ক্যাটাগরি ধর্ম ও জীবন

  • একনজরে ইসলামের তৃতীয় খলিফা উসমান (রা.)

    একনজরে ইসলামের তৃতীয় খলিফা উসমান (রা.)

    উসমান (রা.) ছিলেন অতুলনীয় লজ্জাশীল, অত্যন্ত দানশীল এবং কোরআনের খেদমতে অনন্য অবদান রাখা একজন মহান সাহাবি। সংক্ষেপে তাঁকে জেনে নিন।

    * পূর্ণ নাম : উসমান ইবন আফফান ইবন আবিল আস আল-কুরাইশী আল-উমাবী

    * কুনিয়াত : আবু আবদুল্লাহ

    * উপাধি : যুন-নূরাইন (দুই নূরের অধিকারী)

    * গোত্র : বনু উমাইয়্যা (কুরাইশ)

    * জন্ম : আনুমানিক ৫৭৬-৫৭৯ খ্রিষ্টাব্দ, মক্কা

    * শাহাদাত : ৩৫ হিজরি (৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দ), মদিনা (কোরআন তিলাওয়াতরত অবস্থায় বিদ্রোহীদের হাতে শাহাদত লাভ করেন)

    বিশেষ মর্যাদা

    ১. নবীদের পরে এই উম্মতের তৃতীয় শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি।

    ২. প্রথম দিকের ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম।

    ৩. নবী (সা.)-এর দুই কন্যাকে ধারাবাহিকভাবে বিয়ে করেন; এজন্য ‘যুন-নূরাইন’ উপাধিতে ভূষিত হন।

    ৪. জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ সাহাবির একজন।

    ৫. মুসলিম উম্মাহর তৃতীয় খলিফা নির্বাচিত হন।

    ৬. কোরআনের মুসহাফ একীভূত করে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরণ করেন।

    ৭. তাঁর শাসনামলে ইসলামি রাষ্ট্র ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়।

    ৮. তাবুক অভিযানে বিপুল দান করেন এবং রুমা কূপ মুসলিমদের জন্য ওয়াক্ফ করেন।

    উসমান (রা.) সম্পর্কে নবী (সা.)

    নবী (সা.) বলেছেন, ‘আমি কি সে লোককে (উসমানকে) লজ্জা করব না, ফেরেশতারা পর্যন্ত যাকে দেখলে লজ্জা পান।’ (মুসলিম : ২৪০১)

    [প্রধান সূত্র : সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (ইবন কাসির), হাদিস বিডিÑ উসমান (রা.)-এর ফজিলত অধ্যায়]

  • যে ফুলের খুশবুতে জাহান মাতোয়ারা

    যে ফুলের খুশবুতে জাহান মাতোয়ারা

    নীরবতার কোলে মাথা রেখে একে একে ঘুমিয়ে পড়েছে পৃথিবীর সব মানুষ। লাগামহীন পাখিগুলোও আজ নীরব, নিস্তব্ধ। চারপাশে গভীর প্রশান্তি। অথচ জেগে আছে আরবের প্রকৃতি। সেজে উঠেছে আরবের মরুপ্রান্তর। মাথার উপর ডানা মেলে থাকা আকাশ আজ যেন অদ্ভুত এক রূপ ধারণ করেছে। চাঁদ মেতে উঠেছে আকাশের সঙ্গে কোনো এক গোপন সংলাপে। শতসহস্র মাইল দূরের তারাগুলোও যেন নিঃসঙ্গতার বিষাদ ভুলে আনন্দে ঝলমল করছে। মনে হচ্ছে, পৃথিবীর দিকে একটু ঝুঁকে না এলে আজকের এই আনন্দের সাক্ষী হওয়া যাবে না। বাতাসের বুকে ভর করে কী এক মোহনীয় সুর উড়ে বেড়াচ্ছে প্রান্তর থেকে প্রান্তরে। কী যেন ঘটতে যাচ্ছে! কীসের যেন আলামত পৃথিবীর প্রাণে প্রাণে অদৃশ্য গান হয়ে বাজছে। মক্কা তখনো জানে না, ইতিহাসের কোন মহামুহূর্ত তার দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবী তখনো জানে না, এমন একজন মানুষ আসছেন, যার নাম উচ্চারিত হবে শতাব্দীর পর শতাব্দী। যার জীবন বদলে দেবে মানুষের চিন্তা, সমাজ, সভ্যতা ও ইতিহাসের গতিপথ। তিনি আসছেন। রহমতের নবী। মানবতার শিক্ষক। আল্লাহর সর্বশেষ রাসুল, মুহাম্মদ ﷺ।

    শিশু মুহাম্মদ ﷺ-এর জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অপূর্ব নূরের বর্ণনা। তার মা আমিনা বিনতে ওয়াহাবের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি এমন এক নূর দেখেছিলেন, যার আলোয় শামের প্রাসাদগুলো আলোকিত হয়ে উঠেছিল। মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জন্মের সময় তাঁর মা এমন এক নূর দেখেছিলেন, যার দ্বারা শামের প্রাসাদ আলোকিত হয়েছিল। আরেক বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজেই তাঁর মায়ের সেই স্বপ্নের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, তাঁর মা তাঁকে গর্ভে ধারণ করার সময় এমন একটি নূর দেখেছিলেন, যার আলোয় শামের বুসরার প্রাসাদগুলো আলোকিত হয়েছিল। কী আশ্চর্য! একটি শিশু তখনো মায়ের গর্ভে। কিন্তু তাঁর আগমনের নূর যেন মক্কার সীমানা পেরিয়ে বহু দূরের শামের দিকে ইশারা করছে। এ যেন অন্ধকার পৃথিবীর সামনে আলোর একটি প্রথম সংবাদ। শুধু একটি ঘর নয়, শুধু একটি নগর নয়, একটি নূর যেন ভবিষ্যতের এক বিশাল দিগন্তকে আলোকিত করার ঘোষণা নিয়ে এসেছে। কাজী নজরুল ইসলামের কল্পনায় সেই দৃশ্য হয়ে উঠেছে আরো মায়াময় : ‘যেন উষার কোলে রাঙা রবি দোলে, তোরা দেখে যা আমেনা মায়ের কোলে।’ সত্যিই তো! আমিনার কোলে তখন শুধু একটি শিশু নয়। সেই কোলে যেন ভবিষ্যতের এক নতুন ইতিহাস ঘুমিয়ে আছে।

    শেষ রাতের দিকে খুলে গেল রহস্যের জট। পৃথিবীর ইতিহাসে উদিত হলো এক নতুন ভোর। আমিনার কোল আলো করে জন্ম নিলেন এক আশ্চর্য সুন্দর মানবশিশু। তাঁর মুখ যেন পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও উজ্জ্বল। তাঁর ছোট্ট শরীর যেন সদ্য ফোটা ফুলের মতো কোমল ও পবিত্র। তিনি মুহাম্মদ ﷺ। এক মায়ের কোল আলো করে জন্ম নিলেন এমন এক শিশু, যাঁর আগমন পরবর্তীকালে বদলে দেবে মানুষের ইতিহাস। যে সময় আরবের সমাজ ডুবে ছিল অজ্ঞতা, শিরক, গোত্রবাদ, জুলুম ও নৈতিক অবক্ষয়ের অন্ধকারে, সে সময়েই জন্ম নিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁর মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের জন্য হেদায়াতের দ্বার উন্মুক্ত করবেন। কোরআন তাঁকে বলেছেন, ‘সমস্ত জগতের জন্য রহমত।’ তাই তাঁর আগমন শুধু একটি শিশুর জন্ম নয়। এটি ছিল রহমতের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

