চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) আলাওল হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. জমালুল আকবর চৌধুরীর পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন হলটির শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে প্রভোস্টকে হলে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে তার কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন তারা।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরের দিকে হল সংসদের নেতৃবৃন্দের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরা এ কর্মসূচি শুরু করেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, হল সংসদের সঙ্গে সমন্বয় না করা, প্রশাসনিক কাজে দীর্ঘসূত্রিতা, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, সিট বণ্টনে অস্বচ্ছতা এবং জরুরি সংস্কারকাজে ধীরগতিসহ নানা কারণে তারা দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তিতে রয়েছেন। এ ছাড়া খেলাধুলা ও ক্রীড়া সামগ্রী ক্রয়সহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজেও প্রভোস্টের অসহযোগিতার অভিযোগ করেন তারা।
আলাওল হল সংসদের জিএস নুরুন্নবী বলেন, তিনি হল সংসদের কোনো কাজে সহায়তা করেন না। আমরা তার পদত্যাগ চাই। সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে তাকে হলে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। হলটির সমাজসেবা, পরিবেশ ও মানবাধিকার সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবি নিয়ে তার কাছে গেলে নানা বিষয়ে হয়রানির শিকার হন। আমরা তার পদত্যাগ চাই।
চবির সহকারী প্রক্টর খায়রুল ইসলাম সুজন বলেন, আলাওল হলে তালা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছি। প্রক্টরিয়াল বডি সমস্যা সমাধানের জন্য হল সংসদের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করছে।
চট্টগ্রামের দামপাড়ায় পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের সামনে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগ মিছিল করেছে।
আজ শুক্রবার জুমার নামাজের সময় নগরের দামপাড়া পুলিশ লাইনের সামনে মিছিল নিয়ে চলে যায় ছাত্রলীগ।
মিছিলের ব্যানারে লেখা ছিল, ‘দেশরত্ন শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন প্রস্তুতি- বাংলাদেশ ছাত্রলীগ চট্টগ্রাম মহানগর।’ মিছিলটিতে ২০ থেকে ২৫ জন তরুণ ও যুবক অংশ নেন।
পুলিশ লাইনে নগর পুলিশের (সিএমপি) কমিশনারসহ গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের কার্যালয় রয়েছে। পুলিশ কমিশনার লালদিঘির পাড়স্থ নবনির্মিত ভবনের পাশাপাশি দামপাড়া পুলিশ লাইনের অফিসেও মাঝে মধ্যে বসেন।
চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নূর হোসেন মামুন আগামীর সময়কে বলেন, ‘৫ সেকেন্ডের জন্য তারা মিছিল করেছে। এখনো কাউকে আটক করা যায়নি। তবে কাজ চলছে।’
চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁওয়ে সড়কে ভাসমান ভ্যান বসানো ও চাঁদা আদায়কে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে ফজলুল আমিন নামে এক যুবদল নেতাকে মারধরের পর হত্যার অভিযোগ উঠেছে।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকাল ১১টার দিকে চান্দগাঁও থানার ওমর আলী মাতব্বর বাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
স্বজনদের অভিযোগ, ভ্যান বসানো চাঁদা নেওয়ার প্রতিবাদ করায় নিজ দলের কর্মী হিসেবে পরিচিত শাহজাহান ও তার ছেলে সিফাতের সঙ্গে ফজলুল আমিনের বিরোধ হয়। একপর্যায়ে তাকে ধাক্কা ও ঘুষি মারা হলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
নিহত ফজলুল আমিন ৬ নম্বর পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ড যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। অভিযুক্ত শাহাজাহান চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির এক সদস্যের অনুসারী এবং কৃষক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত মো. শাহজাহান (৪৫) ও তার ছেলে সিফাতকে (২০) আসামি করে চান্দগাঁও থানায় মামলা করেছেন নিহতের পরিবার।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই এলাকায় ভাসমান ভ্যান বসানো নিয়ে আগে থেকেই বিরোধ ছিল। স্থানীয়দের বৈঠকে নির্দিষ্ট স্থানে ভ্যান না বসানোর সিদ্ধান্ত হলেও শুক্রবার সেখানে আবার ভ্যান বসানো হলে ফজলুল আমিন বাধা দেন। এ নিয়ে শাহজাহানের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়। ঘটনার আগের দিন ভ্যান সরিয়ে দেওয়া হলেও পরে আবার তা বসানো হয়। ভ্যান বসানোর পেছনে প্রভাবশালী এক নেতার নির্দেশের কথা বলা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এক যুবক বলেন, ‘চলাচলের রাস্তায় ভ্যান না বসাতে বলেন। এ নিয়ে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে তাকে ঘুষি মারা হলে তিনি মাটিতে পড়ে যান। আমরা তাকে হাসপাতালে পাঠাই। মারামারি বেশি হয়নি, তবে ঘুষির আঘাতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে জানতে পারি, হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়েছে।’
