ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি, আবাসনসংকট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্থায়নের ঘাটতির প্রতিবাদে সম্প্রতি রাজপথে নেমেছেন লাখ লাখ মানুষ। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে বিক্ষোভে সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। যদিও অনেক বিক্ষোভই ছিল শান্তিপূর্ণ।
সবচেয়ে বেশি অস্থিরতা দেখা গেছে ফ্রান্সে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, গত শনিবার দেশজুড়ে ৫ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যেই এ বিক্ষোভ হয়।
এ পরিস্থিতিতে ইউরোপের দেশগুলোর ঋণ সংকট ও সরকারের আর্থিক চাপ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে বিপুল ঋণ নেওয়ায় অনেক দেশের সরকার এখন গভীর ঋণের জালে আটকা পড়েছে। একই সঙ্গে বাড়ছে ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয়।
সরকার কীভাবে ঋণ নেয়
সাধারণ মানুষ যেভাবে ঋণ নেয়, সরকারও অনেকটা একইভাবে ঋণ নেয়। তবে ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে সরকার সাধারণত বন্ড বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করে।
বন্ড কেনার বিনিময়ে বিনিয়োগকারীদের সুদ দেয় সরকার। পাশাপাশি নির্ধারিত মেয়াদ শেষে মূল অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
১০ বছর মেয়াদি বন্ড হলো এমন এক ঋণ, যা সরকার এক দশক পর পরিশোধ করে। এই বন্ডের ‘ইল্ড’ বা বিনিয়োগকারীদের প্রাপ্ত মুনাফা হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক, যা থেকে বোঝা যায়—কোনো দেশ তার ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাজারের কতটা আস্থা অর্জন করতে পেরেছে।
যেভাবে কাজ করে সরকারি বন্ড
১. সরকার ঋণ নেয়—একজন বিনিয়োগকারী ১০ বছর মেয়াদি একটি বন্ড কেনার জন্য ১০০ ইউরো প্রদান করেন।
২. সরকার সুদ প্রদান করে—১০ বছর ধরে প্রতি বছর বিনিয়োগকারী একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পেয়ে থাকেন। সুদের হার ২ দশমিক ৫ শতাংশ হলে, তিনি প্রতি বছর ২ দশমিক ৫০ ইউরো (মোট ২৫ ইউরো) পাবেন। আর সুদের হার ৫ শতাংশ হলে, তিনি প্রতি বছর ৫ ইউরো (মোট ৫০ ইউরো) পাবেন।
৩. সরকার ঋণ পরিশোধ করে – ১০ বছর পর, বিনিয়োগকারী তার মূল বিনিয়োগ করা ১০০ ইউরো ফেরত পান।
ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়লে কী হয়
বন্ডের দাম কমে গেলে সাধারণত এর ইল্ড বা সুদের হার বেড়ে যায়। ফলে সরকারের জন্য নতুন ঋণ নেওয়া আরো ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।
কোনো পরিবার যেমন উচ্চ সুদের হারের কারণে বন্ধকী ঋণের চাপে পড়ে, তেমনি কোনো সরকারকেও তখন ঋণের সুদ পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। এতে স্কুল, হাসপাতাল ও সড়কের মতো জরুরি খাতে ব্যয়ের জন্য অর্থ কমে যায়।
ইউরো অঞ্চল চালুর ঠিক পরপর, ২০০০-এর দশকের শুরুর দিক থেকে ইউরোপের বড় অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য ১০ বছর মেয়াদী ঋণের ব্যয় কখনোই ৫ শতাংশের মতো উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
২০১০ থেকে ২০১২ সালের ইউরোজোন ঋণ সংকটের সময় গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের মতো সংকটাপন্ন দেশগুলোকে ৫ শতাংশ বা তার বেশি সুদ দিতে হয়েছিল। সুদের হার ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালকে আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা নিতে হয়েছিল।
দুই দেশের সুদের হারের এই ব্যবধান বাড়ার অর্থ হলো, ফ্রান্সকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা জার্মানির তুলনায় বেশি মুনাফা দাবি করছেন। এর মধ্য দিয়ে ফ্রান্সের সরকারি অর্থব্যবস্থা নিয়ে বাজারের উদ্বেগও প্রতিফলিত হচ্ছে।
ইউরোজোন ও যুক্তরাজ্যের সরকারি ঋণের সুদের হারের তুলনায় দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে ইতালি ও গ্রিসের চেয়েও বেশি সুদ দিতে হচ্ছে ফ্রান্সকে। ইউরোর বাইরে থাকা যুক্তরাজ্যের ঋণের সুদের হারই কেবল ফ্রান্সের চেয়ে বেশি।
কোন দেশ সবচেয়ে বেশি ঋণী
সরকারি ঋণের পরিমাণে বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ঋণ ৪১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১২৭ শতাংশ। এরপর চীনের ঋণ ২২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার এবং জাপানের ৮ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। জিডিপির অনুপাতে জাপানের ঋণ ১৯৯ শতাংশ।
ফ্রান্সের সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির ১১৮ দশমিক ৫ শতাংশ। এ হিসাবে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম ঋণগ্রস্ত দেশ ফ্রান্স। ইতালির ঋণ ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার হলেও জিডিপির অনুপাতে তা ১৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে জার্মানির ঋণ ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৬৫ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্রান্সের সরকারি ঋণ জিডিপির ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
সুদ পরিশোধেই বছরে ৩.৩ ট্রিলিয়ন ডলার
ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে সরকার, পরিবার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত ঋণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়ে ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের মাথাপিছু প্রায় ৪৪ হাজার ডলার ঋণের সমান। ঋণ বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে উদীয়মান বাজারের দেশগুলো থেকে।
বিপুল এই ঋণের সুদ পরিশোধ করতেও ব্যয় হচ্ছে বিপুল অর্থ। গত এক বছরে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো সরকারি বন্ডের সুদ পরিশোধে ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেছে।
ব্যয়ের এই পরিমাণ বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করা ৩ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে ব্যয় করা ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে ব্যয় করা ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশি।
সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব
সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় বাড়লে জনসেবামূলক খাতে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ সংকুচিত হয়। স্কুল, হাসপাতাল ও পেনশনের মতো খাতে ব্যয় কমানোর চাপ তৈরি হতে পারে। ঘাটতি সামাল দিতে সরকারকে কর বাড়ানোর পথেও হাঁটতে হতে পারে।
এর প্রভাব শুধু সরকারি বাজেটেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সরকারি ঋণের সুদের হার বেড়ে গেলে আবাসনঋণ, গাড়ি কেনার ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ডের সুদের হারও বাড়তে পারে।
ফলে একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অন্যদিকে সরকারি সেবায় অর্থসংকট—দুই চাপই সাধারণ মানুষের ওপর এসে পড়ে। ইউরোপজুড়ে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পেছনে এই অর্থনৈতিক চাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সরকারগুলোর জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, ক্রমবর্ধমান ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় সামাল দেওয়ার পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক খাতে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন বজায় রাখা।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
