ক্যাটাগরি উপসম্পাদকীয়

  • নতুন বাংলাদেশ ও শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক পুনর্গঠন

    নতুন বাংলাদেশ ও শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক পুনর্গঠন

    শিক্ষা ডেস্ক:

    ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মোড় এনে দিয়েছে। রাজপথের অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের মাধ্যমে তরুণ সমাজ শুধু এক ফ্যাসিস্ট শাসনের শিকড় উপড়ে ফেলেনি, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের আমূল রূপান্তরের ঐতিহাসিক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে। তবে যে তরুণদের রক্তের বিনিময়ে এই নতুন বন্দোবস্তের সুযোগ তৈরি হলো, তাদের সেই স্বপ্নের ভিত্তি মজবুত করতে হলে হাত দিতে হবে জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত—শিক্ষাব্যবস্থায়। রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার যদি বিপ্লবের প্রথম পর্ব হয়, তবে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক পুনর্গঠনই হলো রাষ্ট্র টেকসই করার দ্বিতীয় ও প্রধানতম লড়াই।

    বিগত দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের শিক্ষা খাত এক গভীর কাঠামোগত পঙ্গুত্বের মধ্য দিয়ে গেছে। আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থা পরিণত হয়েছিল শুধু সনদ সর্বস্ব, মুখস্থনির্ভর এবং বৈশ্বিক কর্মবাজার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক প্রক্রিয়ায়। ইউনেসকোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের অন্তত ৬ শতাংশ অথবা জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ থাকা উচিত। অথচ বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আমাদের শিক্ষা বাজেট বছরের পর বছর ধরে জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৪ শতাংশের ঘরে আটকে রয়েছে। যদিও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা ২ শতাংশে উন্নীত করে। তবু দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনেসকোর ‘গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট’-এ বারবার এই বাজেট সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উঠে এসেছে। এই বরাদ্দের বড় অংশই আবার চলে যায় অবকাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যয়ে, যা উদ্ভাবন বা গবেষণায় কোনো অবদান রাখে না।

    শিক্ষা খাতের এই গুণগত দেউলিয়াত্বের ফল দাঁড়িয়েছে ভয়াবহ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশে সামগ্রিক বেকারত্বের তুলনায় উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। বিআইডিএসের গবেষণায় দেখা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ডিগ্রিধারীদের এক বিরাট অংশই স্নাতকোত্তর শেষ করার পর দীর্ঘকাল উপযুক্ত কর্মসংস্থান পান না। এর মূল কারণ শিল্প খাতের বাস্তব চাহিদা এবং আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের মধ্যকার পর্বতসম ব্যবধান। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা অ্যানালিটিকস ও বিশ্বমানের দক্ষতার যুগে আমাদের শ্রেণিকক্ষগুলো এখনো দুই দশক আগের সিলেবাস আঁকড়ে ধরে আছে।

    শিক্ষার এই নিম্নমানের প্রতিফলন ঘটছে বৈশ্বিক মূল্যায়নেও। কোয়াকুয়ারেলি সিমনডস বা টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিংয়ে বিশ্বের শীর্ষ ৫০০ বা ১০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুপস্থিতি এখন নিয়মিত চিত্র। গবেষণার অভাব এবং তার চেয়েও বড় কথা—শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে মেধার পরিবর্তে নগ্ন রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়াই এই পতনের মূল কারণ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পরিণত করা হয়েছিল শাসকদলের পেশিশক্তি চর্চার আখড়ায়। দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির তাণ্ডবে ছাত্র সংসদগুলো অকার্যকর করে রাখা হয়েছিল, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তা ও স্বাভাবিক নেতৃত্ব বিকাশকে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলে।

