বাংলাদেশে সম্প্রতি হামের প্রকোপ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই নতুন করে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে এবং কয়েকজনের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে। বর্ষাকাল শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানী ঢাকার সমস্যা নয়; এটি সারাদেশের জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী মৌসুমে হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হন। অনেক ক্ষেত্রে রোগী দ্রুত শকে চলে যান, রক্তক্ষরণ হয়, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল হতে পারে এবং মৃত্যুও ঘটে। তাই ডেঙ্গুকে শুধুমাত্র একটি “মশাবাহিত জ্বর” হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ডেঙ্গুর টিকা: নতুন আশার আলো-
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে ডেঙ্গু প্রতিরোধে টিকা ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে থাইল্যান্ড, ইন্দেনেশিয়া, ব্রাজিল এবং কিছু লাতিন আমেরিকান দেশে ডেঙ্গু টিকা অনুমোদিত হয়েছে।
বর্তমানে কোন কোন ডেঙ্গু টিকা আছে?
১. উবহমাধীরধ (ডেঙভ্যাক্সিয়া) প্রথম অনুমোদিত ডেঙ্গু টিকা। তবে এটি শুধুমাত্র পূর্বে ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য উপযোগী বলে বিবেচিত হয়।
২. ছফবহমধ ( কিউডেঙ্গা)- বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত ডেঙ্গু টিকা। এটি জাপানের তাকেডা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানী তৈরি করেছে। বেশ কয়েকটি দেশে অনুমোদিতও হয়েছে।
এটা কে কিভাবে কত ডোজ নিবে?
এই টিকা আপাতত দুই ডোজ নিতে হবে ৩ মাসের ব্যবধানে। ৪ বছর থেকে ৬০ বছর বয়সিদের এটি নেয়ার কথা বলা হচ্ছে।
প্রথম ডোজ নেয়ার ১৪ দিন পরই ইমিউনিটি ডেভেলপ করতে শুরু করে। তাই কেউ চাইলে ডেঙ্গু প্রবণ এলাকায় যাওয়ার ১৪ দিন আগে এটি নিতে পারে। এক ডোজের পরেও ৮২ শতাংশ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়। ২য় ডোজ নেয়ার ৩০ দিন পর সবচেয়ে ভাল প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরী হয়।
কিউডেঙ্গা কতটা কার্যকর?
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে:
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়, যা প্রায় ৯০.৪ শতাংশ পর্যন্ত বলেও গবেষকেরা দাবী করেছে।
গুরুতর ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমায়, ডেঙ্গু হলেও তা মারাত্মক পর্যায় পর্যন্ত যায় না।
চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই সুরক্ষা দেয়, যাকে বিশেষজ্ঞরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে দেখছে।
এটা ৪ বছর থেকে ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত সবাই নিতে পারবে।
আগে ডেঙ্গু না হলেও এটা নেয়া যাবে। আগেরটারমত এই শর্ত এখানে নাই।
টিকা নেয়ার আগে কোন রক্ত পরীক্ষার প্রয়োজন নাই।
তবে এই টিকা শতভাগ সুরক্ষা দেয় না। ৮০.২ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষার কথা বলা হচ্ছে। তাই টিকা নেওয়ার পরও মশা নিয়ন্ত্রণ ও ব্যক্তিগত সতর্কতা প্রয়োজন।
শুধু টিকা কি সমস্যার সমাধান? না।
পাশের দেশ থাইল্যান্ডে টিকার দাম কত?
দেশভেদে মূল্য ভিন্ন। থাইল্যান্ডে সাধারণত দুই ডোজ সম্পূর্ণ করতে আনুমানিক ৩,০০০-৬,৫০০ থাই বাথ বা তারও বেশি খরচ হতে পারে, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১১,০০০-২২,০০০ টাকার সমপরিমাণ হতে পারে। তবে ক্লিনিক ও হাসপাতাল ভেদে মূল্য পরিবর্তিত হয়।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর টিকা চালু করতে কার কী করণীয়?
১. সরকার-
আন্তর্জাতিক তথ্য পর্যালোচনা
নিরাপত্তা মূল্যায়ন
স্থানীয় গবেষণানিয়ন্ত্রক অনুমোদন দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে।
২. ঔষধ প্রশাসন- ডিরেক্টর জেনারেল অব ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশনকে টিকার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে হবে।
৩. আইইডিসিআর- ইনস্টিটিউট অব এপিডিমিওলজি ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড রিসার্চকে রোগতাত্ত্বিক তথ্য বিশ্লেষণ করতে হবে।
৪. চিকিৎসক সমাজ- কোন বয়সী জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে তা নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে হবে।
৫. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা-বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উচ্চ ডেঙ্গু প্রবণ এলাকার ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সীদের জন্য এটি সুপারিশ করেছে। সরকার স্থানীয়ভাবে এটি উৎপাদনের কথা বিবেচনা করছে।
ডেঙ্গু কী?
ডেঙ্গু হলো একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা হয় এবং সংক্রমিত স্ত্রী এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। প্রধান বাহক হলো: এডিস এইজিপ্টি ও এডিস এলবোপিক্টাস নামের মশা।
এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলায় কামড়ায় এবং পরিষ্কার জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে।
কেন বাংলাদেশে ডেঙ্গু বাড়ছে?