    মা আমিনার ঝিমিয়ে পড়া জীবনে যেন নতুন ছন্দ ফিরে এলো। অশ্রু ঝাপসা চোখের আলো যেন আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বেঁচে থেকেও এতদিন তিনি যেন মৃত্যুর কালো চাদর মুড়ি দিয়ে ছিলেন। স্বামীর মৃত্যু তার জীবন থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল অনেক স্বপ্ন, অনেক রঙ। কিন্তু আজ তাঁর কোল আলো করা এই শিশুর আগমনে জীবনের সঙ্গে তাঁর যেন নতুন এক যোগসূত্র তৈরি হলো। যে দিনগুলো ছিল বেদনার, সেগুলোতে এলো আনন্দের স্পর্শ। যে রাতগুলো ছিল দীর্ঘ ও বিষণ্ণ, সেগুলোতে নেমে এলো প্রশান্তি। তৃষ্ণার্ত চোখে মা আমিনা বারবার তাঁর শিশুকে দেখেন। যত দেখেন, ততই যেন দেখার আকাঙ্ক্ষা বাড়ে। শিশুটির বিস্ময়ভরা চাহনি মায়ের মনে কত যে স্বপ্ন জাগায়! মনে হয়, এই শান্তিদূতের জন্য তাঁর সমস্ত জীবন উৎসর্গ করে দেন। বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা সব মমতা ঢেলে দেন তাঁর কোমল শিশুটির ওপর। প্রতিবেশিনীরা দলে দলে আসতে শুরু করল শিশুটিকে দেখতে। তাদের বিস্মিত চোখ শিশুর মুখে স্থির হয়ে থাকে। তাঁর সৌন্দর্য দেখে তারা মুগ্ধ হয়। বাছা আমার, সাত রাজার ধন! মুখের লালা যেন মধুর মতো মিষ্টি। অবাক চাহনিতে এমন এক আকর্ষণ, যা দেখলে মন আপনা-আপনি তাঁর দিকে টেনে যায়। এই তো সেই শিশু আহমদ! যাঁর আগমনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নূরের সেই বিস্ময়কর সংবাদ।

    নবীজি ﷺ-এর জন্মের সঙ্গে আরো কিছু বিস্ময়কর ঘটনার কথা সিরাত ও দালায়িলের বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলো পারস্যের সম্রাট কিসরার প্রাসাদ বা ইওয়ানের কেঁপে ওঠা এবং তার চৌদ্দটি বারান্দা বা শরফত ভেঙে পড়ার ঘটনা। একই বর্ণনায় বলা হয়েছে, পারস্যের অগ্নিমন্দিরে দীর্ঘদিন ধরে জ্বলতে থাকা আগুন নিভে গিয়েছিল। সাওয়া হ্রদের পানি শুকিয়ে যাওয়ার কথাও সেখানে এসেছে। আরো এসেছে কিসরার দরবারে দেখা এক অদ্ভুত স্বপ্নের কথা, যেখানে আরবের উট ও অশ্বদের দজলা নদী অতিক্রম করার দৃশ্য দেখা হয়েছিল। ঘটনাগুলো যেন একে একে একটি নতুন যুগের আগমনের বার্তা বহন করছিল। পারস্যের অগ্নিমন্দিরের আগুন, কিসরার প্রাসাদের কম্পন, সাওয়া হ্রদের শুকিয়ে যাওয়া, আরবের মরুপ্রান্তরে জন্ম নেওয়া এক শিশু। সবকিছু মিলিয়ে যেন ইতিহাসের মঞ্চে নতুন কোনো অধ্যায়ের পর্দা উঠছিল। প্রচলিত বর্ণনায় বলা হয়, নবীজি ﷺ-এর জন্মরাতে পারস্যের একটি অগ্নিমন্দিরের আগুন নিভে গিয়েছিল। পারস্যের অগ্নিপূজার ঐতিহ্যে আগুন ছিল বিশেষ মর্যাদার প্রতীক। তাই এ ঘটনার মধ্যে অনেকে দেখেছেন, অন্ধকারের যুগ পেরিয়ে তাওহিদের আলো পৃথিবীতে উদিত হওয়ার এক প্রতীকী ইঙ্গিত। সাওয়া হ্রদের কাহিনিও নবীজি ﷺ-এর জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। বলা হয়, সেই রাতে হ্রদের পানি শুকিয়ে গিয়েছিল। আর কিসরার প্রাসাদের চৌদ্দটি শরফত ভেঙে পড়ার ঘটনাটিও ইতিহাসের নানা বর্ণনায় এসেছে। যেন পুরোনো পৃথিবী কেঁপে উঠেছিল নতুন এক পৃথিবীর আগমনে।

    কিন্তু এই নূর আসলে কীসের নূর? শুধু কি আকাশ আলোকিত করা কোনো আলো? শুধু কি কোনো প্রাসাদ আলোকিত করার আলো? না। তাঁর আগমনের সবচেয়ে বড় আলো ছিল হেদায়াতের আলো। কোরআনে এসেছে, ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে এসেছে এক নূর এবং সুস্পষ্ট কিতাব।’ এই নূর মানুষের চোখের জন্য নয়, হৃদয়ের জন্য। এই আলো অন্ধকার ঘরকে নয়, অন্ধকার হৃদয়কে আলোকিত করে। এই আলো কোনো প্রাসাদের দেয়ালে আটকে থাকে না। এটি ছড়িয়ে পড়ে মানুষের বিশ্বাসে, চরিত্রে, জীবনে। মক্কার সেই ছোট্ট ঘর থেকে যে আলোর যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা ছড়িয়ে পড়ে মক্কা থেকে মদিনা, মদিনা থেকে আরব, আরব থেকে পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে। একসময় যে মানুষ নিজের কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দিত, সেই মানুষই তাঁর শিক্ষা গ্রহণ করে এত কোমল হয়ে উঠল যে, একটি পাখির ছানার কষ্ট নিয়েও চিন্তিত হতে শিখল। যে গোত্রগুলো সামান্য কারণে বছরের পর বছর যুদ্ধ করত, তারা তাঁর শিক্ষায় ভাই ভাই হয়ে গেল। যে সমাজে শক্তিই ছিল ন্যায়ের মাপকাঠি, সেখানে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন মানুষের মর্যাদা। যে পৃথিবী অন্ধকারে ডুবে ছিল, সেখানে তিনি নিয়ে এলেন তাওহিদের আলো। সুতরাং তাঁর জন্মের সবচেয়ে বড় অলৌকিক নিদর্শন শুধু কোনো প্রাসাদ কেঁপে ওঠা নয়। সবচেয়ে বড় নিদর্শন হলো, একজন মানুষ এলেন এবং তাঁর মাধ্যমে একটি জাতি বদলে গেল। একটি জাতি বদলে গেল, আর ইতিহাস বদলে গেল। ইতিহাস বদলে গেল, আর কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের পথ বদলে গেল।

    নবীজি ﷺ-এর আগমনকে কবি একটি ফুলের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সাহারার বুকে ফুটে ওঠা এক অপূর্ব ফুল। যে ফুলের রং শুধু একটি বাগানকে সুন্দর করেনি। যে ফুলের সুবাস শুধু একটি জনপদে ছড়ায়নি। বরং তার সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে যুগ থেকে যুগান্তরে। কাজী নজরুল ইসলামের কণ্ঠে সেই অনুভূতি হয়ে উঠেছে : ‘সাহারাতে ফুটল রে, রঙিন গুলে-লালা, সেই ফুলেরই খোশবুতে আজ দুনিয়া মাতোয়ালা। সে ফুল নিয়ে কাড়াকাড়ি চাঁদ-সূর্য গ্রহ-তারায়, ঝুঁকে পড়ে চুমে সে ফুল নীল গগন নিরালা। সেই ফুলেরই রওশনিতে আরশ-কুরসি রওশন, সেই ফুলেরই রঙ লেগে আজ ত্রিভুবন উজালা।’ কবির ভাষা ভালোবাসার ভাষা। আর ইতিহাসের ভাষা আমাদের বলে, এই নবজাতকই একদিন আরবের বিচ্ছিন্ন গোত্রগুলোকে ঈমানের বন্ধনে একত্র করবেন। অজ্ঞতার অন্ধকারে ডুবে থাকা মানুষকে তাওহিদের দিকে ডাকবেন। জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন। মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করবেন। আর তাঁর হাতে পৌঁছে যাবে আল্লাহর শেষ ওহি। তাই তাঁর জন্মের রাতের সবচেয়ে বড় আলো শুধু আকাশে দেখা কোনো নূর নয়। সবচেয়ে বড় আলো ছিল সেই হেদায়াত, যা তাঁর মাধ্যমে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই আলো আজও নিভে যায়নি। মক্কার সেই ছোট্ট ঘর থেকে যে আলো যাত্রা শুরু করেছিল, তা আজও কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে জ্বলছে। সেই আলো কোনো প্রাসাদের দেয়ালে সীমাবদ্ধ নয়। কোনো মরুভূমির বালুতেও সীমাবদ্ধ নয়। কোনো একটি জাতির জন্যও নয়। এটি মানুষের হৃদয়ের আলো। আর সেই আলোর বাহক ছিলেন মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ ﷺ। একটি ফুল ফুটেছিল আরবের মরুভূমিতে। কিন্তু তার সুবাসে মাতোয়ারা হয়েছিল জাহান। সেই ফুলের নাম, মুহাম্মদ ﷺ।

