মঙ্গলবার রাতটা (বাংলাদেশ সময়) বিশ্বকাপের অন্য রাতের মতো ছিল না। এ রাতে পৃথক ম্যাচে মাঠে নেমেছিলেন নতুন প্রজন্মের দুই তারকা- কিলিয়ান এম্বাপে ও আর্লিং হলান্ড। নিউইয়র্ক, বোস্টন থেকে তারা যখন ফুটবল বিশ্বে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার বার্তা দিচ্ছিলেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের আরেক প্রান্তে কানসাস সিটিতে সবার নজর ছিল লিওনেল মেসির দিকে।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে মাঠে নেমে নতুনদের উদ্দেশে মেসি যেন সেই চিরাচরিত বার্তাটিই দিলেন- ‘সেরা হতে চাইলে আগে সেরাকে হারাতে হবে।’
কয়েক ঘণ্টা আগেই বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় মেসিকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন এম্বাপে। অন্যদিকে ইরাকের বিপক্ষে দুই গোল করে বিশ্বমঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা দেন হলান্ড। তখন মনে হচ্ছিল, বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকার আসনটি দখল করতে নতুন প্রজন্মের এই দুই নক্ষত্র প্রায় প্রস্তুত।
গোলের পর এম্বাপের উদযাপন। ছবি: এএফপি
কয়েকদিনের মধ্যে ৩৯ বছরে পা দিতে যাওয়া মেসি কিংবা ৪১ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে অনেকেই অতীতের অধ্যায় হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। এমন সময়ে বিশ্বমঞ্চে হ্যাটট্রিক করে মেসি যেন নিজের দাপটের কথা আরেকবার জানান দিলেন।
প্রথমে তিনি বিশ্বকাপে গোল সংখ্যার তালিকায় এম্বাপেকে ছাড়িয়ে যান। এরপর নিজের প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক পূর্ণ করে ১৬ গোল নিয়ে যৌথভাবে শীর্ষস্থানে ওঠেন। সেখানে তাঁর সঙ্গী জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসে। আরেকটি বিরল কীর্তিও গড়েছেন মেসি। তিনিই এখন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী এবং সবচেয়ে বেশি বয়সী গোলদাতা।
ম্যাচে লিওনেলের প্রথম গোল পেতে খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি। সেই গোলটি ছিল অসাধারণ এক শট, যা নিঃসন্দেহে এবারের বিশ্বকাপের সেরা মুহূর্তগুলোর তালিকায় জায়গা করে নেবে। মাঠের মাঝখান দিয়ে বাড়ানো একটি থ্রু বল পেয়ে মেসি বক্সের দিকে এগিয়ে যান। তাঁকে ঘিরে ধরতে এগিয়ে আসেন পাঁচজন আলজেরিয়ান ডিফেন্ডার। ঠিক তখনই তিনি বাম দিকে এক পা সরিয়ে জোরালো শট নেন। প্রায় ২০ গজ দূর থেকে নেওয়া সেই শট গোলরক্ষক লুকা জিদানের আঙুল ছুঁয়ে জালে জড়ায়।
গোলটির পর অনেক দর্শকের মনেই দোলা দেয়- ‘এটাই যেন সেই চিরচেনা মেসি। সেই জাদুকর মেসি’।
দ্বিতীয় গোলের শট নিচ্ছেন মেসি। ছবি: এএফপি
মেসি দ্বিতীয় গোলের দেখা পান দ্বিতীয়ার্ধ শুরুর ১৫ মিনিট পর। তখন তাঁকে দেখা যায় বার্সেলোনার সেই ‘সুযোগসন্ধানী স্ট্রাইকার’ রূপে। বক্সের প্রায় ৩০ গজ বাইরে থেকে আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার জোরালো শট নেন। বলটি সোজা আলজেরিয়ার গোলরক্ষকের দিকে গেলেও শটের গতি সামলাতে পারেননি। বল ছিটকে বেরিয়ে আসতেই তা লুফে নেন মেসি। আলজেরিয়ার এক ডিফেন্ডারের অসতর্কতার কারণে অনসাইডে থাকা মেসি সহজেই বল জালে পাঠিয়ে আর্জেন্টিনাকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। এটি ছিল এমন এক কিংবদন্তির গোল, যিনি এখনো পায়ের মতোই মস্তিষ্ক দিয়ে খেলেন।
