাপতি গিয়ান্নি ইনফান্তিনোর কঠোর সমালোচনা করেছেন। গ্রুপ পর্বে টানা তৃতীয় ড্রয়ের পরও ইরানকে এখন শেষ ৩২-এ ওঠার জন্য অন্য ম্যাচগুলোর ফলাফলের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। ম্যাচ শেষে তারেমি বিশ্বকাপের ভ্রমণ ও লজিস্টিক ব্যবস্থাকে একটি বিপর্যয় বলে অভিহিত করেন। শুক্রবারের ম্যাচ শেষে তারেমি ও তার সতীর্থদের যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটল থেকে উড়ে মেক্সিকোর তিহুয়ানায় ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। প্রথমে টুর্নামেন্ট চলাকালে দলটির বেস ক্যাম্প যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনাঅঙ্গরাজ্যের টুকসনে হওয়ার কথা থাকলেও, মে মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাতের কারণে তারা বেস ক্যাম্প মেক্সিকোতে সরিয়ে নেয়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য আটলান্টিক।

    যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের যুদ্ধ শুরু হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথ সামরিক হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করে। এর জবাবে ইরান পাল্টা হামলা চালায়। ইরান দল এবং তাদের কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচ খেলতে যাওয়া ও সেখান থেকে বের হওয়ার ক্ষেত্রে বারবার জটিলতার মুখে পড়েছেন। তারেমির অভিযোগ, পরিস্থিতির উন্নতির যে প্রতিশ্রুতি ইনফান্তিনো দিয়েছিলেন, তা তিনি বাস্তবায়ন করতে পারেননি।

    তারেমি সাংবাদিকদের বলেন, এটি একটি বিপর্যয়কর বিশ্বকাপ; পুরোপুরি একটি বিপর্যয়। ফিফার এখানে প্রতিটি সমস্যার সমাধান করা উচিত ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তারা শুরু থেকেই কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। তিনি বলেন, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের পর মি. ইনফান্তিনো আমাদের ড্রেসিংরুমে এসে বলেছিলেন, ‘এটা তো কেবল শুরু…’।

    তারেমি আরও বলেন, আমাদের লজিস্টিক কর্মীরা এখানে নেই। তারা ভিসা পাননি। এটা কীভাবে সম্ভব যে আমাদের প্রতিবার তিহুয়ানা থেকে যাতায়াত করতে হচ্ছে? আমরা তিহুয়ানার মানুষকে ভালোবাসি। আমরা মেক্সিকোকে ভালোবাসি। তারা অত্যন্ত বিনয়ী মানুষ। কিন্তু একজন পেশাদার ফুটবলার হিসেবে, একটি পেশাদার প্রতিযোগিতায় এভাবে খেলাটা ঠিক নয়। তিনি বলেন, এটা ন্যায়সংগত নয়। আমাদের মতে, এটা মোটেও ন্যায়সংগত নয়। ফিফার কাছে যদি এটা ন্যায়সংগত মনে হয়, সেটা তাদের ব্যাপার। কিন্তু আমাদের কাছে নয়। আসলে আমাদেরকে কে সাহায্য করতে চায়? যদি তারা চায় আমরা টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিই, তাহলে ঠিক আছে, আমরা বিদায় নেব। কিন্তু এটা ন্যায়সংগত নয়। আমাদের পুনর্বাসন (রিকভারি) বিশেষজ্ঞ নেই, লজিস্টিক কর্মীও নেই, যারা আমাদের সাহায্য করবে। আমরা সব সময় এসব বিষয়ে অভিযোগ করি, কিন্তু কেউ আমাদের সাহায্য করে না, কেউই না।

    বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মেক্সিকো সিটিতে দেয়া বক্তব্যে গিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলেছেন, প্রয়োজন হলে তিনি ইরানের রাজধানী তেহরান থেকে নিজেই বাস চালিয়ে দলটিকে বিশ্বকাপে নিয়ে আসতেন। মিশরের বিপক্ষে ড্র হওয়া ম্যাচের প্রথমার্ধে একটি পেনাল্টি মিস করা তারেমিকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তার কি মনে হয় ইরানকে এই টুর্নামেন্টে স্বাগত জানানো হয়নি? জবাবে তিনি বলেন, এখানে আমাদের সবকিছুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, মানুষ আসলে কী চায়, আমি জানি না। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে মনে হয়, তারা সম্ভবত এটাই চায়। ৯০ মিনিট খেলার পর আবার তিহুয়ানায় ফিরে যেতে হবে, এটা কীভাবে সম্ভব?

    মিশরের বিপক্ষে শুক্রবারের ড্রয়ের ফলে ইরান গ্রুপ জি’তে তৃতীয় স্থানে শেষ করেছে। শেষ ৩২-এ ওঠার জন্য শনিবারের গ্রুপ পর্বের বাকি ম্যাচগুলোর ফল তাদের অনুকূলে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল। যদি গ্রুপ জে’তে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়া ড্র করে। গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো হারিয়েছে উজবেকিস্তানকে। ক্রোয়েশিয়া হারিয়েছে ঘানা’কে। ফলে ইরানকে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হয়েছে।