৬ নম্বর পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ড যুবদলের জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘ভাসমান ভ্যান থেকে চাঁদা আদায়ের বিষয়টি নিয়ে ফজল আমিন শাহজাহানের কাছে জানতে চেয়েছিল বলে শুনেছি। গরিব মানুষ ভাসমান দোকান বসিয়ে জীবিকা চালায়, তাদের কাছ থেকে কেন চাঁদা নেওয়া হচ্ছে এমন প্রশ্নের পর তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। পরে শাহজাহান ফজল আমিনকে ধাক্কা ও ঘুষি মারে বলে আমরা জানতে পেরেছি। এরপর তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।’
নিহতের ছেলে বলেন, ‘আমার বাবা সারাজীবন এলাকার মানুষের জন্য কাজ করেছেন। আমরা চাই, তার মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং যারা জড়িত তাদের বিচার হোক। ৫ আগস্টের পর এলাকায় নতুন করে নেতৃত্বে আসা কিছু ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের বিষয়ে দলীয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।’
চান্দগাঁও থানার ওসি জসিম উদ্দিন বলেন, ‘দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মামলাটি রেকর্ড করা হয়েছে। মামলায় আরও ৫ থেকে ৭ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং বিরোধের প্রকৃত কারণ কী, তা তদন্ত করা হচ্ছে।’
এদিকে, ফজলুল আমিনের মরদেহ এলাকায় আনার পর স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। নিজ দলের কর্মীর হাতে তার মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। স্বজন ও স্থানীয়রা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন।
চট্টগ্রামে নিখোঁজের পর দুই দিন হাসপাতালের মর্গে পড়ে ছিল ১৫ বছর বয়সী কিশোর সায়েদ মুনিফ আহমেদ শানের লাশ। এদিকে ছেলেকে খুঁজে না পেয়ে দিশেহারা পরিবারকে অপহরণের কথা বলে ৬০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি চক্র। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশের প্রকাশ করা ছবি দেখে মর্গে থাকা লাশটি শানের বলে শনাক্ত করে পরিবার।
শান চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরের চট্টগ্রাম মডার্ন স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সে সন্দ্বীপের মগধারা এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের ছেলে। গত শনিবার হালিশহরের চুনা ফ্যাক্টরি এলাকার বাসা থেকে কোচিংয়ে যাওয়ার কথা বলে বের হয় সে। পরে আর বাসায় ফেরেনি।
পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজির পর হালিশহর থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। এর মধ্যে পরদিন এক ব্যক্তি ফোন করে জানায়, শানকে অপহরণ করে আটকে রাখা হয়েছে। তাকে ফিরে পেতে টাকা দাবি করে ওই ব্যক্তি। পরে ষোলশহর এলাকায় আসতে বলা হয় পরিবারকে।
বিষয়টি পুলিশকে জানালে পুলিশ সেখানে গেলেও কাউকে পাওয়া যায়নি। পরে একটি বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠানোর জন্য চাপ দেওয়া হয়। একপর্যায়ে শানের মামার বিকাশ নম্বর থেকে ওই নম্বরে ৬০ হাজার টাকা পাঠানো হয়। পরে জানা যায়, নম্বরটি লোহাগাড়া উপজেলার এক ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত।
অন্যদিকে, শনিবার রাতে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকা থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক কিশোরের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে লাশটি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। সোমবার সন্ধ্যার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশের দেওয়া ছবি দেখে পরিবার ও হালিশহর থানা পুলিশ লাশটি শানের বলে শনাক্ত করে।
পতেঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. পারভেজ জানান, দুই দিন আগে অজ্ঞাতপরিচয় এক কিশোরের লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠানো হয়েছিল। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রকাশ করা হলে পরিবার ও হালিশহর থানার পক্ষ থেকে কিশোরটির পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।
পুলিশ জানায়, শান পাঁচ বন্ধুর সঙ্গে কোচিং শেষে পতেঙ্গা সৈকতে গিয়েছিল। সেখানে সবাই পানিতে নামলে ঢেউয়ের তোড়ে শান ভেসে যায়। ভয়ে তার চার বন্ধু বিষয়টি কাউকে জানায়নি। এ ঘটনায় শানের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে এবং চার বন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
