আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী

  • কানাডায় উচ্চশিক্ষা: খরচ বাড়ছে, কমছে স্টাডি পারমিট, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কঠিন হিসাব

    কানাডায় উচ্চশিক্ষা: খরচ বাড়ছে, কমছে স্টাডি পারমিট, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কঠিন হিসাব

    কানাডায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর স্টাডি পারমিট এক বছরে কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ, খরচ দেখানোর শর্ত বেড়েছে ১৩.৬ শতাংশ; বৃত্তিতেও টানাটানি, ডিগ্রির পর চাকরির অনিশ্চয়তা।

    ২০১৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্নে কানাডায় পাড়ি জমান এক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। স্নাতকোত্তর শেষ করে ভর্তি হন পিএইচডি প্রোগ্রামে। দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে থাকার কষ্ট কাটাতে একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যদেরও কানাডায় নিয়ে আসেন। কিন্তু পরিবার আসার পরই বদলে যায় তাঁর আর্থিক হিসাব। বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তির অর্থে একা চলতে পারলেও পরিবারের সবার খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। গবেষণার চাপ, সংসারের ব্যয় ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা একসময় প্রভাব ফেলে তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যেও। নিউফাউন্ডল্যান্ডে বসবাসরত এই পিএইচডি শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত পরিচয় প্রকাশ করতে না চাওয়ায় তাঁর অনুরোধে নাম গোপন রাখা হয়েছে।

    উন্নত শিক্ষা, গবেষণা ও কর্মজীবনের সম্ভাবনা নিয়ে কানাডায় আসা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অনেকেই এমন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন। কানাডার অভিবাসন বিভাগ ইমিগ্রেশন, রিফিউজিস অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কানাডার (IRCC) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৬ হাজার ৫০৫ জন বাংলাদেশি স্টাডি পারমিট পেলেও ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৫৩৫ জনে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্টাডি পারমিট আবেদনে জীবনযাত্রার ব্যয়ের জন্য দেখাতে হওয়া ন্যূনতম আর্থিক সক্ষমতার শর্ত ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে।

    বাংলাদেশিদের স্টাডি পারমিট ২০২৫ সালে ১৫% কমেছে: ২০২৪ সালে ৬,৫০৫, ২০২৫ সালে ৫,৫৩৫ (সূত্র: IRCC)
    গ্রাফিক: বিডি গ্লোবাল টাইমস

    কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বৃত্তি, গবেষণা সহকারী (Research Assistant) ও শিক্ষক সহকারী (Teaching Assistant) হিসেবে কাজের সুযোগ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করে। আধুনিক গবেষণাগার, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষকদের সঙ্গে কাজের সুযোগ এবং গবেষণা অনুদানও দেশটির উচ্চশিক্ষার অন্যতম আকর্ষণ। তবে এসব সুযোগের পাশাপাশি উচ্চ টিউশন ফি, আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয়, চাকরির প্রতিযোগিতা এবং অভিবাসননীতির পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

    IRCC-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৩ হাজার ৫০০ জন বাংলাদেশি নাগরিক স্টাডি পারমিট পেয়েছেন। তবে এটি আট মাসের হিসাব হওয়ায় আগের দুই বছরের পূর্ণাঙ্গ সংখ্যার সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা যায় না।

    পরিবার নিয়ে আর্থিক সংকটে পড়া ওই পিএইচডি শিক্ষার্থী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি থেকে যে পরিমাণ অর্থ পাই, তা দিয়ে একা চলা সম্ভব হলেও পরিবার নিয়ে চলা অত্যন্ত কঠিন। আবার পরিবারকে বাংলাদেশে রেখে দীর্ঘদিন একা থাকাও মানসিকভাবে কষ্টকর। একদিকে পরিবারের দায়িত্ব, অন্যদিকে গবেষণার চাপ সব মিলিয়ে অনেক কঠিন সময় পার করতে হয়েছে।’

    পূর্ণকালীন গবেষণার কারণে অতিরিক্ত কাজ করার পর্যাপ্ত সময়ও তাঁর ছিল না। দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিশ্চয়তা গবেষণার কাজেও প্রভাব ফেলেছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আর্থিক চাপ কমাতে বৃত্তি ও গবেষণা তহবিল বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।

    বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে ওই শিক্ষার্থী জানান, অ্যাপয়েন্টমেন্টের মাধ্যমে তিনি নিয়মিত কাউন্সেলিং সেবা পেয়েছেন এবং সেবার মান নিয়েও সন্তুষ্ট। তবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য অ্যাকাডেমিক ও ক্যারিয়ার কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ সব সময় পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করেন তিনি।

