সাহিত্য গ্যালারি

  • সুকান্ত ভট্টাচার্য: জন্মশতবর্ষ

    সুকান্ত ভট্টাচার্য: জন্মশতবর্ষ

    সাহিত্য ডেস্ক:

    জীবনের শেষ প্রান্তে উপনীত হয়ে ‘ঐকতান’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন—
    ‘কৃষাণের জীবনের শরিক যে জন
    কর্মে ও কথায় সত্য আত্মীয়তা করেছে অর্জন,
    যে আছে মাটির কাছাকাছি,
    সে কবির বাণী-লাগি কান পেতে আছি।’
    কৃষাণের জীবনের শরিক হয়ে তাঁদের সত্য আত্মীয়তা অর্জন করেছিলেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। অথচ তাঁর জন্ম নগরে, ফসলের খেত আর ফসল ফলানো কৃষক থেকে বহু দূরে তাঁর সামাজিক অবস্থান। কৃষকের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও লড়াইকে চেতনায় ধারণ করে তিনি উপহার দিয়েছেন অসামান্য সব কবিতা। ইট-পাথরের হৃদয়হীন শহরে বাস করেও গ্রামের মাটির ‘ফসলের ডাক’ শুনে তাঁর জোরালো প্রত্যয়:
    ‘কাস্তে দাও আমার এ হাতে—
    সোনালি সমুদ্র সামনে, ঝাঁপ দেব তাতে।’
    শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকের লড়াকু চেতনা অসাধারণ অভিব্যক্তি পেয়েছে ‘দুর্মর’ কবিতায়। ১৯৪৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস। সুকান্ত তখন রোগশয্যায়, ফসলের দুই-তৃতীয়াংশের দাবিতে গড়ে ওঠা তেভাগা আন্দোলনের খবরে শিহরিত হলেন তিনি। গভীর আবেগে লিখলেন:
    ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ
    কেঁপে কেঁপে ওঠে পদ্মার উচ্ছ্বাসে বাংলাদেশ ।
    সে কোলাহলের রুদ্ধস্বরের আমি পাই উদ্দেশ
    জলে ও মাটিতে ভাঙনের বেগ আসে।’
    সুকান্ত উপলব্ধি করেছেন, কৃষক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ‘জন্ম নিয়েছে সচেতনতার ধান/গত আকালের মৃত্যুকে মুছে/আবার এসেছে বাংলা দেশের প্রাণ।’
    তেভাগা আন্দোলনের লড়াকু চেতনা প্রতিধ্বনিত হয় কবিতার রক্তিম পঙ্‌ক্তিতে:
    ‘“হয় ধান নয় প্রাণ”—এ শব্দে
    সারা দেশ দিশাহারা,
    একবার মরে ভুলে গেছে আজ
    মৃত্যুর ভয় তারা’
    কৃষকদের বলিষ্ঠ উত্থান অভূতপূর্ব আশাবাদের প্রতীকে উপস্থাপন করে বাংলাদেশকে যা স্থান ও কালের সীমা অতিক্রম করে যায়:
    ‘সাবাস বাংলা দেশ, এ পৃথিবী
    অবাক তাকিয়ে রয়:
    জ্বলে-পুড়ে মরে ছারখার
    তবু মাথা নোয়াবার নয়।’
    শুধু কৃষক নয়, শ্রমিক, মজুর, ডাকহরকরা, ক্ষুধার্ত মানুষ, শোষিত-বঞ্চিতজনের আর্তি ও সংকল্প মর্মস্পর্শী ভাষা পেয়েছে সুকান্তের কবিতায়। সাধারণ বস্তুকেও রূপকের আড়ালে মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছেন তিনি। ইতিহাস সচেতন ও শ্রেণিসচেতন সুকান্তের কবিতায় এক বিশেষ কালপর্বে (১৯৩৯-১৯৪৭) পরাধীন ভারতবর্ষের ঘটনাবহুল ইতিহাসের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই, শ্রমিক ধর্মঘট, ১৯৪২ সালের আগস্ট আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাপ, কালোবাজারি-মজুতদারির দৌরাত্ম্য, আজাদ হিন্দ ফৌজের লড়াই, নৌবিদ্রোহ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাবে সুকান্তের সৃজনবিশ্ব উদ্বেলিত হয়ে উঠেছে।
    জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ও চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের চাঞ্চল্যকর ঘটনারও প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর সাহিত্যে। চল্লিশের দশকের ঘটনাবহুল যুগবৈশিষ্ট্যের পরিপ্রেক্ষিতে সুকান্তের রাজনৈতিক চেতনা ও কবিতার সমান্তরাল বিকাশ ঘটেছিল।
    বাঙালি সাহিত্যিকদের সাহিত্যচর্চার সূত্রপাত সাধারণত কবিতার মাধ্যমে ঘটে। সুকান্তের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ব্যতিক্রম তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু। কৈশোরে ও তারুণ্যে প্রেমের কবিতা লেখাই বাঙালি কবির বিধিলিপি। অথচ এ বয়সে সুকান্ত প্রেম নয়, কবিতার বিষয় হিসেবে বেছে নেয়েছেন সমাজদেহের নানা ব্যাধিকে। তিনি শুধু রোগ নির্ণয় করে দায়িত্ব শেষ করেননি, রোগ নিরাময়ের উপায়ও নির্দেশ করেছেন। স্নায়ুছেঁড়া বাস্তবতায় কঠিন সত্যের মুখোমুখি হয়ে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন প্রেম-সৌন্দর্যের স্বপ্নময় ভাবলোকের মাধুর্য নয়, জীবনসংগ্রামের রূঢ় বাস্তবতাকে মূর্ত করে তুলতে হবে নিজের কবিতায়।

    মার্ক্সবাদী সমাজদৃষ্টিতে ধনতন্ত্র একদিন নিজেই নিজের কবর খুঁড়বে। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার মূলে যে অন্যায়, শোষণ ও লোভ তার গর্ভেই রয়েছে পুজিঁবাদের অনিবার্য ধ্বংসের বীজ। এই বিশ্বাস অসাধারণ রূপ পেয়েছে ‘চারাগাছ’ কবিতায়। এ কবিতায় প্রাচীন এক প্রাসাদের গায়ে অশ্বত্থগাছের চারা দেখা যায়।

    সাম্যবাদের স্বপ্নে উদ্দীপিত সুকান্তের কবিতায় এ স্বপ্নের অনুরণন স্পষ্ট। তাঁর বহুল আলোচিত কবিতাগুলোর শিরোনাম স্মরণ করা যাক: ‘বিবৃতি,’ ‘অনুভব: ১৯৪০’, ‘অনুভব: ১৯৪৬’, ‘খবর’, ‘বোধন’, ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’, ‘লেনিন’, ‘মহাত্মাজীর প্রতি’, ‘ঠিকানা,’ ‘পঁচিশে বৈশাখের উদ্দেশ্যে, ‘সূচনা’, ‘ছাড়পত্র’, ‘দিনবদলের পালা,‘আগ্নেয়গিরি’, ‘রানার,’ দুর্বার, ‘যুদ্ধের গান’, ‘হে মহাজীবন,’ ‘দেশলাই কাঠি’, ‘সিঁড়ি’,‘ কলম’, ‘সিগারেট’, ‘একটি মোরগের কাহিনী,’ ‘হে মহাজীবন’, ‘উদ্যোগ’, ‘আঠারো বছর বয়স’, ‘প্রেম:১৯৪৩’ এবং ‘প্রিয়তমাসু’। এ কবিতাগুলো ব্যবচ্ছেদ করলে দেখা যাবে, ক্ষুধা, শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও সাম্যের স্বপ্ন সুকান্তের সাহিত্যচর্চার মূল প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।

