উত্তরপ্রদেশে আবারও যোগী প্রশাসনের ‘বুলডোজার নীতি’র নিষ্ঠুর শিকার হলো মুসলিমদের একটি ধর্মীয় উপাসনালয়। এবার কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই গভীর রাতের আঁধারে বুলডোজার চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ঐতিহাসিক এক মসজিদ। বিরোধী দলগুলোর তীব্র বাধা এবং প্রতিবাদের তোয়াক্কা না করেই মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঐতিহ্যবাহী কাঠামোটি ধূলিসাৎ করে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। এই বর্বরোচিত ঘটনাটি ঘটেছে উত্তরপ্রদেশের সম্ভল জেলার নাখাসা থানা এলাকার কাসেরওয়া গ্রামে।
হৃদয়বিদারক এই ঘটনার পর স্থানীয় মুসলিমদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। অন্যায্য এই উচ্ছেদ অভিযানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাসেরওয়া গ্রামে অবস্থিত ‘মুস্তফা কাদরি মসজিদ’ লক্ষ্য করে গভীর রাতে আচমকাই ভারী পুলিশ ফোর্স নিয়ে হানা দেয় জেলা প্রশাসন। দুটি বিশাল বুলডোজার নিয়ে মসজিদের ওপর চালানো হয় তাণ্ডব। প্রশাসনের দাবি, মসজিদটি নাকি সরকারি জমিতে ‘অবৈধভাবে’ নির্মাণ করা হয়েছিল।
কর্মকর্তারা অজুহাত দেখিয়েছেন যে, ওই জমিটি মূলত গ্রাম সভার এবং তা কবরস্থানের জন্য সংরক্ষিত ছিল। এর আগেও মসজিদের একটি অংশ ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, আর এবার রাতের অন্ধকারে বাকি অংশটুকুও মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হলো।
প্রশাসনের এই কাপুরুষোচিত অভিযানের টাইমিং নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার দিনই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল পূর্বের ভাঙচুরের ঘটনা পরিদর্শন করতে ওই গ্রামে অবস্থান করছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কংগ্রেস প্রতিনিধি দল গ্রাম থেকে বের হওয়া মাত্রই প্রশাসন পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে এবং চিরুনি অভিযান শুরু করে।
শুধু মসজিদ ভাঙাই নয়, ঘটনার পরপরই অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে সমস্ত ধ্বংসাবশেষ ও রাবিশ ট্রাকে করে সরিয়ে ফেলা হয়, যাতে সেখানে কোনো মসজিদের অস্তিত্ব ছিল—তার প্রমাণও না থাকে। প্রশাসনের এই অতি-তৎপরতাকে ‘প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা’ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।
প্রশাসনের এই একতরফা ও অত্যাচারী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ফেটে পড়েছেন সমাজবাদী পার্টির প্রভাবশালী নেতা জিয়া-উর-রেহমান বার্ক। সরকারি দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “প্রশাসন ক্ষমতার অপব্যবহার করে জঘন্য অপরাধ করেছে। যে জমিতে মসজিদ ছিল, তা কোনো সরকারি জমি নয়; বরং সেটি ওয়াকফ বোর্ডের বৈধ সম্পত্তি। আমরা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে চুপ থাকব না, বিষয়টি নিয়ে আমরা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছি।”
কংগ্রেস এবং সমাজবাদী পার্টি যৌথভাবে অভিযোগ করেছে যে, কোনো আইনি প্রক্রিয়া বা আদালতের চূড়ান্ত নির্দেশ ছাড়াই সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং মুসলিম সমাজকে উস্কানি দিতেই এই বুলডোজার অ্যাকশন চালানো হয়েছে।
এদিকে মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার আরও একটি নতুন চক্রান্ত শুরু করেছে যোগী রাজ্যের পুলিশ। উচ্ছেদ অভিযানের সময় মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে নাকি “আই লাভ মোহাম্মদ” লেখা কিছু পোস্টার উদ্ধার করা হয়েছে—এমন দাবি করে ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে প্রশাসন।
জেলা পুলিশ সুপারের (এসপি) বিশেষ নির্দেশে এই পোস্টারকে কেন্দ্র করে মুসলিমদের বিরুদ্ধে একটি নতুন মামলা দায়ের করা হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদ দমাতেই এখন নিরীহ মুসলিম যুবকদের এই মামলায় ফাঁসানোর নীল নকশা করা হচ্ছে।
রাতের অন্ধকারে একটি পবিত্র মসজিদ উধাও করে দেওয়ার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সম্ভলজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুরো এলাকায় বিপুল সংখ্যক সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
