উপসম্পাদকীয়

  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া সেই ভাষণে জিন্নাহ যা বলেছিলেন

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া সেই ভাষণে জিন্নাহ যা বলেছিলেন

    ব্রিটিশ শাসনের অবসান ও ভারত ভাগের মাত্র সাত মাস পর ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় পা রাখেন পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। পূর্ব পাকিস্তানে সেটিই ছিল তার প্রথম এবং শেষ সফর। যক্ষ্মাসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন জিন্নাহ। ঢাকায় আসার ছয় মাসের মধ্যেই তিনি মারা যান।

    দশ দিনের ওই সফরে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ঢাকাসহ চট্টগ্রামে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এ সময় তিনি একাধিক স্থানে বক্তব্যও দেন। এর মধ্যে ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্য বিশেষভাবে আলোচিত। এসব অনুষ্ঠানে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে শিক্ষার্থীদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়েন জিন্নাহ।

    জিন্নাহর সেই ভাষণের বাংলা অনুবাদ দেওয়া হলো-

    ভদ্র মহোদয় ও মহোদয়াগণ আপনাদের উপাচার্য মহাশয় যখন আমাকে এসে অনুরোধ করলেন সমাবর্তন একটা বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। আমি তাকে স্পষ্ট বলে দিলাম আমার নানা ব্যস্ততার কারণে সমাবর্তনের জন্য একটা আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা প্রস্তুত করা হয়তো সম্ভব হবে না; যা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন মহান বিষয়াদি যেমন শিল্প ইতিহাস দর্শন বিজ্ঞান আইন প্রকৃতির সঙ্গে মানসম্মত হয়। যাইহোক- আমি অবশ্য প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে, সমাবর্তন উপলক্ষে ছাত্রদের সামনে দুটো কথা বলব এবং এখন যে কথাগুলো বলব তা এই প্রতিজ্ঞা পূরণই বলা যায়। প্রথমেই উপাচার্য মহাশয়কে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করব বিভিন্ন গাল ভরা বিশেষণে আমাকে বিশেষায়িত করার জন্য।

    জনাব উপাচার্য। আমি এখন যা করছি কিংবা যতটা করতে সক্ষম হয়েছি মোটামুটি সবই ছিল আমার দায়িত্ব পালন। একজন মুসলমান হিসেবে সততা এবং নিঃস্বার্থতার সঙ্গে দেশের মানুষের সেবা করাটা দায়িত্ব হিসেবে বর্তায়। আপনাদেরকে যখন আমি কথাগুলো বলছি, তা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নয় বরং এমন একজন বন্ধু হিসেবে বলছি, যে সার্বক্ষণিক আপনাদের মমতায় বেঁধে রাখে। অনেকেই আজকে তাদের ডিপ্লোমা এবং ডিগ্রি অর্জন করেছেন। আমি তাদের সাধুবাদ জানাই। আপনারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিজেদের যোগ্য প্রমাণ করার জন্য জয় মাল্য ছিনিয়ে নিয়েছেন।

    বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত পরিসরে যেখানে আপনারা প্রবেশ করতে যাচ্ছেন সেখানেও আপনাদের সফলতা কামনা করছি। অনেকেই আপনাদের শিক্ষা জীবনের শেষ প্রান্তে এবং জীবনের চরম চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন। আপনারা ভাগ্যবান যে একান্ত নিজেদের একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে যেতে পারছেন যা আপনাদের পূর্বপুরুষরা পারেননি। পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্মের কারণে যে যুগান্তকারী পরিবর্তনগুলো সূচিত হয়েছে তা আপনাদের এবং পরবর্তী ছাত্রদের বুঝতে পারাটা অত্যন্ত জরুরি। পরাধীনতার শিকল আমরা ভেঙেছি এখন আমরা মুক্ত মানুষ। আমাদের দেশ আমাদের একান্ত নিজেদের।