তৃতীয় গোলটি যেন প্রথম দুই গোলেরই আরেক রূপ। ততক্ষণে আলজেরিয়ার রক্ষণভাগ মেসি ও তাঁর সতীর্থদের চাপে বিধ্বস্ত। ফলে ওই সময় বক্সের কিনারায় কেউই আর মেসিকে মার্ক করতে যাননি। উইং থেকে নিকো গনজালেসের বাড়ানো পাসটি মেসির পেছনের দিকে ছিল। কিন্তু ক্লান্ত আলজেরিয়ান ডিফেন্ডাররা তা প্রতিহত করার কোনো তাড়াহুড়োই দেখাননি। সে সুযোগে মেসি পা বাড়িয়ে বল নিয়ন্ত্রণে নেন, অর্ধেক ঘুরে নিচু শটে বল পাঠিয়ে দেন জালের কোণে। সেখানেই ম্যাচের নিষ্পত্তি হয়ে যায়।
আগের ম্যাচগুলোতে কিলিয়ান এম্বাপে ও আর্লিং হলান্ডের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর মহাতারকা লিওনেল মেসির কাছে থেকেও একই মানের কিছু দেখার প্রত্যাশা ছিল সবার। ফ্রান্সের হয়ে এম্বাপের জোড়া গোল সামর্থ্যের পুরো ঝলক দেখিয়েছে। তাঁর দ্বিতীয় গোলটিতে ফুটে ওঠে অসাধারণ দক্ষতার পরিচয়। প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে নেওয়া শক্তিশালী শট সেনেগালের গোলরক্ষক এদুয়ার মেন্ডিকে পরাস্ত করে জালে জড়ায়।
প্রথম ম্যাচেই বিশ্বমঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা দিয়েছেন আর্লিং হলান্ড। ছবি: এএফপি
অন্যদিকে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ম্যাচেই জোড়া গোল করে নিজের কার্যকারিতা দেখিয়েছেন হলান্ড। প্রথমে নিখুঁত এক ক্রসে স্লাইড করে বল জালে পাঠিয়ে নরওয়ের হয়ে গোলের সূচনা করেন। এরপর ইরাকের এক ডিফেন্ডারের ঢিলেঢালা ব্যাকপাসে দ্রুত ঝাঁপিয়ে পড়ে গোলরক্ষকের আগে বল দখলে নিয়ে দ্বিতীয় গোলটি করেন। শেষ পর্যন্ত নরওয়ে ম্যাচটি ৪-১ ব্যবধানে জেতে।
বিশ্বকাপের এমন এক রাতে যখন একের পর এক তারকা আলো ছড়াচ্ছিলেন, তখন অনেকেরই মনে হচ্ছিল বিশ্ব ফুটবলে নেতৃত্ব বদলের সময় বোধহয় এসে গেছে। মেসি ও রোনালদো এত দীর্ঘ সময় ধরে আধিপত্য ধরে রেখেছেন যে, নিজেরাই তাদের উত্তরসূরির উত্থান-পতন দেখেছেন। এবার তারা দুজনই ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপ খেলছেন।
তবে এম্বাপেকে অনেকেই মেসি-রোনালদোর প্রকৃত উত্তরসূরি হিসেবে দেখেন। অপরদিকে হলান্ড নিজেকে বিশ্বের সেরা ও নিখুঁত স্ট্রাইকারদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তারা নিঃসন্দেহে উজ্জ্বল নক্ষত্র।
কিন্তু কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে ম্যাচ শেষ হওয়ার ১১ মিনিট আগে যখন মেসি মাঠ ছাড়েন এবং দর্শকদের বজ্রধ্বনির মতো করতালিতে বিদায় নেন, তখন তিনি আবারও মনে করিয়ে দেন- এম্বাপে, হলান্ড কিংবা অন্যরা হয়তো তারকা, কিন্তু ফুটবল নামের এই মহাবিশ্ব এখনো সেই সূর্যকে ঘিরে আবর্তিত হয়। যে সূর্যের নাম লিওনেল মেসি।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