    অন্যদিকে, কানাডার সাসকাটুনে বসবাসরত এক বাংলাদেশি স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা তুলনামূলক ইতিবাচক। ব্যক্তিগত পরিচয় প্রকাশ করতে না চাওয়ায় তাঁর নামও গোপন রাখা হয়েছে। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি থেকে টিউশন ফি পরিশোধের পর অবশিষ্ট অর্থে তাঁর আবাসনসহ প্রয়োজনীয় খরচ মিটে যায়। ফলে আপাতত বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়তে হয়নি তাঁকে।

    তাঁর মতে, কানাডার উন্নত গবেষণার পরিবেশ, আধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ গবেষণাগার এবং আন্তর্জাতিক গবেষকদের সঙ্গে কাজের সুযোগ শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করে। গবেষণার প্রয়োজনে বিভিন্ন সম্মেলন ও প্রেজেন্টেশনে অংশ নেওয়ার খরচও ক্ষেত্রবিশেষে বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক বহন করেন।

    তবে এসব সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পড়াশোনা শেষে কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন তিনি। সাম্প্রতিক অভিবাসননীতির পরিবর্তন তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

    নিজ খরচে কানাডায় পড়তে আসা আরেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জানান, তাঁর বার্ষিক টিউশন ফি ১৮ হাজার কানাডীয় ডলার। এর বাইরে বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াতসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় খরচ রয়েছে।

    IRCC-এর নিয়ম অনুযায়ী, যোগ্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা নিয়মিত শিক্ষাকালীন সময়ে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা ক্যাম্পাসের বাইরে কাজ করতে পারেন। তবে এই আয়ে টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার সব খরচ মেটানো অনেকের জন্য কঠিন।

    ওই শিক্ষার্থী জানান, গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে পূর্ণকালীন কাজ করে কিছু অর্থ সঞ্চয়ের চেষ্টা করেন তিনি। ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট ও পরীক্ষার পাশাপাশি নিজের খরচ চালানোর চিন্তা তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

    আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আর্থিক সক্ষমতার শর্তও বেড়েছে। IRCC-এর আর্থিক সক্ষমতাসংক্রান্ত নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে কুইবেক ছাড়া অন্যান্য প্রদেশে একজন শিক্ষার্থীর জীবনযাত্রার ব্যয়ের জন্য ন্যূনতম ২০ হাজার ৬৩৫ কানাডীয় ডলার দেখানোর শর্ত ছিল। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয় ২২ হাজার ৮৯৫ ডলার। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে নির্ধারিত হয় ২৩ হাজার ৪৪৮ ডলার। অর্থাৎ, ২০২৪ সালের তুলনায় বৃদ্ধির হার প্রায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

    দুই সদস্যের পরিবারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত অর্থের পরিমাণ ২৯ হাজার ১৯২ কানাডীয় ডলার। এর সঙ্গে টিউশন ফি ও যাতায়াতের খরচ আলাদাভাবে হিসাব করতে হয়।

    স্টাডি পারমিটে ন্যূনতম দেখাতে হওয়া অর্থ ২০২৪ সালের ২০,৬৩৫ থেকে বেড়ে ২৩,৪৪৮ কানাডীয় ডলার (সূত্র: IRCC)
    গ্রাফিক: বিডি গ্লোবাল টাইমস

    তবে IRCC নির্ধারিত অর্থ শিক্ষার্থীদের প্রকৃত গড় জীবনযাত্রার ব্যয় নয়; এটি স্টাডি পারমিট আবেদনের জন্য ন্যূনতম আর্থিক সক্ষমতার শর্ত। শহরভেদে বাসাভাড়া, খাবার ও যাতায়াতের ব্যয় আলাদা হওয়ায় প্রকৃত খরচও ভিন্ন হয়।

    ইউনিভার্সিটি অব সাসকাচোয়ানে সার্টিফিকেট ইন বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা বাংলাদেশি শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ সাকিব মারুফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোর্সভিত্তিক মাস্টার্স প্রোগ্রামে অর্থায়নের সুযোগ তুলনামূলক সীমিত। অন্যদিকে, থিসিসভিত্তিক মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ে, বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (STEM) বিষয়ে গবেষণা ও শিক্ষকতা সহকারী হিসেবে অর্থায়নের সুযোগ তুলনামূলক বেশি।