    আমাদের সরকার একান্ত নিজেদের। জনগণের জন্য জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং রাষ্ট্রের উন্নতির জন্য কাজ করে যাচ্ছি। যাই হোক, স্বাধীনতা মানে কিন্তু লাইসেন্স পাওয়া নয়, এর মানে এই নয় যে তোমরা যা ইচ্ছা তাই করবে। রাষ্ট্রের কে কি মনে করল সেসব না ভেবে যেমন ভালো লাগে তেমন আচরণ করবে। আপনাদের উপর অনেক দায়িত্ব। বলতে গেলে অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেশি। আমাদের একতাবদ্ধ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ জাতি হিসেবে কাজ করতে হবে। স্বাধীনতা অর্জনের সময় যে সামরিক শক্তির প্রয়োজন ছিল তার চেয়ে এখন বেশি দরকার উন্নয়নমূলক শক্তির জন্য। স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সামরিক শক্তির প্রয়োগের চেয়ে কঠিন হচ্ছে তাকে গড়ে তোলাটা। জেলে যাওয়া কিংবা স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করা সরকার পরিচালনার চেয়ে সহজতর। বরঞ্চ যেসব বিপদ আমরা কাটিয়ে উঠেছি এবং যেসব কতিপয় ঝামেলা সামনে আসছে সেসব সম্পর্কে আপনাদের দুটি কথা বলি। পাকিস্তানের জন্ম ঠেকাতে না পারার অতৃপ্ত বাসনা মেটানোর জন্য শত্রুরা এখন নজর দিয়েছে আমাদের দুর্বল এবং ধ্বংস করার পথ খুঁজতে। এ কারণেই সরকার ক্ষমতায় আসতে না আসতেই পাঞ্জাব এবং দিল্লির ব্যাপক হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হলো। হাজার হাজার পুরুষ, নারী এবং শিশুকে জবাই করা হয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষ ঘর ছাড়া হয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই এমন ৫০ লাখ মানুষ পাঞ্জাবে এসে হাজির হয়েছে।দেহ এবং মন উভয় ক্ষেত্রেই বিপর্যস্ত এই দুর্ভাগা অভিবাষীদের পরিচর্যা এবং পুনর্বাসন করতে যেসব সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে তা যেন কোন বৃহৎ রাষ্ট্রকেও পথে নামাতে পারে। কিন্তু পাকিস্তানের জন্মকে আতুর ঘরেই যারা মেরে দিতে চেয়েছিল তারা হতাশ হয়েছে। পাকিস্তান সেই বিপর্যয় কেবল কাটিয়েই ওঠেনি। বরঞ্চ আরও শক্তিশালী, মার্জিত এবং পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশিভাবে সজ্জিত। এর সঙ্গে শাড়ি বেঁধে আরও কিছু সমস্যা উদ্ভূত হয়েছে যেমন, ভারত কর্তৃক আমাদের উদ্বৃত্ত এবং সামরিক যন্ত্রপাতির প্রতিহিংসামূলক আচরণ এবং অতি সম্প্রতি আপনাদের এই প্রদেশের সঙ্গে পুরোপুরি অর্থনৈতিক অবরোধ স্থাপন। আমার কোনো সন্দেহ নেই যে, ভারতীয় প্রদেশের সুচিন্তার মানুষগুলো এসব ঘটনাকে সমর্থন করেন না এবং যারা এসব ঘটাচ্ছেন তাদেরও মন মানসিকতার পরিবর্তন হবে।

    তারপরেও এসব বিষয়ে আপনাদের ধারণা থাকাটা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের অংশের উপর কড়া নজর রাখার উপর তারা জোর দিচ্ছে। বিশেষ করে সম্প্রতি আপনাদের প্রদেশের উপর আক্রমণের ঘটনা রহস্যময় রূপ নিয়েছে। অতি দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, আমাদের শত্রুদের মধ্যে কিছু মুসলমানও রয়েছে। যারা প্রাদেশিকতার জোর প্রচারণা চালাচ্ছে যাতে পাকিস্তান দুর্বল হয়ে পড়ে এবং আগের মতো ভারতীয় আধিপত্যের সঙ্গে একাত্ম হয়। যারা এইসব ভাবছে তারা বোকার স্বর্গে বসবাস করছে যদিও তা তাদের চেষ্টা থেকে নিরস্ত রাখছে না। প্রতিটা দিন একগাদা মিথ্যা-বানোয়াট ইস্যু তৈরি করা হচ্ছে যাতে দেখানো যায় যে, মুসলমানদের মধ্যে সৌহার্দ্য নেই এবং তাদেরকে আইন বিরোধী কাজকর্মে উদ্বুদ্ধ করা যায়। সাম্প্রতিককালের ভাষা বিষয়ক বিতর্কের কথাই ধরুন; আমি অতীব দুঃখের সঙ্গে বলতে বাধ্য হচ্ছি আপনাদের অনেকেই প্রাদেশিকতাবাদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছেন।

    আপনাদের মনে কি এটা কখনোই জাগে না, যে প্রদেশের পত্রিকাগুলোর কাছে পাকিস্তান কেবল একটি অভিশাপের নাম- তারাই ভাষার ব্যাপারে আপনাদের অধিকার শেখাতে আসছে? এটা কি মনে হয় না যে, অতীতে যে মুসলমানদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে কিংবা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। হুট করে ভাষার বিষয়ে সে এখন আপনাদের দাতা হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। আপনাদের অধিকার সচেতন হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখাচ্ছে। এই ফিফথ কলামিস্টদের থেকে সাবধান হন।

    পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার বিষয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গি আরেকটি বার ব্যাখ্যা করছি। এই প্রদেশের অফিশিয়াল ব্যবহারের জন্য এই প্রদেশের লোকজন যেমনটা চায় তেমন এক ভাষা তারা পছন্দ করতে পারে। এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই।