  • সৌন্দর্যের অদ্বিতীয় স্থাপনা তাজমহল

    সৌন্দর্যের অদ্বিতীয় স্থাপনা তাজমহল

    তাজমহল বিশ্ববিখ্যাত এক স্মৃতিসৌধ। আস্থার সঙ্গে বলা যায়, এমন দৃষ্টিনন্দন মধ্যযুগীয় স্থাপনা দ্বিতীয়টি নেই। তাজমহল ভারতের উত্তর প্রদেশের আগ্রায় অবস্থিত। মোগল সম্রাট শাহজাহান তার স্ত্রী সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহলের (বেগম আরজুমান্দ বানু) স্মৃতি রক্ষার্থে এই অপূর্ব সুন্দর সৌধটি মোগল সাম্রাজ্যের রাজধানী আগ্রায় নির্মাণ করেন। এটি মোগল স্থাপত্যশৈলীর সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন, যার নির্মাণশৈলীতে ইসলামি, পারস্য, তুরস্ক ও ভারতীয় স্থাপত্যশিল্পের সম্মিলন ঘটেছে। তাজমহলের নকশা করেন লাহোরের বিখ্যাত স্থপতি ওস্তাদ আহমেদ। ইনি ঈশা খান নামেও পরিচিত ছিলেন। তাজমহলের নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১৬৩২ সালে আর মূল সমাধিসৌধ নির্মাণ সম্পন্ন হয় ১৬৪৮ সালে। পূর্ণাঙ্গ নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয় ১৬৫৩ সালে। সময় লাগে মোট ২২ বছর। নির্মাণের সময় ভারত, পারস্য, মিসর ও মধ্য এশিয়া থেকে আসা ২০ হাজার দক্ষ কারিগর ও শ্রমিক নিয়মিত কাজ করেছে বলে জানা যায়। ১৯৮৩ সালে তাজমহল বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম হিসেবে ইউনেসকোর তালিকাভুক্ত হয়।

    ভিত্তি ও তাজমহলের গঠন : তাজমহলের মূলে হলো তার সাদা মার্বেল পাথরের সমাধি। সমাধিটি বর্গাকার বেদিকার ওপর স্থাপিত। ভিত্তি কাঠামোটি বিশাল এবং কয়েক কক্ষবিশিষ্ট। প্রধান কক্ষটিতে মমতাজ মহল ও শাহজাহানের স্মৃতিফলক বসানো হয়েছে। ভিত্তিটি প্রতিদিকে ৫৫ মিটার লম্বা, পাশে ধনুকাকৃতির পথ, আইওয়ানের কাঠামো, সঙ্গে ওপরে একই রকমের ধনুকাকৃতির বারান্দা রয়েছে। এই প্রধান ধনুকাকৃতির তোরণ উপরে ইমারতের ছাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সম্মুখভাগ তৈরি করেছে। তাজমহলের প্রতিটি দিক একই রকম ডিজাইনে নির্মাণ করা হয়েছে। ভিত্তির প্রতিটি কোনায় একটি করে—মোট চারটি মিনার রয়েছে। মমতাজ মহল ও শাহজাহানের কবর রয়েছে সবচেয়ে নিচের তলায়।

    তাজমহলের মার্বেল পাথরে নির্মিত গম্বুজ খুবই আকর্ষণীয়। এর আকার ৩৫ মিটার, যা ইমারতের ভিত্তির সমান। গম্বুজের ওপরের দিক একটি পদ্মফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে, যা গম্বুজের উচ্চতাকে আরো দৃষ্টিগোচর করেছে। গম্বুজের উপরে পারসীয় অলংকরণে অলংকৃত একটি তামার দণ্ড রয়েছে। বড় গম্বুজটির চার কোনায় রয়েছে একই রকম দেখতে আরো চারটি ছোট গম্বুজ। ছোট গম্বুজগুলোয়ও তামার দণ্ড রয়েছে। বড় গম্বুজটির ওপর মুকুটের মতো একটি চূড়া রয়েছে। ১৮০০ শতকের আগে পর্যন্ত চূড়াটি স্বর্ণের নির্মিত ছিল, কিন্তু পরে স্বর্ণেরটি সরিয়ে ব্রোঞ্জনির্মিত চূড়া বসানো হয় ।

    মিনারগুলোর মূল বেদিকার কোনায় একটি করে মোট চারটি বড় চৌকি রয়েছে। প্রতিটি চৌকির উচ্চতা ৪০ মিটারেরও বেশি। চৌকিগুলো নকশা করা হয়েছে মসজিদের প্রথাগত মিনারের নকশায়, যেখানে মুয়াজ্জিন নামাজের জন্য আজান দেন। প্রতিটি মিনারকেই দুটি বারান্দা দিয়ে তিনটি সমান উচ্চতায় ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি মিনার বেদিকা থেকে বাইরের দিকে সামান্য হেলানো আছে, যাতে এগুলো কখনো ভেঙে পড়লেও যেন তা মূল সমাধির উপরে না পড়ে।

  • কুরআনের দৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত যে ৬ ব্যক্তি

    কুরআনের দৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত যে ৬ ব্যক্তি

    ধর্ম ও জীবন

    মানুষ সাধারণত ধন-সম্পদ, সম্মান বা বৈষয়িক কোনো কিছু হারানোকে ‘ক্ষতি’ বলে মনে করে। ব্যবসায় লোকসান হলে বা পার্থিব কোনো সুযোগ হাতছাড়া হলে আমরা নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত ভাবি। কিন্তু পবিত্র কুরআনের মাপকাঠিতে প্রকৃত ক্ষতি এটি নয়। কুরআনের বিচারে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত সে-ই, যে তার পরকালীন অনন্ত জীবনকে ধ্বংস করেছে, আল্লাহর অসন্তুষ্টি অর্জন করেছে এবং জান্নাতের বদলে জাহান্নামকে নিজের ঠিকানা হিসেবে বেছে নিয়েছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ এমন কিছু ব্যক্তির পরিচয় সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন, যারা দুনিয়া ও আখিরাতে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। চলুন, কুরআনের আলোকে সেই ৬ শ্রেণির মানুষের পরিচয় জেনে নিই—

    কুরআনের আলোকে ক্ষতিগ্রস্ত ৬ ব্যক্তির পরিচয়

    ১. আল্লাহর সঙ্গে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী

    যারা আল্লাহর সঙ্গে ইমানের অঙ্গীকার করার পর তা ভঙ্গ করে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, কুরআনে তাদের ক্ষতিগ্রস্ত বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

    الَّذِينَ يَنقُضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِن بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَن يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ ۚ أُولَٰئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ

    ‘যারা আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক বজায় রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন, তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে; তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সুরা বাকারা: আয়াত ২৭)

    ২. শিরককারী বা আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার স্থাপনকারী

    শিরক মানবজাতির সবচেয়ে বড় এবং ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক করে, সে চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—

    لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ

    ‘(হে নবী!) যদি আপনি আল্লাহর সঙ্গে শরিক করেন, তবে আপনার আমল নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং আপনি অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।’ (সুরা যুমার: আয়াত ৬৫)

