চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি : দেশ স্বাধীনের দীর্ঘ ৫৪ বছরেও নিজ উপজেলা থেকে একজন এমপি পাইনি চৌগাছাবাসী। নির্বাচনের পর নির্বাচন গেছে চৌগাছাবাসী কেবল বঞ্চিতই থেকে গেছে। বার বার কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের কাছে ধরনা দিয়েও চৌগাছা থেকে সংসদ সদস্য পদে মনোনয়ন নিয়ে আসতে পারেনি বড় তিন দলের নেতারা । অথচ দেশ স্বাধীনের পূর্বে পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরে চৌগাছা উপজেলার তিন তিনজন কৃতি সন্তান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তারা হলেন উপজেলার নারায়ণপুর গ্রামের খান বাহাদুর আব্দুল আজিজ, চৌগাছা শাহাদৎ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক ও ইছাপুর গ্রামের কৃতি সন্তান মোবারক আলী এবং সিংহঝুলি গ্রামের শহীদ মসিয়ূর রহমান। এদের মধ্যে শহীদ মসিয়ূর রহমান ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে এম এল এ নির্বাচিত হয়ে প্রাদেশিক সরকারের আইন ও বিচার বিভাগের মন্ত্রী হয়েছিলেন। রাজনীতির ইতিহাসে সমৃদ্ধশালী এমন একটা উপজেলার মানুষকে কিভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে দুরে রাখা যায় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ চৌগাছা উপজেলা। এক দুই বছর নয়, দীর্ঘ অর্ধ শতাব্দী ধরে চৌগাছার মানুষগুলোকে রাজনৈতিক ভাবে দেউলিয়া করে রাখা হয়েছে। দেশ স্বাধীনের পর বিগত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে ১২ টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চৌগাছা উপজেলা থেকে কোন প্রার্থী করেনি বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো। আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও চৌগাছা উপজেলা থেকে এমপি পদে মনোনয়ন পাবার সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। চৌগাছাবাসী এমন দূর্ভাগা যে,সংসদীয় আসনের বাইরে থেকে প্রার্থী নিয়ে আসলেও চৌগাছা উপজেলার কোন রাজনৈতিক নেতার ভাগ্যের শিঁকে ছেড়েনি। এক তথ্যানুসন্ধানে জানাযায় দেশ স্বাধীনের পর প্রথম নির্বাচন হয় ১৯৭৩ সালে। তখন বৃহত্তর যশোরের এ আসন ছিল জাতীয় সংসদের ৮৩ তম আসন এবং যশোর- ৬। ১৯৭৩ সালের সেই নির্বাচনে আওয়ামীলীগের নৌকা প্রতিক নিয়ে নির্বাচিত হন তৎকালীন আওয়ামীলীগের বিশিষ্ট নেতা আবুল ইসলাম । এরপর ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সে সময় বৃহত্তর যশোরের এ আসন ছিল জাতীয় সংসদের ৮৭তম আসন এবং যশোরের ছিল ৬ নং আসন। সে নির্বাচনে যশোর শহর থেকে অ্যাডভোকেট বদরুল আলাকে ধার করে নিয়ে এসে প্রার্থী করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি ) এবং এ্যাডভোকেট বদরুল আলা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৬ সালে। এসময় জাতীয় সংসদে এ আসনের অবস্থান হয় ৮৬ এবং যশোর-২, সীমানা হয় ঝিকরগাছা উপজেলার ১১টি ও চৌগাছা উপজেলার ১১ টি ইউনিয়ন অর্থাৎ ২২ টি ইউনিয়ন নিয়ে হয় এ আসন।এখন পর্যন্ত এ অবস্থান টিকে আছে। এ নির্বাচনে নির্বাচিত হয় জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ঝিকরগাছা উপজেলার মকবুল হোসেন। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত হয় জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী ঝিকরগাছা উপজেলার মীর শাহাদাতুর রহমান। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত হন আওয়ামীলীগ মনোনীত ঝিকরগাছা উপজেলার অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত ঝিকরগাছা উপজেলার অ্যাডভোকেট কাজী মনিরুল হুদা নির্বাচিত হন । একই বছর অর্থাৎ ১৯৯৬ সালে ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামীলীগ মনোনীত ঝিকরগাছা উপজেলার অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম আবারো নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত তথা চারদলীয় জোট থেকে নির্বাচিত হন ঝিকরগাছা উপজেলার আবু সাঈদ মুহাম্মদ শাহাদৎ হুসাইন। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ মনোনীত ঝিকরগাছা উপজেলার মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ মনোনীত ঝিকরগাছা উপজেলার অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ মনোনীত ঝিকরগাছা উপজেলার মেজর জেনারেল (অব:) অধ্যাপক ডাক্তার নাসির উদ্দিন নির্বাচিত হন।