    লেনিন, রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধী—সমকালীন এই তিন মনীষী সুকান্তকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির কাজে তিনি জীবন উত্সর্গ করেছিলেন। ঢাকায় বিখ্যাত গল্পকার সোমেন চন্দ নিহত হওয়ার পর ফ্যাসিস্টবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘে যুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর কবিসত্তায় জাগ্রত ছিল বিপ্লবী রাজনৈতিক আদর্শ। অক্লান্ত পরিশ্রম ও ধারাবাহিক অসুস্থতা তাঁর অকালমৃত্যুর ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল। ১৯৪৫ সালে মেজো বউদিকে পাঠানো একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন:
    ‘…আমি কবি বলে নির্জনতাপ্রিয় হব, আমি কি সেই ধরনের কবি? আমি যে জনতার কবি হতে চাই, জনতা বাদ দিলে আমার চলবে কি করে? তা ছাড়া কবির চেয়ে বড় কথা আমি কমিউনিস্ট, কমিউনিস্টদের কাজ–কারবার সব জনতা নিয়েই।’
    ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণে বিপর্যস্ত স্বদেশবাসীর যন্ত্রণা উত্সারিত হয় তাঁর কণ্ঠে—‘এ দেশে জন্মে পদাঘাতই শুধু পেলাম।’ ‘জনতার কবি’ সুকান্ত ‘ছন্দের লালিত্য ঝঙ্কার’ময় ‘স্নিগ্ধ কবিতা’ রচনার তাগিদ অনুভব করেননি। জনগণের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন ‘গদ্যের কড়া হাতুড়ি’কে, ছুটি দিয়েছেন কবিতাকে। ছাড়পত্র কাব্যের ‘হে মহাজীবন’ কবিতাকে সুকান্তের সাহিত্যচর্চার মূল দর্শন হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায়:
    ‘প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা—
    কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,
    ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়;
    পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।’
    মানবতাবাদী সুকান্তের কবিতায় জনগণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা বারবার মূর্ত হয়ে উঠেছে। সাম্যের পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন তিনি। জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছেন অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে। ‘ছাড়পত্র’ কবিতায় তিনি অমানবিকতা ও বৈষম্যের জঞ্জাল সরিয়ে নতুন প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ার অঙ্গীকার করেছেন। এ দৃপ্ত ঘোষণা তাঁর কাব্যসাধনা ও জীবনসাধনার অভিন্ন লক্ষ্য:
    ‘চলে যাব, তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
    প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
    এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি—
    নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’
    মার্ক্সবাদী সমাজদৃষ্টিতে ধনতন্ত্র একদিন নিজেই নিজের কবর খুঁড়বে। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার মূলে যে অন্যায়, শোষণ ও লোভ তার গর্ভেই রয়েছে পুজিঁবাদের অনিবার্য ধ্বংসের বীজ। এই বিশ্বাস অসাধারণ রূপ পেয়েছে ‘চারাগাছ’ কবিতায়। এ কবিতায় প্রাচীন এক প্রাসাদের গায়ে অশ্বত্থগাছের চারা দেখা যায়। সুকান্তের ভাষায়: ‘এ শিশুর মধ্যে আমি দেখি এক বৃদ্ধ মহীরূহ/শিকড়ে শিকড়ে আনে অবাধ্য ফাটল/উদ্ধত প্রাচীন সেই বনিয়াদী প্রাসাদের দেহে।’

    অত্যাচারী ও শোষক জমিদারের বিরুদ্ধে সুকান্ত তীব্র বিদ্রূপের চাবুক মেরেছেন ‘ভাল খাবার’ ছড়ায়। প্রবল প্রতাপশালী জমিদার এমন আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে উদরপূর্তি করেন যে একসময় তার খাদ্যে অরুচি হয়। ডাক্তার–কবিরাজ তার রোগ সারাতে ব্যর্থ। ভয়ার্ত নায়েব তখন জমিদার ধনপতি পালের কাছে জানতে চান সবচেয়ে ভালো খাবার কোনটি।

    এই চারাগাছ একদিন অনেক বড় হয়ে তার শিকড়ের শক্তিতে প্রাসাদ ধসিয়ে দেবে, গর্বোদ্ধত প্রাসাদরূপী পুজিঁবাদী সভ্যতার পতন ঘটবে। সুকান্ত শক্তিমান কবি বলেই রাজনৈতিক বিশ্বাসকে শিল্পরূপ দিতে পেরেছেন।
    শৈল্পিক ও প্রতীকী ব্যঞ্জনায় সুকান্ত নানা কবিতায় অত্যাচারীর বিরুদ্ধে অত্যাচারিতের ক্ষোভকে ভাষা দিয়েছেন। ‘রানার’ কবিতায় রানার বা ডাকহরকরা সমাজের দায়িত্ব কাঁধে বয়ে চলা শোষিত ও শ্রমজীবী মানুষের প্রতীক। দারিদ্র্য ও হতাশায় ক্লিষ্ট রানারের জীবনকে পরম মমতায় তুলে ধরেছেন সুকান্ত:
    ‘…জীবনের বহু বছরকে পিছু ফেলে,
    পৃথিবীর বোঝা ক্ষুধিত রানার পৌঁছে দিয়েছে মেলে।
    ক্লান্তশ্বাস ছুঁয়েছে আকাশ, মাটি ভিজে গেছে ঘামে,
    জীবনের সব রাত্রিকে ওরা কিনেছে অল্প দামে।’
    নৈরাশ্যের রাত্রিকে চূড়ান্ত বলে মেনে নেননি সুকান্ত। ‘বিবৃতি’ কবিতায় আহ্বান জানিয়েছেন—‘রাত্রির গভীর বৃন্ত থেকে ছিঁড়ে আনো ফুটন্ত সকাল।’
    সুকান্তের কবিতায় দুর্ভিক্ষ দুঃস্বপ্নের মতো ফিরে ফিরে এসেছে। ‘ঐতিহাসিক’ কবিতায় তিনি মনে করিয়ে দেন, দুর্ভিক্ষ জাতি-ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় চেনে না। সবাই আক্রান্ত হয় এর করাল গ্রাসে। দুর্ভিক্ষ থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজন জনগণের ঐক্যবদ্ধ লাইন, যে ঐক্য তারা দেখিয়েছে খাদ্য সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে। তিনি ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’ কবিতায় নিজেকে ‘দুর্ভিক্ষের কবি’ বলে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি তাঁর অন্যতম স্মরণীয় কবিতা ‘বোধন’–এ উন্মোচন করেছেন দুর্ভিক্ষ সৃষ্টিকারী মজুতদার-কালোবাজারিদের বর্বর ভূমিকা। তিনি শুধু তাদেরকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করাননি, তাদের নির্মূল করার জন্য প্রতিশোধের সংকল্প ব্যক্ত করেছেন:
    ‘আদিম হিংস্র মানবিকতার যদি আমি কেউ হই
    স্বজনহারানো শ্মশানে তোদের
    চিতা আমি তুলবই।’
    সুকান্ত বিশ্বনাগরিক ছিলেন। তিনি স্বদেশের পরিপ্রেক্ষিতে যেভাবে শ্রমজীবী মানুষের জয়গান গেয়েছেন, আন্তর্জাতিক স্তরেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। সোভিয়েত ইউনিয়নের শক্তিশালী ভূমিকার কারণে সাম্রাজ্যবাদী ও ফ্যাসিবাদী অপশক্তির পতনে তাঁর উচ্ছ্বাস প্রকাশিত হয়েছে ‘রোম: ১৯৪৩’ কবিতায়। জাতীয়তা ও আন্তর্জাতিকতার অনবদ্য সমন্বয় ঘটেছে ‘প্রিয়তমাসু’ কবিতায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পটভূমিতে রচিত এ কবিতায় সুকান্ত নিজেকে উপস্থাপন করেছেন সৈনিকের অবয়বে। সেই সৈনিক দেশপ্রেমী, কিন্তু উগ্র জাতীয়তাবাদী নয়। সেই সৈনিক প্রেমী, একই সঙ্গে দেশ ও পৃথিবীর প্রতি দায়বদ্ধ। যুদ্ধ শেষে তাঁর অভিব্যক্তি:
    ‘পরের জন্যে যুদ্ধ করেছি অনেক,
    এবার যুদ্ধ তোমার আর আমার জন্যে।
    প্রশ্ন করো যদি এত যুদ্ধ ক’রে পেলাম কী? উত্তর তার—
    তিউনিসিয়ায় পেয়েছি জয়
    ইতালীতে জনগণের বন্ধুত্ব,
    ফ্রান্সে পেয়েছি মুক্তির মন্ত্র;
    আর নিষ্কণ্টক বার্মায় পেলাম ঘরে ফেরার তাগাদা।’
    অত্যাচারী ও শোষক জমিদারের বিরুদ্ধে সুকান্ত তীব্র বিদ্রূপের চাবুক মেরেছেন ‘ভাল খাবার’ ছড়ায়। প্রবল প্রতাপশালী জমিদার এমন আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে উদরপূর্তি করেন যে একসময় তার খাদ্যে অরুচি হয়। ডাক্তার–কবিরাজ তার রোগ সারাতে ব্যর্থ। ভয়ার্ত নায়েব তখন জমিদার ধনপতি পালের কাছে জানতে চান সবচেয়ে ভালো খাবার কোনটি। তারপর—
    ‘নায়েবের অনুরোধে ধনপতি চারিদিক
    দেখে নিয়ে বার কয় হাসলেন ফিক-ফিক।
    তারপর বললেন: বলা ভারি শক্ত
    সবচেয়ে ভালো খেতে গরীবের রক্ত।’