    ৩. আল্লাহর আয়াতকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী

    যারা অহংকারবশত আল্লাহর সুস্পষ্ট আয়াত ও নিদর্শনগুলোকে অস্বীকার করে, আখেরাতে তাদের আমলের পাল্লা হালকা হয়ে যাবে এবং তারাই হবে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন—

    وَمَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَٰئِكَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنفُسَهُم بِمَا كَانُوا بِآيَاتِنَا يَظْلِمُونَ

    ‘আর যাদের (নেকির) পাল্লা হালকা হবে, তারাই নিজেদের ক্ষতি করেছে, কারণ তারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি অবিচার (অস্বীকার) করত।’ (সুরা আরাফ: আয়াত ৯)

    ৪. পরকাল ও আল্লাহর সাক্ষাৎ অস্বীকারকারী

    যারা মনে করে এই দুনিয়ার জীবনই শেষ এবং মৃত্যুর পর আর কোনো হিসাব-নিকাশ নেই, কুরআন তাদের সুস্পষ্টভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ঘোষণা করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

    قَدْ خَسِرَ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِلِقَاءِ اللَّهِ

    ‘নিশ্চয়ই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যারা আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎকে মিথ্যা মনে করেছে।’ (সুরা আনআম: আয়াত ৩১)

    ৫. পরিবারকে জাহান্নামের দিকে ঠেলে দেওয়া ব্যক্তি

    যে ব্যক্তি নিজে তো আমল করেই না, বরং নিজের পরিবার ও সন্তানদেরও ইসলামের সঠিক পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, কিয়ামতের দিন সে এক ভয়ানক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

    قُلْ إِنَّ الْخَاسِرِينَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنفُسَهُمْ وَأَهْلِيهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ۗ أَلَا ذَٰلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ

    ‘বলুন, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত তো তারাই, যারা কিয়ামতের দিন নিজেদের এবং নিজেদের পরিবার-পরিজনকে ক্ষতির মধ্যে ফেলবে। জেনে রেখো, এটাই সুস্পষ্ট ক্ষতি।’ (সুরা যুমার: আয়াত ১৫)

    ৬. ইমান, সৎকর্ম ও সত্যের পথ থেকে বঞ্চিত ব্যক্তি

    সময়ের কসম খেয়ে মহান আল্লাহ জানিয়েছেন, সব মানুষই ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত, কেবল সেই ভাগ্যবানরা ছাড়া, যারা ৪টি গুণের অধিকারী। আল্লাহ তাআলা বলেন—

    وَالْعَصْرِ * إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ * إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ

    ‘কালের (সময়ের) শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ চরম ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে তারা ছাড়া— যারা ইমান এনেছে, সৎকাজ করেছে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে ও ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।’ (সুরা আসর: আয়াত ১-৩)

    কুরআনের এই আয়াতগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, প্রকৃত সফলতা ব্যাংক ব্যালেন্স বা দুনিয়াবি পদমর্যাদায় নয়। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত সে-ই, যে তার ইমান হারিয়েছে, রবের অবাধ্য হয়েছে এবং আখিরাতকে ভুলে গেছে। পক্ষান্তরে, আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাস, সৎকর্ম, মানুষকে সত্যের পথে ডাকা এবং বিপদে ধৈর্য ধারণ করাই হলো চূড়ান্ত সফলতার চাবিকাঠি। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই ৬ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে হেফাজত করুন এবং দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত সফলতা দান করুন। আমিন।

  • শিশুর প্রতিপালনে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা

    শিশুর প্রতিপালনে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা

    ইসলাম এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে শিশুকে শুধু পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে মা-বাবার কাছে অর্পিত এক পবিত্র আমানত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কোরআনে সন্তানকে পিতা-মাতার জন্য দুনিয়ার শোভা ও পরীক্ষা—উভয়ভাবেই আখ্যায়িত করা হয়েছে। ফলে শিশুর শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক বিকাশের দায়িত্ব শুধু আবেগের বিষয় নয়; বরং একটি ধর্মীয় দায়িত্বও। এই দায়িত্ব পালনে প্রয়োজন স্নেহ, ভালোবাসা, দয়া ও প্রজ্ঞাপূর্ণ শিক্ষা, আবার প্রয়োজন হলে সীমিত ও ন্যায়সংগত শাসনেরও অনুমতি ইসলাম দিয়েছে। এভাবে ইসলামের শিক্ষা একদিকে কোমলতা শেখায়, অন্যদিকে দায়িত্বশীল অভিভাবকত্বেরও দিকনির্দেশনা দেয়।

    মহানবী (সা.) ছিলেন শিশুদের প্রতি সর্বোত্তম আদর্শ। তিনি শিশুদের ভালোবাসতেন, কোলে তুলে নিতেন, মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিতেন, হাসিমুখে কথা বলতেন এবং আন্তরিকতার সঙ্গে আচরণ করতেন। পথ চলতে শিশুদের আগে সালাম দেওয়ার ঘটনাও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। তিনি নিজের নাতি হাসান-হোসাইনকে চুম্বন করতে দেখে এক সাহাবি বিস্ময় প্রকাশ করলে বলেছিলেন, ‘যার অন্তরে দয়া নেই, তার প্রতিও দয়া দেখানো হয় না।’ এমনকি নামাজরত অবস্থায় নাতনি উম্মে কুলসুমকে কাঁধে নিয়ে সালাত আদায় করার ঘটনাও হাদিসে এসেছে, যা শিশুর প্রতি তার সহনশীলতা ও কোমলতার প্রমাণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (তিরমিজি : ১৯২১)

    শিশুরা স্বভাবগতভাবেই চঞ্চল ও কৌতূহলী। তারা ভুল করবে, শিখবে এবং ধীরে ধীরে পরিণত হবে—এটাই স্বাভাবিক বিকাশের ধারা। তাই প্রতিটি ভুলের জবাবে কঠোরতা নয়, বরং ধৈর্য, বোঝানো ও উৎসাহ দেওয়াই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা। ইসলামি চিন্তাবিদরা মনে করেন, শিশুর ভুলকে শাস্তির চোখে না দেখে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত, কারণ ভয়ের পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশু আত্মবিশ্বাসহীন ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে থাকে।তবে ইসলাম শাসনের প্রয়োজনীয়তাকেও অস্বীকার করে না। সন্তানকে দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সময়মতো শিক্ষা ও সংশোধন অপরিহার্য। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও এবং দশ বছর বয়সে নামাজ না পড়লে তাদের শাসন করো।’ (আবু দাউদ : ৪৯৫) এ হাদিসের উদ্দেশ্য কোনোভাবেই নির্যাতনকে বৈধতা দেওয়া নয়; বরং দীর্ঘদিন শিক্ষা ও উৎসাহ দেওয়ার পরও প্রয়োজন হলে সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।ইসলামি বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, শাসনের ক্ষেত্রেও ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া উচিত। প্রথমে নরম ভাষায় উপদেশ, এরপর মৃদু তিরস্কার, তারপর প্রয়োজন হলে কঠোর ভাষায় সতর্ক করা। এরপরও সংশোধন না হলে এমন শাসনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে যা কষ্টদায়ক বা স্থায়ীভাবে ক্ষতিকর নয় এবং যার একমাত্র উদ্দেশ্য সংশোধন। মুখমণ্ডল বা দেহের সংবেদনশীল অংশে আঘাত করা, রাগের বশে প্রহার করা কিংবা প্রকাশ্যে অপমান করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ফিকহবিদরা এমনকি শারীরিক শাস্তির ক্ষেত্রে আঘাতের মাত্রা, স্থান ও উদ্দেশ্য নিয়েও সুনির্দিষ্ট শর্ত আরোপ করেছেন, যাতে তা প্রতিহিংসামূলক না হয়ে শিক্ষামূলক থাকে।