    এর পাশাপাশি আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার বুনিয়াদও চরম হোঁচট খেয়েছে। বারবার কারিকুলাম পরিবর্তন, অপরিকল্পিত পরীক্ষা পদ্ধতি চালু এবং পর্যাপ্ত যোগ্য শিক্ষক তৈরির ঘাটতির কারণে শিক্ষার মৌলিক মানই ধ্বংস হয়ে গেছে। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে শেখার চেয়ে কোচিং সেন্টার ও প্রাইভেট টিউশনের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হয়েছে, যা শিক্ষা ক্ষেত্রে এক ধরনের চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি করেছে। গ্রামের সাধারণ প্রান্তিক পরিবারের সন্তানটি আজ শহরের ব্যয়বহুল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় শুরুতেই পিছিয়ে পড়ছে।

    এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তরুণ প্রজন্মের প্রথম ও প্রধান দাবি হলো—মেধাকেন্দ্রিক এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র পরিচালনা। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে উঠে আসা এই তরুণরা কোনো খণ্ডিত সমাধান চায় না; তারা চায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং যোগ্যতার সঠিক মর্যাদা। পাবলিক সার্ভিস কমিশনসহ রাষ্ট্রের সর্বস্তরে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা এবং দলীয় পরিচয়ভিত্তিক স্বজনপ্রীতি চিরতরে বন্ধ করাই এখন সময়ের প্রধান দাবি।

    দ্বিতীয়ত, তরুণ সমাজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেজুড়বৃত্তিক দলীয় রাজনীতির অবসান চায়। তবে এর অর্থ রাজনীতিবিমুখতা নয়; বরং তারা চায় সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ। প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত বিরতিতে ছাত্র সংসদ (যেমন—ডাকসু, জাকসু, রাকসু ইত্যাদি) নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। ক্যাডারভিত্তিক গণরুম, গেস্টরুমের নামে দখলদারিত্বের বদলে ছাত্র সংসদই হবে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়, মুক্তচিন্তার চর্চা এবং ভবিষ্যৎ জাতীয় নেতৃত্ব তৈরির একমাত্র স্বীকৃত প্ল্যাটফর্ম।

    একইভাবে ব্রেন ড্রেন বা মেধা পাচার রোধ করাও আজকের দিনে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিবছর হাজার হাজার মেধাবী তরুণ উচ্চশিক্ষা ও উন্নত জীবনের আশায় দেশ ছাড়ছে এবং তারা আর ফিরছে না। এর একমাত্র কারণÑদেশে তাদের মেধার মূল্যায়ন নেই, নেই গবেষণার পর্যাপ্ত পরিবেশ। এই মেধাবীদের দেশে ধরে রাখতে না পারলে ২০৪১ সালের উন্নত বা স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন শুধু কাগজ-কলমেই থেকে যাবে।

    শিক্ষাব্যবস্থার টেকসই পুনর্গঠনে এখন কয়েকটি জরুরি নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্যÑ

    * পাঠ্যক্রম সংস্কার ও কারিগরি শিক্ষা : সাধারণ তত্ত্বনির্ভর শিক্ষার বাইরে মাধ্যমিক স্তর থেকেই তথ্যপ্রযুক্তি, কোডিং, প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা-দক্ষতা ও প্র্যাকটিক্যাল শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে প্রতি তিন বছর পরপর সিলেবাস হালনাগাদ করা আবশ্যক।

    * স্বাধীন জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন : শিক্ষক নিয়োগে দলীয় প্রভাব ও আর্থিক দুর্নীতি বন্ধে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ‘জাতীয় শিক্ষা কমিশন’ বা ‘শিক্ষক নিয়োগ কমিশন’ গঠন করা যেতে পারে, যা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে শুধু মেধার ভিত্তিতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ দেবে।

    * গবেষণায় বাজেট ও ইনকিউবেশন : শিক্ষায় জিডিপির অন্তত ৩-৪ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত গবেষণা তহবিল গঠনের পাশাপাশি তরুণদের উদ্যোক্তা বানাতে স্টার্টআপ ইনকিউবেশন সেন্টার এবং জামানতহীন সহজ শর্তে ঋণের আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে।

