ইসলামী ডেস্ক : আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও কল্যাণ লাভ করা প্রতিটি মুমিনের সবচেয়ে বড় কামনা। কিন্তু আল্লাহর রহমত সব সময় সম্পদ, আরাম-আয়েশ বা বাহ্যিক সফলতার মাধ্যমে প্রকাশ পায় না। অনেক সময় পরীক্ষা, কষ্ট, তৌফিক, ইমান, তাকওয়া এবং নেক আমলের সুযোগই হয়ে ওঠে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের নিদর্শন। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা একজন বান্দার প্রতি আল্লাহর কল্যাণকামিতার ইঙ্গিত বহন করে।
১. মৃত্যুর আগে নেক আমল
আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তাকে মৃত্যুর আগে সৎকাজ করার সুযোগ করে দেন এবং উত্তম অবস্থায় তার কাছে ফিরিয়ে নেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِعَبْدٍ خَيْرًا اسْتَعْمَلَهُ
‘আল্লাহ যখন কোনো বান্দার কল্যাণ চান, তখন তিনি তাকে (নেক কাজে) নিয়োজিত করেন।’
সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, কীভাবে?
يُوَفِّقُهُ لِعَمَلٍ صَالِحٍ قَبْلَ الْمَوْتِ ثُمَّ يَقْبِضُهُ عَلَيْهِ
‘আল্লাহ যখন কোনো বান্দার কল্যাণ চান, তখন তাকে সৎকাজের তৌফিক দান করেন। এরপর সেই নেক আমলের অবস্থায়ই তার মৃত্যু ঘটান।’ (তিরমিজি ২১৪২)
২. তাকে ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন
আল্লাহ যাকে হেদায়েত দিতে চান, তার হৃদয়কে ইসলামের জন্য প্রশস্ত করে দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَمَنْ يُرِدِ اللَّهُ أَنْ يَهْدِيَهُ يَشْرَحْ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ
‘আল্লাহ যাকে হেদায়েত দিতে চান, তার বক্ষ ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন।’ (সুরা আল-আনআম: আয়াত ১২৫)
৩. তাকে বিপদ-আপদের মাধ্যমে সতর্ক করেন
মুমিনের জীবনের অনেক বিপদই আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কতা, শিক্ষা এবং তাঁর দিকে ফিরে আসার সুযোগ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُصِبْ مِنْهُ
‘আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে তিনি বিপদ-আপদে পরীক্ষা করেন।’ (বুখারি ৫৬৪৫)
৪. পরীক্ষা ও কষ্টের মাধ্যমে তাকে পরিশুদ্ধ করেন
পরীক্ষা মুমিনের গুনাহ মোচন করে এবং তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ… إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ
‘মুসলিমের ওপর যে ক্লান্তি, কষ্ট, দুঃখ, রোগ কিংবা দুশ্চিন্তাই আসে, আল্লাহ এর মাধ্যমে তার গুনাহ মাফ করে দেন।’ (বুখারি ৫৬৪১, মুসলিম ২৫৭৩)
৫. তাকে তাকওয়ার পথে পরিচালিত করেন
তাকওয়াই আল্লাহর নিকট মর্যাদার প্রকৃত মানদণ্ড। আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।’ (সুরা আল-হুজুরাত: আয়াত ১৩)
৬. তাকে সত্যবাদী ও নেককার সঙ্গী দান করেন
সৎ মানুষের সঙ্গ ইমানকে শক্তিশালী করে এবং নেক আমলে উৎসাহ দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ
‘হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাক।’ (সুরা আত-তাওবা: আয়াত ১১৯)
৭. তাকে দ্বীনের জ্ঞান দান করেন
দ্বীনের সঠিক জ্ঞান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ
‘আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন।’ (বুখারি ৭১, মুসলিম ১০৩৭
৮. তার অন্তরে প্রকৃত প্রশান্তি দান করেন
প্রকৃত শান্তি ধন-সম্পদে নয়, আল্লাহর স্মরণে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয় প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা আর-রা’দ: আয়াত ২৮)
৯. সম্পদ, সন্তান ও নিজের মাধ্যমে পরীক্ষায় ফেলেন
আল্লাহ অনেক সময় বান্দাকে তার সম্পদ, সন্তান কিংবা নিজের জীবন দিয়েও পরীক্ষা করেন, যাতে তার ইমানের দৃঢ়তা প্রকাশ পায়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ…
‘আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৫৫)
১০. তার অন্তরে বিনয় ও নম্রতা সৃষ্টি করেন
নম্রতা একজন মুমিনের সৌন্দর্য এবং আল্লাহর প্রিয় গুণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللَّهُ
‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনয় অবলম্বন করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।’ (মুসলিম ২৫৮৮)
আল্লাহর কল্যাণ সব সময় বাহ্যিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের মাধ্যমে প্রকাশ পায় না। অনেক সময় নেক আমলের তাওফিক, ইমানের দৃঢ়তা, দ্বীনের জ্ঞান, তাকওয়া, সৎ সঙ্গ, হৃদয়ের প্রশান্তি, বিনয় এবং ধৈর্যের সঙ্গে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তার বিশেষ রহমত। তাই একজন মুমিনের উচিত শুধু দুনিয়ার আরাম কামনা না করে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের সফলতাকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য বানানো। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তার বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত ও প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