    পরিবার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশে শারীরিক শাস্তির বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন সংশোধনমূলক পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন—সাময়িকভাবে খেলাধুলার সুযোগ সীমিত রাখা, শ্রেণিকক্ষে কিছুক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখা, অতিরিক্ত অনুশীলনের দায়িত্ব দেওয়া, প্রিয় বিষয় থেকে সাময়িক বিরত রাখা কিংবা শান্ত পরিবেশে বসিয়ে উপদেশমূলক আলোচনা করা। আধুনিক শিশু-মনোবিজ্ঞানও এসব পদ্ধতিকে কার্যকর বলে সমর্থন করে, কারণ এতে শিশুর আত্মমর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে এবং একই সঙ্গে সংশোধনের সুযোগও সৃষ্টি হয়।

    সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুর ওপর জুলুম করা মারাত্মক গুনাহ, কারণ এটি বান্দার হকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আল্লাহতায়ালা নিজের অধিকারের ব্যাপারে ক্ষমাশীল হলেও মানুষের হক নষ্ট করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রাপ্য আদায় বা ক্ষমা ছাড়া মুক্তি পাওয়া কঠিন। তাই অভিভাবক, শিক্ষক কিংবা দায়িত্বশীল যিনিই হোন না কেন, শিশুর প্রতি রাগ, প্রতিশোধ বা অপমানের মনোভাব থেকে কোনো আচরণ করা ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং প্রতিটি সিদ্ধান্তের মূলে থাকতে হবে সন্তানের কল্যাণ ও সঠিক পথে পরিচালনার আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা।আজকের সমাজে শিশুদের মানসিক সুস্থতা, নৈতিক বিকাশ ও পারিবারিক বন্ধন নিশ্চিত করতে আমাদের প্রয়োজন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শে ফিরে যাওয়া। স্নেহ হবে শিক্ষার ভিত্তি, দয়া হবে সম্পর্কের সৌন্দর্য এবং শাসন হবে প্রজ্ঞা, সংযম ও সংশোধনের মাধ্যম—শাস্তি বা প্রতিশোধের হাতিয়ার নয়। এ ভারসাম্যই একটি শিশুকে আত্মবিশ্বাসী, নৈতিকতাসম্পন্ন ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে এবং তা পরিবার ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

  • মুমিনের সফলতার পথে ১০ প্রতিবন্ধকতা

    মুমিনের সফলতার পথে ১০ প্রতিবন্ধকতা

    ইসলাম চায়- একজন মুমিন শুধু শারীরিক শক্তিতে নয়; ঈমান, চরিত্র, অধ্যবসায় ও কর্মে শক্তিশালী হয়ে উঠুন। তিনি আল্লাহকে ভয় করেন, বিপদে সবর করেন, পৃথিবীকে সুন্দর করার জন্য কাজ করেন, অহংকার ও হিংসা থেকে দূরে থাকেন এবং সর্বদা আল্লাহর এই বাণীকে সামনে রাখেন- ‘যে ব্যক্তি সৎকর্ম করে, সে পুরুষ হোক বা নারী আর সে যদি মুমিন হয়, তাহলে অবশ্যই আমি তাকে পবিত্র ও সুন্দর জীবন দান করব এবং তাদেরকে তাদের উত্তম কাজের সর্বোত্তম প্রতিদান প্রদান করব।’ (সুরা : আন-নাহল, আয়াত : ৯৭)।

    সফলতা হলো পরিশ্রমীদের প্রাপ্য, যা আল্লাহ কর্মঠ মানুষের জন্য নির্ধারণ করেছেন। যে ব্যক্তি দৃঢ় ঈমান, মহান লক্ষ্য এবং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে চেষ্টা করে, সে আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার বেশি উপযুক্ত। তার জন্য দুনিয়া ও আখিরাত- উভয় জগতেই আছে মহাপুরস্কার। সফল মানুষের জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁরা সাধারণত অধিক ঈমানদার, সুশৃঙ্খল, নমনীয় ও অনেক নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য থেকে দূরে থাকেন।

    নিচে সফলতার পথে প্রধান ১০টি বাধা তুলে ধরা হলো-

    ১. আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের ক্ষেত্রে দুর্বলতা : কখনো মানুষ নিজের দক্ষতা, জ্ঞান বা সামর্থ্যের ওপর এতটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়ে যে অহংকারে আক্রান্ত হয়। এর ফলে হয় সে ভণ্ড সফলতার ফাঁদে পড়ে, নয়তো আল্লাহর সাহায্য থেকে বঞ্চিত হয়ে ব্যর্থ হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথাযথভাবে ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদের এমনভাবে রিজিক দিতেন যেমন পাখিদের দেন; তারা সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৪৪)।

    ২. দৈনিক পরিকল্পনার অভাব : সফল মানুষের লক্ষ্য স্পষ্ট থাকে- স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি উভয়ই। তাঁরা প্রতিদিনের কাজের পরিকল্পনা তৈরি করেন এবং অগ্রাধিকার ঠিক করেন। পাশাপাশি প্রতিটি কাজ সুন্দরভাবে ও দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করার চেষ্টা করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ ভালোবাসেন, যখন তোমাদের কেউ কোনো কাজ করে, তখন তা নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করে।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ১৮৮০)।

    ৩. নেতিবাচক মানুষের সঙ্গে মেলামেশা : নৈরাশ্যবাদী ও নেতিবাচক মানুষের প্রভাব ধীরে ধীরে নিজের মনেও পড়ে। তাই সফল মানুষ এমন সঙ্গ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেন এবং ইতিবাচক, সৎ ও আশাবাদী মানুষের সান্নিধ্য গ্রহণ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর ধর্ম ও চরিত্রের ওপর থাকে। তাই তোমাদের প্রত্যেকে যেন দেখে, সে কাকে বন্ধু বানাচ্ছে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৩৩)।

    ৪. ব্যর্থতার কারণে হতাশ হয়ে পড়া : সফল মানুষ জানেন, ব্যর্থতা সফলতারই একটি অংশ। তাঁরা ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেন এবং নতুন উদ্যমে এগিয়ে যান। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘‘যদি কোনো বিপদ আসে, তবে বোলো না- ‘যদি আমি এমন করতাম…’ বরং বলো, ‘এটি আল্লাহর তাকদির, তিনি যা চান তাই করেন।’ কারণ ‘যদি’ শব্দটি শয়তানের কাজের দরজা খুলে দেয়।’’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৬৪)।

    ৫. অন্যের মূল্যায়ন নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করা : সফল মানুষ নিজের মূল্য অন্যের প্রশংসা বা সমালোচনার ওপর নির্ভর করান না। তাঁদের নিজস্ব আদর্শ, লক্ষ্য ও আত্মবিশ্বাস থাকে। তাই তাঁরা অযথা মানুষের কথায় ভেঙে পড়েন না।

    ৬. অতিরিক্ত অজুহাত দেওয়া : সফল মানুষ ব্যর্থতা স্বীকার করতে পারেন, কিন্তু অজুহাত দেখিয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে যান না। তাঁরা নিজের কাজের দায়িত্ব নিজেরাই নেন এবং সমস্যার সমাধান খোঁজেন।

    ৭. অন্যের সফলতায় হিংসা করা : সফল মানুষ প্রতিযোগিতা করেন, কিন্তু হিংসা করেন না। অন্যের সফলতাকে তাঁরা অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করেন এবং আরো কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেকে উন্নত করার চেষ্টা করেন। হিংসুক ব্যক্তি অন্যকে ক্ষতি করার আগে সে নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কেননা শুরুতেই সে হিংসার আগুনে জ্বলতে থাকে। হিংসা দূর না হওয়া পর্যন্ত এটাই তার জন্য স্থায়ী দুনিয়াবি শাস্তি। তার চেহারা সব সময় মলিন থাকে। তার সঙ্গে তার পরিবারে হাসি ও আনন্দ থাকে না। অন্যের ক্ষতি করার চক্রান্তে ও ষড়যন্ত্রে সে সর্বদা ব্যস্ত থাকে। প্রতিপক্ষের হামলার ভয়ে সে সর্বদা ত্রস্ত ও ভীত থাকে। ফলে সৎ সংসর্গ থেকে সে বঞ্চিত হয়। ঘুণ পোকা যেমন কাঁচা বাঁশকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়, হিংসুক ব্যক্তির অন্তর তেমনি হিংসার আগুন কুরে কুরে খায়। একসময় সে ধ্বংস হয়ে যায়, যেমন ঘুণে ধরা বাঁশ হঠাৎ ভেঙে পড়ে যায়। এভাবে দুনিয়ায় সে এসি ঘরে শুয়ে থেকেও হিংসার আগুনে জ্বলে-পুড়ে মরে।

    রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা পরস্পরে বিদ্বেষ কোরো না, হিংসা কোরো না, ষড়যন্ত্র কোরো না ও সম্পর্ক ছিন্ন কোরো না। তোমরা পরস্পরে আল্লাহর বান্দা হিসাবে ভাই ভাই হয়ে যাও।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০৭৬)।

    ৮. স্বাস্থ্য ও বিশ্রামকে অবহেলা করা : শরীর ও মনের সুস্থতা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সফলতা সম্ভব নয়। তাই সফল মানুষ পর্যাপ্ত বিশ্রাম, স্বাস্থ্য ও মানসিক প্রশান্তির যত্ন নেন। সুস্বাস্থ্যের জন্য শরীরচর্চার বিকল্প নেই। যাঁরা কর্মব্যস্ততায় শরীরচর্চার সুযোগ পান না, চিকিৎসকরা তাঁদের প্রতিদিন নিয়ম করে দ্রুত হাঁটার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। শরীরচর্চার অংশ হিসেবে নবীজি (সা.) সাহাবাদের সঙ্গে কুস্তি লড়েছেন। মাঝেমধ্যে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন। প্রিয়তমা স্ত্রী আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গেও এক রাতে দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন।

    তিনি সব সময় স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে দ্রুতগতিতে হাঁটতেন। আবু হুরায়রা (রা.) বলেছেন, ‘আমি নবীজি (সা.)-এর চেয়ে দ্রুতগতিতে কাউকে হাঁটতে দেখিনি।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৬৪৮)।

    ৯. অস্পষ্ট লক্ষ্য ও দুর্বল সিদ্ধান্ত : সফল মানুষের লক্ষ্য পরিষ্কার ও নির্দিষ্ট থাকে। তাঁরা জানেন তাঁরা কী অর্জন করতে চান। ফলে তাঁরা সহজেই নিজেদের অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে পারেন। তাঁদের সিদ্ধান্ত দৃঢ় হয় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তা বাস্তবায়নে দেরি করেন না। এভাবেই তাঁদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।

    ১০. বাধা এলে ভয় পেয়ে থেমে যাওয়া : জীবনের পথে বাধা আসবেই; কিন্তু সফল মানুষ প্রয়োজনে পরিকল্পনা ও কৌশল পরিবর্তন করতে দ্বিধা করেন না। তাঁদের লক্ষ্য অপরিবর্তিত থাকে, তবে লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতি পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তন করতে তাঁরা প্রস্তুত থাকেন। পৃথিবীতে যত মানুষ স্মরণীয়-বরণীয় হয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ কর্মে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। সফলতা অর্জনের জন্য নিরলসভাবে চেষ্টা-সাধনা চালিয়ে গেছেন। একসময় মহান আল্লাহ তাঁদের চেষ্টার সফল উপহার দিয়েছেন। মানুষ কোনো বিষয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে সাধনা করলে মহান আল্লাহ তাদের তা দিয়ে দেন।

    পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর এই যে মানুষ তা-ই পায়, যা সে চেষ্টা করে।’ (সুরা : আন নাজম, আয়াত : ৩৯)।

    আল্লাহ সবাইকে কবুল করুন। আমিন।

  • জান্নাতে যেসব জিনিস থাকবে না!

    জান্নাতে যেসব জিনিস থাকবে না!

    জান্নাত। যেখানে থাকবে না কোনো দুঃখ, কষ্ট বা মৃত্যুর ছোঁয়া। জান্নাত এমন এক চিরস্থায়ী আবাস, যেখানে নেই কোনো দুঃখ, কষ্ট, ভয়, রোগ, মৃত্যু কিংবা অপূর্ণতা। সেখানে প্রতিটি নিয়ামত হবে পরিপূর্ণ, প্রতিটি মুহূর্ত হবে আনন্দময় এবং প্রতিটি বাসিন্দা থাকবে চিরস্থায়ী শান্তি ও প্রশান্তিতে। মহান আল্লাহ কুরআনে এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) সহিহ হাদিসে জান্নাতের অসংখ্য নিয়ামতের বর্ণনা দিয়েছেন, যা একজন মুমিনকে নেক আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে।

    জান্নাতে যেসব জিনিস থাকবে না

    ১. দুঃখ, ভয় ও চিন্তা থাকবে না

    মহান আল্লাহ বলেন—

    بَلَىٰ مَنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُۥ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَلَهُۥٓ أَجْرُهُۥ عِندَ رَبِّهِۦ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ

    ‘যে ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করে এবং সৎকর্মশীল হয়, তার জন্য তার রবের কাছে রয়েছে প্রতিদান। তাদের কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১১২)

    ২. রোগ, ক্লান্তি ও অবসাদ থাকবে না

    আল্লাহ তাআলা বলেন—

    لَا يَمَسُّهُمْ فِيهَا نَصَبٌ وَمَا هُم مِّنْهَا بِمُخْرَجِينَ

    ‘সেখানে কোনো ক্লান্তি তাদের স্পর্শ করবে না এবং সেখান থেকে তাদের কখনো বের করা হবে না।’ (সুরা আল-হিজর: আয়াত ৪৮)

    অন্য হাদিসে এসেছে, জান্নাতবাসীদের ঘুমেরও প্রয়োজন হবে না; কারণ ঘুম ক্লান্তির ফল, আর জান্নাতে কোনো ক্লান্তিই থাকবে না।

    ৩. হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা থাকবে না

    জান্নাতবাসীদের হৃদয় হবে সম্পূর্ণ পবিত্র। সেখানে কেউ কারও প্রতি হিংসা, ঘৃণা বা শত্রুতা পোষণ করবে না। মহান আল্লাহ বলেন—

    وَنَزَعْنَا مَا فِي صُدُورِهِم مِّنْ غِلٍّ

    ‘আমি তাদের অন্তর থেকে সব বিদ্বেষ দূর করে দেব।’ (সুরা আল-আরাফ: আয়াত ৪৩)

    ৪. গুনাহ, অশ্লীলতা ও অনর্থক কথা থাকবে না

    আল্লাহ তাআলা বলেন—

    ﴿لَا يَسْمَعُونَ فِيهَا لَغْوًا وَلَا تَأْثِيمًا ۝ إِلَّا قِيلًا سَلَامًا سَلَامًا﴾

    ‘সেখানে তারা কোনো অসার বা পাপপূর্ণ কথা শুনবে না। তারা কেবল শুনবে— সালাম, সালাম।’ (সুরা আল-ওয়াকিআহ: আয়াত ২৫–২৬)

    ৫. শয়তান ও তার কুমন্ত্রণা থাকবে না

    জান্নাত হলো সম্পূর্ণ পবিত্র আবাস। সেখানে শয়তানের কোনো প্রবেশাধিকার থাকবে না এবং তার কোনো প্ররোচনাও থাকবে না। ফলে জান্নাতবাসীরা চিরকাল নিরাপদ ও প্রশান্তিতে থাকবে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

    اُدۡخُلُوۡهَا بِسَلٰمٍ اٰمِنِیۡنَ وَ نَزَعۡنَا مَا فِیۡ صُدُوۡرِهِمۡ مِّنۡ غِلٍّ اِخۡوَانًا عَلٰی سُرُرٍ مُّتَقٰبِلِیۡنَ لَا یَمَسُّهُمۡ فِیۡهَا نَصَبٌ وَّ مَا هُمۡ مِّنۡهَا بِمُخۡرَجِیۡنَ

