সাম্য ও সম্প্রীতির সমাজ নির্মাণে ইসলাম

জাতীয় মসজিদ — প্রতীকী ছবি

প্রতিবেদন:

·

মানুষের বানানো কোনো আইন দিয়ে মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা পুরোপুরি সম্ভব নয়। মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য আত্মসমর্পণ করতে হয় মাবুদের আইনের কাছে। কুরআনের কাছে। নবীর কাছে। এমন সরল স্বীকারোক্তির পর যে কেউই নিজেকে প্রশ্ন করতে পারে, আমি কি নিজেকে আল্লাহর আইনের কাছে, কুরআনের কাছে আত্মসমর্পণ করেছি নাকি লোভ-মোহ-স্বার্থের কাছে বিক্রি করে দিয়েছি। আমি কি কুরআনের আইন অনুযায়ী শান্তির ফেরিওয়ালা হয়েছি, নাকি হানাহানি-মারামারি আর রাহাজানির কালো ডোবায় নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি।

ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানবতার কল্যাণ, ন্যায়বিচার ও শান্তি নিশ্চিতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার ও আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অন্যায় ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন।’ (সূরা নাহল, আয়াত ৯০)। এ নীতির আলোকে একজন মুসলমানকে ধর্ষণ, হত্যা, গুম, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, সুদ, ঘুস, চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট, মুনাফাখোরি, মজুতদারিসহ সব ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করা ফরজ। কারণ এসব অপরাধ শুধু আইন ভঙ্গ করে না; বরং সমাজের শান্তি, নিরাপত্তা ও মানবিক মূল্যবোধও ধ্বংস করে দেয়।

সমাজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে ইনসাফভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যাতে সাধারণ মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মান নিরাপদ থাকে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে বুদ্ধিমানগণ! হত্যার বদলে হত্যার (কিসাস) মধ্যেই তোমাদের জন্য জীবন রয়েছে।’ (সূরা বাকারাহ, আয়াত ১৭৯)। একইভাবে ইসলাম মানুষের জীবনের মর্যাদাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়া আল্লাহর কাছে একজন নিরপরাধ মানুষ হত্যার চেয়েও হালকা।’ তবে ইসলাম কখনো আবেগনির্ভর বিচার বা মব জাস্টিসকে সমর্থন করে না। কোনো অপরাধের উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়া কাউকে শাস্তি দেওয়া ইসলামের ন্যায়বিচারের পরিপন্থি; কিন্তু দুঃখজনকভাবে আজ রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জনরোষের নামে অনেক সময় প্রকৃত বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদের যেন ন্যায়বিচার বর্জন করতে প্ররোচিত না করে। ন্যায়বিচার করো, এটাই তাকওয়ার নিকটবর্তী।’ (সূরা মায়েদাহ, আয়াত ৮)।

অপরাধ দমন ও ন্যায়বিচারের পাশাপাশি নারীর প্রকৃত মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার পক্ষেও দৃঢ়ভাবে অবস্থান করেছে ইসলাম। ইসলাম নারীকে শিক্ষা, সম্পদ, ভরণপোষণ, সম্মান ও নিরাপত্তার অধিকার দিয়েছে। মা হিসাবে সর্বোচ্চ মর্যাদা এবং স্ত্রী হিসাবে সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করেছে। অথচ আধুনিকতার নামে অনেক সময় নারীকে ভোগবাদী সংস্কৃতির উপকরণে পরিণত করা হচ্ছে, যা প্রকৃত সম্মান নয়। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত।’

একইভাবে সুদ, ঘুস ও অর্থনৈতিক লুটপাটের বিরুদ্ধেও ইসলাম দাঁড়িয়েছে শক্তভাবে। সমাজ ধ্বংসের অন্যতম কারণও এটাই। এসব অন্যায় মানুষের মধ্যে বৈষম্য, শোষণ ও অবিচার বৃদ্ধি করে। বাজার সিন্ডিকেট, পণ্য মজুত এবং কৃত্রিম সংকট সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে এবং মানবিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ ‘সূরা বাকারাহ, আয়াত ২৭৫)। নবী (সা.) ঘুসদাতা ও ঘুসগ্রহীতা উভয়ের ওপর লানত করেছেন।

ন্যায় ও মানবকল্যাণের প্রশ্নে জাতি, বর্ণ, ধর্ম ও শ্রেণিভেদে বৈষম্যের করার সুযোগ নেই। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান-সব মানুষই ন্যায়বিচার ও সম্মান পাওয়ার অধিকার রাখে। কোনো রাজনৈতিক স্বার্থে বিভাজন, দমনপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পার। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সে-ই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক তাকওয়াবান’ (সূরা হুজুরাত, আয়াত ১৩)।

তেমনি ইসলাম অশ্লীলতা, নৈতিক অবক্ষয় ও অবাধ সম্পর্কের বিপক্ষে; পরিবার, সামাজিক শৃঙ্খলা ও নৈতিক মূল্যবোধের পক্ষে। কারণ সুস্থ পরিবারই একটি সুস্থ সমাজ ও সভ্যতার ভিত্তি। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয় না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্ট পথ’ (সূরা ইসরা, ৩২)।

শিশুশ্রম, যুদ্ধ, গণহত্যা এবং নিরীহ মানুষের ওপর জুলুম-নিপীড়নের কঠোর বিরোধিতা করা হয়েছে ধর্মে। পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে অন্যায় ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড কলঙ্কস্বরূপ। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তোমার ভাইকে সাহায্য করো, সে জালিম হোক বা মজলুম।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘মজলুমকে সাহায্য করা বুঝলাম, কিন্তু জালিমকে কীভাবে সাহায্য করব?’ তিনি বললেন, ‘তাকে জুলুম থেকে বিরত রাখার মাধ্যমে সাহায্য করো।’

প্রকৃত মানবতা কখনো অন্যায়, জুলুম, দুর্নীতি ও নৈতিক অবক্ষয়কে প্রশ্রয় দেয় না; বরং সত্য, ইনসাফ, নৈতিকতা ও মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে ওঠে। তাই সমাজ, রাষ্ট্র ও মানবতার প্রকৃত কল্যাণ চাইলে আমাদের উচিত সৃষ্টিকর্তার ন্যায়ভিত্তিক বিধান, সততা, জবাবদিহি ও নৈতিক মূল্যবোধকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করা। কারণ ইনসাফ ও নৈতিকতাই পারে একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে।

এ এম

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