    দেশের লোকজন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ে নিজেদের পছন্দমত ভাষা পছন্দ করে নেবে। যাই হোক, লিঙ্গুয়া-ফ্রাঙ্কা অর্থাৎ বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে অন্তর যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত ভাষা অবশ্যই উর্দু হবে অন্য কিছু নয়। সুতরাং রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু এবং অবশ্যই উর্দু, যা এমন একটি ভাষা যা উপমহাদেশের লাখ লাখ মুসলমানদের নিবিড় পরিচর্যায় বেড়ে উঠেছে পাকিস্তানের প্রতিটি কোনায় কোনায়। যে ভাষা অন্য যেকোনো প্রাদেশিক ভাষার চেয়ে লোকে ভালো বুঝতে পারে। মুসলমানদের কৃষ্টি এবং সংস্কৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এবং অন্যান্য ইসলামী রাষ্ট্রের ভাষাগুলোর মোটামুটি কাছাকাছি। ভারতীয় ইউনিয়ন থেকে উর্দুর বিতরণ এমনকি অফিসিয়াল ব্যবহার থেকে উর্দুকে বাদ রাখা বিনা কারণে ঘটেনি। ভাষা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে যারা পানি খোলা করতে চাইছে ব্যাপারটা তাদের অজানা নয়। এ ঝামেলা স্বীকার না করে উপায় নেই। যদিও তারা স্বীকার করবে না।

    কেননা তা তাদের মনোবাসনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের ভাষা-বিতর্ক সৃষ্টির একমাত্র কারণ মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন তৈরি এবং অবাঙালি মুসলমানদের প্রতি ঘৃণার প্ররোচনা প্রদান। অবশ্য ভাষা বিতর্কে আপনাদের প্রধানমন্ত্রী করাচি থেকে ফিরে যে স্পষ্ট বয়ান দিয়েছেন যে বাঙালিরা ইচ্ছে করলে বাংলাকে অফিশিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ বানাতে পারেন। শুনে তারা তাদের কর্মপরিকল্পনা পরিবর্তন করেছে। এখন তারা চাচ্ছে বাংলাকে পুরো পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বানাতে এবং আরেকটি মুসলিম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর দাবিকে তারা অগ্রাহ্য করছে। তারা বলছে, বাংলা এবং উর্দু দুটিকেই রাষ্ট্রভাষা করতে। এ বিষয়ে আপনাদের ভুল করা উচিত নয়। রাষ্ট্রের একাত্মতার স্বার্থে কেবল একটাই রাষ্ট্রভাষা থাকতে পারে এবং আমার মতে তা উর্দু। এ বিষয়ে অনেক আলোচনা করেছি আমাদের শত্রুদের এবং কিছু সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদদের ব্যাপারে। তাই আপনাদের সতর্ক করছি।

    আপনারা যারা জীবনের বিস্তীর্ণ পথে হাঁটতে যাচ্ছেন তারা নিজেদেরকে এইসব মানুষ থেকে দূরে রাখবেন। যারা আরও কিছুদিন পড়াশোনা চালিয়ে যাবেন তারা নিজেদের স্বার্থান্বেষী রাজনীতিবিদের

    বলির পাঠা হতে দেবেন না। আগের দিন যেমনটা বলেছিলাম আমাদের নিজেদের জন্য পিতা-মাতার জন্য রাষ্ট্রের জন্য আপনারা পুরো দোস্তর পড়াশোনায় মনোনিবেশ করুন। একমাত্র এই পথেই ভবিষ্যতের জীবনযুদ্ধের জন্য আপনারা নিজেদেরকে সজ্জিত করতে পারবেন। একমাত্র এভাবেই আপনি নিজেকে দেশের সম্পদ, শক্তি এবং অহংকার রূপে গড়ে তুলতে পারবেন।

    একমাত্র এভাবেই সামনের নানাবিধ সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে দেশকে বিশ্বের মধ্যে উন্নত ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হবেন। নবীন বন্ধুরা, এ কারণে আমি কিছু ব্যাপারের প্রতি আলোকপাত করব যা সম্পর্কে আপনাদের সদা সতর্ক থাকতে হবে। প্রথমত আমাদের অন্তর্বর্তী ফিফথ কলামিস্টদের ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, সব স্বার্থপর ব্যক্তিদের বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা ধারণ করতে হবে এবং তাদের মূলোৎপাটন করতে হবে। কেননা তারা তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আপনাকে কাজে লাগাতে চাইবে। তৃতীয়ত, প্রকৃত সৎ এবং পরোপকারী সরকারি কর্মচারী যারা তাদের সবটুকু দিয়ে জনগণের জন্য কাজ করতে চায় তাদেরকে চিনতে হবে এবং সমর্থন করতে হবে। চতুর্থত, মুসলিম লীগকে আরও দৃঢ়ভাবে গড়ে তুলতে হবে কারণ তারা প্রকৃত অর্থেই এক মহান পাকিস্তান গড়ে তুলবে। পঞ্চমত এই মুসলিম লীগই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছে এবং এখন পাকিস্তানকে গড়ে তোলার সে পবিত্র দায়িত্বের রক্ষক হিসেবে একটা মুসলিম লীগেরই দায়িত্ব। ষষ্ঠত, এমন অনেকেই রয়েছেন যারা আমাদের সংগ্রামের সময় আমাদের বিন্দুমাত্র সহযোগিতা করেননি এমনকি আমাদের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন এবং খোলামেলা ভাবেই আমাদের মহান সংগ্রামের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছেন এবং এই শত্রুপক্ষের সহযোগিতাকারীদের সংখ্যা মোটেই অপ্রতুল নয়।

