রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাংবাদিকতায় আগ্রহী নবীন শিক্ষার্থীদের নিয়ে পাঁচ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু)। কর্মশালা শেষে ২৮ জন শিক্ষার্থীকে সাংবাদিক ফেলোশিপ ও সনদ প্রদান করা হয়েছে।
শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনস কমপ্লেক্সের কনফারেন্স কক্ষে রাকসুর মিডিয়া ও প্রকাশনা বিভাগের আয়োজনে কর্মশালার সমাপনী ও সনদ বিতরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে রাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, সাংবাদিকতার গুরুত্ব অপরিসীম। অনেক বড় সাংবাদিকের পাশাপাশি অসংখ্য লেখক ও সাহিত্যিকও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের সাহিত্যকর্ম ও চিন্তাচর্চায় সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সক্রেটিসের ‘Know Thyself’ বা ‘নিজেকে জানো’ উক্তির উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “আমাদের একজন লেখক ছিলেন, যিনি মাত্র দুটি শব্দ বলেছিলেন—‘Know Thyself’, অর্থাৎ ‘নিজেকে জানো’। জানেন, তিনি কে? তিনি সক্রেটিস। তাঁর চেহারা প্রচলিত সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে আকর্ষণীয় ছিল না। কথিত আছে, তাঁর স্ত্রী প্রায়ই তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন। কিন্তু সারা দেশের তরুণেরা তাঁর কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করতেন। তিনি এত সুন্দর কথা বলতেন যে, ‘নিজেকে জানো’—এই দুটি শব্দই যথেষ্ট ছিল। সেই প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত এই কথাটি মানুষের মনে গেঁথে আছে। আমরা বিভিন্ন বক্ততায়ও এর উদাহরণ দিই।”
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত পঙ্ক্তি ‘পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?’-এর প্রসঙ্গ তুলে মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, “এটি লিখেছেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। আমরা তাঁকে একজন সাহিত্যিক হিসেবে জানি। কিন্তু পাশাপাশি এটাও জানতে হবে, তিনি ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। এমন একটি কালজয়ী পঙ্ক্তি রচনার পেছনে শুধু তাঁর সাহিত্যিক সত্তাই নয়, সাংবাদিকসত্তারও ভূমিকা ছিল।”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “আমরা তাঁকে একজন বড় কবি ও লেখক হিসেবে জানি। সাংবাদিকদের আমরা প্রায়ই বলি, ‘আপনারা সহজ করে লেখেন না কেন? এত ঘুরিয়ে বলেন কেন? সহজভাবে বলে দেন।’ অথচ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই বলেছিলেন, ‘সহজ কথা বলতে আমায় কহ যে, সহজ কথা যায় না বলা সহজে।’ তিনি শুধু কবি ছিলেন না, ‘সাধনা’ পত্রিকার সম্পাদকও ছিলেন। কিন্তু তাঁর এই পরিচয়টি আমরা অনেক সময় ভুলে যাই। তাঁর সাহিত্যিক সত্তার বিকাশে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।”
তিনি আরও বলেন, অনেক বড় কবি ও লেখক সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের হাত ধরেই বাংলা সাহিত্য ও ভাষার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান যুক্ত হয়েছে।
কাজী নজরুল ইসলামের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে রাকসুর ভিপি বলেন, “তিনি ‘নবযুগ’, ‘লাঙল’ ও ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি কীভাবে এমন অসাধারণ কবিতা লিখলেন, তা বুঝতে হলে তাঁর সাহিত্যিক সত্তার পাশাপাশি সাংবাদিকসত্তাকেও বিবেচনায় নিতে হবে। তাঁর লেখায় যে বিদ্রোহী চেতনা, সাহস ও শক্তিশালী ভাষার প্রকাশ ঘটেছে, তার পেছনে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাও ভূমিকা রেখেছে। শুধু কবিসত্তা দিয়ে তাঁর সৃষ্টিকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।”
বাংলা ভাষার বিকাশে প্রমথ চৌধুরীর অবদান তুলে ধরে তিনি বলেন, “বাংলা সাহিত্যে যখন সাধুভাষার প্রচলন বেশি ছিল, তখন অনেকের কাছে সেই ভাষায় লেখা সাহিত্য পড়া কঠিন মনে হতো। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা পাঠকের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথের অনেক লেখার ভাষা সাধারণ পাঠকের কাছে কঠিন মনে হতো। সেই সময়ে প্রমথ চৌধুরী চলিত ভাষার প্রচলন ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।”
তিনি আরও বলেন, “তিনি বলেছিলেন, ‘জীবনে লেখামি আর সাহিত্যে নেকামি আমি পছন্দ করি না।’ তাঁর ভাষাচর্চা শুধু সাহিত্যিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি ‘সবুজপত্র’ পত্রিকার সম্পাদকও ছিলেন। বাংলা ভাষার বিকাশে তাঁর সাংবাদিকসত্তারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।”
বিশ্বসাহিত্যে সাংবাদিকদের অবদানের কথা তুলে ধরে মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, “বাংলা সাহিত্য ও ভাষার ইতিহাসে সাংবাদিকেরা এভাবেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। শুধু বাংলা সাহিত্য নয়, বিশ্বসাহিত্যেও সাংবাদিকতার অবদান অনেক। আপনারা দেখবেন, অনেক নোবেলজয়ী সাহিত্যিক সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁরা তাঁদের লেখায় সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন অসংগতি তুলে ধরেছেন এবং ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করেছেন। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের কথাই ধরুন। তাঁর ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়। তাঁর সাহিত্যকর্মের পেছনে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।”
সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার পারস্পরিক সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “আমরা যাঁদের ব্যঙ্গাত্মক লেখক বলি, যাঁরা সরকারের সমালোচনা করেন কিংবা সমাজের অসংগতি তুলে ধরেন, তাঁদের অনেকেই সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের সাহিত্যকর্মে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা ও সমাজ পর্যবেক্ষণের প্রভাব দেখা যায়। তাঁদের সাহিত্যিক ও সাংবাদিকসত্তা একসঙ্গে মিলে এমন সব রচনা সৃষ্টি করেছে, যা সারা বিশ্বের অসংখ্য পাঠককে প্রভাবিত করেছে।”
নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে রাকসুর ভিপি বলেন, “এ জন্যই আমি বলি, আপনারা সাংবাদিকতাকে প্যাশন হিসেবে নেবেন। আগামী দিনে সাংবাদিকতা পেশার মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে আপনারাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। দেশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে আপনাদের অবদান ছড়িয়ে পড়ুক—এটাই প্রত্যাশা।”
সাংবাদিকতায় ছাত্রীদের অংশগ্রহণে উৎসাহিত সাবেক জনসংযোগ প্রশাসক
অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক আখতার হোসেন মজুমদার নবীন শিক্ষার্থীদের সাংবাদিকতায় আগ্রহ ও বিশেষ করে ছাত্রীদের অংশগ্রহণে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, “এখানে যারা নতুন করে সাংবাদিকতা শুরু করেছে, তাদের মধ্যে বিশেষ করে ছাত্রীদের দেখে আমি খুবই উৎসাহিত হয়েছি। আমি যখন সাংবাদিকতায় ছিলাম, তখন যাদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি, তাদের মধ্যে মাত্র একজন ছাত্রীকে দেখেছিলাম। পরে আরও দুজন ছাত্রী নতুন করে শুরু করেছিল। এখন এখানে নতুনদের মধ্যে ছয়জনকে দেখা যাচ্ছে। এটি খুবই উৎসাহব্যঞ্জক। আশা করি, সবাই ভালো করবে। সবার জন্য শুভকামনা রইল।”
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