    * প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বৈষম্য দূরীকরণ : কোচিংনির্ভরতা কমাতে শ্রেণিকক্ষেই পড়াশোনা নিশ্চিত করতে হবে এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরকারি স্কুলগুলোতে যোগ্য ও উন্নত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ ত্বরান্বিত করতে হবে।শিক্ষা কোনো অনুদান নয়, এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি। একটি মেরুদণ্ডহীন ও দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে কোনো শক্তিশালী বাংলাদেশ গঠন সম্ভব নয়। ২০২৪-এর তরুণ প্রজন্ম তাদের দায়িত্ব পালন করেছে—তারা পরিবর্তনের নতুন পথ খুলে দিয়েছে। এখন রাষ্ট্র ও নীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের দায়িত্ব হলো তরুণদের এই আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করা। যে শিক্ষা তরুণকে দাসত্ব নয়, বরং স্বাধীন চিন্তা, প্রজ্ঞা ও দেশপ্রেমের প্রেরণা জোগায়Ñসেই শিক্ষাব্যবস্থার গোড়াপত্তনই হোক নতুন বাংলাদেশের মূল অঙ্গীকার।

  • পাঠ্যপুস্তক: রাজনৈতিক দলিল নয়, জাতি গঠনের নকশা

    পাঠ্যপুস্তক: রাজনৈতিক দলিল নয়, জাতি গঠনের নকশা

    উপসম্পাদকীয়

    একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তার অনেকখানি নির্ধারিত হয় সেই জাতির শ্রেণিকক্ষের ভেতরে। আর শ্রেণিকক্ষের সবচেয়ে নীরব অথচ সবচেয়ে শক্তিশালী শিক্ষক হলো পাঠ্যপুস্তক। পাঠ্যপুস্তক যদি শিশুকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে, তাহলে একটি আত্মবিশ্বাসী জাতি গড়ে ওঠে। আর যদি সেখানে বৈষম্য, সংকীর্ণতা কিংবা অযৌক্তিক সামাজিক ধারণার প্রতিফলন ঘটে, তবে সেই ক্ষতি বহু বছর ধরে সমাজকে বহন করতে হয়।

    একটি শিশুর কাছে পাঠ্যপুস্তকে যা লেখা থাকে, সেটিই অনেক সময় চূড়ান্ত সত্য। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশুর আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদাবোধের ভিত্তি তৈরি হয় শৈশবেই। বিশ্বব্যাপী গবেষণাগুলো দেখিয়েছে, বিদ্যালয়ের পাঠ্যবস্তু, শিক্ষক এবং পরিবার—এই তিনটি উৎসই শিশুদের আত্মবিশ্বাস গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। ফলে পাঠ্যপুস্তক শুধু তথ্য নয়; এটি একটি মানসিক ও সামাজিক নির্মাণের উপকরণ।

    আজও আমাদের সমাজে রান্না, গৃহপরিচর্যা কিংবা পারিবারিক দায়িত্বকে অনেকেই নারীর একক কাজ হিসেবে ভাবেন। অথচ উন্নত বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থায় এগুলোকে লাইফ স্কিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন ছেলে যেমন রান্না শিখবে, তেমনি একজন মেয়েও আর্থিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তি বা নেতৃত্ব শিখবে। শিক্ষা যদি সমাজকে পরিবর্তন না করে, তবে সেই শিক্ষা শুধু পরীক্ষার খাতা পূরণের জন্যই রয়ে যায়।

    আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট পাঠ্যবই নয়, প্রণয়ন পদ্ধতিতে। আমাদের দেশে পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের আলোচনা প্রায়ই শুরু হয় বই ছাপার পর। অথচ প্রশ্ন হওয়া উচিত—বই লেখার আগেই কি পর্যাপ্ত গবেষণা হয়েছিল? বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জাতীয় পর্যায়ে কয়েকজন বিশেষজ্ঞের মতামতের মধ্যেই পুরো প্রক্রিয়া সীমাবদ্ধ থাকে। মাঠপর্যায়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক কিংবা গবেষকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অনেক সময় নীতিনির্ধারণ পর্যন্ত পৌঁছায় না। ফলে যে কারিকুলাম সচিবালয়ের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে নিখুঁত বলে মনে হয়, সেটি প্রত্যন্ত গ্রামের একটি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে গিয়ে বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক কোনো অফিসকক্ষে বসে তৈরি হয় না; এটি তৈরি হয় শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষণার সম্মিলিত অভিজ্ঞতা থেকে।