হালিশহর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ সুলতান আহসান উদ্দীন বলেন, শান বন্ধুদের সঙ্গে পতেঙ্গায় গিয়ে পানিতে ভেসে যায়। পরে বন্ধুরা ভয় পেয়ে বিষয়টি গোপন রাখে। অপহরণের কথা বলে পরিবারের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার ঘটনাটিও তদন্ত করা হচ্ছে।
শানের চাচা গোফরান উদ্দিন অভিযোগ করেন, দুই দিন ধরে পরিবার তাকে খুঁজলেও মর্গে থাকা লাশটি যে শানের, সে তথ্য তারা আগে জানতে পারেনি। অপহরণের কথা বলে যারা টাকা নিয়েছে, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
চট্টগ্রাম নগরের ডবলমুরিং থানার মনসুরাবাদ এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিটিং থেকে এক সাংবাদিকসহ ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার রাতে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানায়, ১৫ আগস্ট উপলক্ষে আলোচনা করার জন্য আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা মনসুরাবাদ এলাকায় জড়ো হন। খবর পেয়ে শনিবার বিকেলে মনসুরাবাদ ওয়াপদা কলোনি-সংলগ্ন হাজী ফজলুল করিম চৌধুরী ‘রয়েল টাচ’ অ্যাপার্টমেন্টের পঞ্চম তলায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের আটক করা হয়। পরে তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজন নারী রয়েছেন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির স্থানীয় সরকারবিষয়ক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট উম্মে হাবিবা, হালিশহর থানা আওয়ামী লীগের দপ্তরবিষয়ক সম্পাদক ইস্কান্দার মির্জা, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের বঙ্গবন্ধু পরিষদের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক শুভ আইচ, চন্দনাইশ উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা যুব মহিলা লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক কামেলা খানম রুপা, চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও ছাত্রলীগের সাবেক সহসম্পাদক সুজলা অন্তরা এবং বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাবেক মহিলা বিষয়ক সম্পাদক শারমিনা ইয়াসমিন নিশু।
এ ছাড়া সঞ্জয় কান্তি নাথ, এস এম সালাউদ্দিন, আহসান আবিদ, সুলতান মাহমুদ জিদান, পার্থ প্রতিম নন্দী, সাংবাদিক যীশু রায় চৌধুরী, মশিউর রহমান আবীর, আয়েশা হেভেন ও মোহাম্মদ জাকির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ডবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীনূর আলম গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এ ঘটনায় ডবলমুরিং থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। মামলার নম্বর ১২। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশের হামজারবাগে এক প্রবাসী ব্যবসায়ীর বাড়ি লক্ষ্য করে দুই রাউন্ড গুলির ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টা আগে বিদেশি একটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে ওই ব্যবসায়ীর ছেলের কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে পরিবারের সবাইকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। নম্বরটি ব্লক করে দেওয়ার পর রাতেই বাড়িতে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে।
সোমবার রাত ১১টার দিকে হামজারবাগ এলাকায় হাজী মোহাম্মদ ইউসুফের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। গুলি দুটি বাড়ির গেটে লাগে। তবে এতে কেউ হতাহত হননি। ঘটনার পর আতঙ্কে বাড়ির বাসিন্দারা দীর্ঘ সময় ঘরের বাইরে বের হতে পারেননি। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
বাড়ির মালিক মোহাম্মদ ইউসুফ জানান, তাঁর বড় ছেলে মোহাম্মদ শওকত দুবাইপ্রবাসী। সোমবার দুপুরে শওকতের হোয়াটসঅ্যাপে বিদেশি একটি নম্বর থেকে ভয়েস রেকর্ড পাঠানো হয়। এতে এক ব্যক্তি নিজেকে কাতারপ্রবাসী পরিচয় দিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন।
ওই ব্যক্তি বলেন, তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অনেক টাকা রয়েছে। ৫০ লাখ টাকা দিতে হবে। টাকা নেওয়ার জন্য একজনকে পাঠানো হবে। তাঁর হাতে টাকা তুলে দিতে হবে। টাকা না দিলে পরিবারের সবাইকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়।
বিষয়টি বাবাকে জানান শওকত। ইউসুফ তাঁকে কোনো উত্তর না দিয়ে নম্বরটি ব্লক করে দিতে বলেন। এরপরই হোয়াটসঅ্যাপ থেকে ভয়েস রেকর্ডটি মুছে ফেলা হয়। এর কয়েক ঘণ্টা পর রাত ১১টার দিকে তাঁদের বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি করা হয়।
