ভারতের আবহাওয়া দপ্তর ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের ইয়ানামের কাছে স্থলভাগে আঘাত হানার সম্ভাব্য সময় এগিয়ে ২৮ অক্টোবরের প্রথম প্রহরে এনেছে। আগের পূর্বাভাসের চেয়ে বাতাসের গতিও বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশের ২৭ অক্টোবরের ভোরের বুলেটিনে চার বন্দরে সতর্কসংকেত বহাল রাখা হয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরের মাছ ধরার নৌযানকে উপকূলের কাছাকাছি থাকতে বলা হয়।
ছবির ক্যাপশন: কক্সবাজারের সৈকতের ফাইল ছবি, ঘূর্ণিঝড়ের বর্তমান পরিস্থিতি নয়। বাংলাদেশের ২৭ অক্টোবর ভোরের বুলেটিনে কক্সবাজারসহ চার বন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রাখতে বলা হয়েছিল। ছবি: তারেক উদ্দিন আহমেদ, CC BY 2.0, উইকিমিডিয়া কমন্সের মাধ্যমে।
সংক্ষেপে
- পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় অর্ণব অবস্থান করায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রাখতে বলেছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর।
- মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর রাত ৩টায় ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্র চট্টগ্রামের ৯৯০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ছিল। সর্বোচ্চ একটানা বাতাসের গতি ছিল ঘণ্টায় ১১৮ কিলোমিটার, দমকায় ১৫০ কিলোমিটার। উত্তর বঙ্গোপসাগরের মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে উপকূলের কাছাকাছি থাকতে বলা হয়েছে।
- ২৭ অক্টোবর ভারতীয় সময় রাত ১১টা ২৬ মিনিটে প্রকাশিত বুলেটিনে আইএমডি রাত ২টা থেকে ৪টার মধ্যে ইয়ানামের কাছে ও দক্ষিণে স্থলভাগে আঘাতের পূর্বাভাস দিয়েছে। বাতাসের একটানা গতি ঘণ্টায় ১২৫ থেকে ১৩৫ কিলোমিটার এবং দমকায় ১৫০ কিলোমিটার হতে পারে। সরিয়ে নেওয়া মানুষের সংখ্যা পরিবর্তনশীল হিসাব, চূড়ান্ত মোট নয়।
- বাংলাদেশ সম্ভাব্য স্থলভাগে আঘাতের এলাকার বাইরে থাকলেও উত্তাল সাগর ও বৃষ্টির ঝুঁকি রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের একজন আবহাওয়াবিদের আগের পূর্বাভাসে বুধ ও বৃহস্পতিবার উপকূলে এবং বৃহস্পতিবার ঢাকা ও রাজশাহীতে হালকা বৃষ্টির কথা বলা হয়েছিল।
বন্দরে সতর্ক সংকেত
মঙ্গলবার ভোরে প্রকাশিত বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বুলেটিনে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা, চার সমুদ্রবন্দরকেই ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রাখতে বলা হয়। রাতে পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে মঙ্গলবার ভোরে অর্ণব অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়।
রাত ৩টায় ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্র ছিল ১৫.৮ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ ও ৮৫.৬ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। এটি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রায় ৯৯০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার থেকে ৯৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং মোংলা ও পায়রা, উভয় বন্দর থেকে ৮৬৫ কিলোমিটার দক্ষিণে ছিল। কেন্দ্রের ৬৪ কিলোমিটারের মধ্যে সর্বোচ্চ একটানা বাতাসের গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১১৮ কিলোমিটার, যা দমকা ও ঝোড়ো হাওয়ায় ১৫০ কিলোমিটারে উঠছিল। কেন্দ্রের কাছে সাগর খুবই উত্তাল। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উত্তর বঙ্গোপসাগরের সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে উপকূলের কাছাকাছি থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় চলতে বলা হয়েছে।
৩ নম্বর সংকেত বন্দরে ঝোড়ো আবহাওয়ার সতর্কবার্তা। এর অর্থ সাগরের পরিস্থিতি নিরাপদ নয়। সোমবার দুপুরে বন্দরগুলোতে ২ নম্বর দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত ছিল। ওপরের অবস্থান ও বাতাসের তথ্য বাংলাদেশের রাত ৩টার বুলেটিনের, ২৭ অক্টোবরের পরবর্তী সময়ে ঘূর্ণিঝড়ের অবস্থান নয়।
অন্ধ্রের দিকে ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ
২৭ অক্টোবর ভারতীয় সময় রাত ১১টা ২৬ মিনিটে প্রকাশিত ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের উপকূলীয় বুলেটিনে বলা হয়েছে, অর্ণব ২৮ অক্টোবর রাত ২টা থেকে ৪টার মধ্যে বাপাতলা ও বিশাখাপত্তনমের মধ্যবর্তী উপকূলে, ইয়ানামের কাছে ও দক্ষিণে স্থলভাগে আঘাত হানতে পারে। বুলেটিন অনুযায়ী, দ্রুত এগোনোর কারণে সম্ভাব্য সময় এগিয়ে এসেছে। আঘাত হানার সময় সর্বোচ্চ একটানা বাতাসের গতি ঘণ্টায় ১২৫ থেকে ১৩৫ কিলোমিটার এবং দমকায় ১৫০ কিলোমিটার হতে পারে।
বুলেটিনে অন্ধ্র প্রদেশের ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন উপকূলীয় অংশে স্বাভাবিক জোয়ারের উচ্চতার ওপর ১.৫ থেকে ২.৫ মিটার এবং গোদাবরীর মোহনার কাছে ২ থেকে ৩.৫ মিটার জলোচ্ছ্বাসের পূর্বাভাস রয়েছে। ভারী বৃষ্টি, কম দৃশ্যমানতা ও বিপজ্জনক সমুদ্র পরিস্থিতির সতর্কতাও দেওয়া হয়েছে। এগুলো পূর্বাভাস, ইতিমধ্যে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির পরিমাপ নয়।
বাংলাদেশ এই গতিপথের বাইরে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হামিদ মিয়া বলেছেন, ঘূর্ণিঝড়ের বর্তমান পথ অন্ধ্র উপকূলের দিকে, যা বাংলাদেশে সরাসরি প্রভাব কম হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। ভারতে অর্ণব স্থলভাগে আঘাত হানার পর বুধ ও বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের উপকূলে এবং বৃহস্পতিবার ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগে হালকা বৃষ্টি হতে পারে।
অন্য উপকূলে সরিয়ে নেওয়ার কাজ
যে উপকূলের দিকে ঘূর্ণিঝড়টি যাচ্ছে, সেখানে ব্যাপকভাবে মানুষ সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অন্ধ্র প্রদেশ রাজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রখর জৈন রয়টার্সকে বলেছেন, সোমবার রাত পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে আশ্রয়ে নেওয়া হয়েছিল। আনুমানিক ৪ লাখ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। জৈন বলেন, “সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।” প্রাথমিক হিসাবে, ১৬ জেলার ২ হাজার ৪৬০টি রাজস্ব গ্রাম ও ৯২টি শহরাঞ্চল সরাসরি ঘূর্ণিঝড়ের পথে রয়েছে। ১ হাজার ৭৬৩টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছিল এবং ১১টি উচ্চঝুঁকির জেলায় জাতীয় ও রাজ্য দুর্যোগ মোকাবিলা দল মোতায়েন করা হয়েছিল। রাজ্যের পৃথক হিসাবে প্রায় ৮৯ হাজার মানুষের জন্য ১০১টি ত্রাণশিবির প্রস্তুত থাকার কথা বলা হয়।
অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী নারা চন্দ্রবাবু নাইডু সোমবার কর্মকর্তাদের ঘূর্ণিঝড় সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। কর্তৃপক্ষ গুরুত্বপূর্ণ নিচু এলাকা থেকে মানুষ সরানোর নির্দেশ দেয় এবং কিছু জেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মঙ্গলবার থেকে শনিবার পর্যন্ত বন্ধ করে। সম্ভাব্য বিপজ্জনক এলাকায় বসবাসকারী ৪ হাজার ৭০০ জনের বেশি অন্তঃসত্ত্বা নারীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। ট্রেন চলাচল বাতিল করা হয় এবং বিশাখাপত্তনমে কমলা সতর্কতা বহাল ছিল। সেখানে ইতিমধ্যে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছিল।
ঘূর্ণিঝড়ের দক্ষিণ পাশে থাকা শ্রীলঙ্কায় মুষলধারে বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের সতর্কতায় বিদ্যালয় বন্ধ করা হয় এবং সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয়। ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য আঘাত হানার এলাকার বাইরেও বৃষ্টি ও স্থানীয় বন্যার ঝুঁকি রয়েছে।
এরপর যা হবে
গতিপথ, বাতাস, জলোচ্ছ্বাস ও বন্দরের সংকেত বদলের ক্ষেত্রে আইএমডি ও বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের বুলেটিনই কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা। প্রথম প্রহরের সময়সীমা একটি পূর্বাভাস, স্থলভাগে আঘাত হানার নিশ্চিত খবর নয়। পরিস্থিতি বদলানোর সঙ্গে মানুষ সরানো ও স্থানীয় ক্ষয়ক্ষতির খবর আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে। বাংলাদেশের বাইরে স্থলভাগে আঘাতের পূর্বাভাস দেখে নিরাপদ মনে না করে মাছ ধরার নৌযানের কর্মীদের আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত।