    তাহলে কীভাবে হওয়া উচিত কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন? বাংলাদেশে পাঠ্যক্রম তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটি নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। প্রথমেই যে শ্রেণির জন্য বই তৈরি হবে, সেই শ্রেণিতে পাঠদান করেন—এমন শহর ও গ্রামের অন্তত দুটি করে মডেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ শিক্ষকদের মতামত সংগ্রহ করতে হবে। একই সঙ্গে ওই বয়সের শিশুর মানসিক বিকাশ, ভাষাগত সক্ষমতা ও শেখার পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করেছেন—এমন শিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী, ভাষাবিজ্ঞানী, বিষয়বিশেষজ্ঞ এবং কারিকুলাম গবেষকদের সম্পৃক্ত করতে হবে।

    এরপর খসড়া পাঠ্যক্রম তৈরি করে সেটি বিভিন্ন গণমাধ্যম, শিক্ষা-সংক্রান্ত ওয়েবসাইট এবং উন্মুক্ত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করতে হবে, যাতে শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী, গবেষক এবং সাধারণ নাগরিক যুক্তিসংগত মতামত দেওয়ার সুযোগ পান।

    প্রথমে অন্তত এক বছরের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে নতুন কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তক পাঠ্য করা উচিত। এ উদ্দেশ্যে জাতীয় অনলাইন কারিকুলাম ফিডব্যাক প্ল্যাটফর্ম চালু করা যেতে পারে, যেখানে নিবন্ধিত শিক্ষকরা নির্ধারিত ফরম্যাটে মতামত, সমস্যা ও সমাধানের প্রস্তাব জমা দেবেন। সেই মতামত বিশ্লেষণ করবেন গবেষক ও কারিকুলাম বিশেষজ্ঞরা। এরপর প্রয়োজনীয় সংশোধন করে চূড়ান্ত পাঠ্যক্রম অনুমোদন দেওয়া হবে।

    বিশ্বের উন্নত শিক্ষাব্যবস্থাগুলো দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—কারিকুলাম কখনো একদিনে তৈরি হয় না।

    ফিনল্যান্ডে জাতীয় মূল কাঠামো তৈরির পর স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ও বিদ্যালয়গুলো নিজেদের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ্যক্রম অভিযোজিত করে। শিক্ষকরা শুধু বাস্তবায়নকারী নন; তারা কারিকুলাম উন্নয়নেরও অংশীদার।

    সিঙ্গাপুরে নতুন পাঠ্যক্রম চালুর আগে বহু বছর ধরে গবেষণা, পাইলটিং, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক এবং বিদ্যালয় একসঙ্গে কাজ করে।

    অস্ট্রেলিয়ান কারিকুলাম প্রণয়নের সময় খসড়া জনমতের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। হাজার হাজার শিক্ষক, গবেষক, অভিভাবক ও নাগরিকের মতামত বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত সংস্করণ প্রকাশ করা হয়।

    যুক্তরাজ্যেও জাতীয় কারিকুলাম সংশোধনের সময় ব্যাপক পরামর্শ, গবেষণা ও জনমত গ্রহণের দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।

    এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়—শিক্ষাব্যবস্থার স্থায়িত্ব আসে অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে, ক্ষমতার কেন্দ্রীয়করণ থেকে নয়।একটি দেশের সরকার বদলাতে পারে। রাজনৈতিক দর্শনও পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু পাঠ্যপুস্তক এমন হওয়া উচিত নয়, যা প্রতি কয়েক বছর পরপর নতুন আদর্শের পরীক্ষাগারে পরিণত হয়। শিক্ষার্থীর প্রয়োজন স্থিতিশীলতা, গবেষণাভিত্তিক জ্ঞান এবং নিরপেক্ষ ইতিহাস। কারণ শিক্ষা কোনো মন্ত্রণালয়ের একক সম্পদ নয়; শিক্ষা একটি জাতির সম্মিলিত বিবেক। আর সেই বিবেকের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল হওয়া উচিত আমাদের পাঠ্যপুস্তক।