ইউসুফ বলেন, ‘গুলি করার সময় বিকট শব্দ হয়। সবাই ভয় পেয়ে ঘরে বসে ছিলাম। পরে নিচে নেমে দেখি বাড়ির গেটে গুলির চিহ্ন। দুটি গুলি গেটে লেগেছে।’
তিনি জানান, গুলি করার সময় বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীকে অস্ত্রের ভয় দেখানো হয়। এ কারণে তিনি দ্রুত গেট বন্ধ করে ভেতরে চলে যান। ফলে হামলাকারীদের কাউকে শনাক্ত করতে পারেননি।
মোহাম্মদ ইউসুফের বাড়ি ফটিকছড়ি উপজেলায়। প্রায় ২৫ বছর ধরে তাঁরা হামজারবাগের নিজস্ব বাড়িতে বসবাস করছেন। ইউসুফ নিজেও দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলেন। তাঁর ছেলে শওকত কয়েক মাস আগে দুবাই থেকে দেশে ফিরেছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, বাড়িটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আজিজুর রহমান আজিজের শ্বশুরবাড়ি। আজিজ চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুদিন পর তিনি গ্রেপ্তার হন। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের সুযোগ নিয়ে কে বা কারা বাড়িটি লক্ষ্য করে দুই রাউন্ড গুলি করেছে। আতঙ্ক সৃষ্টির জন্যই গুলি করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি।’
ওসি বলেন, ‘চাঁদা দাবির ভয়েস রেকর্ডের বিষয়টিও আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। গুলির ঘটনা, চাঁদা দাবি এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত—সবকিছু তদন্ত করা হচ্ছে।’
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে পুলিশের একাধিক দল। তবে এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছেন বাড়ির মালিক। মঙ্গলবার দুপুরে বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম সফরে আসছেন তারেক রহমান। আগামীকাল রোববার একদিনের সফরে কক্সবাজারের মহেশখালী এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালী, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীতে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেবেন তিনি। সফরের শেষ পর্যায়ে সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লুতে চট্টগ্রাম বিএনপির সাংগঠনিক সভায় যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
সাংগঠনিক সভায় চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির পাশাপাশি ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলবেন প্রধানমন্ত্রী। নেতাকর্মীরাও তাঁর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাবেন বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী-বায়েজিদ আংশিক) আসনের সংসদ সদস্য ও ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবার চট্টগ্রামের তিনটি সাংগঠনিক ইউনিটের মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি এবং ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলবেন। নেতাকর্মীরাও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন। এটা তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শন। এই দর্শনকে ধারণ করেই তিনি দেশ ও দলকে এগিয়ে নিতে চান।’
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বাঁশখালী, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীসহ সফরের সাতটি ভেন্যুর প্রস্তুতি শেষ হয়েছে।
শনিবার ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীর কয়েকটি ভেন্যু পরিদর্শন করে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা তদারক করেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি ফটিকছড়ির পেলাগাজী দিঘির মাঠে নির্মিত হেলিপ্যাড, বাবুনগর মাদ্রাসা, হাটহাজারী সরকারি কলেজসংলগ্ন মাঠ এবং জেলা পরিষদ ডাকবাংলো পরিদর্শন করেন।
মহেশখালী দিয়ে সফর শুরু
সফরসূচি অনুযায়ী, রবিবার সকাল ৯টায় মহেশখালী পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মিডা) কার্যক্রম পরিদর্শন করবেন তিনি। এরপর হেলিকপ্টারে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন এলাকায় যাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ত্রাণ বিতরণ করবেন। একই অনুষ্ঠানে ১০০ গৃহহারা পরিবারের হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে বাঁশখালীতে বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যেও ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রস্তুতি সভা করে নেতাকর্মীদের সুশৃঙ্খলভাবে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দীন বলেন, বাঁশখালীতে প্রধানমন্ত্রী ত্রাণ বিতরণ ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের নতুন বাড়ির চাবি হস্তান্তর করবেন। সেখানে জনসভা না থাকলেও প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখতে বিপুলসংখ্যক মানুষ উপস্থিত হতে পারেন। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