    তারা হয়তো এখন তাদের চটকদার স্লোগান, বাধা বলি, আদর্শ আর কর্মসূচি নিয়ে আমাদের সামনে গিয়ে আসতে পারে। কিন্তু তাদের অবশ্যই বিশ্বস্ততা কিংবা তাদের অন্তর্নিহিত চিন্তাধারার যে প্রকৃত পরিবর্তন ঘটেছে তার প্রমাণ দিতে হবে। আর এর সত্যতা পাওয়া যাবে এই ভয়ংকর সন্ধিক্ষণে যারা তাদের ব্যাঙের ছাতার মত দল গঠন না করে আমাদের মত ও বিশ্বাস নিয়ে মুসলিম লীগে যোগদান করে এবং এই দলকে সমর্থন করে। এমন একটা সময় যখন আমরা নানাবিধ বহির্মুখী এবং অন্তর্মুখী বিপদের সম্মুখীন হচ্ছি যার সঙ্গে সাত কোটি মানুষের ভাগ্য জড়িয়ে রয়েছে এজন্য প্রয়োজন সম্পূর্ণ সংহতি ঐক্য আর শৃঙ্খলা একটা ব্যাপারে আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি যে একতায় উত্থান বিভেদে পতন এরকম আরও একটা ব্যাপার আছে যার প্রতি আমি আলোকপাত করতে চাই।

    নবীন বন্ধুরা এখন পর্যন্ত আপনারা প্রচলিত গদ বাধার রীতি অনুসরণ করে আসছেন। যখন আপনারা আপনাদের ডিগ্রি নিয়ে হাজার হাজার ইউনিভার্সিটি থেকে বের হন তখন আপনাদের একটাই চিন্তা আর আকাঙ্ক্ষা থাকে। আর তা হলো সরকারি চাকরি। আপনাদের উপাচার্য যথার্থই বলেছেন অদ্যবদি শিক্ষাদীক্ষার পুরনো আর প্রচলিত রীতি হলো সুপ্রশিক্ষিত সুসজ্জিত কেরানি তৈরি করা। অবশ্য তাদের মধ্যে কেউ কেউ উচ্চ পর্যায়ে অধিষ্ঠিত হয়েছিল কিন্তু পুরো সিস্টেমটাই ছিল সুদক্ষ কেরানি তৈরি করার জন্য সিভিল সার্ভিসে মূলত ব্রিটিশ কর্মীরাই নিযুক্ত হতেন পরে ভারতীয়রা এতে যোগদান শুরু করেন এবং এই ধারা বাড়তেই থাকে এর সামগ্রিক উদ্দেশ্য ছিল এমন একটা মানসিকতা তৈরি করা যে একজন সাধারণ মানুষ বিএ অথবা এমএ পাশ করেই একটি সরকারি চাকরি খুঁজতে থাকবে যদি সে এটা পেয়ে যেত তবে ভাবতো সে তার র্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছে গেছে আমরা সবাই জানি যে এর প্রকৃত ফলাফল কি ছিল? আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি একজন এমএ পাশ ব্যক্তি একজন ট্যাক্সি ড্রাইভারের থেকেও কম আয় করেন এবং তথাকথিত অধিকাংশ সরকারি চাকরিজীবী সচ্ছল পরিবারে নিযুক্ত বৃত্তের থেকেও দুর্দশায় জীবন অতিবাহিত করেন। এখন আমি চাই আপনারা সে প্রচলিত রীতি আর মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসুন। কারণ আমরা এখন মুক্ত পাকিস্তানের বাসিন্দা। সরকার হাজারে হাজারে চাকরি দিতে পারবে না এটা অসম্ভব। কিন্তু সরকারি চাকুরির এই প্রতিযোগিতায় আপনাদের মধ্যে অধিকাংশই নোবলহীন হয়ে পড়েন। সরকার কেবল সীমিত জনকে চাকরি দিতে পারে এবং যারা বাকি থাকে তারা কোন কিছুতেই স্থির হতে পারে না। আর এই হতাশ মানুষগুলো সহজেই স্বার্থান্বেষী নিষিধের শিকারে পরিণত হন। আমি চাই আপনারা আপনাদের মন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এমন পথে পরিচালিত করুন। সেসব ক্ষেত্রে যেসব ক্ষেত্রে আপনার জন্য উন্মুক্ত এবং ভবিষ্যতে আরও উন্মুক্ত হবে। কায়িক পরিশ্রম করার মধ্যে কোনো লজ্জা নেই। কারিগরি শিক্ষায়ও প্রচুর সুযোগ রয়েছে কারণ কারিগরি জ্ঞানের দক্ষ লোকজনের ভীষণ প্রয়োজন আমাদের। আপনারা অর্থ ও ব্যাংকিং, বাণিজ্য, আইন প্রভৃতি সম্পর্কে জানতে পারেন যা বর্তমানে অপরিসীম সুযোগ সৃষ্টি করছে। ইতোমধ্যে আপনারা জানেন নতুন নতুন কারখানা, ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, বাণিজ্যিক ফার্ম প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে এবং সেগুলো সময়ের সঙ্গে বাড়তেই এই পথগুলোই আপনাদের জন্য অপারিত। এগুলো সম্পর্কে ভাবুন এবং আপনার মনোযোগকে এদিকে পরিচালিত করুন। বিশ্বাস করুন এভাবে আপনি সরকারি চাকরির তুলনায় অনেক বেশি লাভবান হবেন। অনেক বেশি খুশি থাকবেন। কারণ অনেক বেশি সুযোগের মাধ্যমে আপনি অনেক বেশি উন্নতি করতে পারবেন যদি আপনি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আর কারখানাগুলোয় যোগদান করেন। আর এভাবে আপনি আপনার নিজের পাশাপাশি রাষ্ট্রকেও সহযোগিতা করতে পারবেন।