১. জলবায়ু পরিবর্তন- তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টি এবং দীর্ঘায়িত বর্ষাকাল মশার বংশবৃদ্ধির জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করছে।
২. অপরিকল্পিত নগরায়ণ- অসংখ্য নির্মাণাধীন ভবন, ছাদে জমে থাকা পানি, ফেলে রাখা টায়ার, ড্রাম, ফুলের টব ও প্লাস্টিকের পাত্র এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে।
৩. জনসচেতনতার ঘাটতি- অনেক মানুষ এখনও মনে করেন ডেঙ্গু শুধু নোংরা পানিতে জন্মানো মশার মাধ্যমে হয়। বাস্তবে এডিস মশা পরিষ্কার পানিতেই বেশি জন্মায়।
৪. সমন্বিত কর্মসূচির অভাব- মশকনিধন, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, নজরদারি এবং স্বাস্থ্যশিক্ষা কার্যক্রম অনেক সময় যথেষ্ট সমন্বিতভাবে পরিচালিত হয় না।
ডেঙ্গুর লক্ষণ-
সাধারণ লক্ষণ: হঠাৎ উচ্চ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পিছনে ব্যথা, শরীর ও জয়েন্টে ব্যথা, বমি বমি ভাব, ত্বকে র্যাশ ইত্যাদি।
বিপদসংকেত-
নিম্নোক্ত লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে: তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, শ্বাসকষ্ট, নাক বা মাড়ি থেকে রক্ত পড়া, কালো পায়খানা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্থিরতা বা ঘুমঘুম ভাব, প্রস্রাব কমে যাওয়া।
সরকার কী করতে পারে? ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১. জাতীয় জরুরি কর্মসূচি- স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, সিটি কর্পোরেশন ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে জাতীয় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি জোরদার করতে হবে।
২. মশার উৎস ধ্বংস- শুধু ফগিং করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
গুরুত্ব দিতে হবে:
লার্ভা ধ্বংস
পানি জমার স্থান অপসারণ
নির্মাণাধীন ভবন পরিদর্শন
নিয়মিত জরিমানা
৩. হাসপাতাল প্রস্তুতি- প্রতিটি জেলা হাসপাতালে:
ডেঙ্গু কর্নার
পর্যাপ্ত নরমাল স্যালাইনের সরবরাহ নিশ্চিত করা
রক্ত সঞ্চালন ও প্লেটলেট সাপোর্ট
প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য সাপোর্টিং স্টাফ নিশ্চিত করতে হবে।
৪. রোগতত্ত্ব নজরদারি- প্রতিদিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে কোন এলাকায় সংক্রমণ বাড়ছে তা দ্রুত শনাক্ত করতে হবে।
৫. স্কুলভিত্তিক কর্মসূচি- স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে পরিবার পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে।
৬. গবেষণায় বিনিয়োগ- বাংলাদেশে ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপের কোনটার কখন কোথায় বিস্তার হচ্ছে, মশার ঘনত্ব এবং জলবায়ুর প্রভাব নিয়ে গবেষণা বাড়াতে হবে।
জনগণের করণীয়: সপ্তাহে অন্তত একদিন “২০ মিনিট ডেঙ্গু অভিযান”
বাড়িতে ও বাড়ির চারপাশে:
টব
ড্রাম
এসির ট্রে
ফ্রিজের ট্রে
টায়ার
ডাবের খোসা
বোতল পরিষ্কার করতে হবে।
ব্যক্তিগত সুরক্ষা: এটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ
মশারি ব্যবহার
ফুলহাতা পোশাক পরিধান
মশা নিরোধক ব্যবহার
জানালায় নেট
জ্বর হলে:
দ্রুত রক্ত পরীক্ষা
প্রচুর তরল পান
চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে
যা করা যাবে না:
নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া
জ্বরের জন্য আইবুপ্রোফেন বা ডাইক্লোফেনাক সেবন
অযথা ভয়ে প্লেটলেট দেওয়া
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের মূল ভিত্তি তিনটি:
১. মশার উৎস ধ্বংস
২. দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ
৩. উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা
টিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ব্যবস্থা মাত্র।
যদি চারপাশে মশার ঘনত্ব বেশি থাকে, তবে টিকা থাকা সত্ত্বেও সংক্রমণ চলতে পারে।
ভবিষ্যৎ করণীয়-
বাংলাদেশের জন্য একটি সমন্বিত ডেঙ্গু কৌশল প্রয়োজন:
সারা বছর মশা নিয়ন্ত্রণ
আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা
গবেষণা বৃদ্ধি
হাসপাতাল প্রস্তুতি
গণসচেতনতা
ডেঙ্গু টিকার সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি
পরিশেষে মনে রাখতে হবে, হামের প্রাদুর্ভাবের পর ডেঙ্গুর বিস্তার বাংলাদেশের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ। ডেঙ্গু একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ হলেও অবহেলা করলে এটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। যা আমরা আগের বছর গুলিতেই দেখেছি। শুধু সরকার বা স্বাস্থ্য বিভাগ একা এই সমস্যা মোকাবিলা করতে পারবে না; জনগণকেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হবে। বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সমন্বিত উদ্যোগই পারে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে।
ডেঙ্গুর টিকা বিশ্বে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে টিকা আসার অপেক্ষায় না থেকে এখনই মশার উৎস ধ্বংস, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করাই হবে ডেঙ্গু মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। একটি সচেতন পরিবার, একটি পরিচ্ছন্ন বাড়ি এবং একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচিই পারে হাজারো প্রাণ রক্ষা করতে।