ফটিকছড়িতে বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ
বাঁশখালী থেকে হেলিকপ্টারে ফটিকছড়ির আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর বাবুনগর মাদ্রাসায় যাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে তাঁর। এরপর সংগঠনটির কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন তিনি।
হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে এ সাক্ষাৎকে অরাজনৈতিক সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনটির নেতারা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর শপথের সময় আমিরের সঙ্গে সাক্ষাতের যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, তা রাখতেই এই সফর।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে বাবুনগর মাদ্রাসায় প্যান্ডেল ও মঞ্চ তৈরির পাশাপাশি হেলিকপ্টার অবতরণের জন্য অস্থায়ী হেলিপ্যাড প্রস্তুত করা হয়েছে।
হাটহাজারীতে পুনর্বাসন সহায়তা
ফটিকছড়ি থেকে সড়কপথে হাটহাজারীতে যাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় গিয়ে হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা আমির মরহুম আল্লামা শাহ আহমদ শফীর কবর জিয়ারত করবেন তিনি।
এরপর হাটহাজারী সরকারি কলেজসংলগ্ন মাঠে ৩০টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ঘর নির্মাণের সহায়তা হিসেবে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে দেওয়ার কথা রয়েছে। একই অনুষ্ঠানে ১৫ জন প্রতিবন্ধীকে ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কর্মসূচিও রয়েছে।
নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী
প্রধানমন্ত্রীর সফর নির্বিঘ্ন করতে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (এসএসএফ) কাজ করছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও দায়িত্ব পালন করছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচিতে থাকা প্রতিটি ভেন্যু ঘুরে দেখা হয়েছে। সার্বিক প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। এখন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি ও সর্বশেষ অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সন্ধ্যায় বিএনপির সাংগঠনিক সভা
সফরের শেষ পর্যায়ে সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লুতে চট্টগ্রাম বিএনপির সাংগঠনিক সভায় যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। সভায় মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির পাশাপাশি ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। দলীয় সূত্র জানায়, সভায় চট্টগ্রামের সাংগঠনিক পরিস্থিতি, স্থানীয় সমস্যা ও দলীয় কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হতে পারে। দীর্ঘদিন দলের দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাকেও সভায় আমন্ত্রণ জানানো হবে।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান বলেন, নির্ধারিত যোগ্যতার ভিত্তিতে বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতারা সভায় অংশ নেবেন। দীর্ঘদিন দলের দায়িত্ব পালন করা কিছু জ্যেষ্ঠ নেতাকেও আমন্ত্রণ জানানো হবে।
সফরসূচি অনুযায়ী, রবিবার রাত ৯টা ২০ মিনিটে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে।
ব্যবসায়ী কিংবা প্রবাসীদের মুঠোফোনে হুমকি দেওয়া হতো লাখ থেকে কোটি টাকা চাঁদার জন্য। এরপর বাহকের মাধ্যমে নগদে সংগ্রহ করা হতো চাঁদাবাজির সেই টাকা। চাঁদার টাকা সংগ্রহের জন্য ছিল এলাকাভেদে পৃথক ব্যক্তি। তাঁরা মূলত ইউসুফ নামের এক ব্যক্তিকে চাঁদাবাজির সেই টাকা জমা দিতেন। তিনি এসব টাকা হুন্ডি এবং কয়েকটি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিতেন চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের কাছে।
পুলিশ ও চাঁদাবাজির শিকার ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। গত বুধবার সকালে যশোর থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পথে ইমনকে তিন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ইমন পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে। বৃহস্পতিবার ইমনকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
