ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার কারণে ঋণ ও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সরকারের লক্ষ্যের প্রায় অর্ধেক। এই চিত্রের বিপরীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৭ অক্টোবর টোকিওতে বলেছেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে জিডিপি ১ লাখ কোটি ডলার ছাড়াতে পারে। প্রবাসী আয় বৃহত্তর বৈদেশিক হিসাবে সহায়তা করে, তবে পণ্যবাণিজ্যের ঘাটতি নিজে থেকে কমায় না।
ছবির ক্যাপশন: রাতে মতিঝিলের শাপলা চত্বরের ফাইল ছবি, পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন। ছবি: আবু নাঈম, CC BY 3.0, উইকিমিডিয়া কমন্সের মাধ্যমে।
সংক্ষেপে
- বিশ্বব্যাংকের হিসাবে গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও একই হারের পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। সরকারের লক্ষ্য ৬.৫ শতাংশের বিপরীতে আইএমএফের পূর্বাভাস ৩.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং গড় মূল্যস্ফীতি ১০.৯ শতাংশ।
- ব্যাংকব্যবস্থায় তীব্র সংকট রয়েছে। জুনে মোট ঋণের ৩৩.২ শতাংশ খেলাপি হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকব্যবস্থার মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ছিল ঋণাত্মক ২.৬ শতাংশ, যেখানে নিয়ন্ত্রক ন্যূনতম হার ১০ শতাংশ। জুনে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৪.৫ শতাংশে নেমেছে, যা ৩৩ বছরের সর্বনিম্ন।
- এশিয়ান এজের প্রতিবেদনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ব্যাংক পুনর্গঠনে জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ, আনুমানিক ৬ লাখ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। বাজেটে বরাদ্দ ৪০ হাজার কোটি টাকা, ওই অঙ্কের ১৫ ভাগের এক ভাগ।
- জুলাইয়ে আমদানি বেড়েছে ৮.৬ শতাংশ এবং রপ্তানি হয়েছে ৪৩৫ কোটি ডলার। অর্থবছরের প্রথম মাসে পণ্যবাণিজ্যের ঘাটতি ছিল ২০৯ কোটি ডলার। প্রবাসী আয় বৈদেশিক লেনদেনের অর্থ জোগাতে সহায়তা করে। এটি রপ্তানি আয় বা ওই বাণিজ্যঘাটতির হ্রাস নয়।
লক্ষ্যের নিচে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস
ঋণদাতা সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসে ব্যবধান রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অক্টোবরের হালনাগাদে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও একই হার এবং পরের বছর ৩.৯ শতাংশে পুনরুদ্ধারের পূর্বাভাস রয়েছে। এগুলো বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন ও পূর্বাভাস, চূড়ান্ত জাতীয় হিসাবের বিকল্প নয়। অক্টোবরে প্রকাশিত আইএমএফের পূর্বাভাসের সংবাদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩.২ শতাংশ এবং গড় মূল্যস্ফীতি ১০.৯ শতাংশ বলা হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সেপ্টেম্বরের পূর্বাভাস ছিল প্রায় ৪ শতাংশ। সরকারের লক্ষ্য ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও ৭.৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি।
আইএমএফের প্রকাশিত গতিপথে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ২.২ শতাংশে নামার পর ২০৩০-৩১ অর্থবছরে প্রায় ৩ শতাংশে ফেরার কথা রয়েছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৪ শতাংশ। একটি মাসের বছরওয়ারি হার এবং পুরো বছরের গড় পূর্বাভাস ভিন্ন সময়কে বোঝায়। পরেরটি প্রতি মাসে ধারাবাহিক বৃদ্ধি হওয়ার পূর্বাভাস নয়। বিশ্বব্যাংকও দারিদ্র্য বৃদ্ধি ও পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা দুর্বল হওয়ার কথা জানিয়েছে।
ব্যাংক খাতের সংকট
বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনের বরাত দেওয়া এশিয়ান এজের বিবরণে ব্যাংক খাতকে সবচেয়ে তীব্র ঝুঁকি বলা হয়েছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যানে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকব্যবস্থার মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ঋণাত্মক ২.৬ শতাংশ, নিয়ন্ত্রক ন্যূনতম হার ১০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আরও কঠোরভাবে তথ্য প্রকাশের ফলে মন্দঋণের ব্যাপকতা সামনে এসেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ২০.২ শতাংশের তুলনায় ২০২৬ সালের জুনে পুরো ব্যাংকব্যবস্থায় খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩৩.২ শতাংশে পৌঁছায়। ব্যাংকের শ্রেণিভেদে অনুপাত আলাদা: ইসলামী ব্যাংকগুলোতে ৫৮.৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকে ৪৩.২ শতাংশ।
সবচেয়ে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দিয়ে আসছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। জুনের মধ্যে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে জামানত ছাড়া ৭৬ হাজার কোটি টাকা, প্রায় ৬২০ কোটি ডলার তারল্য সহায়তা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, নিয়ন্ত্রক ছাড় ও বারবার সহায়তা অব্যাহত থাকলে হিসাবের স্থিতি ঠিক করার কাজ বিলম্বিত হতে পারে এবং ব্যাংকব্যবস্থার ওপর আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
প্রতিবেদনের প্রাক্কলন, ব্যাংক পুনর্গঠনে জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ, আনুমানিক ৬ লাখ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে, যা ওই প্রাক্কলনের ১৫ ভাগের এক ভাগ। এই তুলনা প্রমাণ করে না যে পুরো পুনর্গঠনের খরচ এক বছরের বাজেট থেকেই মেটাতে হবে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৬.০৩ শতাংশে এবং জুনে ৪.৫ শতাংশে নেমেছে। শেষের হারটি ৩৩ বছরের সর্বনিম্ন, যা প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগের অর্থায়ন সীমিত করছে।
বাণিজ্যঘাটতি ও প্রবাসী আয়ের সহায়তা
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে জুলাইয়ে আমদানি ছিল ৬৪৪ কোটি ডলার, আগের বছরের একই মাসের চেয়ে ৮.৬ শতাংশ বেশি। রপ্তানি ছিল ৪৩৫ কোটি ডলার। পার্থক্য ২০৯ কোটি ডলারের পণ্যবাণিজ্য ঘাটতি। প্রবাসী আয় লেনদেনের ভারসাম্যের অন্য অংশে নথিভুক্ত হয়। পণ্যবাণিজ্যের ওই ঘাটতি না বদলিয়েও এটি চলতি হিসাব ও বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহের ওপর চাপ সামলাতে পারে। বিশ্বব্যাংকের হালনাগাদে শক্তিশালী প্রবাসী আয় ও উন্নত রিজার্ভকে বৈদেশিক খাতের অভিঘাত সামলানোর উৎস বলা হয়েছে।
জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগের প্রক্ষেপণ ও প্রধানমন্ত্রীর জিডিপির উচ্চাকাঙ্ক্ষা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, এখনকার প্রাপ্তি নয়। ব্যাংক পুনর্গঠন, জ্বালানি সরবরাহ ও ঋণপ্রাপ্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ করার ক্ষমতায় প্রভাব ফেলবে। পাঁচ বছরের বেসরকারি বিনিয়োগের প্রক্ষেপণকে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হারের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা বা ব্যাংকের হিসাবের স্থিতি ঠিক করতে ইতিমধ্যে পাওয়া অর্থ হিসেবে ধরা যায় না।
এরপর যা হবে
পরবর্তী তথ্য আসবে ঋণ, মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগের হিসাব এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর সমাধানে অর্থায়ন নিশ্চিত করা পরিকল্পনা থেকে। আইএমএফের কর্মসূচির পরবর্তী পর্যালোচনায় নীতিগত অঙ্গীকারও স্পষ্ট হবে। ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের কথা রয়েছে। প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর আবেদন বিবেচনাধীন। বাণিজ্যসুবিধার অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা বাজারভেদে আলাদা; সবগুলোর জন্য ওই তারিখ নির্ধারণ করা যায় না।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