    ‘(তাদেরকে বলা হবে,) তোমরা শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে তাতে প্রবেশ কর। আমি তাদের অন্তরে যে ঈর্ষা থাকবে তা দূর করে দেব; তারা ভ্রাতৃভাবে পরস্পর মুখোমুখি হয়ে আসনে অবস্থান করবে। সেখানে তাদেরকে অবসাদ স্পর্শ করবে না এবং তারা সেখান থেকে বহিস্কৃতও হবে না।’ (সুরা আল-হিজর: আয়াত ৪৬–৪৮)

    ৬. বার্ধক্য ও মৃত্যু থাকবে না

    রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

    يَا أَهْلَ الْجَنَّةِ إِنَّ لَكُمْ أَنْ تَحْيَوْا فَلَا تَمُوتُوا أَبَدًا، وَإِنَّ لَكُمْ أَنْ تَصِحُّوا فَلَا تَسْقَمُوا أَبَدًا، وَإِنَّ لَكُمْ أَنْ تَشِبُّوا فَلَا تَهْرَمُوا أَبَدًا

    ‘হে জান্নাতবাসীগণ! তোমরা চিরকাল জীবিত থাকবে, কখনো মৃত্যু হবে না; তোমরা সর্বদা সুস্থ থাকবে, কখনো অসুস্থ হবে না; তোমরা সর্বদা যুবক থাকবে, কখনো বার্ধক্যে উপনীত হবে না।’ (মুসলিম ২৮৩৭)

    ৭. ক্ষুধা, তৃষ্ণা, অভাব ও দারিদ্র্য থাকবে না

    মহান আল্লাহ বলেন—

    إِنَّ لَكَ أَلَّا تَجُوعَ فِيهَا وَلَا تَعْرَى ۝ وَأَنَّكَ لَا تَظْمَؤُا فِيهَا وَلَا تَضْحَى

    ‘নিশ্চয়ই সেখানে তোমার ক্ষুধার্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই, নগ্ন থাকারও নয়। সেখানে তোমার তৃষ্ণার্ত হতে হবে না এবং রৌদ্রের কষ্টও ভোগ করতে হবে না।’ (সুরা ত্বহা: আয়াত ১১৮–১১৯)

    জান্নাত— চিরস্থায়ী শান্তি ও পরিপূর্ণ সুখের নিবাস

    জান্নাত এমন এক আবাস, যেখানে প্রতিটি নিয়ামত হবে সীমাহীন ও চিরস্থায়ী। সেখানে থাকবে না কোনো অশান্তি, কষ্ট, বিচ্ছেদ বা অপূর্ণতা। জান্নাতবাসীরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করবে এবং তার পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সম্মান ও অনন্ত সুখ লাভ করবে। পৃথিবীর সকল দুঃখ-কষ্ট তখন তাদের কাছে অতীতের একটি ক্ষণিক স্মৃতি মাত্র হয়ে থাকবে।

    দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আখিরাতের জীবন চিরস্থায়ী। তাই আমাদের উচিত ঈমান, তাকওয়া, নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, সৎকর্ম এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে জান্নাতের উপযুক্ত হওয়ার চেষ্টা করা। মহান আল্লাহ আমাদের অন্তরকে পবিত্র করুন, নেক আমলের তৌফিক দান করুন এবং তার অসীম রহমতে আমাদের সবাইকে জান্নাতুল ফিরদাউসের অধিবাসী হিসেবে কবুল করুন। আল্লাহর কাছে দোয়া করুন—

    اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ الْفِرْدَوْسَ الْأَعْلَى مِنَ الْجَنَّةِ

    উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকাল ফিরদাউসাল আ’লা মিনাল জান্নাহ।’

    অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর জান্নাতুল ফিরদাউস প্রার্থনা করছি।’ আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।

  • হজের প্রাথমিক নিবন্ধন শুরু সোমবার, যেতে পারবেন না যারা

    হজের প্রাথমিক নিবন্ধন শুরু সোমবার, যেতে পারবেন না যারা

    ২০২৭ সালের হজের প্রাথমিক নিবন্ধন আগামীকাল সোমবার (২৭ জুলাই) থেকে শুরু হচ্ছে। আর এ নিবন্ধন কার্যক্রম চলবে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।

    এ সময়ের মধ্যেই হজে গমনেচ্ছু ব্যক্তিদেরকে প্রাথমিক নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে। ই-হজ সিস্টেমের মাধ্যমে যে কেউ নিবন্ধন করতে পারবেন। অর্থ পরিশোধ করে চূড়ান্ত নিবন্ধন করতে হবে।

    সৌদি হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ঘোষিত হজ কার্যক্রমের রোডম্যাপ অনুযায়ী এই সময়সূচি ঘোষণা করেছে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

    হজে গমনেচ্ছু ব্যক্তিদের অবশ্যই মেয়াদ সম্বলিত পাসপোর্ট থাকতে হবে। জটিল রোগে আক্রান্ত বা শারীরিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিরা হজে যেতে পারবেন না।

    নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ

    সাড়ে তিন লাখ টাকা জমা দিয়ে সরকারি ও বেসরকারি যেকোনো মাধ্যমে হজের প্রাথমিক নিবন্ধন করা যাবে। প্রাথমিক নিবন্ধিত ব্যক্তিদেরকে চলতি বছরের ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে প্যাকেজ মূল্যের অবশিষ্ট অর্থ পরিশোধ করে চূড়ান্ত নিবন্ধন করতে হবে। প্রাথমিক নিবন্ধনের পূর্বে হজযাত্রীদের আবশ্যিকভাবে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে প্রাক-নিবন্ধন করতে হবে।

    যে সকল স্থানে নিবন্ধন করা যাবে

    সরকারি মাধ্যমে ই-হজ সিস্টেমে (hajj.gov.bd) ইউজার তৈরি করে যে কেউ নিজেই নিবন্ধন করতে পারবে। এ ছাড়া, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়, জেলা ও উপজেলা মডেল মসজিদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বায়তুল মোকাররম অফিস ও ঢাকা হজ অফিসে হজের নিবন্ধন করা যাবে।

    সরকারি মাধ্যমে হজে গমনেচ্ছু ব্যক্তিদেরকে সোনালী ব্যাংকের যেকোনো শাখায় ভাউচারের মাধ্যমে টাকা জমা দিয়ে প্রাথমিক নিবন্ধন করতে হবে।

    তবে, বেসরকারি মাধ্যমের হজযাত্রীদেরকে হজ কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে এজেন্সির নির্ধারিত হিসাবে টাকা জমা দিতে হবে। এজেন্সির ব্যাংক হিসাবের তথ্য হজ পোর্টালে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির প্রোফাইলে পাওয়া যাবে।

    যে সকল ব্যক্তি হজে যেতে পারবে না

    ১৫ বছরের কম বয়সী কেউ হজে যেতে পারবে না। এছাড়া, দুরারোগ্য ব্যাধি যেমন: হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, লিভার বা কিডনি রোগ, স্নায়ুবিক বা মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত ও ডিমনেশিয়া রোগী, কেমোথেরাপি বা বায়োলজিক্যাল থেরাপি বা রেডিওথেরাপি নিচ্ছেন-এমন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী হজে যেতে পারবেন না।

    এ ছাড়া জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে এমন সক্রিয় সংক্রামক রোগ যেমন- যক্ষ্মা ও হেমোরেজিক ফিভারে আক্রান্ত ব্যক্তি হজে যেতে পারবে না। গর্ভাবস্থার শেষ দুই মাস ও ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থায় কোনো মহিলা হজযাত্রী ফিটনেস সনদ পাবে না।

    উল্লেখ্য, প্রাথমিক নিবন্ধনের সময় হজযাত্রীদেরকে আবশ্যিকভাবে প্রশিক্ষণ ও টিকা গ্রহণের জেলা, হজের ধরণ ও হজ প্যাকেজ নির্বাচন করতে হবে। এ ছাড়া ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ সম্বলিত পাসপোর্ট প্রয়োজন হবে।