    তাঁর মতে, মাস্টার্স বা পিএইচডি পর্যায়ে বছরে ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার কানাডীয় ডলারের ফান্ডিং পাওয়া গেলেও সেই অর্থের বড় অংশ টিউশন ফি পরিশোধে ব্যয় হতে পারে। ফলে শিক্ষার্থীর হাতে দৈনন্দিন খরচ চালানোর জন্য পর্যাপ্ত অর্থ না-ও থাকতে পারে।

    মারুফ বলেন, শুধু ফান্ডিংয়ের মোট অঙ্ক বিবেচনা না করে টিউশন ফি বাদ দেওয়ার পর কত অর্থ অবশিষ্ট থাকবে এবং তা দিয়ে সংশ্লিষ্ট শহরে বসবাস সম্ভব কি না, আগে থেকেই হিসাব করা জরুরি।

    থম্পসন রিভার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োলজি বিভাগের শিক্ষক ড. সালাহ উদ্দিন খান একসময় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে কানাডায় এসেছিলেন। পড়াশোনা ও গবেষণার বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।

    আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আর্থিক চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কানাডায় উচ্চশিক্ষার আর্থিক বাস্তবতা বুঝতে হলে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট এবং মাস্টার্স-পিএইচডি শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে দেখতে হবে। আমার অভিজ্ঞতায়, আন্ডারগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। তাঁদের জন্য উল্লেখযোগ্য স্কলারশিপের সুযোগ সীমিত। বিশেষ করে টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার সম্পূর্ণ খরচ বহন করতে পারে, এমন স্কলারশিপ অত্যন্ত বিরল।’

    ‘কানাডায় উচ্চশিক্ষার আর্থিক বাস্তবতা বুঝতে হলে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট এবং মাস্টার্স-পিএইচডি শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে দেখতে হবে। আমার অভিজ্ঞতায়, আন্ডারগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। তাঁদের জন্য উল্লেখযোগ্য স্কলারশিপের সুযোগ সীমিত। বিশেষ করে টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার সম্পূর্ণ খরচ বহন করতে পারে, এমন স্কলারশিপ অত্যন্ত বিরল।’

    স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার টিউশন ফিসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে আন্তর্জাতিক স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের গড় বার্ষিক টিউশন ফি প্রায় ৪১ হাজার ৭০০ কানাডীয় ডলার। এর বাইরে রয়েছে আবাসন, খাবার, যাতায়াত ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ।

    কানাডায় স্নাতকের প্রথম বছরে লাগতে পারে প্রায় ৬৫,১৯৪ কানাডীয় ডলার: গড় টিউশন আর জীবনযাত্রার ন্যূনতম তহবিল
    গ্রাফিক: বিডি গ্লোবাল টাইমস

    ড. খান বলেন, ‘কানাডায় এসেই চাকরি পাওয়া সহজ নয়। বিশেষ করে ছোট শহরগুলোতে কাজের সুযোগ সীমিত। স্থানীয় অভিজ্ঞতা, ভাষাগত দক্ষতা ও যোগাযোগের অভাবে অনেক শিক্ষার্থী প্রথম চাকরি পেতে সমস্যায় পড়েন। ফলে শুধু পার্ট টাইম কাজ করে টিউশন ফি ও অন্যান্য খরচ বহন করা প্রায় অসম্ভব।’

    তাঁর মতে, বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ল্যাব, অ্যাসাইনমেন্ট ও গবেষণার চাপ থাকায় পড়াশোনা ও কাজের মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন। কেউ কেউ শিক্ষকতা বা গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজের সুযোগ পেলেও তা সীমিত। অন্যদিকে, গবেষণাভিত্তিক মাস্টার্স ও পিএইচডি শিক্ষার্থীদের অর্থায়নের সুযোগ তুলনামূলক বেশি হলেও পরিবার বা সন্তান থাকলে ব্যয় সামলানো কঠিন হতে পারে।

    কানাডা সরকারের ডক্টরাল বৃত্তি কানাডা গ্র্যাজুয়েট রিসার্চ স্কলারশিপ–ডক্টরাল (CGRS-D)-এ বছরে ৪০ হাজার কানাডীয় ডলার করে সর্বোচ্চ তিন বছর অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে। কানাডার কোনো ডক্টরাল প্রোগ্রামে ভর্তি থাকা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরাও আবেদন করতে পারেন; মোট বৃত্তির সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ তাঁদের জন্য। তবে এসব বৃত্তি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক।