২০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে গত সোমবার সকালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বড় দিঘিরপাড় এলাকার ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিনের নির্মাণাধীন ভবনে হামলা ও ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ ওঠে ইমনের অনুসারীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় মামলা করার পর ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। এর আগে ১৩ জুলাই ২ কোটি টাকা চাঁদার জন্য নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোডে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ডিডিএনে হামলা ও ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ ওঠে ইমনের অনুসারীদের বিরুদ্ধে। এই দুটি ঘটনার পর মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করে চাঁদাবাজি বন্ধ এবং ইমনকে গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়। যদিও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে চাঁদাবাজিসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন ইমন।
চাঁদা দাবির আগে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ
পুলিশ জানায়, চাঁদা চাওয়ার আগে কোনো ব্যক্তির আয়ের উৎস, বর্তমান সম্পদ, নির্মাণাধীন ভবনের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন ইমনের লোকজন। পরিবারের সদস্যদের জীবনবৃত্তান্তও সংগ্রহ করা হয়। তথ্য সংগ্রহের জন্য এলাকাভিত্তিক সোর্স রয়েছে ইমনের।
তথ্য সংগ্রহের পর চাঁদার জন্য বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে ফোন করা হয় নির্ধারিত ব্যক্তিকে। কয়েক লাখ টাকা থেকে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হয়। ওই ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের কে কোথায় থাকেন, কী করেন, সব জানানো হয়। দাবি অনুযায়ী চাঁদা না দিলে গুলি করার হুমকি দেন ডেভিড ইমন। নির্ধারিত সময়ে টাকা না পেলে হামলার ঘটনাও ঘটে।
তথ্য সংগ্রহের পর চাঁদার জন্য বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে ফোন করা হয় নির্ধারিত ব্যক্তিকে। কয়েক লাখ টাকা থেকে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হয়। ওই ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের কে কোথায় থাকেন, কী করেন, সব জানানো হয়। দাবি অনুযায়ী চাঁদা না দিলে গুলি করার হুমকি দেন ডেভিড ইমন।
ইমনকে চলতি মাসের শুরুতে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দেওয়া এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। তিনি নগরের দক্ষিণ পাহাড়তলীর বড় দিঘিরপাড় এলাকার বাসিন্দা। ইমন গ্রেপ্তার হলেও এখনো ভয়ে রয়েছেন সেই ব্যবসায়ী।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ওই ব্যবসায়ী প্রথম আলোকে বলেন, জুন মাসের শেষের দিকে বিদেশি একটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের সহযোগী পরিচয় দিয়ে ডেভিড ইমন তাঁকে ফোন করেন। তাঁর নির্মাণাধীন একটি বহুতল ভবন ও বিভিন্ন ব্যবসার কথা বলে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন ইমন। ওই সময় ওই ব্যবসায়ীর ছেলেমেয়েরা কে কোথায় পড়াশোনা করেন, তারও বিস্তারিত বর্ণনা দেন। চাহিদামতো টাকা না দিলে ব্যবসায়ীর কলেজপড়ুয়া বড় ছেলেকে শেষ করে দেওয়ার হুমকি দেন।
অস্ত্র হাতে ইমনছবি: সংগৃহীত
ওই ব্যবসায়ী জানান, নিরুপায় হয়ে বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। এর মধ্যে রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ছিলেন। কয়েকজনের মাধ্যমে ইমনকে ফোন করা হয়। কিন্তু কারও কথা শুনতে নারাজ ছিলেন ইমন। ইতিমধ্যে নির্মাণাধীন ভবনে হামলা চালানো হয়। মারধর করা হয় নিরাপত্তা প্রহরীকে।
ওই ব্যবসায়ী বলেন, ‘এরপর আমাকে আবার ফোন করা হয়। চাঁদা দেওয়ার মতো এত টাকা নেই জানিয়ে আমি তাঁকে অনুনয়-বিনয় করে চাঁদা কমানোর অনুরোধ করি। শেষে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা নির্ধারিত হয়। ইমন তখন বলেন, আমার লোকজন নগদে টাকা নেবে। যেখান থেকে বলা হবে, সেখান থেকে নিতে পারবে।’
‘তাদের একটি দল তথ্য সংগ্রহ করে, আরেকটি দল নগদ টাকা গ্রহণ করে, আরেকটি হামলা-ভাঙচুর কিংবা গুলিবর্ষণের মতো ঘটনায় জড়ায়। প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা আলাদা দল রয়েছে।’
কাজী মোহাম্মদ তারেক আজিজ, অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার, চট্টগ্রাম
পরে বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে ফোন করে ইমনের লোক পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি নগরের অক্সিজেন এলাকায় টাকা নিয়ে যেতে বলেন বলে জানান ওই ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ‘আমি যেতে রাজি না হওয়ায় একটি অটোরিকশায় করে দুই যুবক বড় দিঘিরপাড়ে আমার বাসার সামনে আসে। নগদ পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে তারা আবার একই গাড়িতে করে চলে যায়।’