    নব্বইয়ের দশকে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের পতনের পর সুকান্তচর্চায় ভাটা পড়তে শুরু করে। সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির উত্থান-পতন দিয়ে সুকান্তের সাহিত্য মূল্যায়ন যথার্থ নয়। প্রকৃত সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপলব্ধি করা সম্ভব, ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী আজও গদ্যময়। শতবর্ষে পা রাখা সুকান্তের উচ্চারণ তাই পুরোনো হয় না।

    বিভিন্ন পত্র–পত্রিকায় সুকান্তের পাঁচটি গল্পের সন্ধান পাওয়া যায়। ১৯৪৩ সাল; অর্থাৎ ১৩৫০ বঙ্গাব্দ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দাবানলে পুড়ছে। অবিভক্ত বাংলা স্মরণকালের সবচেয়ে বড় মন্বন্তরের সম্মুখীন হয় যা ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ নামে ইতিহাসে কলঙ্কিত হয়ে আছে। খাদ্যের অভাব, ম্যালেরিয়া ও কলেরার প্রভাব এবং অপুষ্টি ও চিকিত্সাব্যবস্থার মর্মান্তিক দুরবস্থার ফলে ৩০ লাখ মানুষের শোচনীয় মৃত্যু ঘটে কয়েক বছরের মধ্যে। ক্ষুধা ও বঞ্চনার জীবন্ত দলিল হয়ে উঠেছে সুকান্তের গল্প। গল্পগুলো হচ্ছে ‘ক্ষুধা’, ‘দরদী কিশোর’, ‘দুর্বোধ্য’, ‘কিশোরের স্বপ্ন’ ও ‘ভদ্রলোক’।

    সুকান্ত পঞ্চাশের মন্বন্তরের মর্মান্তিক স্মৃতি নিয়ে সম্পাদনা করেছিলেন আকাল নামে এক অমূল্য কবিতা সংকলন। শুধু দুর্ভিক্ষ নিয়ে যে একটি কবিতা সংকলন হতে পারে, তা একমাত্র সুকান্ত ভট্টাচার্যই চিন্তা করেছিলেন। এই সংকলনে নিজের কবিতার পাশাপাশি অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, অরুণ মিত্র, অমিয় চক্রবর্তী, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, দীনেশ দাসের মতো কবি–সাহিত্যিকদের কবিতা। তাঁদের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। সম্পাদক হিসেবে ‘কথামুখ’–এ তাঁর বক্তব্য সুকান্তের অসাধারণ ইতিহাসচেতনার সাক্ষ্য বহন করে। তিনি লিখেছেন:
    ‘তেরোশো পঞ্চাশ সম্বন্ধে কোনো বাঙালীকে কিছু বলতে যাওয়া অপচেষ্টা ছাড়া আর কি হতে পারে? কেননা তেরোশো পঞ্চাশ কেবল ইতিহাসের একটা সাল নয়, নিজেই একটা স্বতন্ত্র ইতিহাস। সে ইতিহাস একটা দেশ শ্মশান হয়ে যাওয়ার ইতিহাস; ঘর ভাঙা, গ্রাম ছাড়ার ইতিহাস, দোরে দোরে কান্না আর পথে পথে মৃত্যুর ইতিহাস, আমাদের অক্ষমতার ইতিহাস।’
    ‘জনতার কবি’ হতে চেয়েছিলেন সুকান্ত, তিনি তা হয়েও ছিলেন। রাজনীতি তাঁর কবিতাকে যেমন জনপ্রিয় করেছে, তেমনি রাজনীতির মোড়কে তাঁকে সীমাবদ্ধ রাখার প্রবণতা তাঁর কবিপ্রতিভার প্রতি অবিচার করেছে। তাঁর জন্ম, বিকাশ ও পরিণতির কালে—এমনকি পরবর্তী কয়েকটি দশকেও বিশ্বজুড়ে সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির শক্তিশালী প্রভাব ছিল। সুকান্ত মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তখন রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণই মুখ্য ছিল, সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ নয়। নব্বইয়ের দশকে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের পতনের পর সুকান্তচর্চায় ভাটা পড়তে শুরু করে। সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির উত্থান-পতন দিয়ে সুকান্তের সাহিত্য মূল্যায়ন যথার্থ নয়। প্রকৃত সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপলব্ধি করা সম্ভব, ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী আজও গদ্যময়। শতবর্ষে পা রাখা সুকান্তের উচ্চারণ তাই পুরোনো হয় না। যত দিন পৃথিবীতে অসাম্য, শোষণ ও ক্ষুধা থাকবে, তত দিন সুকান্তের সাহিত্য বঞ্চিত ও ক্ষুধার্ত মানুষের বলিষ্ঠ প্রতিনিধি হিসেবে বেঁচে থাকবে।

  • আল মাহমুদ; লোকজ জীবনের মহাকাব্যিক কথক

    আল মাহমুদ; লোকজ জীবনের মহাকাব্যিক কথক

    তিতাস থেকে বুড়িগঙ্গাছেলেটি চঞ্চল। মন ডানপিটে। গ্রামের পথে হাঁটে। পাখির ডাক শোনে। কাদার গন্ধ শোঁকে। এই ছেলেটির হৃদয়ে গেঁথে গেল গ্রামীণ রূপকথা। রক্তে মিশে গেল লোকজ মিথ। বাবা গান ভালোবাসেন। আবার দাদুর মুখে শুনতেন জারিগান। এভাবেই গড়ে ওঠে এক কিশোরের মনোজগৎ।তারপর এলো ঝড়ের দিন। দেশ ভাগ হয়। শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। চারদিকে স্লোগান। কিশোর মাহমুদ মিছিলে নামে। পুলিশ তাকে খোঁজে। সে বাড়ি ছাড়ে।

    শুরু হয় এক যাযাবর জীবন। কিন্তু পকেটে কবিতা আর বুকে শব্দ। এই মানুষটিই বাংলাদেশের অনন্য কবি– আল মাহমুদ।
    সময় যেতে থাকে। কবির ভাবনা ডানা মেলে। এভাবে একদিন তিনি পা রাখেন ঢাকা দক্ষিণের প্রবেশদ্বার সদরঘাটে। গা ছুঁয়ে যায় বুড়িগঙ্গার বাতাস। হাতে ভাঙা সুটকেস। পকেটে পয়সা নেই। কিন্তু চোখ ভরা স্বপ্ন।

    সদরঘাটে যখন তাঁর প্রথম পায়ের দাগ পড়ে, সেই সময়টা ছিল গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক। ১৯৫৪ সাল। ঢাকা তখন এক অচেনা নগরী। শহরটা তাঁকে ভয় দেখায়। তিনি ভয় পান না। বরং ঘুরে বেড়ান শহরের গলিপথ ধরে।

    সাংবাদিকতা
    অবশেষে আশ্রয় হয় পত্রিকার অফিসে। খাবারের অভাব। কিন্তু কবিতা লিখে যান নিরবধি। তখনকার ঢাকা ছিল সাহিত্যের আড্ডাখানা। বিউটি বোর্ডিংয়ের প্রাণ। তরুণ মাহমুদ সেখানে যান। চোখে চশমা। মুখে কবিতা। গ্রামীণ শব্দ দিয়ে কবিতা গাঁথেন। কবিরা চমকে ওঠেন। সম্পাদকেরা মুগ্ধ হন।

    এক কবির বুকে শব্দের আগুন। হাতে এক সব্যসাচী কলম। সাপ্তাহিক ‘কাফেলা’ পত্রিকায় লেখার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর সাংবাদিক জীবন। একই সময় ‘দৈনিক মিল্লাত’ পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে কাজ করেন। পরে ‘কাফেলা’ পত্রিকার সম্পাদক হন। তারপর ইত্তেফাক পত্রিকার প্রুফ রিডার। কিছুদিন পর ইত্তেফাকের সহসম্পাদক। মাঝে কিছুদিন চট্টগ্রাম ‘বইঘর’ প্রকাশনীর সঙ্গে যুক্ত হন। ষাটের দশকজুড়ে তাঁর সংবাদপত্রে বিচরণ। ১৯৬৯ সালে আবার তিনি ‘ইত্তেফাক’-এর সহকারী সম্পাদক হন। জীবনের শেষ প্রান্তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’-এর সহকারী সম্পাদক হন। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক কর্ণফুলী’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। এভাবে প্রুফ রিডার থেকে শুরু করে প্রধান সম্পাদকের চেয়ার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তাঁর এক আপসহীন, নান্দনিক সাংবাদিক জীবন।