    আমি আপনাদের একটি উদাহরণ দিতে পারি। আমি একজন তরুণকে চিনি যিনি সরকারি চাকরিতে ছিলেন। চার বছর আগে ২০০ রুপিতে তিনি একটি ব্যাংকিং করপোরেশনে যোগদান করেন। কারণ তিনি ব্যাংকিং বিষয়ে পড়েছিলেন। আজ তিনি ওই করপোরেশনের একটি ফার্মের ব্যবস্থাপক এবং মাত্র চার বছরের মাথায় তিনি এখন মাসিক ১৫০০ রুপি আয় করছেন। এই সুযোগগুলোর সৎ ব্যবহার করতে হবে এবং আমি সত্যিই আপনাদের উপর খুশি হব যদি আপনারা বিষয়গুলো নিয়ে ভাবেন।

    পরিশেষে আমি আচার্যকে ধন্যবাদ জানাই। আর বিশেষত ধন্যবাদ জানাই উপাচার্যকে। আমাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জ্ঞাপন আর ওইসব প্রশংসাসূচক বাক্যবর্ষণের জন্য। আমার আশা নয় বরং দীর্ঘ প্রত্যয় পূর্ব বাংলার তরুণেরা আমাকে আশাহত করবে না।

  • নতুন বাংলাদেশ ও শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক পুনর্গঠন

    নতুন বাংলাদেশ ও শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক পুনর্গঠন

    শিক্ষা ডেস্ক:

    ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মোড় এনে দিয়েছে। রাজপথের অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের মাধ্যমে তরুণ সমাজ শুধু এক ফ্যাসিস্ট শাসনের শিকড় উপড়ে ফেলেনি, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের আমূল রূপান্তরের ঐতিহাসিক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে। তবে যে তরুণদের রক্তের বিনিময়ে এই নতুন বন্দোবস্তের সুযোগ তৈরি হলো, তাদের সেই স্বপ্নের ভিত্তি মজবুত করতে হলে হাত দিতে হবে জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত—শিক্ষাব্যবস্থায়। রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার যদি বিপ্লবের প্রথম পর্ব হয়, তবে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক পুনর্গঠনই হলো রাষ্ট্র টেকসই করার দ্বিতীয় ও প্রধানতম লড়াই।

    বিগত দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের শিক্ষা খাত এক গভীর কাঠামোগত পঙ্গুত্বের মধ্য দিয়ে গেছে। আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থা পরিণত হয়েছিল শুধু সনদ সর্বস্ব, মুখস্থনির্ভর এবং বৈশ্বিক কর্মবাজার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক প্রক্রিয়ায়। ইউনেসকোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের অন্তত ৬ শতাংশ অথবা জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ থাকা উচিত। অথচ বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আমাদের শিক্ষা বাজেট বছরের পর বছর ধরে জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৪ শতাংশের ঘরে আটকে রয়েছে। যদিও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা ২ শতাংশে উন্নীত করে। তবু দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনেসকোর ‘গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট’-এ বারবার এই বাজেট সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উঠে এসেছে। এই বরাদ্দের বড় অংশই আবার চলে যায় অবকাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যয়ে, যা উদ্ভাবন বা গবেষণায় কোনো অবদান রাখে না।