    ড. খানের ভাষায়, ‘আমার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া আর পড়াশোনার খরচ বহনের সামর্থ্য থাকা দুটি আলাদা বিষয়। তাই কানাডায় আসার আগে ফান্ডিং, সম্ভাব্য ব্যয় এবং নিজের আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা জরুরি।’

    কানাডায় আসার আগে যে হিসাব করবেন

    • ফান্ডিংয়ের মোট অঙ্ক নয়, টিউশন ফি বাদ দিয়ে হাতে কত থাকবে তা দেখুন।
    • যে শহরে পড়বেন, সেখানকার বাসাভাড়া, খাবার ও যাতায়াতের খরচ আলাদা করে হিসাব করুন; IRCC-এর ন্যূনতম অঙ্ক প্রকৃত খরচ নয়।
    • পরিবার সঙ্গে আনলে খরচ কত বাড়বে, আগেই হিসাব করুন; দুজনের জন্য IRCC-এর ন্যূনতম অঙ্ক ২৯ হাজার ১৯২ ডলার।
    • শুধু পার্টটাইম কাজের আয়ে টিউশন ও খরচ চালানোর পরিকল্পনা করবেন না।
    • পড়াশোনা শেষে ওয়ার্ক পারমিট (PGWP) সর্বোচ্চ তিন বছর; সবাই পূর্ণ মেয়াদ পান না।

    আর্থিক অনিশ্চয়তা, পড়াশোনার চাপ এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সমস্যা অনেক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে।

    ড. সালাহ উদ্দিন খান বলেন, ‘কানাডায় মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে বিনামূল্যেও।’

    তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণে অনেক শিক্ষার্থী মানসিক চাপকে বিদেশজীবনের স্বাভাবিক অংশ মনে করেন। কেউ কেউ কাউন্সেলিং নেওয়াকে দুর্বলতা হিসেবে দেখেন।

    এ ছাড়া বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে কানাডার গবেষণানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় মানিয়ে নেওয়াও অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। স্বাধীন চিন্তা, গবেষণার প্রশ্ন তৈরি, বৈজ্ঞানিক সাহিত্য বিশ্লেষণ এবং যুক্তি উপস্থাপনের দক্ষতার ওপর এখানে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

    কানাডায় উচ্চশিক্ষা শেষ করলেই যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি নিশ্চিত হয় না। স্থানীয় কাজের অভিজ্ঞতা, পেশাগত যোগাযোগ, নিয়োগদাতার চাহিদা এবং চাকরির বাজারের প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক গ্র্যাজুয়েটদের কর্মজীবনে প্রবেশকে কঠিন করে তুলতে পারে।

    স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, ২০২০ সালে পড়াশোনা শেষ করা এবং কানাডায় অবস্থানরত আন্তর্জাতিক গ্র্যাজুয়েটদের ৮৮ দশমিক ৬ শতাংশ ২০২৩ সালে কর্মরত ছিলেন। একই সময়ে কানাডীয় গ্র্যাজুয়েটদের কর্মসংস্থানের হার ছিল ৯১ দশমিক ০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক গ্র্যাজুয়েটদের গড় আয়ও কানাডীয় গ্র্যাজুয়েটদের তুলনায় ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ কম ছিল। স্নাতক ডিগ্রিধারী আন্তর্জাতিক গ্র্যাজুয়েটদের মাত্র ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ তাঁদের চাকরিকে পড়াশোনার বিষয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত বলে জানিয়েছেন, যেখানে কানাডীয় গ্র্যাজুয়েটদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৬২ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে এই পরিসংখ্যান ২০২০ সালের গ্র্যাজুয়েটদের ওপর ভিত্তি করে তৈরি; এটি ২০২৬ সালের বর্তমান কর্মসংস্থানের হার নয়।

    নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাংলাদেশি আন্তর্জাতিক গ্র্যাজুয়েট জানান, পড়াশোনা শেষ করার পর প্রায় দুই বছর পার হতে চললেও এখনো নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাননি। ফলে মানসিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে সময় কাটছে তাঁর।

    কানাডায় পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন ওয়ার্ক পারমিটের (PGWP) মেয়াদ শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অন্যান্য শর্ত অনুযায়ী সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত হতে পারে। তবে সব গ্র্যাজুয়েট তিন বছরের অনুমতি পান না।

    ওই শিক্ষার্থীর আশঙ্কা, অবশিষ্ট সময়ের মধ্যে উপযুক্ত চাকরি কিংবা কানাডায় থাকার অন্য কোনো বৈধ সুযোগ নিশ্চিত করতে না পারলে তাঁকে দেশ ছাড়ার পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।