    শিল্প-সাহিত্য

    ধীরে ধীরে কবি বিশাল সাহিত্য সম্ভারে আলোকিত হন। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, শিশুসাহিত্য, আত্মজীবনী, সাক্ষাৎকার, সাংবাদিকতাসহ নানা অনুষঙ্গে জীবনকে সমৃদ্ধ করেন। লোক লোকান্তর, কালের কলস, সোনালী কাবিনসহ ১২টিরও বেশি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। পানকৌড়ির রক্ত, সপ্তর্ষি, প্রিয় পঞ্চমীসহ তাঁর রয়েছে প্রায় ছয়টি গল্পগ্রন্থ। উপমহাদেশ, কাবিলের বোন, কবি ও কোলাহলসহ লিখেছেন প্রায় ১২টি উপন্যাস। এখানেই শেষ নয়, যেভাবে বেড়ে উঠি, বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ এবং যে পারো ভুলিয়ে দাওসহ লিখেছেন চারটি আত্মজীবনী। এ ছাড়া পাখির কাছে ফুলের কাছে, ময়নামতির নেকলেস, বাতাসের নূপুরসহ ১০টিরও বেশি শিশু-কিশোর গ্রন্থ রয়েছে তাঁর।

    সাক্ষাৎকার
    বাংলা সাহিত্যে সাক্ষাৎকার প্রদানে কবি আল মাহমুদ সম্ভবত রেকর্ড করেছেন। তিনি প্রায় চার দশকে অসংখ্য সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সরদার আবদুর রহমান তাঁর ৬০টি সাক্ষাৎকার নিয়ে একটি বই করেছেন। বাংলা সাহিত্যে আর কোনো কবি, সাহিত্যিক এত সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বলে জানা নেই। বিভিন্ন পত্রিকায় কলাম, প্রবন্ধ ও ভ্রমণ কাহিনি লিখেছেন।

    কাব্যগ্রন্থ

    ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তর’। বাংলা সাহিত্যে এ যেন এক নতুন সুর। বাংলা কবিতার বাঁকবদল। ‘লোক লোকান্তর’ নাগরিক কবিতা নয়। মাটির গান। নদী ও নারীর উপাখ্যান। কবির জীবনের বহিঃপ্রকাশ।

    ‘আমার চেতনা যেন এক শাদা সত্যিকার পাখি,
    বসে আছে সবুজ অরণ্যে এক চন্দনের ডালে;…,
    লোক থেকে লোকান্তরে আমি যেন স্তব্ধ হয়ে শুনি
    আহত কবির গান। কবিতার আসন্ন বিজয়।’

    কবি আল মাহমুদের কবিতায় প্রকৃতি ও মানুষের মন এক হয়ে যায়। কবির ভাবনায় চেতনা বিমূর্ত নয়। এটা এক রহস্যময় পাখি। চন্দনের ডাল, সবুজ অরণ্য, লতা আর পরাগের গন্ধ, এসব কবির আত্মার প্রতিধ্বনি। প্রকৃতির এই মায়া কবিকে মুক্তির স্বাদ দেয়। সংসার, সমাজ, ধর্ম, লোকালয়, মানুষকে আড়ষ্ট রাখে। চেতনার পাখি ডানা মেললেই উন্মুক্ত প্রকৃতি। এটা রহস্যময় এক অন্তর্জগৎ। যেখানে কেবলই সুন্দরের বাস। শত প্রতিকূলতার মাঝেও শিল্পের জয় হয়। এই কবিতা তারই ঘোষণা।

    এখানে আহত কবি মানে সেই স্রষ্টা, যিনি যন্ত্রণা বহন করেন। কিন্তু তাঁর কণ্ঠেই জন্ম নেয় সৌন্দর্য। অরণ্যের নীরবতায় দাঁড়িয়ে কবি শোনেন সুন্দরের আহ্বান। তাই এই কবিতা প্রকৃতির ছবি। এটি আত্মার জাগরণ। সৌন্দর্যের বিস্ময়। কবিতার এক অপূর্ব নান্দনিক উপাখ্যান।

    কালের কলস প্রকৃতির এই নিবিড় পাঠ ও অন্তর্জগতের মায়াবী সীমানা পেরিয়ে কবি দৃষ্টি ফেরান মহাকালের দিকে। ‘লোক লোকান্তর’ গ্রন্থের আত্মার জাগরণ আর কবিতার নান্দনিকতা সঙ্গী করে ১৯৬৬ সালে রচনা করেন এক অপূর্ব কাব্যগ্রন্থ ‘কালের কলস’।

    অনিচ্ছায় কতকাল মেলে রাখি দৃশ্যপায়ী তৃষ্ণার লোচন
    ক্লান্ত হয়ে আসে সব, নিসর্গও ঝরে যায় বহুদূর অতল আঁধারে
    আর কী থাকলো তবে হে নীলিমা, হে অবগুণ্ঠন
    আমার কাফন আমি চাদরের মত পরে কতদিন আন্দোলিত হবো
    কতকাল কত যুগ ধরে
    দেখবো, দেখার ভারে বৃষের স্কন্ধের মতো নুয়ে আসে রাত্রির আকাশ?

    এক কাব্যগ্রন্থের মধ্য দিয়ে কবি বাংলা কবিতার লোকজ শব্দ, গ্রামীণ মাঠ, ঘাট, পরিবেশ, প্রকৃতি ও নাগরিক জীবনের এক অনন্য সমন্বয় করেছেন। ‘কালের কলস’ সময় ও জীবনের গভীরে নামার এক কাব্যিক অভিযাত্রা। চারপাশের চেনা পৃথিবী, নিসর্গ যেন এক অতল অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে। জীবনের সব কোলাহল ক্ষীণ হয়ে আসছে। এই গ্রন্থের প্রতিটি কবিতা যেন সময়ের চিরন্তন সংগ্রাম, স্বপ্ন, আত্মপরিচয়ের নিরন্তর অনুসন্ধান। কবি তাঁর ভাবনা উচ্চারণ করেন, শিল্পে রূপ দেন। তারপর শব্দের ভেতর জ্বেলে দেন অনুভূতির দীপশিখা। এখানেই এই কাব্যগ্রন্থের শিল্পসৌন্দর্য, গভীরতা এবং দীর্ঘস্থায়ী আবেদন।
    সোনালী কাবিন, কালের কলস গ্রন্থের পর এবার কবির অভিযাত্রা যেন বৃহত্তর কোনো পূর্ণতার দিকে। এই অন্বেষণই তাঁকে বাংলার শিকড় ও মাটির কাছে নিয়ে যায়। এর চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে তাঁর ‘সোনালী কাবিন’ কাব্যগ্রন্থে।

    তখন ১৯৭৩ সাল। প্রকাশ হলো তাঁর মহাকাব্যিক সৃষ্টি ‘সোনালী কাবিন’। এটি বাংলা সাহিত্যের এক চিরন্তন সম্পদ। তিনি লোকজ ভাষাকে করেন সর্বজনীন। কামনার আগুনকে শিল্পের রূপ দেন। তিনি লেখেন–

    আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন,
    পরম স্বস্তির মন্ত্রে গেয়ে ওঠো শ্রেণির উচ্ছেদ,…
    তারপর তুলতে চাও কামের প্রসঙ্গ যদি নারী
    ক্ষেতের আড়ালে এসে নগ্ন করো যৌবন জরদ,…।

    আল মাহমুদের ‘সোনালী কাবিন’ বাংলা সাহিত্যের এক চিরন্তনী কাব্য। এখানে ইতিহাস ও মাটির গন্ধ আছে। তিনি গ্রামীণ প্রেমকে এক ঐশ্বরিক রূপ দিয়েছেন। এখানে কবি নগরের কৃত্রিমতা ভেঙে শিকড়ের টানে ফিরেছেন। অপূর্ব শব্দমালায় গেঁথেছেন কাম ও প্রেম। এই কবিতা এক শাশ্বত মিলনের ঘোষণা। এই মিলন শহুরে ঐশ্বর্য বা যৌতুকের বিনিময় নয়। কবির কাবিন হলো প্রকৃতির দান।

    তিনি নদী, পলিমাটি আর শস্যের বিনিময়ে নারীকে আপন করতে চান। কবির কাছে প্রেম কোনো বিলাসিতা নয়। বেঁচে থাকার সংগ্রাম। গ্রামীণ বধূর আঁচলে লুকিয়ে থাকে বাংলার হাজার বছরের সংস্কৃতি। সামন্তবাদী শোষণের বিরুদ্ধে কবি দ্রোহী। ‘সোনালী কাবিন’ প্রেমের কবিতা নয়, এটি মাটির বুকে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিচ্ছবি।

    গল্প
    কবি আল মাহমুদ বাংলা কবিতার প্রাণ। আবার সেই তিনিই এক মায়াবী কথাসাহিত্যিক। তখন ১৯৭৫ সাল। চারদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই লেখেন ছোটগল্পের বই ‘পানকৌড়ির রক্ত’। এ বইয়ের প্রথম গল্পটির নামও ‘পানকৌড়ির রক্ত’।