    শিক্ষা খাতের এই গুণগত দেউলিয়াত্বের ফল দাঁড়িয়েছে ভয়াবহ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশে সামগ্রিক বেকারত্বের তুলনায় উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। বিআইডিএসের গবেষণায় দেখা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ডিগ্রিধারীদের এক বিরাট অংশই স্নাতকোত্তর শেষ করার পর দীর্ঘকাল উপযুক্ত কর্মসংস্থান পান না। এর মূল কারণ শিল্প খাতের বাস্তব চাহিদা এবং আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের মধ্যকার পর্বতসম ব্যবধান। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা অ্যানালিটিকস ও বিশ্বমানের দক্ষতার যুগে আমাদের শ্রেণিকক্ষগুলো এখনো দুই দশক আগের সিলেবাস আঁকড়ে ধরে আছে।

    শিক্ষার এই নিম্নমানের প্রতিফলন ঘটছে বৈশ্বিক মূল্যায়নেও। কোয়াকুয়ারেলি সিমনডস বা টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিংয়ে বিশ্বের শীর্ষ ৫০০ বা ১০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুপস্থিতি এখন নিয়মিত চিত্র। গবেষণার অভাব এবং তার চেয়েও বড় কথা—শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে মেধার পরিবর্তে নগ্ন রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়াই এই পতনের মূল কারণ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পরিণত করা হয়েছিল শাসকদলের পেশিশক্তি চর্চার আখড়ায়। দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির তাণ্ডবে ছাত্র সংসদগুলো অকার্যকর করে রাখা হয়েছিল, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তা ও স্বাভাবিক নেতৃত্ব বিকাশকে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলে।

    এর পাশাপাশি আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার বুনিয়াদও চরম হোঁচট খেয়েছে। বারবার কারিকুলাম পরিবর্তন, অপরিকল্পিত পরীক্ষা পদ্ধতি চালু এবং পর্যাপ্ত যোগ্য শিক্ষক তৈরির ঘাটতির কারণে শিক্ষার মৌলিক মানই ধ্বংস হয়ে গেছে। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে শেখার চেয়ে কোচিং সেন্টার ও প্রাইভেট টিউশনের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হয়েছে, যা শিক্ষা ক্ষেত্রে এক ধরনের চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি করেছে। গ্রামের সাধারণ প্রান্তিক পরিবারের সন্তানটি আজ শহরের ব্যয়বহুল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় শুরুতেই পিছিয়ে পড়ছে।

    এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তরুণ প্রজন্মের প্রথম ও প্রধান দাবি হলো—মেধাকেন্দ্রিক এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র পরিচালনা। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে উঠে আসা এই তরুণরা কোনো খণ্ডিত সমাধান চায় না; তারা চায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং যোগ্যতার সঠিক মর্যাদা। পাবলিক সার্ভিস কমিশনসহ রাষ্ট্রের সর্বস্তরে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা এবং দলীয় পরিচয়ভিত্তিক স্বজনপ্রীতি চিরতরে বন্ধ করাই এখন সময়ের প্রধান দাবি।

    দ্বিতীয়ত, তরুণ সমাজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেজুড়বৃত্তিক দলীয় রাজনীতির অবসান চায়। তবে এর অর্থ রাজনীতিবিমুখতা নয়; বরং তারা চায় সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ। প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত বিরতিতে ছাত্র সংসদ (যেমন—ডাকসু, জাকসু, রাকসু ইত্যাদি) নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। ক্যাডারভিত্তিক গণরুম, গেস্টরুমের নামে দখলদারিত্বের বদলে ছাত্র সংসদই হবে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়, মুক্তচিন্তার চর্চা এবং ভবিষ্যৎ জাতীয় নেতৃত্ব তৈরির একমাত্র স্বীকৃত প্ল্যাটফর্ম।

    একইভাবে ব্রেন ড্রেন বা মেধা পাচার রোধ করাও আজকের দিনে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিবছর হাজার হাজার মেধাবী তরুণ উচ্চশিক্ষা ও উন্নত জীবনের আশায় দেশ ছাড়ছে এবং তারা আর ফিরছে না। এর একমাত্র কারণÑদেশে তাদের মেধার মূল্যায়ন নেই, নেই গবেষণার পর্যাপ্ত পরিবেশ। এই মেধাবীদের দেশে ধরে রাখতে না পারলে ২০৪১ সালের উন্নত বা স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন শুধু কাগজ-কলমেই থেকে যাবে।

    শিক্ষাব্যবস্থার টেকসই পুনর্গঠনে এখন কয়েকটি জরুরি নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্যÑ

