দেশে ইলেকট্রিক ট্রেন!

প্রতিবেদন:

·

দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে রেল পরিবহন বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। বাষ্পচালিত ইঞ্জিন থেকে ডিজেল, আর ডিজেল থেকে বিদ্যুৎ—রেল যোগাযোগের এই বিবর্তনে এবার যুক্ত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশও। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও জয়দেবপুর রুটে দেশের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে কেন ইলেকট্রিক ট্রেন

বাংলাদেশ রেলওয়ের অধিকাংশ ট্রেন বর্তমানে ডিজেলচালিত ইঞ্জিনে পরিচালিত হয়। ডিজেলচালিত ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরতা কমানো, পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানো, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমানো এবং পরিবেশদূষণ কমানোর লক্ষ্যেই বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশনের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা ও জয়দেবপুর করিডোরে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু হলে জ্বালানি ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ কমতে পারে। একই সঙ্গে ট্রেনের গড় গতিবেগ ১৮ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই করিডোরটি রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও শিল্পসমৃদ্ধ এলাকাকে যুক্ত করেছে। এ পথে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক যাত্রী যাতায়াত করেন। প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন চালু হলে রেলের পরিবহন সক্ষমতা বাড়বে এবং সড়ক পরিবহনের ওপর চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে।

কীভাবে চলবে ইলেকট্রিক ট্রেন

বৈদ্যুতিক ট্রেনের জন্য রেললাইনের ওপর বিশেষ বৈদ্যুতিক তারের ব্যবস্থা করা হবে। ট্রেনের ছাদে থাকা প্যান্টোগ্রাফ নামের যন্ত্রের মাধ্যমে ওপরের তার থেকে বিদ্যুৎ সংগ্রহ করা হবে। এরপর সেই বিদ্যুৎ ট্রেনের বৈদ্যুতিক মোটর ও অন্যান্য ব্যবস্থা পরিচালনা করবে। অন্যদিকে ইএমইউ ট্রেনে আলাদা ভারী ইঞ্জিনের পরিবর্তে একাধিক কোচেই মোটর ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থাকতে পারে। ফলে দ্রুত গতি অর্জন এবং বারবার স্টেশনে থামা ও চলার মতো শহর ও শহরতলির রুটে এ ধরনের ট্রেন কার্যকর।

কোথায় কোথায় চলছে ইলেকট্রিক ট্রেন

ইউরোপে সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, যুক্তরাজ্যসহ বহু দেশে বৈদ্যুতিক ট্রেন নিয়মিত যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করছে। এশিয়ায় চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াতেও ব্যাপকভাবে বৈদ্যুতিক রেল চালু রয়েছে। জাপানের শিনকানসেন থেকে চীনের উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক, আধুনিক রেল পরিবহনের বড় একটি অংশই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশে প্রথম ধাপ কোথায়

বাংলাদেশে প্রথম ধাপে নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা ও জয়দেবপুরের ৫২ দশমিক ৩২ কিলোমিটার রেলপথকে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশনের আওতায় আনা হচ্ছে। এ রুটে বৈদ্যুতিক তার, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, ইএমইউ ট্রেন এবং রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা গড়ে তোলা হবে। তবে এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের বৃহত্তর পরিকল্পনায় নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং টঙ্গী, জয়দেবপুরসহ আরো রেলপথে ভবিষ্যতে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন চালুর সম্ভাব্যতা নিয়ে কাজ হয়েছে।

গতি ও সময় কতটা কমবে

বৈদ্যুতিক মোটরের বড় সুবিধা হলো দ্রুত গতি অর্জন। ফলে শহর ও শহরতলির রুটে ঘনঘন স্টেশনে থামতে হলেও ইএমইউ ট্রেন কার্যকরভাবে চলতে পারে। বাংলাদেশের প্রস্তাবিত প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশনে ট্রেনের গড় গতিবেগ ১৮ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যয় কমার সম্ভাবনা রয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।

পরিবেশের ওপর প্রভাব

বৈদ্যুতিক ট্রেন চলার সময় ডিজেল ইঞ্জিনের মতো সরাসরি ধোঁয়া ও নিষ্কাশন গ্যাস নির্গত করে না। তবে এর পরিবেশগত সুবিধা কতটা হবে, তা বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎসের ওপরও নির্ভর করে। বাংলাদেশের প্রকল্পে ডিজেলের ব্যবহার কমানো, বায়ুদূষণ ও গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো এবং রেলের শক্তি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।

বড় চ্যালেঞ্জ কোথায়

বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু করতে শুধু নতুন ট্রেন কেনাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, উপকেন্দ্র, ওপরের বৈদ্যুতিক তার, সংকেত ও নিরাপত্তাব্যবস্থার সমন্বয়। পাশাপাশি ইএমইউ ট্রেন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দক্ষ কারিগরি জনবল তৈরি করতে হবে। অর্থাৎ এটি শুধু নতুন ট্রেন কেনার প্রকল্প নয়, বরং বাংলাদেশের রেল অবকাঠামো ও পরিচালন ব্যবস্থায় একটি বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন।

রেলে প্রযুক্তির নতুন অধ্যায়

১৮৭৯ সালে বার্লিনের একটি প্রদর্শনীতে শুরু হওয়া বৈদ্যুতিক রেলের যাত্রা আজ চীন, ভারত, জাপান ও ইউরোপের বিস্তীর্ণ রেল নেটওয়ার্কে বাস্তবতার অংশ। বাংলাদেশে সেই প্রযুক্তির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা ও জয়দেবপুর করিডোর দিয়ে। রেলপথে বাংলাদেশের এই বিদ্যুতায়নের সাফল্য নির্ভর করবে বিদ্যুৎ সরবরাহ, অবকাঠামো, দক্ষ জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর। তবে একনেকের অনুমোদনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রেল যোগাযোগে ডিজেল থেকে বৈদ্যুতিক প্রযুক্তিতে রূপান্তরের আনুষ্ঠানিক দরজা খুলে গেল।