  • তরবারির জোরে নয়, আরব বণিকদের মাধ্যমে ভারতে এসেছিল ইসলাম

    তরবারির জোরে নয়, আরব বণিকদের মাধ্যমে ভারতে এসেছিল ইসলাম

    ধর্ম ও জীবন

    প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধ আক্রমণের মাধ্যমে ভারতে ইসলামের আগমন ঘটেছিল। একে অনেকে তরবারির শক্তির ওপর ভর করে ইসলামের আগমন বলে মনে করেন। তবে আধুনিক ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের অনেকেই এই ধারণার সঙ্গে একমত নন।

    তাদের মতে, ভারতে ইসলামের আগমন কোনো একক ঘটনার ফল নয়। এটি কয়েক শতাব্দী ধরে চলা ঐতিহাসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার পরিণাম।

    ভারতে ইসলামের প্রসারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল বাণিজ্য। প্রাচীনকাল থেকেই ভারত গোলমরিচের জন্য সারা বিশ্বে পরিচিত ছিল। আরব সাগর শান্ত থাকায় এই সমুদ্রপথে আরব বণিকদের দীর্ঘদিনের প্রভাব ছিল। তারা বর্ষার সময়ে ভারতে আসতেন এবং ব্যবসা শেষে আরবে ফিরে যেতেন।

    বিখ্যাত ইতিহাসবিদ সৈয়দ সুলেমান নদভীর মতে, ইসলামের আবির্ভাবের পর বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ আরবদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। দীর্ঘদিন যোগাযোগের ফলে দক্ষিণ ভারতে ‘মাপ্পিলা মুসলিম’ নামে এক মুসলিম সম্প্রদায়ের বিকাশ ঘটে।

    রাজনীতিবিদ ও লেখক শশী থারুর প্রায়ই উল্লেখ করেন যে, পরিচিত ও বিশ্বস্ত আরব বণিকদের হাত ধরেই মালাবার উপকূলে ইসলাম এসেছিল। কোনো তলোয়ারের জোরে কেরালায় ইসলাম পৌঁছায়নি। দক্ষিণ ভারতে ইসলামের আগমন সম্পর্কে বেশ কিছু তত্ত্ব প্রচলিত আছে।

    প্রথম তত্ত্ব অনুযায়ী, নবী মোহাম্মদ (সা.)-এর জীবদ্দশাতেই প্রাচীন মুজিরিস বন্দর দিয়ে কেরালায় ইসলাম এসেছিল। ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে মালিক বিন দিনারের উদ্যোগে নির্মিত ‘চেরামন জামা মসজিদ’ এই দাবির পক্ষে বড় প্রমাণ। মসজিদটি প্রতিষ্ঠার পেছনে কেরালার হিন্দু রাজা চেরামন পেরুমলের ইসলাম গ্রহণের গল্পও জড়িয়ে আছে।

    প্রফেসর ইলিয়াসের মতে, আরবরা এখানে মূলত গোলমরিচের ব্যবসা করতে এসেছিলেন। তারা বাণিজ্যের পাশাপাশি হিসাব করার পদ্ধতি, ওজন মাপার কৌশল এবং ভালো নৌকা তৈরির প্রযুক্তিও শিখিয়েছিলেন।

    ঐতিহাসিকদের একাংশ ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধ ও মুলতান দখল এবং পরবর্তীতে দিল্লির সালতানাত প্রতিষ্ঠাকে রাজনৈতিক সম্প্রসারণ হিসেবে দেখেন।

    তবে আধুনিক গবেষকদের মতে, এই জয়ের মূল উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা, জোর করে মানুষকে ধর্মান্তরিত করা নয়।

    ভারতে ইসলামের প্রসারে সুফি আন্দোলনও বড় ভূমিকা পালন করেছে। একাদশ শতকের পর চিশতি ও সোহরাওয়ার্দী সিলসিলার সুফি-সন্তরা ভারতের বিভিন্ন অংশে বসতি স্থাপন করেন। তাদের খানকাহ ও দরগাহগুলো আধ্যাত্মিক এবং সামাজিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। আজমেরের খাজা মঈনুদ্দিন চিশতির দরগাহ এর একটি বড় উদাহরণ, যেখানে সব ধর্মের মানুষ আসেন। ইসলামের সাম্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও ন্যায়বিচারের নীতি মানুষকে আকর্ষণ করেছিল।

    ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটনের মতো পণ্ডিতরা আরেকটি নতুন তত্ত্ব দিয়েছেন। তাদের মতে, বাংলা ও পাঞ্জাবের মতো অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার মূলত কৃষি উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। মুসলিম শাসকরা সুফি খানকাহ ও মসজিদগুলোকে অনুর্বর জমি দান করতেন। এই প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কৃষি বসতি স্থাপন করলে স্থানীয় কৃষকরা ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক অগ্রগতির অংশ হিসেবে ইসলাম গ্রহণ করেন। সব মিলিয়ে, বাণিজ্য, আধ্যাত্মিকতা, রাজনীতি ও সামাজিক সুযোগের এক দীর্ঘ মিশ্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এই অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার ঘটেছিল।

    সূত্র: বিবিসি বাংলা

  • বিয়ে করে আত্মীয়-স্বজনকে জানানোর বিধান

    বিয়ে করে আত্মীয়-স্বজনকে জানানোর বিধান

    ধর্ম ও জীবন

    ইসলামে বিবাহ কেবল একটি সামাজিক চুক্তি নয়; এটি একটি পবিত্র ইবাদত, দায়িত্ব এবং আমানত। বিশেষ পরিস্থিতিতে একজন মুসলিম পুরুষকে একাধিক বিয়ের অনুমতি দেওয়া হলেও ইসলাম এটিকে কোনো শর্তহীন অধিকার হিসেবে উপস্থাপন করেনি। বরং ন্যায়বিচার, আর্থিক সামর্থ্য, দায়িত্বশীলতা এবং আল্লাহভীতিকে একাধিক বিয়ের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করেছে। ইসলামে বিয়ে গোপন রাখার অনুমোদন নেই। বরং বিয়ের পর তা সমাজে ঘোষণা করা বা প্রচার করা আবশ্যক।

    বিয়ের ঘোষণা (ই’লান): রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছেন, তোমরা বিয়ে প্রকাশ্যে সম্পন্ন করো। বিয়ে যে সম্পন্ন হয়েছে, তা যেন সমাজের মানুষ জানতে পারে, সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

    সাক্ষী ও অভিভাবক: বিয়ের আকদ বা চুক্তি বৈধ হওয়ার জন্য শর্ত হলো দুইজন মুসলিম পুরুষ (অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী) সাক্ষী এবং কনের অভিভাবকের (ওয়ালী) উপস্থিতি থাকতে হবে। হাদিসে এসেছে, অভিভাবক ও দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর উপস্থিতি ছাড়া বিয়ে হয় না। (সহিহ ইবনে হিব্বান)

    ওলিমা: বিয়ের ঘোষণা দেওয়ার সবচেয়ে উত্তম এবং সুন্নাতসম্মত মাধ্যম হলো ‘ওলিমা’ বা বিয়ের খাবার আয়োজন করা। সামর্থ্য অনুযায়ী আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও অভাবীদের দাওয়াত খাইয়ে বিয়ের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া এবং জানান দেওয়া ওয়াজিব বা মুস্তাহাব পর্যায়ের আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে ওয়ালিমা করেছেন এবং সাহাবিদের করতে বলেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) জয়নব বিনতে জাহাশ (রা.)-কে বিয়ে করার পরদিন ওয়ালিমা করেছিলেন। (বুখারি, হাদিস নম্বর-৫১৭০)। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছাফিয়াহ (রা.)-কে বিয়ের পর

    তিন দিন যাবৎ ওয়ালিমা খাইয়েছিলেন। (মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদিস নম্বর-৩৮৩৪)

    ঢোল বাজানো ও আনন্দ করা: ইসলামে বিয়ের ঘোষণা দেওয়ার জন্য মেয়েদের দফ (এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র) বাজিয়ে গান গাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যাতে আশেপাশের মানুষ বুঝতে পারে যে বিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা বিয়ের ঘোষণা দেবে এবং তা মসজিদে সম্পন্ন করবে। আর এ উপলক্ষে দফ বাজাবে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১০৮৯)