    বাংলা সাহিত্যে আক্তারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’, শাহেদ আলীর ‘জিব্রাইলের ডানা’, আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘বৃষ্টি’সহ কিছু কালজয়ী গল্প আছে। তেমনি কবি আল মাহমুদের ‘পানকৌড়ির রক্ত’ও এক কালজয়ী গল্প। এটি বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ।

    কবি সদ্য বিবাহিত। তাঁর মনে এক অন্য ঝড়। কুমারী নারীর প্রতি আদিম তৃষ্ণা। অথচ নিয়তির পরিহাস! স্ত্রী আদিনার শরীরে তখন ঋতুচক্রের রক্তধারা। মিলনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা বিফল।

    এই কামনার আগুনে পুড়ছেন কবি। তিনি গ্রামের বিলের দিকে তাকান। সেখানে এক পানকৌড়ি। ডুব দেয় গভীর অতলে। ঠিক যেমন কবি ডুব দিতে চান তাঁর আদিনার সিন্ধ শরীরের ভাঁজে। পানকৌড়ির ভেজা পালক যেন আদিনার দীর্ঘ কেশ। পাখিটার গ্রীবা, বুকের ওঠানামা ভেতরকে জাগিয়ে দেয়। তাঁর চোখে প্রকৃতি ও নারী একাকার। পানকৌড়ি হয়ে ওঠে কামার্ত এক মানবী। হঠাৎ বন্দুকের গুলি। ছিন্নভিন্ন হয় পানকৌড়ির চঞ্চলতা। লাল রক্ত ছিটকে পড়ে স্বচ্ছ জলে।

    কবির চোখে সেই রক্ত আর সাধারণ কোনো তরল নয়। এ যেন আদিনার গোপন অবয়ব থেকে পড়া অবাধ্য ধারা। পানকৌড়ির সেই রক্ত আর আদিনার নিভৃত রক্তস্রোত মিশে যায় এক মোহনায়। পানকৌড়ির চঞ্চু আর আদিনার ঠোঁট এক হয়ে যায়। এর পিঠের কালো মখমল যেন আদিনারই অন্ধকার উপত্যকা। রক্তমাখা সেই ডানা যেন আদিনারই কুমারিত্বের বিসর্জন। রক্তাক্ত ডানার স্পন্দন যেন আদিনারই সত্তার প্রতিধ্বনি।

    এই গল্পটিতে গ্রামীণ যৌন আবেগ, সেই আবেগের দ্রোহ, আর অবদমন মিলে তৈরি হয়েছে এক অনন্য আখ্যান। বাংলা সাহিত্য স্তব্ধ হয়ে দেখে এক খাঁটি, কাঁচা ও নান্দনিক আবেগের দ্রোহ।

    উপন্যাস
    কবি ভোরের কুয়াশা, মাটির গন্ধ, প্রেম, আবেগ ও আবেগের দ্রোহ থেকে ফিরে আসেন জীবনের বাস্তবতায়। তিনি একাত্তরের যুদ্ধদিনের এক দুঃসহ পরিস্থিতি নিয়ে লেখেন উপমহাদেশ উপন্যাস। যেখানে আছে ঘাত-প্রতিঘাত, যুদ্ধ, মৃত্যু ও জীবনের অনিশ্চয়তা।

    এই উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে হামিদ মীর নামে এক কবি। দেশপ্রেম ও মৃত্যুর ভয়ে ঝুলছে তার অস্তিত্ব। তার সঙ্গে যুক্ত হয় দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধা আনিস। আছে নন্দিনী। যুদ্ধের বিভীষিকা, বোন সীমার মৃত্যু ও চরম নিরাপত্তাহীনতা নন্দিনীকে পুরোপুরি কবি হামিদ মীরের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। উত্তাল যুদ্ধদিনের দীর্ঘ যাত্রায় তাদের মানসিক নৈকট্য এক গভীর ভালোবাসায় রূপ নেয়। আল মাহমুদ এই সম্পর্কের মিলনান্তক রূপ দেননি। বরং যুদ্ধকালীন সংকটে মানুষের হৃদয়ের দোটানা, নৈতিক বোধ ও সম্পর্কের বহুমাত্রিক রূপকে উন্মোচন করেছেন।

    উপন্যাসটিতে রয়েছে রাজেনৈতিক জটিলতা। রণাঙ্গনের মাঠেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিভিন্ন পন্থিদের আদর্শিক ফাটল। দেশ স্বাধীনের চেয়েও তাদের কাছে বড় হয়ে ওঠে রাজনীতির সমীকরণ। দেশ যখন হানাদারের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত, কেউ কেউ তখন ব্যস্ত তাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে।

    আল মাহমুদ এই উপন্যাসে স্বপ্ন ও ভাঙনের গল্প বুনেছেন। যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেও জেগে থাকে প্রেম। এটি শেষ পর্যন্ত মানুষের বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা ও ভালোবাসার গান। এটি এক মানবাত্মার উপাখ্যান।

    উপমহাদেশ উপন্যাসের মতো কাবিলের বোনও যুদ্ধদিনের উপন্যাস। তবে এটি যুদ্ধদিনের এক মনস্তাত্বিক প্রেমের উপন্যাস। ঢাকা তখন আগ্নেয়গিরি। চারদিকে উত্তেজনা, ভয়, আতঙ্ক। এই উত্তাল সময়ের এক অনন্য দলিল ‘কাবিলের বোন’ উপন্যাস। এটি শুধু যুদ্ধের কাহিনি নয়। এটি এক চরম মনস্তাত্ত্বিক উপাখ্যান। আল মাহমুদ এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন অবরুদ্ধ শহরের ভেতরের জীবন যন্ত্রণা।

    উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে কাবিল। সে এক মানবিক ও পরোপকারী বাঙালি যুবক। তার পাশে ছায়ার মতো জড়িয়ে আছে পিতৃহীন মামাতো বোন মোমেনা। অন্যদিকে রয়েছে উচ্চবিত্ত ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন তরুণী রোকসানা। রোকসানার ফুফাতো ভাই আন্দালিব এক অবাঙালি যুবক। এই চার চরিত্র ঘিরে আবর্তিত হয় কাহিনির বিন্যাস।

    যুদ্ধ তাদের মুখোমুখি দাঁড় করায়। কাবিল ও আন্দালিবের ভেতরে চলে আদর্শের লড়াই। একজন বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতীক, অন্যজন পাকিস্তানি ভাবধারার। রোকসানা এই দুইয়ের টানাপোড়েনের সেতু। তাদের সম্পর্কগুলো রক্তের নয়। কিন্তু একাত্তরের তীব্র অনিশ্চয়তা তাদের এক সুতোয় বেঁধেছে।

    শহরের বুকে তখন পাকিস্তানি জান্তার বুটের আওয়াজ। প্রতিদিন মানুষ মরছে। সম্পর্কগুলো প্রতিনিয়ত রূপ বদলাচ্ছে। এই ভয়াবহতার মাঝেও আল মাহমুদ বুনেছেন এক গভীর মায়াজাল। উপন্যাসের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে গভীর দহন। তিনি ইতিহাসের এক অমোঘ সত্য তুলে ধরেন। তিনি মনে করেন যে যুদ্ধ শুধু মানুষ মারে না, মানুষের ভূগোলও বদলে দেয়। এই ভূগোল যেমন মানচিত্রের, তেমনি তা হৃদয়েরও। একাত্তরের সেই অবরুদ্ধ মনস্তত্ত্ব বাংলা সাহিত্যে তিনি নিখুঁতভাবে এঁকেছেন।

    আল মাহমুদ ছোট-বড় সব পাঠকের কথা ভেবেছেন। শব্দকে তিনি এমন এক সহজ জাদুতে রূপ দিতেন, যা সবার মন ছুঁয়ে যায়। বয়সের সীমানা পেরিয়ে তিনি অনন্য। তাঁর লেখার আবেদন সর্বজনীন। তিনি বাংলা সাহিত্যের এমন সাহিত্যিক, যাঁর লেখা ছোট-বড় সবাইকে আলো দেয়। পাখির কাছে ফুলের কাছে, ময়নামতির নেকলেস, বাতাসের নূপুরসহ ১০টিরও বেশি শিশুসাহিত্য রয়েছে তাঁর। ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ তাঁর এক অমর সৃষ্টি। শিশুরা তাঁর ছড়ায় খুঁজে পায় নদী, ফুল-পাখি, প্রজাপতি। তিনি চাঁদের আলো দিয়ে শব্দ বোনেন। শিশু-কিশোরদের জন্য ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ কবিতায় লিখেছেন–

    নারকেলের ঐ লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল
    ডাবের মত চাঁদ উঠেছে ঠাণ্ডা ও গোলগাল।
    ছিটকিনিটা আস্তে খুলে পেরিয়ে গেলাম ঘর
    ঝিমধরা এই মস্ত শহর কাঁপছিলো থরথর…।