এই ব্যবসায়ীর মতো আরও অন্তত পাঁচজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। তাঁরা সবাই নগদে বাহকের কাছে চাঁদার টাকা পরিশোধ করেছেন। তবে নাম প্রকাশ করে এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে তাঁরা রাজি হননি। কারণ জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, ইমন জামিনে বেরিয়ে এলে তাঁদের ক্ষতি করতে পারেন। তা ছাড়া ইমনের অনেক সহযোগী এখনো বাইরে রয়েছেন।
ইউসুফকে খুঁজছে পুলিশ
পুলিশ জানায়, চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় ইমনের লোকজন চাঁদার নগদ টাকা সংগ্রহ করে নিয়ে যেতেন নগরের জিইসি মোড় এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে। সেখানে ইউসুফ নামের এক ব্যক্তিকে জমা দিতেন। পরে তিনি এসব টাকা ইমনের নির্দেশমতো হুন্ডি কিংবা ব্যাংক হিসাবে পাঠাতেন।
ইমনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য মিলেছে জানিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, ইউসুফকে ধরার চেষ্টায় রয়েছে পুলিশ। তাঁকে পেলে চাঁদাবাজির টাকা কোথায় যায়, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসবে।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী মোহাম্মদ তারেক আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইমন জানিয়েছেন, ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে কৌশল হিসেবে নগদে চাঁদার টাকা নিতেন। এসব টাকা যাঁরা সংগ্রহ করতেন, তাঁরা সাধারণত ওই এলাকার নন। অন্য কোনো এলাকা থেকে এসে চাঁদার টাকা সংগ্রহ করা হতো।
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, তাদের একটি দল তথ্য সংগ্রহ করে, আরেকটি দল নগদ টাকা গ্রহণ করে, আরেকটি হামলা-ভাঙচুর কিংবা গুলিবর্ষণের মতো ঘটনায় জড়ায়। প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা দল রয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, রিমান্ডে আনার পর ইমনের কাছ থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। ইতিমধ্যে পুলিশ তাঁর কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধার করেছে। চাঁদাবাজি কিংবা হামলার শিকার ভুক্তভোগী লোকজন পুলিশকে এ বিষয়ে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে পারেন।
ক্রিকেট ছেড়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে
ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। তাঁর বাবা মো. মুসা ওমানপ্রবাসী ছিলেন। কয়েক বছর আগে মারা গেছেন।
স্থানীয় লোকজন জানান, স্কুলে পড়ার সময় থেকেই ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় ইমনের। কাঞ্চননগর থেকে সাইকেলে করে ফটিকছড়ি কলেজ মাঠে এসে অনুশীলন করতেন। পরে নগরের অক্সিজেন মোড়ে খালার বাসায় থেকে নিয়মিত ক্রিকেট প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। খেলতেন চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমিতে। অনুশীলন করতেন কাজীর দেউড়ি স্টেডিয়ামে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের মাধ্যমে তাঁর দলে যুক্ত হন। সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ গত বছরের ১৫ মার্চ ঢাকা থেকে গ্রেপ্তারের পর সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী হয়ে ওঠেন ইমন।
২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন, একই বছরের ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যাসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী ঘটনায় আলোচিত হন মোবারক হোসেন ইমন। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে অন্তত ১৫টি।
পুলিশের ভাষ্য, ইমন ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র বহন করেছেন—এমন তথ্য রয়েছে। অস্ত্র ব্যবহারে তিনি দক্ষ। বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় সন্ত্রাসী ও মোটরসাইকেল ভাড়া করার দায়িত্বও তাঁর ছিল। পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া দুজনের একজন ইমন। অন্যজন মোহাম্মদ রায়হান। এর আগে দেশে সন্ত্রাসী দলটির নেতৃত্ব দিতেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। তিনি কারাগারে যাওয়ার পর ইমন ও রায়হান দলটির নেতৃত্বে আসেন।
পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছেন। মোহাম্মদ রায়হান ও ইমন বড় সাজ্জাদের হয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করে আসছেন।
গ্রেপ্তার হওয়ার কয়েক দিন আগে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল ইমনের কাছে। এ সময় তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি টাকা নিই এটা ঠিক, তবে সব বড়লোকদের কাছ থেকে।’ সন্ত্রাসের পথ কেন বেছে নিয়েছেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার ছোটবেলা থেকে ইচ্ছা ছিল বড় ক্রিকেটার হব, নয়তো বড়লোক হব। বড়লোক হওয়ার জন্য এই পথে আছি।’