সর্বশেষ ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ঝিকরগাছা উপজেলার ডা. তুহিনুর রহমান। সবচেয়ে আশ্চর্য্য বিষয় হচ্ছে নির্বাচিত প্রার্থীদের যারা নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী ছিলেন তাদের সবার বাড়িও ঝিকরগাছা উপজেলায়। অর্থাৎ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে ১২ টি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তার কোনটিতেই ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দল কেউই চৌগাছা উপজেলা থেকে প্রার্থী দেইনি। বলা চলে রাজনৈতিক দলগুলোর নিকট চৌগাছা উপজেলার কোন কানাকড়ি মুল্য নেই। সেকারনে এক দুই বছর নয় দীর্ঘ ৫৪ বছর ধরে অবহেলার শিকার হয়েছে চৌগাছাবাসী। এব্যাপারে জানতে চাইলে চৌগাছা উপজেলার বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ সিংহঝুলি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা সামছুল আরিফ শান্তি মিয়া বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে সব বড় রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব চৌগাছাবাসীর সাথে বিমাতাসুলভ আচারণ করেছে। সেকারণে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরেও চৌগাছা থেকে সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী করেনি বড় রাজনৈতিক দলগুলো। অপরদিকে চৌগাছা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি জহুরুল ইসলাম যিনি বিএনপির একমাত্র নেতা যার হাত ধরেই চৌগাছা উপজেলায় বিএনপির গণভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয় । বিএনপির অনেক নেতারা এরশাদের আমলে জাতীয় পার্টিতে ঢু মারলেও একমাত্র জহুরুল ইসলাম বিএনপি ছেড়ে অন্য কোন দলে যোগ দেননি। তিনি বলেন,সংসদ নির্বাচনে চৌগাছা থেকে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন পেতে অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মন গলাতে পারিনি। দেখি আগামী নির্বাচনে কেন্দ্রের সুদৃষ্টি চৌগাছাবাসীর উপর পড়ে কিনা। উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও হাকিমপুর ইউনিয়নের তিনবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান মাসুদুল হাসান বলেন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চৌগাছা উপজেলা থেকে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দিতে দলের হাইকমান্ডের কাছে জোর দাবী জনাচ্ছি। তরুণ রাজনীতিবিদ উপজেলা কৃষকদলের সাধারণ সম্পাদক শাহিনুর রহমান শাহিন বলেন চৌগাছা উপজেলায় অনেক যোগ্যতাসম্পন্ন নেতা থাকতেও কেন্দ্র কি কারনে চৌগাছা উপজেলা থেকে দলীয় মনোনয়ন দেয় না তা আমি বুঝলাম না। যুবদল নেতা এম ইলিয়াস আলী,তুহিনুর রহমান বিএনপি নেতা আব্দুর রহিমসহ আরো অনেকে চৌগাছা উপজেলা থেকে সংসদ প্রার্থী দেওয়ার দাবী জানান। উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা গোলাম মোরশেদ বলেন, ঝিকরগাছা উপজেলা থেকে চৌগাছা উপজেলায় কিছু ভোট কম থাকার কারণে চৌগাছা উপজেলা থেকে প্রার্থী দিতে চাইনা কেন্দ্র। তিনি বলেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য জামায়াতের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়ে গেছে, তিনি হলেন যশোর শহরের খড়কি পীর বাড়ির সন্তান ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ। তিনি বলেন, আমাদের কাছে কে কোন উপজেলার এটা কোন ফ্যাক্টর না। আসল ব্যাপার হচ্ছে যাকে প্রার্থী করা হচ্ছে তিনি সৎ এবং যোগ্যতা সম্পন্ন কিনা সেটাই দেখার বিষয়। চৌগাছা প্রেসক্লাবের সভাপতি অধ্যক্ষ আবু জাফর বলেন ,আসলে সংসদ নির্বাচনে চৌগাছা থেকে প্রার্থী না করা আওয়ামীলীগ,বিএনপি ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের একটা ইগোতে পরিনত হয়েছে। এ অবস্থার নিরসন হওয়া দরকার। চৌগাছা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রটারী মাস্টার কামাল আহমেদ বলেন, সৎ ও যোগ্য লোক নির্বাচিত হলে বৈসম্য থাকেনা সেক্ষেত্রে কে কোন উপজেলার এটা কোন বিষয় না। এছাড়া চৌগাছার শিক্ষক ,সাংবাদিক,রাজনীতিবিদ সকলের একই কথা অর্ধশত বছর পার হয়ে গেল অথচ একটি বারের জন্যও চৌগাছা থেকে কেউ এমপি নির্বাচিত হলো না এটা মানতে খুব কষ্ট লাগে । তাই চৌগাছার গণমানুষের দাবী আগামী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে চৌগাছা থেকে যেন বড় রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী মনোনয়ন দেয়। নির্বাচন,রাজনীতি, সারাদেশ
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