    * পাঠ্যক্রম সংস্কার ও কারিগরি শিক্ষা : সাধারণ তত্ত্বনির্ভর শিক্ষার বাইরে মাধ্যমিক স্তর থেকেই তথ্যপ্রযুক্তি, কোডিং, প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা-দক্ষতা ও প্র্যাকটিক্যাল শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে প্রতি তিন বছর পরপর সিলেবাস হালনাগাদ করা আবশ্যক।

    * স্বাধীন জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন : শিক্ষক নিয়োগে দলীয় প্রভাব ও আর্থিক দুর্নীতি বন্ধে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ‘জাতীয় শিক্ষা কমিশন’ বা ‘শিক্ষক নিয়োগ কমিশন’ গঠন করা যেতে পারে, যা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে শুধু মেধার ভিত্তিতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ দেবে।

    * গবেষণায় বাজেট ও ইনকিউবেশন : শিক্ষায় জিডিপির অন্তত ৩-৪ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত গবেষণা তহবিল গঠনের পাশাপাশি তরুণদের উদ্যোক্তা বানাতে স্টার্টআপ ইনকিউবেশন সেন্টার এবং জামানতহীন সহজ শর্তে ঋণের আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে।

    * প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বৈষম্য দূরীকরণ : কোচিংনির্ভরতা কমাতে শ্রেণিকক্ষেই পড়াশোনা নিশ্চিত করতে হবে এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরকারি স্কুলগুলোতে যোগ্য ও উন্নত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ ত্বরান্বিত করতে হবে।শিক্ষা কোনো অনুদান নয়, এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি। একটি মেরুদণ্ডহীন ও দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে কোনো শক্তিশালী বাংলাদেশ গঠন সম্ভব নয়। ২০২৪-এর তরুণ প্রজন্ম তাদের দায়িত্ব পালন করেছে—তারা পরিবর্তনের নতুন পথ খুলে দিয়েছে। এখন রাষ্ট্র ও নীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের দায়িত্ব হলো তরুণদের এই আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করা। যে শিক্ষা তরুণকে দাসত্ব নয়, বরং স্বাধীন চিন্তা, প্রজ্ঞা ও দেশপ্রেমের প্রেরণা জোগায়Ñসেই শিক্ষাব্যবস্থার গোড়াপত্তনই হোক নতুন বাংলাদেশের মূল অঙ্গীকার।

  • পাঠ্যপুস্তক: রাজনৈতিক দলিল নয়, জাতি গঠনের নকশা

    পাঠ্যপুস্তক: রাজনৈতিক দলিল নয়, জাতি গঠনের নকশা

    উপসম্পাদকীয়

    একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তার অনেকখানি নির্ধারিত হয় সেই জাতির শ্রেণিকক্ষের ভেতরে। আর শ্রেণিকক্ষের সবচেয়ে নীরব অথচ সবচেয়ে শক্তিশালী শিক্ষক হলো পাঠ্যপুস্তক। পাঠ্যপুস্তক যদি শিশুকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে, তাহলে একটি আত্মবিশ্বাসী জাতি গড়ে ওঠে। আর যদি সেখানে বৈষম্য, সংকীর্ণতা কিংবা অযৌক্তিক সামাজিক ধারণার প্রতিফলন ঘটে, তবে সেই ক্ষতি বহু বছর ধরে সমাজকে বহন করতে হয়।

    একটি শিশুর কাছে পাঠ্যপুস্তকে যা লেখা থাকে, সেটিই অনেক সময় চূড়ান্ত সত্য। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশুর আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদাবোধের ভিত্তি তৈরি হয় শৈশবেই। বিশ্বব্যাপী গবেষণাগুলো দেখিয়েছে, বিদ্যালয়ের পাঠ্যবস্তু, শিক্ষক এবং পরিবার—এই তিনটি উৎসই শিশুদের আত্মবিশ্বাস গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। ফলে পাঠ্যপুস্তক শুধু তথ্য নয়; এটি একটি মানসিক ও সামাজিক নির্মাণের উপকরণ।

    আজও আমাদের সমাজে রান্না, গৃহপরিচর্যা কিংবা পারিবারিক দায়িত্বকে অনেকেই নারীর একক কাজ হিসেবে ভাবেন। অথচ উন্নত বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থায় এগুলোকে লাইফ স্কিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন ছেলে যেমন রান্না শিখবে, তেমনি একজন মেয়েও আর্থিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তি বা নেতৃত্ব শিখবে। শিক্ষা যদি সমাজকে পরিবর্তন না করে, তবে সেই শিক্ষা শুধু পরীক্ষার খাতা পূরণের জন্যই রয়ে যায়।

    আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট পাঠ্যবই নয়, প্রণয়ন পদ্ধতিতে। আমাদের দেশে পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের আলোচনা প্রায়ই শুরু হয় বই ছাপার পর। অথচ প্রশ্ন হওয়া উচিত—বই লেখার আগেই কি পর্যাপ্ত গবেষণা হয়েছিল? বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জাতীয় পর্যায়ে কয়েকজন বিশেষজ্ঞের মতামতের মধ্যেই পুরো প্রক্রিয়া সীমাবদ্ধ থাকে। মাঠপর্যায়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক কিংবা গবেষকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অনেক সময় নীতিনির্ধারণ পর্যন্ত পৌঁছায় না। ফলে যে কারিকুলাম সচিবালয়ের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে নিখুঁত বলে মনে হয়, সেটি প্রত্যন্ত গ্রামের একটি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে গিয়ে বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক কোনো অফিসকক্ষে বসে তৈরি হয় না; এটি তৈরি হয় শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষণার সম্মিলিত অভিজ্ঞতা থেকে।

    তাহলে কীভাবে হওয়া উচিত কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন? বাংলাদেশে পাঠ্যক্রম তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটি নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। প্রথমেই যে শ্রেণির জন্য বই তৈরি হবে, সেই শ্রেণিতে পাঠদান করেন—এমন শহর ও গ্রামের অন্তত দুটি করে মডেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ শিক্ষকদের মতামত সংগ্রহ করতে হবে। একই সঙ্গে ওই বয়সের শিশুর মানসিক বিকাশ, ভাষাগত সক্ষমতা ও শেখার পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করেছেন—এমন শিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী, ভাষাবিজ্ঞানী, বিষয়বিশেষজ্ঞ এবং কারিকুলাম গবেষকদের সম্পৃক্ত করতে হবে।

    এরপর খসড়া পাঠ্যক্রম তৈরি করে সেটি বিভিন্ন গণমাধ্যম, শিক্ষা-সংক্রান্ত ওয়েবসাইট এবং উন্মুক্ত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করতে হবে, যাতে শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী, গবেষক এবং সাধারণ নাগরিক যুক্তিসংগত মতামত দেওয়ার সুযোগ পান।

    প্রথমে অন্তত এক বছরের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে নতুন কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তক পাঠ্য করা উচিত। এ উদ্দেশ্যে জাতীয় অনলাইন কারিকুলাম ফিডব্যাক প্ল্যাটফর্ম চালু করা যেতে পারে, যেখানে নিবন্ধিত শিক্ষকরা নির্ধারিত ফরম্যাটে মতামত, সমস্যা ও সমাধানের প্রস্তাব জমা দেবেন। সেই মতামত বিশ্লেষণ করবেন গবেষক ও কারিকুলাম বিশেষজ্ঞরা। এরপর প্রয়োজনীয় সংশোধন করে চূড়ান্ত পাঠ্যক্রম অনুমোদন দেওয়া হবে।

    বিশ্বের উন্নত শিক্ষাব্যবস্থাগুলো দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—কারিকুলাম কখনো একদিনে তৈরি হয় না।

    ফিনল্যান্ডে জাতীয় মূল কাঠামো তৈরির পর স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ও বিদ্যালয়গুলো নিজেদের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ্যক্রম অভিযোজিত করে। শিক্ষকরা শুধু বাস্তবায়নকারী নন; তারা কারিকুলাম উন্নয়নেরও অংশীদার।

    সিঙ্গাপুরে নতুন পাঠ্যক্রম চালুর আগে বহু বছর ধরে গবেষণা, পাইলটিং, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক এবং বিদ্যালয় একসঙ্গে কাজ করে।

    অস্ট্রেলিয়ান কারিকুলাম প্রণয়নের সময় খসড়া জনমতের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। হাজার হাজার শিক্ষক, গবেষক, অভিভাবক ও নাগরিকের মতামত বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত সংস্করণ প্রকাশ করা হয়।

    যুক্তরাজ্যেও জাতীয় কারিকুলাম সংশোধনের সময় ব্যাপক পরামর্শ, গবেষণা ও জনমত গ্রহণের দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।

    এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়—শিক্ষাব্যবস্থার স্থায়িত্ব আসে অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে, ক্ষমতার কেন্দ্রীয়করণ থেকে নয়।একটি দেশের সরকার বদলাতে পারে। রাজনৈতিক দর্শনও পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু পাঠ্যপুস্তক এমন হওয়া উচিত নয়, যা প্রতি কয়েক বছর পরপর নতুন আদর্শের পরীক্ষাগারে পরিণত হয়। শিক্ষার্থীর প্রয়োজন স্থিতিশীলতা, গবেষণাভিত্তিক জ্ঞান এবং নিরপেক্ষ ইতিহাস। কারণ শিক্ষা কোনো মন্ত্রণালয়ের একক সম্পদ নয়; শিক্ষা একটি জাতির সম্মিলিত বিবেক। আর সেই বিবেকের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল হওয়া উচিত আমাদের পাঠ্যপুস্তক।