    কী আর করি পকেট থেকে খুলে ছড়ার বই
    পাখির কাছে, ফুলের কাছে মনের কথা কই।

    রাতের নিঝুম আকাশ। চাঁদ উঠেছে নারকেল গাছের ডগায়। কবি একা। চেনা শহর যেন এক মায়াবী রূপকথার জগৎ। শহরটি কাঁপছিল থরথর। মিনারের ছায়া যেন এক প্রহরী। দরগাতলায় মোড় নিতেই হাতছানি দেয় পাহাড়। ডাকে– ‘আয়, আয়!’ পাহাড় ছুঁয়ে কবি জোনাকিদের আলো ঝলমলে রাজদরবারে যায়। আবার দিঘির জল তাঁকে বলে এসো আজ কাব্য করি। কবি পকেট থেকে ছড়ার বই নিয়ে প্রকৃতির মায়াজালে ফুল, পাখির কাছে মনের কথা বলেন।

    বিতর্ক ও নির্জনতা জীবন তো সোজা চলে না। আল মাহমুদের জীবনও বাঁক নিল। শেষ বয়সে তিনি বদলে গেলেন। তাঁর ভাবনায় এলো আধ্যাত্মিকতা। সমাজ তাঁকে নিয়ে দুই ভাগে ভাগ হলো। বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়ল না। কিন্তু তিনি ছিলেন অবিচল। তিনি শুধু লিখে গেছেন। তাঁর চোখ দুটি অন্ধ হয়ে আসছিল। কিন্তু ভেতরের চোখ ছিল খোলা। তিনি মুখে বলতেন। ভক্তরা তা লিখে রাখত। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করলেন– ‘কোনো এক ভোরে দেখবে তোমরা আমি আর নেই।’

    জন্ম

    সে অনেক দিন আগের কথা। দিনটি ছিল ১১ জুলাই। ১৯৩৬ সাল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোড়াইল গ্রাম। চারদিকে তখন বর্ষার জল। নদীর নাম তিতাস। সেই নদীর কোল ঘেঁষেই জন্ম নিল এক শিশু। নাম তার মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। ডাকনাম শুধুই মাহমুদ।

    মৃত্যু
    ‘স্মৃতির মেঘলা ভোর’ শিরোনামে কবির এক অনন্য কবিতা আছে। যেখানে তিনি শুক্রবার ভোরে মৃত্যুর প্রার্থনা করেছেন। চিরবিদায়ের আকাঙ্ক্ষায় শব্দ বুনেছেন এক গভীর আত্মসমর্পণের সৌন্দর্যে।

    কোনো এক ভোরবেলা, রাত্রি শেষে শুভ শুক্রবারে
    মৃত্যুর ফেরেশতা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ
    অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে
    ভালোমন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো এ আমার ঈদ।

    তখন ২০১৯ সাল। ১৫ ফেব্রুয়ারি। শীতের অবসান। চারদিকে বসন্ত। ঢাকার এক হাসপাতালে চোখ বুজলেন কবি আল মাহমুদ। বয়স তখন ৮২ বছর। দুলে উঠল মায়াবী পর্দা। কবি চলে গেলেন ওপারে। কিন্তু প্রকৃতির কী এক অমোঘ খেলা! কবি শুক্রবারে মৃত্যু কামনা করেছিলেন। আর যেদিন তাঁর মৃত্যু হলো সেই দিনটি ছিল শুক্রবার। এটা হয়তো কোনো অলৌকিক কিছু নয়। কিন্তু এর নান্দনিকতা অস্বীকারের উপায় নেই। মহৎ কবিদের জীবনদর্শন এমনই হয়।

    কবি আল মাহমুদ আজ নেই। আছে তাঁর তিতাসের জল। সোনালী কাবিনের শ্লোক। বাংলা ভাষা যতদিন থাকবে, আল মাহমুদ থাকবেন ততদিন। তিনি মাটি মানুষ ও প্রকৃতির কবি। মায়াবী কথক।

  • বহু ভাষাবিদ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্

    বহু ভাষাবিদ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্

    যে দেশে গুণের সমাদর নেই, সে দেশে গুণী জন্মাতে পারে না।’ এ কথাটি বাংলাদেশের বিখ্যাত মনীষী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর। তিনি শুধু বাংলাদেশেরই নন, সমগ্র ভারতবর্ষের বিখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ছিলেন বহুভাষাবিদ ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি ভাষাবিজ্ঞানী ও গবেষক। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জন্ম ১৮৮৫ সালের ১০ জুলাই। জন্মস্থান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনার পেয়ারা গ্রামে।

    ছোটবেলা থেকেই শহীদুল্লাহ্ ছিলেন বিচক্ষণ ও মেধাবী। ছেলেবেলায় তিনি বাড়িতেই আরবি ও ফার্সি ভাষা শিখে ফেলেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য প্রথম ভর্তি হন হাওড়া ইংরেজি স্কুলে। ১৮৯৯ সালে বার্ষিক পরীক্ষায় তিনি রৌপ্যপদক অর্জন করেন।

    ১৯০৪ সালে তিনি সাফল্যের সঙ্গে এনট্রান্স পাস করেন। এরপর তিনি কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। ১৯০৬ সালে সাফল্যের সঙ্গে এফএ পাস করেন। এরপর তিনি বাংলাদেশের যশোর জিলা স্কুলে ১৯০৮-০৯ সালে শিক্ষকতা করেন। অতঃপর ১৯০৯-১০ সেশনে কলকাতা সিটি কলেজ থেকে সংস্কৃতে অনার্সসহ বিএ পাস করেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ১৯১২ সালে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে এমএ পাস করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

    ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ১৯১৫ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত বসিরহাটে আইন ব্যবসা করেন। আইন পেশায়ও তিনি বেশ সুনাম অর্জন করেন। এদিকে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলে তিনি বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯২৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

    ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ১৯২৮ সালে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভের জন্য ফ্রান্সের প্যারিসে গমন করেন। তিনি প্রাচীন বৈদিক, পার্সি ও তিব্বতি ভাষায় গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ডক্টরেট ডিগ্রি লাভের পর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। ১৯৩৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান হন। তিনি ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করছেন।

    ১৯৫৫ সালেই ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬১ থেকে ১৯৬৪ সালে ইসলামী বিশ্বকোষ প্রকল্পের অস্থায়ী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বাংলা ভাষার গবেষণামূলক বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। এগুলো হলো—‘বাঙ্গালা ব্যাকরণ’, ‘ভাষা ও সাহিত্য’, ‘বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত’ ও ‘আঞ্চলিক ভাষার অভিধান’। এছাড়া তার লেখা বইগুলো হলো—‘রকমারি’, ‘পদ্মাবতী’ ও ‘প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে শেষ নবী’। তিনি অনুবাদ করেছেন ‘রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম’ ও ‘দীওয়ানে হাফিজ’। তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন প্রাইড অব পারফরম্যান্স পদক।ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বাংলা, ইংরেজি, ফার্সি, আরবি, তিব্বতি, ওড়িয়া, অসমীয়া ও উর্দু ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারতেন। এই বিখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই ঢাকায় মারা যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পাউন্ডে মুসা খান মসজিদের পশ্চিম পাশে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র কবর রয়েছে।

  • পারস্য প্রতিভা : মহাকবি হাফিজ সিরাজী

    পারস্য প্রতিভা : মহাকবি হাফিজ সিরাজী

    সাহিত্য:

    প্রিয়ার গালের একটি তিলের জন্য সমরখন্দ বিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন যিনি, তিনি খাজা শামসউদ্দিন মোহাম্মদ হাফিজ-ই-সিরাজি। পারস্য তথা ইরানের সুফি কবি। চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথমভাগে সিরাজ নগরীর মোসল্লা নামক স্থানে তাঁর জন্ম। ইরানের নিশাপুর ছাড়া আর কোন নগরই সিরাজের মত বিশ^জোড়া খ্যাতি লাভ করেনি। ইরানের প্রায় সব শ্রেষ্ঠ কবিরই তীর্থভূমি এই সিরাজ নগরী। ইরানিরা হাফিজকে আদর করে ‘বুলবুল ই সিরাজ’ বলতেন। হাফিজকে তারা শুধু কবি বলেই ভালোবাসেনা, তারা হাফিজকে লিসান-উল-গায়েব’ (অজ্ঞাতের বাণী) ‘তর্জমান উল আসরাব’ (রহস্যের মর্মসন্ধানী) বলে আরো বেশি শ্রদ্ধা করেন। ইরানে হাফিজের সমাধি জ্ঞানী-গুণীদের শ্রদ্ধার স্থান। হাফিজের মৃত্যুর শতবর্ষ পরেও তাঁর কোন জীবনী রচিত হয়নি। কবির জীবনের অধিকাংশ ঘটনা আঁধারে রয়ে গেছে। তাঁর জন্ম মৃত্যুর দিন নিয়ে ইরানেও তাই নানাজনের নানা মত। হাফিজের সম্ভাব্য মৃত্যুর সাল ৭৯১ হিজরি বা ১৩৮৯ খ্রিস্টাব্দ।
    হাফিজের পিতা বাহাউদ্দিন ইস্পাহান নগরী থেকে ব্যবসা উপলক্ষে সিরাজে এসে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু মৃত্যুকালে কিছু রেখে যেতে না পারায় শিশু হাফিজ ও তাঁর মা ঐশ^র্যের কোল থেকে একেবারে দারিদ্র্যের করাল গ্রাসে নিপতিত হন। বাধ্য হয়ে হাফিজকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্থোপার্জন করতে হয়। হাফিজ যে কবিখ্যাতি লাভ করার আগে বিশেষরূপে জ্ঞানার্জন করেছিলেন, তা তাঁর কবিতা পড়েই বোঝা যায়। হাফিজের আসল নাম শামসউদ্দিন মোহাম্মদ। ‘হাফিজ’ তার ‘তখল্লুস’ অর্থাৎ কবিতার ভনিতায় ব্যবহৃত উপনাম। পাঠ্যাবস্থায়ই তিনি স্বভাব দক্ষতায় কবিতা রচনা শুরু করে

    হাফিজ তাঁর জীবদ্দশায় কবিতাসমূহ সংগ্রহ করে যাননি। তাঁর বন্ধু গুল আন্দামই সর্বপ্রথম তাঁর মৃত্যুর পর ‘দিওয়ান’ আকারে হাফিজের সমস্ত কবিতা সংগ্রহ ও সংগ্রন্থিত করেন। হাফিজের পাঁচ শতাধিক কবিতা পাওয়া যায়। তাছাড়া অনেক কবিতা হারিয়ে গেছে।
    হাফিজ ছিলেন উদাসীন সুফি। তাই কবিতা লেখার পরই বন্ধু-বান্ধব কেউ সংগ্রহ না করলে তা হারিয়ে যেত। কিন্তু তাঁর কবিতার অধিকাংশই গজল গান। লেখা হওয়া মাত্র মুখে মুখে গীত হত। ধর্মস্থান থেকে পানশালা পর্যন্ত সর্বত্র তাঁর গান জনপ্রিয়তা লাভ করে। হাফিজের প্রায় সব কবিতা ‘শাখ-ই নবাৎ’ নামক কোনও ইরানি সুন্দরীর স্তবগানে মুখরিত। অনেকে বলেন, এটি হাফিজের দেয়া আদরের নাম।

    তাঁর আসল নাম হাফিজ গোপন করে গেছেন। কোন ভাগ্যবতী এই কবির প্রিয়া ছিলেন, কোথায় ছিল তারঁ ঘর, এ নিয়ে অনেকে অনেক জল্পনা কল্পনা করেছেন। রহস্য সন্ধানীদের কাছে এই হরিণআঁখি সুন্দরী আজও রহস্যের আড়ালে রয়ে গেছেন। হাফিজ যৌবনে হয়ত শরাব-সাকির উপাসক ছিলেন তার পরে তিনি সুফি সাধকরূপে দেশ ও দশের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করেন।
    মহাকবি গ্যেটে বলেন- ‘হে হাফিজ তোমার বাণী চিরন্তনের মত মহান। কেননা, তার আদি ও অন্ত নেই। তোমার ভাষা আসমানের গম্বুজের মত একাকী নিজের উপরই স্থিত। তোমার গজলের অর্ধেকটায় বা প্রথম কলিতে কিংবা অন্য কোনও অংশের মধ্যে মোটেও পার্থক্য করা যায় না। কেননা এর সবটাই সৌন্দর্য ও পূর্ণতার নিদর্শন। একদিন যদি পৃথিবীর আয়ু ফুরিয়ে যায়, হে আসমানী হাফিজ আমার প্রত্যাশা যে, একমাত্র তোমার সাথে তোমার পাশে থাকব। তোমার সঙ্গে সরাব পান করব। তোমার মতই প্রেমে আত্মহারা হব। কেননা, এটাই আমার জীবনের গৌরব ও বেঁচে থাকার পাথেয়।কবি হাফিজ সিরাজির কাব্য প্রতিভা ও দর্শন সারা পৃথিবীর কাব্যমোদি ও চিন্তাশীল মনকে যুগে যুগে নাড়া দিয়ে আসছে। পাশ্চাত্য দুনিয়ার মহান কবি ও চিন্তাবিদ গ্যেটে (১৭৩৯-১৮৩২) বলেন, ‘হঠাৎ প্রাচ্যের আসমানী খুশবু এবং ইরানের পথ-প্রান্তর হতে প্রবাহিত চিরন্তন প্রাণ সঞ্জীবনী সমীরণের সাথে পরিচিত হলাম। আমি এমন এক অলৌকিক ব্যক্তিকে চিনতে পারলাম, যার বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব আমাকে আপাদমস্তক তাঁর জন্য পাগল করেছে।’ মহাকবি গ্যেটে হাফিজের প্রতি এতই অনুরক্ত হয়ে পড়েন যে, ‘একটি সময়ের জন্য সবকিছুকে এবং সবাইকে ভুলে যান এবং নিজেকে ফার্সি ভাষার এই কবির ক্ষুদ্র ভক্ত বলে অনুভব করেন। ‘এমনকী তিনি হাফিজের প্রেমানুভূতি ও আধ্যাত্মিক চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর বিশ^বিখ্যাত নাট্যকাব্য ফাউস্ট (ঋঅটঝঞ) রচনা করেন। যেটাকে পাশ্চাত্যে দিওয়ান বলা হয়।বাংলা ভাষাভাষী কবি সাহিত্যকদেরও তিনি দারুণভাবে নাড়া দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো নিজে ১৯৩২ সালে ইরানের সিরাজ নগরে কবির মাজারে উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে এসেছেন। এমনকি কবির পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কবির অসম্ভব ভক্ত ছিলেন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে এই ব্যাপারে লিখেছেন, ‘আমি জানি হাফিজের ধর্মীয় দর্শন ও কবিতা আমার পিতাকে যতখানি অভিভূত করত, বৈষ্ণবদের দর্শন ও সঙ্গীত ততখানি করতে পারত না। হাফিজ ছিলেন তাঁর ঐশ^রিক আনন্দ। তিনি নিজে কবিতা লিখতেন না। হাফিজের কবিতাই তাঁর সৃষ্টি আকাক্সক্ষাকে পূরণ করত। উপনিষদ তাঁর ক্ষুধা নিবারণ করত এবং হাফিজ তাঁর তৃষ্ণা মিটাত।’ জানা যায়, পুরো দিওয়ান মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মুখস্ত ছিল।
    গিরিশচন্দ্র সেন, কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, মোহিতলাল মজুমদার, যতীন্দ্র মোহন বাগচী, কান্তিচন্দ্র ঘোষ, হরেন্দ্রনাথ দেব প্রমুখ কবি হাফিজের বহু রুবাইয়াৎ ও গজল অনুবাদ করেছেন। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হাফিজকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালবাসতেন যে তাঁর পুত্র বুলবুলের মৃত্যুশয্যায় বসেও তাঁর রুবাইয়াৎ অনুবাদ করেছেন। তিনি ফার্সি থেকে মোট ৭৩টি রুবাই সরাসরি বাংলায় অনুবাদ করেন। যেদিন তিনি অনুবাদ শেষ করেন সেদিন কবি পুত্র বুলবুল প্রাণত্যাগ করেন। কবি তাই বেদনার সঙ্গে লিখেছেন, আমি আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান ও সবচেয়ে প্রিয় সম্পদকে উপঢৌকন দিয়ে সিরাজের বুলবুল কবিকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। ইরানের কবি স¤্রাট হাফিজ বাংলার সুলতান গিয়াস উদ্দিনের আমন্ত্রণে সাড়া দেননি। কিন্তু তিনি আমার আমন্ত্রণে সাড়া না দিয়ে পারতেন না।ফার্সি সাহিত্যের আলোচনা করে লেখা গ্রন্থটি হচ্ছে মোহাম্মদ বরকতুল্লাহর ‘পারস্য প্রতিভা’। এ গ্রন্থে কবি হাফিজের উপর একটি চমৎকার প্রবন্ধ আছে। মুহাম্মদ মুনসুরউদ্দিন লিখেছেন, ‘ইরানের কবি’। অবশ্য এ গ্রন্থে’ ‘শামসুদ্দিন হাফিজ’ নামে যে নিবন্ধটি আছে তা তেমন তথ্যবহুল নয়। বাংলাভাষায় দিওয়ানে হাফিজের বহু অনুবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ড. মুহাম্মদ শহিদুল্লাহর অনুবাদ কর্মটি বাংলা ভাষার এক অসামান্য প্রকাশনা। এ বইয়ের দীর্ঘ উপক্রমণিকাতে তিনি হাফিজকে বাংলা ভাষাভাষীর কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। অন্যদিকে কাজি আকরাম হোসেনের অনুবাদটিও চমৎকার। পশ্চিম বঙ্গের দু’জন আধুনিক কবি যারা প্রগতিবাদী হিসাবেও পরিচিত, শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও সুভাষ মুখোপাধ্যায় কবি হাফিজের সাহিত্যেকর্ম অনুবাদ করে এর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

    কবির ৬০০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকায় আয়োজিত এক সম্মেলনে জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলি আহসান বলেন, ‘কবি হাফিজ আমাদের চিন্তায় ও মননে বহুকাল বিদ্যমান ছিলেন। বাংলা কবিতায় আবার তিনি নতুন করে জাগ্রত হয়েছেন।’ অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকের বাঙ্গালী মনীষায় হাফিজ ছিলেন অনেক বড় প্রতিভা, অনেক বড় কবি এবং প্রেমিক। কবির কুরআনের ওপর দক্ষতা দেখে সমকালীন একজন পীর মুর্শিদ তাঁকে হাফিজ উপাধিতে ভূষিত করেন।’ এ ব্যাপারে কবি নিজেই লিখেছেন-

    হাফিজ! তোমার চেয়ে সুন্দর
    গান আর দেখিনাই আর কারো
    তোমার মুখের লুকানো কুরআন
    সে তো সুন্দর আরো।’
    কবি ছিলেন একজন প্রেমিক। তিনি তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে লিখেছেন-
    ‘প্রেয়সী মোর ছিল যে হায়
    পরীর মত অপ্সরী
    পা থেকে তার কেশাগ্রতক
    নিটোল যেন ঠিক পরী।

    কবি তাঁর আদরের সন্তানের মৃত্যুতে শোকাতুর হয়ে লিখেছেন-
    মোর নয়নমনি দিলের মেওয়া
    তার তরে কাঁদে প্রাণ
    হাসতে হাসতে চলে গেল,
    শোকে আমি মুহ্যমান।’
    যদিও এখানে আপন সন্তানের জন্য হাফিজ এ আর্তি ফুটিয়ে তুলেছেন, কিন্তু এ শোকবাণী জগতের সব পুত্রহারা পিতৃ হৃদয়কে নাড়া না দিয়ে পারে না। একটি কথা বলতে ভুলেই গেছি। দিগি¦জয়ী মোঙ্গল বীর তৈমুর লং কবির একটি কবিতা বুঝতে না পেরে কবিকে তলব করেন। কবিতাটি ছিল-
    সেই সিরাজি প্রেমিক যদি জয়
    করে মোর এই হিয়ারে
    তার গালের তিলে বিলিয়ে দেব
    সমরকন্দ আর বুখারারে।

    তৈমুর লং কবির কাছে জানতে চাইলেন এ কবিতা কার? কবি যখন স্বীকার করলেন এ তাঁরই কবিতা, ‘আমি হাজার হাজার সৈন্যের রক্তের বিনিময়ে যা গড়ে তুলেছি, তুমি নারীর গালের কালো তিলের বিনিময়ে তা বিলিয়ে দিতে চাচ্ছ?
    কবি বুঝলেন, যুদ্ধবাজ তৈমুরের মাথায় কাব্যের মহিমা ঢোকার কথা নয়। কবি তাই বিনীতভাবে বললেন, ‘মহামান্য বাদশাহ। এভাবে দান খয়রাত করতে গিয়েই তো আমার আজ এ দীনহীন অবস্থা। আপনি আমার মত করেননি বলেই তো আপনি আজ জগদ্বিখ্যাত স¤্রাট।’ কবি হাফিজের চমৎকার উত্তরে তৈমুর লং খুশি হলেন। তিনি কবিকে সোনার আশরাফি উপহার দিয়ে বিদায় দিলেন।
    কবির দিওয়ানেই হাফিজসহ অন্যান্য গ্রন্থ’ থেকে জানা যায়, তিনি তাঁর যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ আলেম ছিলেন। তিনি ইসলামি আইন শাস্ত্র (ফিকহ), হাদিস, ন্যায়শাস্ত্র (কালাম), তাফ

    সির, ফার্সি সাহিত্য ইত্যাদিতে সুপ-িত ছিলেন। এমনকী তিনি জ্যোতিষ বিজ্ঞানের জ্ঞানও আয়ত্ব করেছিলেন। কবি সিরাজি তাঁর যৌবনকালেই লেখালেখিতে হাত পাকিয়েছিলেন বলে জানা যায়। যাই হোক, কবি তাঁর জীবদ্দশাতেই খ্যাতি ও প্রসিদ্ধি অর্জনে সক্ষম হন যদিও তাঁর সময়টা ছিল সাহিত্য ও কাব্য চর্চার জন্য খুবই খারাপ সময়। কারণ এ সময়টাতেই তাঁর দেশে নানারকম হানাহানি, যুদ্ধবিগ্রহ বিরাজমান ছিল। কবিখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ার পর বিশে^র বিভিন্ন দেশের ভক্তবৃন্দ তাঁকে নিজেদের মধ্যে পাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে থাকে। বাগদাদের সর্বগুণান্বিত সুলতান আহমদ বিন আবেস কবি হাফিজকে বাগদাদে পাওয়ার জন্য বারবার আমন্ত্রণ পাঠাতে থাকেন। কিন্তু কবি প্রিয় জন্মভূমি ছেড়ে ওই সময় কোথাও যেতে রাজি ছিলেন না। তাই স¤্রাটের আহ্বানকেও তিনি প্রত্যাখান করেছিলেন।

    ইস্পাহানের শাসনকর্তার মন্ত্রী উম্মাদ বিন মাহমুদ কবিকে দাওয়াত করেছিলেন। কিন্তু কবি এ দাওয়াতও কবুল করেন নি। দাক্ষিণাত্যের বাহমনী সুলতান শাহ মাহমুদ কবি সাহিত্যিকদের অসম্ভব সম্মান করতেন। দেশ বিদেশের কবি সাহিত্যিকদের তিনি নানা সম্মানে সম্মানিত করতেন। এ সময়ে কবি হাফিজ দাক্ষিণাত্যে আসার জন্য ইরাদা করেছিলেন। কিন্তু নানা কারণে তা আর সম্ভব হয়ে উঠেনি। বাঙালিদের জন্য গর্বের বিষয় হল, সে সময়কাল বাংলার শাসনকর্তা গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ কবি সিরাজিকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কবি না আসতে পারলেও সে কথা তাঁর কবিতায় লিখে গেছেন। কথিত আছে গিয়াসউদ্দিনের তিনজন প্রিয় দাসী ছিলেন, এদের নাম সরব, গুল ও লালা। সুলতান একদিন এ চরণটি ফাঁদলেন। ‘সাকি হাদিসে সারবো গুলো লাল মিরওয়াদ’ কিন্তু আর পরবর্তী চরণটি পূরণ করতে পারলেন না। সভ্য কবিরাও সুলতানের মনঃপুত কিছু দিতে পারলেন না। তখন সুলতান উক্ত লাইনটি কবি হাফিজ সিরাজির কাছে পাঠিয়ে দিলেন। কবি হাফিজ সিরাজি এর উত্তরে কবিতাটি পূর্ণ করে সুলতানের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। কবিতাটি এ রকম-‘সাকি হাদিসে সারবো গোলো
    লালা মিরওয়াদ
    ওইন বাহাস বা সালাসায়
    গোসালা মিরওয়াদ।
    হাফিজ যে শওকে মজলেসে
    সুলতান গিয়াসউদ্দিনের
    খামুস মালো কে কারে তু
    আজ লালা মিরওয়াদ।
    কবিতাটির শেষ দু’লাইনের অর্থ হল-হে হাফিজ সুলতান গিয়াসউদ্দিনের মজলিসে চুপ করে থেকো না, কেননা তাঁর কাজ কান্নার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে।’ কবি সিরাজি সুলতান গিয়াসউদ্দিনের আমন্ত্রণ পাওয়ার পর বাংলায় আসার জন্য মনস্থির করেছিলেন বলে জানা যায়, কিন্তু সাইক্লোন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আসতে পারেন নি। আমাদের গর্ব হল কবিকে আমন্ত্রণ জানানোর কারণে বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ ইরানের সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন।